ঢাকার রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও রাজধানীতে তারা বারবার নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ধানমন্ডি এলাকায় অনুষ্ঠিত ঝটিকা মিছিল। ৩১ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় হঠাৎ শতাধিক নেতাকর্মীর সমাবেশ এবং ব্যানার হাতে মিছিল রাজধানীবাসীকে বিস্মিত করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রথমে কোনো আয়োজনের আলামত ছিল না। সাধারণ মানুষ রাস্তায় চলাচল করছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। হঠাৎ একদল লোক ব্যানার হাতে একত্রিত হয়ে “জয় বাংলা”সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে শুরু করে। মিছিলটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, তবে কিছুক্ষণের জন্য এলাকা এক ধরনের আতঙ্কে ভরে যায়। আরও আলোচনার জন্ম দেয় যখন মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। যদিও এতে কেউ হতাহত হয়নি, তবুও রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা আরেকবার সামনে চলে আসে।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা গণমাধ্যমকে বলেন, তারা সংবাদ পান বিকেল পৌনে ৪টার দিকে। কিন্তু তখন পর্যন্ত মিছিল শেষ হয়ে যায় এবং নেতাকর্মীরা সরে যান। ফলে পুলিশ গিয়ে কাউকে আটক করতে পারেনি। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দল কিভাবে এত বড় সমাবেশ আয়োজন করতে সক্ষম হলো, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু বুঝতেই পারল না।
ঝটিকা মিছিল কোনো নতুন কৌশল নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। হঠাৎ করে সংগঠিত হয়ে স্বল্প সময়ের জন্য মিছিল করে আবার সরে যাওয়া মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল। এতে অংশগ্রহণকারীদের ঝুঁকি কমে যায়, আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এদিন ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যে ঝটিকা মিছিল করেছে, তা স্পষ্ট করে দেয়—তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়নি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া মানে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়া। কিন্তু এই ধরনের ঝটিকা মিছিল তাদের পক্ষ থেকে একটি বার্তা—“আমরা এখনো আছি”। এটি সমর্থকদের মনোবল বাড়ায়, আর বিরোধীদের মনে আশঙ্কা জাগায়। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন দেশে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তুঙ্গে, তখন নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের এই উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মিছিল চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাটি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনেক সময় রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে বা ভীতি ছড়াতে এ ধরনের বিস্ফোরণ ঘটায়। যদিও এতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি, তবে এটি রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষ যেখানে বিকেলবেলা কেনাকাটা বা কাজকর্মে ব্যস্ত, সেখানে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ আতঙ্ক ছড়ায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কর্মীরা শুধু রাজনৈতিক উপস্থিতি জানানই দেয়নি, বরং সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। ধানমন্ডি এলাকা ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বড় সিদ্ধান্তগুলো বহুবার এখান থেকেই হয়েছে। সেখানেই এমন একটি ঘটনা নিঃসন্দেহে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
এলাকার সাধারণ মানুষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা হঠাৎ এই মিছিলে অবাক হয়েছেন। তাদের অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ককটেলের শব্দ শুনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ মনে করছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ যদি বারবার এমনভাবে রাস্তায় নেমে আসে, তবে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে কেউ কেউ এটিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রকাশভঙ্গি হিসেবে দেখছেন।
আওয়ামী লীগের এই ঝটিকা মিছিল আসলে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। দলটি কার্যক্রমে নিষিদ্ধ হলেও তারা দেখাতে চাইছে, তাদের সাংগঠনিক শক্তি এখনো অটুট। সমর্থকরা নির্দেশ পেলে অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তায় নামতে পারে। এটি একদিকে সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকেও সতর্ক করছে। এছাড়া মিছিলের সময় “জয় বাংলা” স্লোগান ব্যবহারও একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। দীর্ঘ সময় ধরে এই স্লোগান দলটির পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এই স্লোগান উচ্চারণের মাধ্যমে তারা তাদের অস্তিত্ব ও পরিচয়কে আবারও সামনে আনতে চাইছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। নিষিদ্ধ একটি দল যদি প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে এবং বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। সরকার বারবার আশ্বাস দিয়েছে, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারের সামনে এখন দুটি পথ—একদিকে কঠোর হাতে দমন, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা। দমননীতির ঝুঁকি হলো, এতে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। আবার সংলাপ বা সমাধানের পথ বেছে নেওয়া হলে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রয়োজন কী ছিল? এই দ্বিধার মধ্যে সরকার কী অবস্থান নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ঝটিকা মিছিলের ঘটনা একবার ঘটেছে মানে ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একইভাবে উপস্থিতি জানান দিতে পারে। এতে জননিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষও রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতি এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যখন প্রতিটি ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের ঝটিকা মিছিল তাই শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও। এটি দেখাচ্ছে, রাজনীতির মঞ্চ থেকে তাদের পুরোপুরি সরানো যায়নি।
ধানমন্ডির ঝটিকা মিছিল বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দল এখনো নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম হচ্ছে। এতে সরকারের সামনে নতুন প্রশ্ন এসেছে—কিভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে? ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে জনগণ আতঙ্কিত হচ্ছে হঠাৎ এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
একদিকে নিষিদ্ধ দলের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ—এই দুইয়ের মাঝে সরকারকে কৌশলী হতে হবে। নইলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। ধানমন্ডির ঝটিকা মিছিল তাই শুধু একটি ঘটনাই নয়, এটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি ইঙ্গিত বহন করছে।
আপনার মতামত জানানঃ