শুক্রবার রাত ১২টা। ঘড়ির কাঁটা যখন নতুন দিনে পা রাখল, তখনই কার্যকর হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে জোরপূর্বক শ্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগ তুলে। খবরটা নতুন হলেও প্রেক্ষাপট নতুন নয়—এর আগেও দুই দফায় বাংলাদেশের ওপর শুল্ক বসিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে প্রশ্নটা এবার একটু ভিন্নভাবে সামনে এসেছে—এই নতুন শুল্ক আসলে কতটা নতুন, আর অর্থনীতির ওপর তার আসল প্রভাবই বা কী।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য স্বস্তির সুরই শোনা যাচ্ছে বেশি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্কস্তরে। এই হিসাবে বাংলাদেশ বরং কিছুটা এগিয়েই থাকছে বলে সরকারের ভাষ্য—প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মার্কিন বাজারে দেশের সুবিধা আরও বাড়বে বলেই মনে করছে তারা। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও একই সুরে বলেছেন, এটি আসলে নতুন কোনো শুল্ক আরোপ নয়, বরং আগের ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন মাত্র। তাঁর ভাষায়, শুল্ক পরিস্থিতিতে বাস্তবে কোনো পরিবর্তনই আসছে না।
রপ্তানিকারকদের প্রতিক্রিয়াতেও এই সুরের প্রতিফলন স্পষ্ট। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের ব্যাখ্যা বেশ কারিগরি—এতদিন ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল, যার মেয়াদ সর্বোচ্চ দেড় শ দিন পর্যন্ত রাখার আইনি সুযোগ ছিল। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই এবার সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন করে একই হারে, অর্থাৎ ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। শতাংশের হিসাবে যেহেতু কোনো পরিবর্তন নেই, তাই তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তিনি দেখছেন না।
তবে অর্থনীতিবিদদের চোখে বিষয়টা অতটা সরল নয়। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের আশঙ্কা, এই শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। তাঁর মতে, পরিসংখ্যানের হিসাবে শুল্কহার একই থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন হতে পারে। ইতিমধ্যে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির ধারায় কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান দুর্বল পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, বিশেষত শ্রমমান-সংক্রান্ত শর্তগুলোর ক্ষেত্রে বাস্তব কোনো উন্নতি না ঘটলে সামনের দিনগুলোয় চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।
এখানেই উঠে আসছে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্যাঁচ—বাংলাদেশে নিজে হয়তো বড় আকারে জোরপূর্বক শ্রমের সমস্যা নেই, কিন্তু দেশের কারখানাগুলো যেসব দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে, বিশেষ করে চীন থেকে, সেখানে যদি এই সমস্যা থাকে, তাহলে তার আঁচও এসে পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপর। মোয়াজ্জেমের ভাষায়, তৃতীয় দেশ হিসেবে চীনের ওপর নির্ভরতা থেকে সহজে সরে আসার মতো অবস্থায় নেই বাংলাদেশ, তাই বাজার বহুমুখী করার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সামনে ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতেও অস্থিরতা আর মেরুকরণের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিজিএমইএ সভাপতিও স্বীকার করছেন, কাঁচামাল আমদানির এই দিকটি সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় সরাসরি কোনো জোরপূর্বক শ্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত এসেছে যে যেসব উৎস থেকে কাঁচামাল আসছে, সেখানে এই সমস্যা থাকতে পারে—আর পরোক্ষে হোক বা প্রত্যক্ষে, সেই আলোচনায় চীনের নামই বারবার উঠে এসেছে। অর্থাৎ সরাসরি রপ্তানিতে তাৎক্ষণিক ধাক্কা না লাগলেও কাঁচামাল আমদানির প্রশ্নে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
পুরো পরিস্থিতিটা বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাণিজ্য ঘাটতি থাকা দেশগুলোর ওপর উচ্চ হারে শুল্ক বসানোর উদ্যোগ নেন। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ৫৭টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয়, যার আওতায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুরুতে বাড়তি শুল্ক দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশ। পরে ধাপে ধাপে তা কমে ৩৫ শতাংশ, এবং একপর্যায়ে ২০ শতাংশে নেমে আসে। এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা এআরটি স্বাক্ষরের পর শুল্কহার দাঁড়ায় ১৯ শতাংশ। তবে ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, সেই ১৯ শতাংশ শুল্ক পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেন।
সুপ্রিম কোর্টের সেই সিদ্ধান্তের কিছুদিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেন, যার আইনি মেয়াদ সর্বোচ্চ দেড় শ দিন। সেই মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরপরই এবার সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন করে একই হারে শুল্ক কার্যকর হলো। অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে অপরিবর্তিত থাকলেও, আইনি কাঠামো বদলে যাওয়াটাই এবারের মূল ঘটনা।
সংখ্যার হিসাবটাও একটু জটিল। শুক্রবার রাত থেকে যে ৬০টি দেশের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে, তার মধ্যে ১৭টি দেশের জন্য ১০ শতাংশ এবং বাকি দেশগুলোর জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত হার নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশ পড়েছে সেই ১০ শতাংশের তালিকায়, যেখানে আছে ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল ও মিসরসহ ৩৮টি দেশের ওপর বসেছে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক। এই ফারাকটুকুই সরকারকে আশাবাদী রাখছে, কারণ প্রধান প্রতিযোগীরাই পড়েছে বেশি হারের তালিকায়।
তবে এই ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক কোনো বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয়—এটি যোগ হচ্ছে আগে থেকে বলবৎ থাকা গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে। ফলে মোট হিসাবে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের হিসাবে, ডিউটি ও ট্যারিফ মিলিয়ে এই হার দাঁড়াবে ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত। তাঁর কথায়, প্রতিযোগী কিছু দেশের জন্য এই হার আরও বেশি হবে, যা এক অর্থে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির কারণ হলেও, সার্বিক রপ্তানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে একটা সংখ্যাই যথেষ্ট—দেশটির বাজারে যত পণ্য যায়, তার প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। আর এই খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশের তালিকাটাও লম্বা—ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস। এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সামান্য শুল্ক-ব্যবধানও রপ্তানি প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে চিত্রটা দাঁড়াচ্ছে এমন—সরকার ও রপ্তানিকারকদের একাংশ যেখানে স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন সংখ্যার হিসাবে অপরিবর্তিত হারে, সেখানে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে। শ্রমমান নিয়ে বাস্তব উন্নতি না ঘটলে এবং কাঁচামাল আমদানির উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে না পারলে, আজকের এই আপাত-স্বস্তি আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে বলেই মনে করছেন তাঁরা। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আর শুল্কহারের সংখ্যায় আটকে নেই—প্রশ্নটা এখন কাঠামোগত, যার উত্তর খুঁজতে সময় লাগবে আরও অনেকটাই।
আপনার মতামত জানানঃ