
নির্বাচন কমিশনের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ অ্যালগরিদম পশ্চিমবঙ্গের ৬০.০৬ লাখ ভোটারের রেকর্ড চিহ্নিত করেছিল। বিচারিক কর্মকর্তাদের পর্যালোচনায় বাদ পড়ে ২৭.১৬ লাখ নাম; তাঁদের ২২.২১ লাখই পুনর্ভুক্তির জন্য আপিল করেছেন। সিদ্ধান্ত মানুষ নিয়েছেন, কিন্তু সন্দেহের সূচনা করেছে যন্ত্র। এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ব্যাখ্যা ও সময়মতো প্রতিকার না থাকলে ভোটাধিকার কতটা নিরাপদ?
একজন নাগরিক ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারলেন, তালিকায় তাঁর নাম নেই। হাতে পরিচয়পত্র আছে, আগের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার স্মৃতিও আছে; কিন্তু এবার তিনি ভোটার নন। প্রশাসনের ভাষায় তাঁর রেকর্ডে হয়তো ছিল একটি ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’—তথ্যের এমন কোনো অসামঞ্জস্য, যা একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত করেছে। নাগরিকের কাছে বিষয়টি আরও সরল ও নির্মম: ভোটের দিন তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব কার্যত অদৃশ্য।
পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-পরবর্তী বিরোধ এই ব্যবধানটিকেই সামনে এনেছে। নির্বাচন কমিশনের সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিশনের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ অ্যালগরিদম ৬০.০৬ লাখ ভোটারের রেকর্ড চিহ্নিত করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ওডিশার প্রায় ৭০০ বিচারিক কর্মকর্তা সেগুলোর যোগ্যতা পর্যালোচনা করেন। তাঁদের সিদ্ধান্তে ২৭.১৬ লাখ নাম বাদ পড়ে এবং ৩২.৯ লাখ নাম রাখা হয়। পরে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২২.২১ লাখ—প্রায় ৮২ শতাংশ—নিজেদের নাম ফেরানোর জন্য আপিল করেন।
এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে দুটি সত্য তুলে ধরে। প্রথমত, অ্যালগরিদম নিজে কাউকে চূড়ান্তভাবে বাদ দেয়নি; বিচারিক কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই মানবিক সিদ্ধান্তও মেনে নেননি এবং পুনর্বিবেচনা চেয়েছেন। ফলে প্রশ্নটি ‘মানুষ বনাম যন্ত্র’ নয়। বরং যন্ত্রের সন্দেহ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, মানবিক বিচার এবং প্রতিকারের সময়—এই চারটি স্তর মিলে নাগরিকের ভোটাধিকারকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, সেটিই আসল বিষয়।
২৭ লাখের অর্থ কী—এবং কী নয়
রাজনৈতিক বিতর্কে সংখ্যা দ্রুত স্লোগানে পরিণত হয়। তাই প্রথমেই একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা জরুরি। ২৭.১৬ লাখ হলো অ্যালগরিদমে চিহ্নিত ৬০.০৬ লাখ ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ মামলার মধ্যে বিচারিক পর্যালোচনার পর বাদ পড়া নাম। এটি পুরো SIR প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত বা সদৃশ রেকর্ডসহ সব ধরনের বাদ পড়ার মোট সংখ্যা নয়। নির্বাচন কমিশনও অভিযোগ করেছে, রাজনৈতিক আবেদনে বিভিন্ন শ্রেণির সংখ্যা এক করে দেখানো হয়েছে।
এই সতর্কতা মানলেও ২২.২১ লাখ আপিলের গুরুত্ব কমে না। বাদ পড়া প্রতি পাঁচজনের চারজন সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেছেন। এত বড় আপিলের হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না যে প্রত্যেকটি বাদ দেওয়া ভুল ছিল; কেউ যথেষ্ট নথি না দিয়েও আপিল করতে পারেন। কিন্তু এটি অন্তত প্রমাণ করে যে সিদ্ধান্তগুলোর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা খুব দুর্বল এবং প্রক্রিয়াটি নাগরিকদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো নিষ্পত্তি হওয়া আপিলের ফল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া প্রায় ১.২২ লাখ মামলার মধ্যে ১,১৩,৯৪৩ জন—প্রায় ৯৩ শতাংশ—নিজেদের নাম ফেরাতে সফল হয়েছেন; ৮,৬৪৯ জনের আপিল ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সূত্র বলেছে, এই নমুনা সব আপিলের প্রতিনিধিত্ব করে না, কারণ যাঁদের নথি প্রস্তুত ছিল তাঁদের মামলা আগে নিষ্পত্তি হয়ে থাকতে পারে। তাই ৯৩ শতাংশ হারকে বাকি সব মামলায় প্রয়োগ করা যাবে না। তবু এটি দেখায়, প্রথম সিদ্ধান্তে বাদ পড়া বহু মানুষ পরবর্তী পরীক্ষায় বৈধ ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
নির্বাচনের পরে পাওয়া অধিকার কি পূর্ণ প্রতিকার?
সুপ্রিম কোর্ট ১০ মার্চ আপিলব্যবস্থা গঠনের নির্দেশ দেয়। নির্বাচন কমিশন ২০ মার্চ ১৯টি ট্রাইব্যুনাল বিজ্ঞাপিত করে; অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারকদের নেতৃত্বে সেগুলো ১৩ এপ্রিল কাজ শুরু করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট ছিল ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটের আগে তালিকায় ফিরতে পেরেছিলেন মাত্র ১,৬০৭ জন। বাকিরা আপিল করলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
এখানে ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি সামনে আসে: বিলম্বিত প্রতিকার অনেক সময় কার্যকর প্রতিকার নয়। কারও নাম সেপ্টেম্বর মাসে ফিরে এলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু এপ্রিলের নির্বাচনে হারানো ভোট ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। ভোট একটি মেয়াদোত্তীর্ণ অধিকার—নির্দিষ্ট দিন পার হয়ে গেলে তার প্রয়োগ আর পুনর্গঠন করা যায় না।
সেপ্টেম্বরের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ৩৮.২০ লাখের বেশি অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়াসংক্রান্ত আপিলের মধ্যে পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ১.০২ লাখ; ৩৭.১৮ লাখের বেশি তখনও বাকি। পরে কমিশন জানায়, ২২.২১ লাখ আপিল বাদ পড়া ভোটারদের নাম ফেরানোর এবং ১৬.১০ লাখ আপিল তালিকায় থাকা নাম আরও বাদ দেওয়ার দাবিতে। কমিশন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসনের সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই সক্ষমতা নির্বাচনের আগেই কেন তৈরি ছিল না?
অ্যালগরিদম কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
‘অ্যালগরিদমের হাতে ভোটাধিকার’ শিরোনামটি সরাসরি কোনো রোবট বিচারকের ছবি তৈরি করতে পারে। বাস্তবতা তার চেয়ে সূক্ষ্ম। অ্যালগরিদম রেকর্ডের তথাকথিত যৌক্তিক অসামঞ্জস্য শনাক্ত করেছে; এরপর বিচারিক কর্মকর্তারা নথি ও শুনানির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রক্রিয়ায় মানুষ ছিল। কিন্তু কে প্রথমে সন্দেহের আওতায় পড়বেন, সেই দরজাটি খুলেছে অ্যালগরিদম। এত বড় পরিসরে প্রাথমিক বাছাই নিজেই ক্ষমতার প্রয়োগ।
কোন বৈশিষ্ট্যকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বলা হয়েছে? নামের বানান বা বয়সের অমিল? পরিবারের সম্পর্ক? ঠিকানা বদল? একই ধরনের রেকর্ড? বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেসের অসম্পূর্ণ মিল? ব্যবস্থাটি কতবার ভুল ইতিবাচক ফল দিয়েছে—অর্থাৎ বৈধ ভোটারকে সন্দেহজনক বলেছে? জেলা, লিঙ্গ, বয়স, ভাষা বা সামাজিক গোষ্ঠীভেদে ভুলের হার কি আলাদা? এসবের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ছাড়া নাগরিক জানতেই পারেন না কেন তাঁর ওপর প্রমাণের বোঝা এসে পড়ল।
‘অ্যালগরিদম’ শব্দটি নিরপেক্ষতার আবরণ তৈরি করে। মনে হয়, একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়েছে, তাই পক্ষপাত নেই। কিন্তু নিয়ম কে লিখেছে, কোন তথ্য ব্যবহার হয়েছে এবং ভুল হলে কোন দিককে বেশি নিরাপদ ধরা হয়েছে—এসব মানবিক সিদ্ধান্ত। যদি ব্যবস্থার লক্ষ্য হয় সন্দেহজনক নাম বেশি করে ধরার, তবে বহু বৈধ ভোটারও জালে পড়বেন। ব্যাংকের জালিয়াতি শনাক্তকরণে এমন ভুলে একটি লেনদেন আটকে যেতে পারে; ভোটার তালিকায় সেই ভুল নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার স্থগিত করে।
তথ্যের অমিল কার জীবনে বেশি হয়
ভারতের মতো সমাজে সরকারি নথির বানান ও পরিচয়ের অসামঞ্জস্য অস্বাভাবিক নয়। বাংলা নাম ইংরেজিতে বিভিন্নভাবে লেখা হতে পারে। বিয়ের পর নারীর পদবি বা ঠিকানা বদলায়। পরিযায়ী শ্রমিক এক জায়গায় কাজ করেন, অন্য জায়গায় পরিবারের ঠিকানা রাখেন। দরিদ্র মানুষ ভাড়া বাড়ি বদলান, ভূমিহীন পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা দুর্বল, বয়স্ক মানুষের জন্মনিবন্ধন অসম্পূর্ণ হতে পারে। ডিজিটাল ব্যবস্থার কাছে এগুলো ‘ডেটা সমস্যা’; বাস্তবে এগুলো নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক জটিলতা।
SIR চলাকালে ভোটার তালিকায় প্রতি হাজার পুরুষের বিপরীতে নারী ভোটারের অনুপাত ৯৭০ থেকে খসড়া তালিকায় ৯৫৬-তে নেমেছিল; চূড়ান্ত তালিকায় তা ৯৬৪-তে ওঠে। এই পরিবর্তন একা বৈষম্য প্রমাণ করে না, কিন্তু কারা বেশি বাদ পড়েছেন তা লিঙ্গ, বয়স, জেলা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী প্রকাশের প্রয়োজন দেখায়। প্রযুক্তির ন্যায়সংগততা গড় নির্ভুলতায় বিচার করা যায় না; ভুলের বোঝা কার ওপর পড়ছে, সেটিও দেখতে হয়।
নথি দেখিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার সামর্থ্যও সবার সমান নয়। শুনানিতে যেতে যাতায়াত খরচ, কাজের দিন নষ্ট, নথি জোগাড় এবং আইনি সহায়তার প্রয়োজন হয়। ১৯টি ট্রাইব্যুনাল যদি মূলত কলকাতার উপকণ্ঠে কেন্দ্রীভূত থাকে, দূরের জেলার একজন দিনমজুর বা প্রবীণ নারীর আপিল কাগজে সহজ হলেও বাস্তবে কঠিন। কমিশনের ‘লোকেশন-অ্যাগনস্টিক’ সফটওয়্যার দূরবর্তী শুনানির সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু ডিজিটাল ব্যবধান ও সহায়তার প্রশ্নও সমাধান করতে হবে।
স্বচ্ছতার ন্যূনতম মান কী হওয়া উচিত
ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন রাখা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। মৃত, স্থানান্তরিত, সদৃশ বা অযোগ্য রেকর্ড না সরালে এক ব্যক্তি এক ভোটের নীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং তালিকা সংশোধনের বিরোধিতা আর নির্বিচার বাদ দেওয়ার বিরোধিতা এক বিষয় নয়। একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা একই সঙ্গে ভুল অন্তর্ভুক্তি এবং ভুল বর্জন—দুই ঝুঁকিই কমাবে।
এর জন্য কয়েকটি ন্যূনতম সুরক্ষা দরকার। প্রথমত, অ্যালগরিদম কোন শ্রেণির অসামঞ্জস্য শনাক্ত করে, তার পূর্ণ নিয়ম ও উদাহরণ প্রকাশ করতে হবে; নিরাপত্তাজনিত সীমিত অংশ থাকলে স্বাধীন বিশেষজ্ঞের নিরীক্ষা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কাউকে চিহ্নিত করা হলে সহজ ভাষায় নির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে—শুধু ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ নয়। তৃতীয়ত, চূড়ান্ত বাদ দেওয়ার আগে ব্যক্তিগত নোটিশ, পর্যাপ্ত সময় এবং স্থানীয়ভাবে নথি দেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। চতুর্থত, ভুলের হার ও আপিলের ফল জেলা, লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক সমষ্টিগত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করতে হবে।
পঞ্চমত, নির্বাচন ঘোষণার বহু আগে আপিল নিষ্পত্তির বাধ্যতামূলক সময়সীমা থাকা দরকার। ভোটের কয়েক দিন আগে ট্রাইব্যুনাল চালু করে লাখ লাখ আপিল শোনা বাস্তবসম্মত নয়। ষষ্ঠত, বাদ পড়া ব্যক্তির আপিলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ তালিকায় থাকা একটি নাম নিয়ে আপত্তি এবং কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার হারানো সমান ধরনের ক্ষতি নয়। সুপ্রিম কোর্টও শুনানিতে এই পার্থক্যটির দিকে ইঙ্গিত করেছে। সপ্তমত, অ্যালগরিদমিক বাছাই ও মানবিক সিদ্ধান্ত—দুই স্তরেরই অডিট ট্রেইল সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে পরে বোঝা যায় কোথায় ভুল হয়েছে।
রাজনৈতিক ফলের প্রশ্ন
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ৩১টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি—এই যুক্তিতে ফল বাতিলের দাবি তুলেছেন। নির্বাচন কমিশন বলেছে, ভোটার তালিকার ত্রুটির ভিত্তিতে সমাপ্ত নির্বাচন সরাসরি বাতিল করা যায় না; Representation of the People Act অনুযায়ী নির্বাচনী পিটিশনের পথ নিতে হয়। কমিশন আরও বলেছে, একই তুলনায় তৃণমূলের জেতা ২১টি আসনেও বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল।
শুধু বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি হলেই ফল বদলেছে—এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। বাদ পড়া সবাই ভোট দিতেন কি না, কাকে ভোট দিতেন, কিংবা তাঁদের মধ্যে কতজন সত্যিই যোগ্য—এসব অজানা। ফলে নির্বাচনের ফল পাল্টেছে বলে প্রমাণ ছাড়া ঘোষণা দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু ফল বদলানোর প্রমাণ না থাকলেও ভোটাধিকার হারানোর ঘটনা তুচ্ছ হয় না। গণতন্ত্রে ক্ষতি শুধু কে সরকার গঠন করল, তা দিয়ে মাপা যায় না; একজন যোগ্য নাগরিক ভোট দিতে পারলেন কি না, সেটিও নিজস্ব মূল্য বহন করে।
পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা তাই প্রযুক্তিবিরোধী সতর্কতা নয়; এটি জবাবদিহিহীন প্রযুক্তির বিরুদ্ধে সতর্কতা। বড় ভোটার তালিকায় অসামঞ্জস্য শনাক্ত করতে সফটওয়্যার দরকার হতে পারে। কিন্তু সন্দেহ তৈরির ক্ষমতার সঙ্গে কারণ ব্যাখ্যা, ভুল সংশোধন এবং নির্বাচনের আগে প্রতিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতাও থাকতে হবে। অন্যথায় অ্যালগরিদম কেবল প্রশাসনিক সহায়ক থাকে না; নাগরিকত্বের প্রবেশদ্বারে অদৃশ্য প্রহরী হয়ে ওঠে।
২৭.১৬ লাখ নাম বাদ পড়া এবং ২২.২১ লাখ আপিলের ঘটনা শেষ পর্যন্ত একটি সহজ প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়: রাষ্ট্র কি নাগরিককে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত ভোটার হিসেবে দেখবে, নাকি অ্যালগরিদম সন্দেহ করলেই নাগরিককে আবার নিজেকে প্রমাণ করতে হবে? পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা গণতন্ত্রের শর্ত। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা ও সময়মতো প্রতিকার ছাড়া পরিচ্ছন্নতার অভিযানই ভোটাধিকার সংকোচনের যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ