ঢাকার পরিকল্পিত নগরায়ণের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক—নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। নাগরিকদের জন্য সুশৃঙ্খল নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণে নিয়ম মানা নিশ্চিত করা এবং আবাসন উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কথা এই সংস্থার। কিন্তু বাস্তবে রাজউককে ঘিরে বহুদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জমতে জমতে যেন এক ভয়ঙ্কর চেহারা ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় দেড় ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যাদের অনেকের সরকারি বেতন দিয়ে এসব সম্পদের ব্যাখ্যা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
রাজউকের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণ কাজের তদারকি, প্লট বরাদ্দ বা বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবাকে ঘিরে একটি অদৃশ্য ঘুষের চক্র তৈরি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবন মালিকদের নোটিশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নকশা অনুমোদনের জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের হুমকি এবং নানা প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তারা গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুসন্ধানে যে পরিমাণ সম্পদের তথ্য সামনে আসছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই অবিশ্বাস্য। মাত্র পাঁচ থেকে সাত বছরের চাকরিজীবনে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্তকারীদেরও বিস্মিত করছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের এই অর্থ শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের নামেও সম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে তদন্ত এড়ানো যায়।
এই তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান। ২০১৮ সালে রাজউকে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা মাত্র সাত বছরের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, বাংলামটরসহ বিভিন্ন এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এর বাইরে গাজীপুর, পটুয়াখালী ও বরিশালে তার নামে কিংবা স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভবন মালিকদের নোটিশ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কিংবা নোটিশ না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করতেন। কেউ এই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের আরেক আলোচিত কর্মকর্তা শফিউল্লাহ বাবুর বিরুদ্ধেও রয়েছে নকশা জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ। ২০০১ সালে মাত্র ১ হাজার ৮৭৫ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা এই কর্মকর্তা এখন শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট এবং প্লট রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নকল করে তিনি নকশা অনুমোদনের ফাইল নিজেই পাস করতেন এবং এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী জালিয়াতি চক্র পরিচালনা করতেন। তার পরিবারের নামে নিবন্ধিত একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যার মূলধন কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশ ভ্রমণের তালিকাও দীর্ঘ—থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল এবং দুবাইয়ে একাধিকবার ভ্রমণ করেছেন তিনি।
কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেকের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। নকশা অনুমোদন ও প্লট বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত থেকে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর আফতাবনগরে তার নামে একটি বহুতল ভবন রয়েছে, পাশাপাশি শান্তিনগরেও রয়েছে ফ্ল্যাট।
নব্বইয়ের দশকে রাজউকে যোগ দেওয়া উপ-ইমারত পরিদর্শক আমীর খসরুর সম্পদের পরিমাণও বিস্ময়কর। রাজধানীর বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্প এলাকায় তার একাধিক ভবন রয়েছে, যেখানে ডজনখানেক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। উত্তরা এলাকায় তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে কয়েকটি প্লট রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। এসব সম্পদের বেশ কিছু নথিতে আত্মীয়স্বজনদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইমারত পরিদর্শক তারিফুর রহমানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে তিনি কৃষি জমিতে অবৈধ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নীরব থেকেছেন এবং ভবন মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেছেন। ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজধানীর রামপুরা এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট এবং আফতাবনগরে প্লট রয়েছে বলে জানা গেছে।
ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। রাজধানীর মুগদায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর সাততলা ভবন, মতিঝিলে ফ্ল্যাট এবং সাভারে জমি রয়েছে তার। এছাড়া পূর্বাচলে স্ত্রীর নামে প্লটের তথ্যও পাওয়া গেছে। নকশাকার এমদাদ আলীর বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পে ছয়তলা বাড়ি এবং ডেমরায় জমি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার বগুড়ায় সাত কাঠা জমির ওপর পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং রাজধানীর মাদারটেকে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। সহকারী অথরাইজড অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধেও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। আফতাবনগরে তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক প্লট এবং একটি বহুতল ভবন রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া বেঞ্চ সহকারী বাসার শরীফ, অফিস সহকারী ইউসুফ মিয়া, বেলাল হোসেন চৌধুরী রিপন, উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ হাসান এবং রেকর্ড কিপার মো. ফিরোজের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট, ভবন ও জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজ এলাকায় গরুর খামার বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন।
রাজউকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারণা শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক নগর পরিকল্পনার সূচনা হয়। সেই সময় গুলশান, বনানী এবং ধানমন্ডির মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ডিআইটিকে পুনর্গঠন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক প্রতিষ্ঠা করা হয়। নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন, ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় এই সংস্থাকে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে। অনেকেই মনে করেন, রাজউকের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে, আর সেই সুযোগেই কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, রাজউক দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তার মতে, এসব ঘটনা আসলে বড় সমস্যার কেবল একটি অংশ মাত্র। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি যারা তাদের সহযোগিতা করেছে বা সুরক্ষা দিয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় এই দুর্নীতির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে। রাজউক কর্তৃপক্ষও বলছে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করে থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—নগর উন্নয়ন ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি এমন দুর্নীতির বিস্তার ঘটে, তবে নাগরিকদের জন্য ন্যায়সংগত ও পরিকল্পিত নগরায়ণ কীভাবে নিশ্চিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ