
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭১ দিন পার হয়েছে। সময়টি কোনো সরকারের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য–ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে সরকার কোন পথে হাঁটছে, কোন প্রতিশ্রুতি কার্যকর নীতিতে পরিণত হয়েছে এবং কোথায় পুরোনো রাষ্ট্রচর্চা ফিরে আসছে—তা যাচাই করার জন্য যথেষ্ট। StateWatch সরকারি নথি, সংসদীয় পদক্ষেপ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দশটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করেছে।
মূল্যায়ন-পদ্ধতি
এই পর্যবেক্ষণে চারটি অবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে—অগ্রগতি, আংশিক, স্থবির এবং উল্টো পথে। শুধু ঘোষণা বা বাজেট বরাদ্দকে বাস্তবায়ন ধরা হয়নি। আইন, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, পরিমাপযোগ্য ফল এবং নাগরিকের অভিজ্ঞতায় দৃশ্যমান প্রভাব—এই চার ধরনের প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্যায়নের শেষ তারিখ ৭ আগস্ট ২০২৬। এটি চূড়ান্ত রায় নয়; পরবর্তী তিন মাস অন্তর হালনাগাদ করার মতো একটি জীবন্ত জবাবদিহি নথি।
এক নজরে প্রতিশ্রুতি-পরীক্ষা
| প্রতিশ্রুতি | বর্তমান অবস্থা | সংক্ষিপ্ত রায় |
|---|---|---|
| জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন | উল্টো পথে | ঘোষিত অঙ্গীকার থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল বা মেয়াদোত্তীর্ণ |
| সংসদীয় জবাবদিহি | আংশিক | সংসদ সক্রিয়, কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এখনো অসম্পূর্ণ |
| বিচার বিভাগের স্বাধীনতা | আংশিক | কিছু আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে; নিয়োগ, বিকেন্দ্রীকরণ ও কার্যকর স্বাধীনতার পূর্ণ রূপ দৃশ্যমান নয় |
| পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা সংস্কার | স্থবির | স্বাধীন ও নাগরিকমুখী পুলিশ কমিশনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; রাজনৈতিক সহিংসতাও উদ্বেগ তৈরি করেছে |
| প্রশাসনে মেধা ও নিরপেক্ষতা | স্থবির | বাজেটে মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের যাচাইযোগ্য কাঠামো অনুপস্থিত |
| মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা | আংশিক | মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কমেছে, কিন্তু এখনো উচ্চ; নিম্ন আয়ের মজুরি তাল মেলাতে পারেনি |
| ব্যাংক খাত সংস্কার | স্থবির | কঠোর মুদ্রানীতি রয়েছে, কিন্তু খেলাপি ঋণ ও দুর্বল ব্যাংকের সংকট গুরুতর |
| কর্মসংস্থান | প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে | উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও তহবিল ঘোষণা হয়েছে; ১৭১ দিনে ফল যাচাইয়ের মতো প্রকাশ্য উপাত্ত নেই |
| গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা | উল্টো পথে | পুরোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভাঙার বদলে নতুন আইন ও সম্প্রচার-নিষেধে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বহাল |
| ভারসাম্যপূর্ণ ভারতনীতি | স্থবির | সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা থাকলেও প্রত্যর্পণ ও দিল্লির রাজনৈতিক মঞ্চ ঘিরে টানাপোড়েন বেড়েছে |
১. জুলাই সনদ: অঙ্গীকার থেকে পশ্চাদপসরণ
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সরকার বলেছে, জুলাই জাতীয় সনদ “অক্ষরে ও চেতনায়” বাস্তবায়ন করা হবে। অথচ অঙ্গীকারটির প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো সংসদে অনুমোদন করা। ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সময় মানবাধিকার, বিচারিক নজরদারি, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা ও পুলিশ সংস্কারসংক্রান্ত অন্তত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে অথবা সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে।
সমস্যাটি কেবল কয়েকটি আইনের মৃত্যু নয়। জুলাই সনদের মূল দর্শন ছিল নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহি। যেসব ব্যবস্থায় ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেগুলোই যদি প্রথম ধাপে দুর্বল হয়, তাহলে সনদটি রাজনৈতিক স্মারক হয়ে থাকার ঝুঁকিতে পড়ে। তাই এই প্রতিশ্রুতির বর্তমান অবস্থা উল্টো পথে।
২. সংসদ: উপস্থিতি আছে, ভারসাম্য কতটা?
দীর্ঘ অন্তর্বর্তী পর্বের পর নির্বাচিত সংসদ ফিরে আসা নিজেই একটি অগ্রগতি। বাজেট পেশ, অধ্যাদেশ পর্যালোচনা এবং নীতিগত বিতর্কের সাংবিধানিক মঞ্চ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সংসদের গুণমান কেবল অধিবেশন বসার ওপর নির্ভর করে না; সরকারকে কতটা প্রশ্ন করা যাচ্ছে, কমিটির নেতৃত্বে বিরোধী দলের ভূমিকা কতটা এবং সরকারি দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—সেটিই আসল পরীক্ষা।
জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বিরোধী দল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নিয়োগ এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ছিল ক্ষমতার ভারসাম্যের উপায়। এগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সংসদ নির্বাচিত হলেও তার জবাবদিহিমূলক শক্তি অসম্পূর্ণ। রায়: আংশিক।
৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: ভিত্তি আছে, ভবন অসম্পূর্ণ
বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় ও বিকেন্দ্রীকরণের মতো পদক্ষেপ দীর্ঘদিনের দাবি। সংস্কার পর্বে স্বাধীন সচিবালয়ের দিকে আইনি অগ্রগতি হয়েছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি জুলাই সনদেও গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্থ শুধু একটি সচিবালয় নয়। বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, নিম্ন আদালতে নির্বাহী প্রভাব হ্রাস এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছু একসঙ্গে কার্যকর হতে হয়।
বর্তমান সময়ে কিছু ভিত্তি তৈরি হলেও বিচারিক নিয়োগ ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের পরিমাপযোগ্য পূর্ণ ফল এখনও প্রকাশ্য নয়। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলায় সমতার ধারণাটিও বিতর্কের বাইরে যেতে পারেনি। তাই রায় আংশিক।
৪. পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা: নাম বদলালেই সংস্কার হয় না
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশার একটি ছিল পুলিশকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে নাগরিকমুখী ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী করা। স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, বেআইনি বলপ্রয়োগের তদন্ত এবং রাজনৈতিক নির্দেশ থেকে পেশাগত স্বাধীনতা—এসব ছিল সংস্কারের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
কিন্তু পুলিশ কমিশনের কাঠামো নিয়ে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, সেখানে অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাতন্ত্রের প্রভাব বহাল রাখার সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অভিযুক্ত বা বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও দেখিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা এখনো সমান নাগরিকত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। কমিশন গঠন বা রদবদলকে ফল বলা যায় না, যতক্ষণ থানায় সেবা, হেফাজতে আচরণ ও রাজনৈতিক ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত বদলাচ্ছে না। রায়: স্থবির।
৫. প্রশাসনে মেধা: ঘোষণার সঙ্গে প্রমাণের দূরত্ব
বাজেট বক্তৃতায় “মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ” গড়ার কথা বলে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রধান মানদণ্ড করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বেতনকাঠামো ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণাও প্রশাসনিক সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা।
কিন্তু মেধা যাচাইয়ের প্রকাশ্য মানদণ্ড, উচ্চপদে নিয়োগের কারণ প্রকাশ, স্বার্থের সংঘাত ঘোষণা এবং বদলি–পদোন্নতির স্বাধীন নিরীক্ষা ছাড়া প্রতিশ্রুতিটি যাচাই করা যায় না। আগের শাসনগুলোর মতো দলীয় আনুগত্য নতুন পরিচয়ে ফিরে আসছে কি না—সেটিও নাগরিকের জানার অধিকার। এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ নেই। রায়: স্থবির।

৬. মূল্যস্ফীতি: হার কমা আর স্বস্তি ফেরা এক নয়
সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে জরুরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের হিসাবে FY26-এ মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং নিম্ন আয়ের শ্রমিকের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে দারিদ্র্য ২১.৪ শতাংশে উঠেছে; নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পড়েছে।
অর্থাৎ ২০২৪ সালের চূড়া থেকে মূল্যস্ফীতি কমা ইতিবাচক, কিন্তু বাজারে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরে এসেছে বলা যাবে না। উচ্চ সুদের মাধ্যমে চাহিদা কমানো হচ্ছে, অথচ সরবরাহব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা, বাজার কারসাজি ও জ্বালানি ব্যয়ের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ধীর। রায়: আংশিক।
৭. ব্যাংক খাত: চিকিৎসা শুরু, রোগ এখনও গভীর
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য কড়াকড়ি বজায় রেখেছে। নমনীয় বিনিময় হার ও শক্তিশালী রেমিট্যান্স বৈদেশিক খাতে কিছু স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের মূল রোগ—খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, রাজনৈতিক ঋণ এবং দুর্বল ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভরতা—এখনও সংকটজনক। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০.৬ শতাংশ।
সুদের হার উঁচু রাখা ব্যাংক সংস্কার নয়। কারা ঋণ ফেরত দিচ্ছে না, পুনঃতফসিল বা ছাড় কারা পাচ্ছে, ব্যাংক পরিচালকদের দায় কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং আমানতকারীর অর্থ রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসবের প্রকাশ্য ফল দরকার। দৃশ্যমান নিষ্পত্তি ও জবাবদিহির ঘাটতিতে রায় স্থবির।
৮. কর্মসংস্থান: বড় লক্ষ্য, ফল মাপার সময় শুরু
সরকার প্রযুক্তি খাতে বছরে দুই লাখ প্রত্যক্ষ এবং প্রশিক্ষণ ও সৃজনশীল শিল্পের মাধ্যমে আট লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য জানিয়েছে। ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল, জেলা–উপজেলায় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এবং নতুন কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পরিকল্পনাও বাজেটে রয়েছে। এগুলো সম্ভাবনাময় নীতি-উপকরণ।
তবে পরিকল্পিত চাকরি আর বাস্তবে পাওয়া চাকরি এক নয়। কতজন নতুনভাবে কর্মরত হয়েছেন, কতটি চাকরি টেকসই, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশ কত এবং প্রশিক্ষণ শেষে আয় বেড়েছে কি না—এসবের ত্রৈমাসিক প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ড নেই। ফলে এখনই সাফল্য বা ব্যর্থতা বলা অনুচিত। অবস্থা: প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে।
৯. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: পুরোনো নিয়ন্ত্রণের নতুন ভাষা
নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা হলো—সরকার নিজের সমালোচনা কতটা সহ্য করে। অথচ সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য ও জাতীয় ডেটা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিধানে বিচারিক সুরক্ষা ছাড়া নজরদারি ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়ে গেছে বলে স্বাধীন মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে। তথ্য অধিকার আইন সংস্কারেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আদালতের আদেশের কথা উল্লেখ করে গণমাধ্যমকে শেখ হাসিনার দিল্লির বক্তব্য প্রচার না করতে সতর্ক করা হয়েছে। দণ্ডিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রচারে সম্পাদকীয় সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু সংবাদমূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে গেলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। বিদ্বেষ বা সহিংসতায় উসকানি রোধের নির্দিষ্ট আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা এক বিষয় নয়। রায়: উল্টো পথে।
১০. ভারতনীতি: স্বাভাবিক সম্পর্কের চেষ্টা, নতুন সংকটের চাপ
নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের আগ্রহ দেখিয়েছে। বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তায় কার্যকর সম্পর্ক বাংলাদেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া এবং দিল্লিতে তাঁকে রাজনৈতিক মঞ্চ দেওয়ার ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবার উত্তপ্ত হয়েছে। ভারত অনুষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও ঢাকার আপত্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন দূর হয়নি।
ভারতনীতি শুধু হাসিনা প্রশ্নে আটকে থাকলে বাংলাদেশের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হবে; আবার বাস্তব উদ্বেগ উপেক্ষা করে সম্পর্ক স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টাও টেকসই নয়। নীতি হতে হবে ব্যক্তি নয়, পারস্পরিক স্বার্থ, চুক্তি ও সমতার ভিত্তিতে। সেই ভারসাম্য এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। রায়: স্থবির।
শেষ কথা: সরকার বদলেছে, পরীক্ষার মানদণ্ড বদলেছে কি?
১৭১ দিনের হিসাব বলছে, নতুন সরকার নির্বাচন ও বাজেটের মাধ্যমে স্বাভাবিক সাংবিধানিক শাসনের কাঠামো ফিরিয়েছে এবং অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কিছু নীতিগত উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। কিন্তু যেসব সংস্কার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে—পুলিশ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বিচারিক নজরদারি ও সংসদীয় ভারসাম্য—সেখানেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
সরকারের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রলোভন হলো আগের শাসনের অন্যায়কে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে একই রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার নিজের পক্ষে চালু রাখা। জবাবদিহি মানে অপরাধের বিচার; প্রতিশোধ মানে পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন, নিরাপত্তা ও বাকস্বাধীনতার মান বদলে দেওয়া। জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হবে নতুন কারা ক্ষমতায় এসেছে দিয়ে নয়, ক্ষমতাকে কতটা নিয়মের অধীন করা গেছে দিয়ে।
StateWatch এই ট্র্যাকার তিন মাস পর আবার হালনাগাদ করবে। তখন ঘোষণার বদলে ফল দেখতে হবে: কয়টি সংস্কার আইনে পরিণত হলো, কয়টি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কার্যকর হলো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে প্রকৃত মজুরির ব্যবধান কতটা কমল, কতটি নতুন চাকরি তৈরি হলো এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হলো। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি প্রতিশ্রুতি নয়—প্রমাণ।
সম্পাদকীয় নোট: দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তথ্যের কারণে প্রকাশের আগে সর্বশেষ সরকারি গেজেট, BBS মূল্যস্ফীতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পুনরায় মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
FAQ
নতুন সরকার কবে দায়িত্ব নেয়? ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়। ৭ আগস্ট পর্যন্ত ১৭১ দিন পূর্ণ হয়েছে।
StateWatch কীভাবে প্রতিশ্রুতিগুলো মূল্যায়ন করেছে? সরকারি নথি, সংসদীয় সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে অগ্রগতি, আংশিক, স্থবির ও উল্টো পথে—এই অবস্থাগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোন ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে? জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পুলিশি জবাবদিহি এবং ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় বাস্তবায়ন-ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
ট্র্যাকারটি কি হালনাগাদ হবে? হ্যাঁ। নতুন আইন, সরকারি ফলাফল ও স্বাধীন উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতি তিন মাসে এটি হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ