মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা অভিযান কেবল একটি দেশের ওপর সামরিক হামলার ঘটনা নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, আন্তর্জাতিক আইন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং এক শতাব্দীর পররাষ্ট্রনীতির অভিজ্ঞতা—সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কয়েক মাস ধরে ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন করে ট্রাম্প প্রশাসন যে চাপ তৈরি করছিল, তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ‘বৃহৎ পরিসরের হামলা’র মাধ্যমে আটক করার ঘটনায়। এই পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক নাটকীয়তা যেমন বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ভেনেজুয়েলার উপকূলে চলাচলকারী ছোট নৌযানগুলো মাদক পাচারে জড়িত ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল। এই যুক্তির ভিত্তিতেই সেখানে বিমানবাহী রণতরি, একাধিক যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও প্রায় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের ফেন্টানিল সংকট বা সাম্প্রতিক ওভারডোজ মহামারির প্রধান উৎস নয়। কোকেন উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশটি বড় খেলোয়াড় হলেও, সেই মাদক প্রধানত ইউরোপের বাজারেই যায়। ফলে ‘মাদক-সন্ত্রাস’ দমনের যুক্তি অনেকের কাছেই ফাঁপা ও রাজনৈতিক সুবিধাজনক অজুহাত বলে মনে হয়েছে।
নিকোলা মাদুরো যে একজন নিপীড়ক ও গণতন্ত্রবিরোধী শাসক, সে বিষয়ে খুব কম মানুষই দ্বিমত পোষণ করবেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তাঁর শাসনামলে বিরোধীদের ওপর হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও নির্বিচার আটক রাখার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন কারচুরির অভিযোগ এবং প্রায় ৮০ লাখ মানুষের দেশত্যাগ ভেনেজুয়েলাকে শুধু অভ্যন্তরীণ সংকটে নয়, গোটা অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, এমন শাসকদের জোরপূর্বক উৎখাত করার চেষ্টা প্রায়ই পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সহিংস করে তোলে।
গত এক শতাব্দীর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকালে এই শিক্ষা স্পষ্ট। আফগানিস্তানে দুই দশকের সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। লিবিয়ায় স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর দেশটি বিভক্ত গোষ্ঠী ও মিলিশিয়াদের হাতে ছিন্নভিন্ন হয়েছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। লাতিন আমেরিকায় চিলি, কিউবা, গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া—প্রায় প্রতিটি দেশেই মার্কিন হস্তক্ষেপ অস্থিরতা ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছে। সেই ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলাকে নতুন করে রাষ্ট্রগঠনের পরীক্ষাগারে পরিণত করার প্রবণতা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়।
ট্রাম্প নিজেই শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে ‘চালাবে’ যত দিন না একটি নিরাপদ ও বিচক্ষণ রূপান্তর নিশ্চিত হয়। এই বক্তব্য কেবল ঔদ্ধত্যপূর্ণই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার পরিপন্থী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই আগ্রাসনের পক্ষে তিনি কোনো সুসংহত আইনি বা নৈতিক যুক্তি উপস্থাপন করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ বা বড় সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু ট্রাম্প সেই পথ এড়িয়ে গেছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের এই অবস্থান তাঁর অতীত বক্তব্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ২০১৬ সালে তিনি ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করে নিজেকে সামরিক বাড়াবাড়ির বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও তিনি যুদ্ধ না শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আরেকটি দেশে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছেন। এটি শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ধারণাকেও দুর্বল করে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই হামলা গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সন্দেহের ভিত্তিতে নৌযানে হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনসহ প্রায় সব মানবাধিকার চুক্তির লঙ্ঘন। একটি ঘটনায় প্রথম হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানে দ্বিতীয়বার হামলা চালিয়ে দুজন নাবিককে হত্যা করা হয়েছে, যাঁরা কোনো হুমকি সৃষ্টি করছিলেন না। এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইনের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভেনেজুয়েলার ওপর এই হামলার পেছনে আরও একটি গভীর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ট্রাম্প প্রশাসনের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে এবং মনরো নীতি নতুনভাবে প্রয়োগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামে পরিচিত এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে সেনা কমিয়ে এনে পশ্চিম গোলার্ধে শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে চায়। ভেনেজুয়েলা কার্যত এই নতুন যুগের সাম্রাজ্যবাদের প্রথম শিকার।
এই পথ শুধু ভেনেজুয়েলার জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক বৈধতা ও ঘরোয়া সমর্থন ছাড়া হামলা চালিয়ে ট্রাম্প চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য স্বৈরশাসকদের হাতে অজুহাত তুলে দিচ্ছেন, যাতে তারা নিজেদের প্রতিবেশীদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এতে বিশ্বব্যবস্থায় শক্তির রাজনীতি আরও উগ্র হয়ে উঠবে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এই হামলার পর আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাদুরোর শাসন টিকিয়ে রাখা জেনারেল ও নিরাপত্তা কাঠামো হঠাৎ ভেঙে পড়বে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘কালেক্টিভোস’ ও কলম্বিয়ার ইএলএন গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়তে পারে। এর ফলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যবাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে, কারণ ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম তেলসমৃদ্ধ দেশ।
অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, ভেনেজুয়েলাবাসীর একটি অংশ মার্কিন হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। দীর্ঘদিনের নিপীড়নের পর মানুষের হতাশা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ইতিহাস বলে, বাহ্যিক শক্তির জোরে শাসন পরিবর্তন টেকসই সমাধান এনে দেয় না। বরং তা নতুন সংকট, গৃহযুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযান একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সবচেয়ে বড় কথা, এটি ভেনেজুয়েলাবাসীর দুর্ভোগ কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এক শতাব্দীর অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে আবারও সামরিক দুঃসাহসিকতার পথে হাঁটলে তার মূল্য শুধু ভেনেজুয়েলাই নয়, গোটা বিশ্বকেই দিতে হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ