
সংবাদে আস্থা কমছে, কিন্তু তথ্যের চাহিদা শেষ হয়নি। মানুষ এখন সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের বদলে পরিচিত মুখ, ভিডিও নির্মাতা, ব্যক্তিগত নিউজলেটার, সামাজিক মাধ্যমের ফিড এবং AI চ্যাটবটের কাছে যাচ্ছে। এটি শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়; প্রতিষ্ঠানহীন বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা এবং অদৃশ্য অ্যালগরিদমের নতুন ক্ষমতার গল্প।
একসময় মানুষ খবরের কাগজ কিনত, নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের সংবাদ দেখত, অথবা পছন্দের সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট খুলত। এখন একটি বড় অংশের কাছে সংবাদ আলাদা কোনো গন্তব্য নয়। ভিডিও দেখতে, বন্ধুর পোস্ট দেখতে বা সময় কাটাতে সামাজিক মাধ্যমে ঢুকে তারা হঠাৎ একটি যুদ্ধ, নির্বাচন, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা অপরাধের খবর পায়। খবরটি সামনে এনেছে সংবাদ সম্পাদক নয়, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম; ব্যাখ্যা করছেন কোনো ভিডিও নির্মাতা, পডকাস্টার কিংবা পরিচিত অনলাইন ব্যক্তিত্ব।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—মানুষ যে জায়গাগুলোকে কম বিশ্বাস করে, সংবাদ পেতে সেই জায়গাগুলোর ওপরই ক্রমে বেশি নির্ভর করছে। Reuters Institute-এর Digital News Report 2026 অনুযায়ী, ৪৮টি বাজারে মাত্র ৩৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তাঁরা অধিকাংশ সংবাদকে অধিকাংশ সময় বিশ্বাস করেন। ২০১৫ সালে পরিমাপ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বনিম্ন হার। সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া সংবাদে আস্থা ২২ শতাংশ এবং AI চ্যাটবটের উত্তরে আস্থা ২০ শতাংশ। তারপরও সংবাদ গ্রহণ সেদিকেই সরে যাচ্ছে। কারণ ডিজিটাল জীবনে বিশ্বাস একমাত্র মুদ্রা নয়; সুবিধা, গতি, পরিচিতি, বিনোদন ও ব্যক্তিগত প্রাসঙ্গিকতাও সমান শক্তিশালী।
প্রতিষ্ঠান নয়, পরিচিত মুখ
সংবাদমাধ্যম একটি প্রতিষ্ঠান। তার নাম, সম্পাদকীয় নীতি, মালিকানা, ইতিহাস, ভুল এবং সুনাম—সব মিলিয়ে মানুষ তাকে বিচার করে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের সংবাদ নির্মাতা নিজেকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে হাজির করেন। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, মন্তব্যের উত্তর দেন, নিজের অবস্থান জানান, কখনো ব্যক্তিগত জীবনের অংশও ভাগ করেন। দর্শক তাঁকে কেবল তথ্যের উৎস নয়, পরিচিত চরিত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
Reuters Institute-এর ২০২৬ জরিপে বিশ্বজুড়ে ২৭ শতাংশ মানুষ বলেছেন, আগের সপ্তাহে তাঁরা সংবাদকেন্দ্রিক কোনো ব্যক্তি বা নির্মাতার কনটেন্ট দেখেছেন। সংবাদ ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে কাজ করেন এমন নির্মাতাদের ধরলে হারটি ৪৬ শতাংশ। দর্শকেরা তাঁদের বেশি বিনোদনমূলক, সহজবোধ্য এবং সম্পর্কযোগ্য বলে মনে করেন। একই সঙ্গে তাঁদের তুলনামূলক কম নির্ভরযোগ্য ও কম নিরপেক্ষও ভাবেন। অর্থাৎ মানুষ সবসময় ‘সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য’ উৎসটি বেছে নেয় না; যে উৎসটি দ্রুত বোঝায়, নিজের ভাষায় বলে এবং দূরত্ব কমিয়ে আনে, সেটিই প্রায়ই জয়ী হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের Pew Research Center-এর গবেষণায়ও একই মনস্তত্ত্ব দেখা যায়। সংবাদ নির্মাতাদের কাছ থেকে খবর পাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ বর্তমান ঘটনা বুঝতে সহায়তা, দ্রুত ব্রেকিং নিউজ, সত্যিকারের নিজস্বতা বা ‘অথেনটিসিটি’, অন্য উৎসে না পাওয়া তথ্য এবং নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে মিলকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৮–২৯ বছর বয়সীদের ৩৮ শতাংশ নিয়মিত সংবাদ নির্মাতাদের কাছ থেকে খবর পান। এই বয়সী দর্শকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির অদৃশ্য সম্পাদক নয়, পর্দায় দেখা মানুষের কণ্ঠই আস্থার শর্টকাট।
এই আস্থা সবসময় তথ্যের নির্ভুলতার ওপর দাঁড়ায় না। অনেক সময় এটি পরিচিতি, ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং মানসিক সংযোগের ফল। একজন নির্মাতাকে প্রতিদিন দেখলে তাঁর ভাষা, রসবোধ ও রাজনৈতিক ঝোঁক পরিচিত হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমের আনুষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার চেয়ে প্রকাশ্য পক্ষপাতও তখন বেশি সৎ বলে মনে হতে পারে: ‘আমি জানি তিনি কোন জায়গা থেকে বলছেন।’ অথচ পরিচিত মানুষ ভুল করতে পারেন, তথ্য গোপন করতে পারেন, বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক স্বার্থে প্রভাবিত হতে পারেন। পার্থক্য হলো, তাঁর প্রভাবের কাঠামোটি প্রতিষ্ঠানের মতো দৃশ্যমান নয়।
সংবাদ খোঁজা নয়, সংবাদ সামনে এসে পড়া
তরুণদের সংবাদাভ্যাসে আরেকটি পরিবর্তন হলো উদ্দেশ্যহীন বা ঘটনাচক্রে সংবাদ পাওয়া। Pew-এর ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জরিপে ১৮–২৯ বছর বয়সীদের মাত্র ২২ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা প্রায়ই বা খুব ঘনঘন ইচ্ছাকৃতভাবে সংবাদ খোঁজেন। রাজনৈতিক সংবাদে ৭০ শতাংশের অভিজ্ঞতা হলো—তাঁরা খুঁজছিলেন না, সামনে এসে পড়েছে।
এই ‘সামনে এসে পড়া’ ঘটনাটি নিরীহ নয়। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় কোন খবর যাবে তা সম্পাদক ঠিক করতেন; এখন ব্যবহারকারী কোন খবর দেখবেন তা ঠিক করে প্ল্যাটফর্মের সুপারিশব্যবস্থা। সে সিদ্ধান্ত নেয় ব্যবহারকারী কোথায় থামলেন, কী দেখলেন, কার সঙ্গে তর্ক করলেন, কোন ভিডিও আবার চালালেন এবং কোন বিষয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দিলেন—এসব সংকেত দেখে। অ্যালগরিদমের লক্ষ্য সাধারণত নাগরিককে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সংবাদ দেওয়া নয়; তাকে যতক্ষণ সম্ভব প্ল্যাটফর্মে রাখা।
ফলে জনস্বার্থের গুরুত্ব ও ডিজিটাল জনপ্রিয়তা এক হয়ে যায় না। বাজেটের দীর্ঘ বিশ্লেষণের চেয়ে নেতার উত্তেজক বাক্য, যুদ্ধের প্রেক্ষাপটের চেয়ে বিস্ফোরণের ভিডিও, নীতির ব্যাখ্যার চেয়ে কেলেঙ্কারির দাবি বেশি প্রতিক্রিয়া পেতে পারে। সংবাদ তখন যাচাই করা তথ্যের সম্পূর্ণ প্যাকেজ নয়; চোখ আটকে দেওয়ার মতো টুকরো। একজন ব্যবহারকারী নিজে উৎস নির্বাচন করছেন মনে করলেও তাঁর পছন্দের পরিধি আগেই অ্যালগরিদম সাজিয়ে দিয়েছে।
আস্থার সংকটের দায় সংবাদমাধ্যমেরও
সব দায় প্ল্যাটফর্ম বা দর্শকের ওপর চাপালে সংবাদমাধ্যম নিজেদের ব্যর্থতা এড়িয়ে যাবে। বহু দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ, মালিকানার প্রভাব, সরকারের চাপ, বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থ এবং সম্পাদকীয় পক্ষপাত নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ আছে। Reuters Institute-এর গবেষণায় উত্তরদাতারা রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তা, সংবাদমাধ্যমের মালিক এবং অন্যান্য শক্তিশালী পক্ষকে সংবাদে প্রভাবশালী বলে মনে করেছেন। মানুষ যখন সংবাদ ও ক্ষমতার মধ্যে অদৃশ্য সম্পর্ক সন্দেহ করে, তখন ‘নিরপেক্ষতা’র দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
সংবাদমাধ্যমের ভাষাও অনেক সময় পাঠকের অভিজ্ঞতা থেকে দূরে। একটি জীবনযাত্রার সংকটকে শুধু জিডিপি, সূচক বা সরকারি বক্তব্য দিয়ে বর্ণনা করলে বাজারে দাম দিতে থাকা মানুষের কাছে সংবাদটি অসম্পূর্ণ মনে হয়। ব্রেকিং নিউজের প্রতিযোগিতায় শিরোনাম অতিরঞ্জিত হয়; ভুল সংশোধন নীরবে করা হয়; একই বিষয়ে বারবার আতঙ্কমূলক কনটেন্ট তৈরি হয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমও ক্লিকের জন্য সেই কৌশল গ্রহণ করে, যার জন্য তারা নির্মাতাদের সমালোচনা করে।
আরেকটি সমস্যা হলো ব্যক্তিহীনতা। একটি প্রতিবেদন কীভাবে তৈরি হলো, প্রতিবেদক কী দেখেছেন, কী যাচাই করা সম্ভব হয়নি, শিরোনাম কে দিলেন বা ভুল হলে দায় কার—পাঠক খুব কমই জানেন। বিপরীতে একজন নির্মাতা সরাসরি বলেন, ‘আমি বিষয়টি এভাবে বুঝেছি।’ তাঁর বিশ্লেষণ দুর্বল হলেও প্রক্রিয়াটি ব্যক্তিগত ও দৃশ্যমান মনে হয়। সংবাদমাধ্যমের পেশাগত নিয়ম শক্তি, কিন্তু সেই নিয়ম পাঠকের সামনে ব্যাখ্যা না করা হলে তা দেয়ালে পরিণত হয়।
মানুষ কি সত্যিই সংবাদমাধ্যম ছেড়ে দিয়েছে?
‘সংবাদমাধ্যম ছেড়ে ব্যক্তি’র দিকে যাওয়ার বর্ণনাটি শক্তিশালী, কিন্তু পুরোপুরি আক্ষরিক নয়। Reuters Institute বলছে, সংবাদ নির্মাতাদের কনটেন্ট গ্রহণকারী অধিকাংশ মানুষ একই সঙ্গে প্রথাগত সংবাদও ব্যবহার করেন। বিশ্বব্যাপী ১৩ শতাংশ বলেছেন, সংবাদকেন্দ্রিক নির্মাতারা তাঁদের অধিকাংশ বা সব সংবাদ-চাহিদা পূরণ করেন; কেবল ৩ শতাংশ শুধুই নির্মাতাদের ওপর নির্ভর করেন। বরং নির্মাতাদের অনুসরণকারীরা গড় মানুষের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত সংবাদ ব্র্যান্ডও বেশি ব্যবহার করেন।
তাই বাস্তবে সংবাদমাধ্যম অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে না; তার পরিচয় ও মূল্য অন্যের কনটেন্টে মিশে যাচ্ছে। একজন নির্মাতা সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কয়েক মিনিটে ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু দর্শক উৎসটির নাম মনে রাখেন না। সার্চ ইঞ্জিন বা AI চ্যাটবট একাধিক প্রতিবেদনের তথ্য এক উত্তরে সাজায়, কিন্তু পাঠক মূল লিংকে যান না। সাংবাদিকতার ব্যয় বহন করে সংবাদকক্ষ; সম্পর্ক ও মনোযোগ পায় মধ্যস্থতাকারী।
এই বিচ্ছিন্নতা ব্যবসায়িকভাবেও বিপজ্জনক। Reuters Institute-এর জরিপে নির্বাচিত দেশগুলোতে অনলাইন সংবাদে অর্থ দেওয়া মানুষের হার ১৭ শতাংশে স্থির। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে সরাসরি যাতায়াত কমলে সদস্যতা বা বিজ্ঞাপনের জন্য পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া আরও কঠিন হয়। মানসম্পন্ন প্রতিবেদন তৈরির অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে ব্যক্তি ও অ্যালগরিদম যে সংবাদ পুনরায় পরিবেশন করে, সেই মূল সংবাদই একসময় কমে যাবে।
AI: সুবিধার চূড়ান্ত রূপ
AI চ্যাটবট এই প্রবণতাকে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। এখানে সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট তো দূরের কথা, অনেক সময় কোনো মানুষের মুখও নেই। ব্যবহারকারী প্রশ্ন করেন; যন্ত্র কয়েকটি উৎসের তথ্য মিলিয়ে সহজ ভাষায় উত্তর দেয়, অনুবাদ করে, সারাংশ বানায় এবং পরবর্তী প্রশ্ন গ্রহণ করে। ২০২৬ সালে সাপ্তাহিক সংবাদ-ব্যবহারে AI চ্যাটবটের বৈশ্বিক ব্যবহার ৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উঠেছে। Asia, Africa, Latin America এবং Southern ও Eastern Europe-এর তুলনামূলক প্ল্যাটফর্মনির্ভর বাজারগুলোতে বৃদ্ধি বেশি।
AI-এর আকর্ষণ পরিষ্কার: সময় বাঁচে, জটিল বিষয় সহজ হয়, বহু উৎস একসঙ্গে পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তরটি কীভাবে গঠিত, কোন উৎস বাদ গেছে, পুরোনো তথ্য ঢুকেছে কি না কিংবা নিশ্চিত তথ্য ও অনুমান আলাদা করা হয়েছে কি না—ব্যবহারকারী সবসময় বুঝতে পারেন না। সংবাদে AI উত্তরের ওপর বৈশ্বিক আস্থা মাত্র ২০ শতাংশ হলেও ব্যবহার বাড়ছে। আবারও সুবিধা উদ্বেগকে পরাজিত করছে।
AI সরাসরি মিথ্যা তৈরি না করলেও উৎসের বৈচিত্র্য সংকুচিত করতে পারে। একটি রাজনৈতিক ঘটনার দশটি ভিন্ন প্রতিবেদন থেকে একটিমাত্র সাবলীল উত্তর তৈরি হলে মতপার্থক্য, অনিশ্চয়তা ও প্রেক্ষাপট মুছে যেতে পারে। পাঠক ‘উত্তর’ পান, কিন্তু সাংবাদিকতার বিতর্কিত ও অসম্পূর্ণ প্রকৃতি দেখতে পান না। সত্য তখন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নয়, পরিষ্কারভাবে লেখা একটি আউটপুট মনে হয়।
সংবাদ থেকে পালানোর মনস্তত্ত্ব
আস্থার সংকটের সঙ্গে সংবাদ-ক্লান্তিও জড়িত। Reuters Institute বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় সংবাদে খুব বা অত্যন্ত আগ্রহী মানুষের হার গড়ে ১৩ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৪৬ শতাংশের একটু নিচে এসেছে। ৪২ শতাংশ মানুষ জানান, তাঁরা অন্তত কখনো সংবাদ এড়িয়ে চলেন; ২০১৭ সালে হারটি ছিল ২৯ শতাংশ। একই সঙ্গে নৈমিত্তিক বা নিষ্ক্রিয় সংবাদ ব্যবহারকারী ২০২১ সালের ১৬ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উঠেছেন।
মানুষ সবসময় সংবাদ এড়িয়ে যান উদাসীনতার কারণে নয়। যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার অবিরাম প্রবাহ অসহায়ত্ব তৈরি করে। সংবাদ যদি সমস্যার পুনরাবৃত্তি করে কিন্তু কারণ, সম্ভাব্য সমাধান বা ব্যক্তির করণীয় না দেখায়, পাঠক মানসিক সুরক্ষার জন্য দূরে সরে যান। এরপর কোনো পরিচিত নির্মাতা একই ঘটনাকে সংক্ষেপে, গল্পের ভাষায় বা হাস্যরসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে সেটি তুলনামূলক সহনীয় লাগে।
কিন্তু এই আরামদায়ক ব্যাখ্যার মূল্য আছে। নির্মাতা দর্শকের আবেগ ও পরিচয় বুঝে কথা বলেন; অ্যালগরিদম সেই মিলকে আরও শক্ত করে। ফলে ব্যবহারকারী এমন উৎসই বেশি দেখেন, যা তাঁর আগে থেকেই থাকা বিশ্বাসকে নিশ্চিত করে। পরিচিত মুখের প্রতি বিশ্বাস তখন তথ্যের সত্যতার বদলে পরিচয়ের আনুগত্যে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি কেন জরুরি
বাংলাদেশে ফেসবুক, ইউটিউব ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও কেবল সংবাদ বিতরণের মাধ্যম নয়; অনেকের জন্য এগুলোই ইন্টারনেটের প্রধান দরজা। প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মালিকানা, ভুল তথ্য, দলীয় অবস্থান ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন আছে। একই সঙ্গে ব্যক্তি-নির্ভর চ্যানেলে উৎসহীন দাবি, কাটা ভিডিও, পুরোনো ছবি, ভুয়া উদ্ধৃতি এবং বিজ্ঞাপনকে মতামত হিসেবে পরিবেশনের ঝুঁকিও প্রবল।
এখানে ‘মূলধারা বনাম সামাজিক মাধ্যম’ দ্বন্দ্বটি যথেষ্ট নয়। কোনো সংবাদপত্রও ভুল করতে পারে; কোনো স্বাধীন নির্মাতা অসাধারণ অনুসন্ধান করতে পারেন। নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ড হওয়া উচিত—উৎস দেখানো হয়েছে কি না, তথ্য ও মতামত আলাদা কি না, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, ভুল স্বীকার ও সংশোধনের ব্যবস্থা আছে কি না, অর্থায়ন ও স্বার্থের সম্পর্ক প্রকাশ করা হয়েছে কি না। পরিচয় নয়, পদ্ধতিই বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি হওয়া দরকার।
আস্থা ফেরাতে সংবাদমাধ্যম কী করতে পারে
প্রথমত, সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়া দৃশ্যমান করতে হবে। কেন একটি খবর করা হলো, কোন নথি ব্যবহার হয়েছে, কী জানা যায়নি এবং পরে কী সংশোধন করা হয়েছে—এসব পাঠককে জানালে পেশাগত পদ্ধতি জীবন্ত হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানকে মানবিক মুখ দিতে হবে। প্রতিবেদক ও সম্পাদক পাঠকের সঙ্গে কথা বলবেন, প্রশ্ন নেবেন, ব্যাখ্যামূলক ভিডিও করবেন; তবে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যেন সম্পাদকীয় জবাবদিহিকে প্রতিস্থাপন না করে।
তৃতীয়ত, সংবাদকে শুধু দ্রুত নয়, ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। বড় ঘটনার সারাংশ, সময়রেখা, তথ্য যাচাই, ‘এর প্রভাব আপনার ওপর কী’ এবং সমাধানমুখী প্রতিবেদন—এসব সংবাদ-ক্লান্তি কমাতে পারে। চতুর্থত, শিরোনাম ও প্রতিবেদনের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে হবে; ক্লিক পাওয়ার জন্য আস্থা খরচ করা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী। পঞ্চমত, মালিকানা, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ ও স্বার্থের সংঘাত স্পষ্ট করা জরুরি।
ষষ্ঠত, প্ল্যাটফর্মে যেতে হবে কিন্তু প্ল্যাটফর্মের যুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না। ছোট ভিডিও, পডকাস্ট ও ব্যক্তিগত নিউজলেটার সাংবাদিকতার শত্রু নয়; এগুলো নতুন ভাষা। সমস্যা তখনই, যখন যাচাই বাদ দিয়ে গতি, প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে আবেগ এবং জনস্বার্থ বাদ দিয়ে ভাইরালতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সপ্তমত, পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক—ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ইমেইল, সদস্যতা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক আয়োজন—পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে অ্যালগরিদম বদলালেই সংবাদমাধ্যম পাঠক হারিয়ে না ফেলে।
সংবাদ আছে, কিন্তু বিশ্বাস নেই—এটি কেবল সংবাদমাধ্যমের সংকট নয়; গণতন্ত্রেরও সংকট। কারণ অভিন্ন তথ্যভিত্তি ছাড়া সমাজে মতভেদ থাকে না, থাকে আলাদা বাস্তবতা। ব্যক্তি আমাদের কাছে টানেন, অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দ বোঝে, AI দ্রুত উত্তর দেয়। কিন্তু কোন তথ্য যাচাই করা হলো, কোন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা হলো এবং ভুল হলে কে দায় নেবে—এই কাজের জন্য প্রতিষ্ঠান এখনো প্রয়োজন।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন তাই সংবাদমাধ্যম থাকবে কি না নয়। প্রশ্ন হলো, সংবাদমাধ্যম কি তার পদ্ধতির শক্তিকে মানুষের ভাষা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও নতুন প্রযুক্তির সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে? আর ব্যক্তি ও প্ল্যাটফর্ম কি সংবাদ ছড়ানোর ক্ষমতার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মতো জবাবদিহিও গ্রহণ করবে? আস্থা কোনো লোগোর স্থায়ী সম্পদ নয়। প্রতিটি প্রতিবেদন, প্রতিটি সংশোধন এবং প্রতিটি স্বচ্ছ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা আবার অর্জন করতে হয়।
আপনার মতামত জানানঃ