বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা দেশের জন্য সাম্প্রতিক রিজার্ভ বৃদ্ধির খবর এক ধরনের স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে একশ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ পাওয়ার ফলে দেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৫ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ৪৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা পাচার এবং অন্যান্য কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয় এবং আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে একসময় রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকাশিত বিপিএম৬ হিসাবেও রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধ উপায়ে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও শক্তিশালী হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দিক থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে না, এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে, ভোগব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ নিশ্চিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর ঋণ ও বাজেট সহায়তাও রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এডিবির একশ কোটি ডলারের ঋণ শুধু রিজার্ভ বাড়ায়নি, বরং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থারও একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের সহায়তা স্বল্পমেয়াদে রিজার্ভকে শক্তিশালী করলেও দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের টেকসই উৎস তৈরি করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ডলারের বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। যদিও শুধুমাত্র রিজার্ভ বৃদ্ধি অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান নয়, তবে এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্দেশনা অনুযায়ী বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ হিসাব প্রকাশ করছে। এই পদ্ধতিতে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ প্রতিফলিত হয়। ফলে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটি অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিপিএম৬ হিসাবেও রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত রাখতে হলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও উৎসাহিত করা, অর্থপাচার রোধ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের যথাযথ ব্যবহার এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠাও জরুরি।
রিজার্ভের এই উত্থান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক খবর। তবে এটি যেন সাময়িক স্বস্তিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। অর্থনীতির ভিত যত শক্তিশালী হবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তত স্থিতিশীল থাকবে। ৪৩ মাস পর সর্বোচ্চ রিজার্ভের এই অর্জন তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
আপনার মতামত জানানঃ