Trial Run

মাদ্রাসাছাত্রকে মেরে ঢেকে রাখা হয়েছিল বিছানাপত্র দিয়ে!

ছবি : সমকাল

মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক একের পর এক শিশু বলাৎকার ও হত্যার ঘটনা মাদ্রাসা বিষয়ে দেশবাসীর নিকট এক নেতিবাচক মনোভাব তৈরী হয়েছে। এরইমধ্যে শোনা গেলো কুমিল্লার চান্দিনায় মাদরাসাতুল আবরার নামে একটি কওমি মাদরাসা থেকে এক ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১১টায় চান্দিনা উপজেলার বাড়েরা ইউনিয়নের নরসিংহপুর এলাকার ওই কওমি মাদরাসা থেকে ছাত্রদের বেডিং এর স্তূপের নিচ থেকে রায়হান হোসেন (১০) নামে ওই ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বলাৎকারের সময় মাদ্রাসাছাত্র রায়হানের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

দেশে নারীর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ঘটছে মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার ও হত্যা। প্রায় প্রতিদিনই মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক শিশু বলাৎকারের খবর আসে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকারে কেবল মাদ্রাসা শিক্ষককেরাই জড়িত থাকে না, মাদ্রাসার বড় ভাইদেরও লালসার শিকার হন মাদ্রাসায় আগত শিশুরা। বড় ভাইয়ের যৌন নির্যাতন থেকে নিরাপদ থাকা এইসব বাচ্চাদের জন্য অনেকটাই জটিল। রায়হান হত্যায় এসমস্ত বড় ভাইদের হাত থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা।

নিহত রায়হান হোসেন পার্শ্ববর্তী ডুমুরিয়া গ্রামের অটোরিকশাচালক মিজানুর রহমানের ছেলে।

নিহতের পিতা মিজানুর রহমান জানান, বুধবার বেলা ১১টায় মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে এসে খাবার খেয়ে দুপুর ১টায় মাদ্রাসায় চলে যায়। সন্ধ্যায় মাদ্রাসা থেকে ফোন করে জানায়, আমার ছেলে মাদ্রাসায় যায়নি। পরবর্তীতে আমরা বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করাসহ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। রাত সাড়ে ১০টার পর মাদ্রাসার এক শিক্ষক আমার বড়ভাই মোস্তফা মিয়ার ফোনে কল করে আমাদের মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য বলেন। আমরা মাদ্রাসায় যাওয়ার পর ছাত্রদের বেডিংয়ের স্তূপের নিচে আমার ছেলের মরদেহ দেখান।

মাদ্রাসার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ক্বারি হারুনুর রশিদ জানান, সন্ধ্যায় আমরা হাজিরা ডাকার সময় রায়হানকে না পেয়ে খোঁজ নেই। তাকে না পেয়ে আমরা তার বাড়িতে খবর দেই। রাতে মাদ্রাসার ছাত্ররা ঘুমাতে যাওয়ার সময় বেডিংয়ের স্তূপ থেকে তাদের বেডিং নেওয়ার সময় ওই ছাত্রকে দেখে আমাদের ডেকে দেখান। কিন্তু কীভাবে ওই ছাত্রের মৃত্যু ঘটেছে আমরা বলতে পারছি না।

চান্দিনা থানার ওসি শামসউদ্দীন মোহাম্মদ ইলিয়াছ জানান, রাতেই ঘটনাস্থল থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে লাশ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিক্ষকসহ ৪ জনকে থানায় আনা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য চেষ্টা চলছে।

তবে রায়হান হত্যা নিয়ে দেখা দিয়েছে রহস্য। পরিবারের অভিযোগ, রায়হানকে হত্যা করে বেডিংয়ের স্তুপের নিচে রাখা হয়েছে। তবে মাদ্রাসা শিক্ষক ও অন্যান্য ছাত্রদের দাবি, নিহত রায়হান ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তার ওপর অন্যান্য ছাত্ররা ভুলক্রমে বেডিং রাখায় চাপা পড়ে মৃত্যু ঘটেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদ্রাসা শিক্ষক ও ছাত্ররা যতটা সহজে ঘটনার বিবরণ দিলেন ঘটনা ততোটা সহজ নয়। একজন ছেলে বেডিংয়ের স্তুপের নিচে চাপা পড়ে যাওয়াটা অতোটা সহজভাবে দেখতে চান না তারা। তারা জানান, মাদ্রাসায় শিক্ষক ও সিনিয়র ছাত্র কর্তৃক বলাৎকারের ঘটনা প্রচলিত হওয়ায় রায়হান হত্যাকে অতোটা সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই। রায়হান হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন সহ মাদ্রাসায় শিশু হত্যা ও বলাৎকার বন্ধে সরকারের কঠোর নজরদারি ও যথাযথ ব্যবস্থা দাবি করেন।

মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন লেখক সাইফুল বাতেন টিটো। মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার নিয়ে গবেষণা করে তিনি ‘বিষফোঁড়া’ নামের একটি উপন্যাস লিখেছেন। রায়হান হত্যা বিষয়ে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্টেটওয়াচকে জানান, মাদ্রাসার শিশু বলে আজ এই ধর্ষণ হত্যা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলবে না, কারণ শিশুটি মাদ্রাসার। গতমাসে এমন দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে মাদ্রাসায়। সেসব নিয়ে কোথাও কোনো কথা শোনা যায়নি। কিন্তু যখন আনুশকাকে হত্যা করা হলো তখন আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম, পথে দাঁড়িয়েছিলাম, টক শোতে টেবিল ফাটিয়েছিলাম। সেইসবের বিরোধীতা করছি না অবশ্য, অন্যায়ের প্রতিবাদ যত হবে ততই ভালো। কিন্তু এই সব মাদ্রাসার হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেউ কথা বলে না।

তিনি বলেন, আমরা গরীবের শিশু হত্যার জন্যও পথে নামতে দেখেছি, টক শোতে  কথাও বলতে দেখেছি। বড় বড় কলামিস্টদের কলাম পড়েছি। কিন্তু এই গরীব শিশুদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেন ওসব হয় না? কারণ একটাই, ধর্ম। একজন মুসলমান আরেক মুসলমানের দোষ গোপন করে চলেছে পরকালের ভয়ে। এখন প্রতিটি গ্রামে গড়ে তিনটা মাদ্রাসা। অর্থাৎ বিশাল কমিউনিটি এদের বিপক্ষে সরকার যেতে চায় না। তাদেরকে সরকার খুব ভয় পায়। তাদের চাপেই তো পাঠ্য বই থেকে হিন্দু লেখকদের লেখা উধাও হয়ে যাচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের লেখা বাদ হচ্ছে।

তিনি বলেন, রায়হান হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত হোক। রায়হান কেন এবং কীভাবে মারা গেলো এবিষয়ে বিস্তারিত উদ্ঘাটন হোক। একইসাথে রায়হান হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৯৩৩ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 479
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    479
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ