Author: দর্শন ডেস্ক

ধরা যাক, একজন বন্ধু আপনার বিশ্বাস ভেঙেছেন। ব্যক্তিগত একটি কথা অন্যের কাছে বলেছেন, তারপর ক্ষমা চেয়েছেন। আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর প্রতি প্রতিশোধের ইচ্ছা পোষণ করবেন না। কিন্তু পরেরবার ব্যক্তিগত কথা বলার আগে সতর্ক থাকবেন। বন্ধু তখন বললেন, ‘ক্ষমা করলে আবার আগের মতো বিশ্বাস করতে পারছ না কেন?’ এই প্রশ্নে একটি পরিচিত বিভ্রান্তি আছে। ক্ষমা, বিশ্বাস এবং সম্পর্কের পুনরুদ্ধারকে আমরা প্রায়ই একই সিদ্ধান্ত বলে ধরে নিই। যেন ক্ষমার ঘোষণা দিলেই ক্ষতির ইতিহাস মুছে যাবে, ভুলকারী আগের অধিকার ফিরে পাবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না। অথচ মানুষকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত এবং তাকে আবার নিজের জীবনে একই জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত…

Read More

এক বিকেলে আপনি নদীর পাশে বসে ছিলেন। কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, কোনো সমস্যার সমাধান করেননি। আলো বদলেছে, কয়েকটি নৌকা গেছে, তারপর বাড়ি ফিরেছেন। কেউ যদি জানতে চায়, ‘এতে কী লাভ হলো?’—হয়তো বলার মতো উত্তর খুঁজে পাবেন না। অথচ বিকেলটিকে অর্থহীন বলতেও মন সায় দেবে না। কিছু সময় আমাদের ভালো লাগে, কিন্তু সেই ভালো লাগার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা কঠিন। জীবনের সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগতেই হবে কি না, প্রশ্নটির শুরু এখানেই। আমরা কোনো বিষয় শেখার জন্য সময় দিই, জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করি, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিই। এসবের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই প্রয়োজনের হিসাব যখন জীবনের প্রতিটি কোণে ঢুকে পড়ে, তখন একটি…

Read More

ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ী ক্রেতাকে ঠকান না। কিন্তু তাঁর সততার কারণ হলো, প্রতারণা ধরা পড়লে ব্যবসার ক্ষতি হবে। আরেকজন ব্যবসায়ীও ক্রেতাকে ঠকান না, কারণ তিনি মনে করেন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা অন্যায়—ধরা পড়ুক বা না পড়ুক। বাইরে থেকে দুজনের আচরণ একই। কিন্তু তাঁদের নৈতিক অবস্থানও কি একই? ইমানুয়েল কান্টের দর্শন এই প্রশ্নে আমাদের থামিয়ে দেয়। ভালো কাজের ফলের পাশাপাশি তিনি জানতে চান, কাজটি কোন নীতিতে এবং কেন করা হলো। এই প্রশ্ন ব্যক্তিগত সততা থেকে রাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা কি সঠিক কাজ করি সুবিধার জন্য, নাকি সঠিক বলেই করি? অন্য মানুষকে সম্মান করি, নাকি নিজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তাঁর সঙ্গে ভালো…

Read More

হঠাৎ বহুদিন আগের একটি গন্ধ ফিরে এল। ভেজা মাটি, পুরোনো কাঠের আলমারি কিংবা শীতের সকালের রান্নাঘর। আপনি তখনো মনে মনে কোনো বাক্য বলেননি, অথচ একটি জায়গা, একটি মুখ, হয়তো হারিয়ে যাওয়া সময়ের অনুভূতি এসে গেছে। তারপর আপনি বলেন, ‘ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে।’ বাক্যটি কি স্মৃতিটিকে তৈরি করল, নাকি ইতিমধ্যে উপস্থিত স্মৃতিকে অন্যের কাছে পৌঁছানোর একটি রূপ দিল? এই ছোট অভিজ্ঞতার মধ্যেই বড় একটি দার্শনিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে: ভাবনা কি মনের ভেতরে উচ্চারিত ভাষা? শব্দগুলো সরিয়ে নিলে কী থাকে—অস্পষ্ট অনুভূতি, নাকি চিন্তার অন্য কোনো বিন্যাস? প্রশ্নটির শুরুতেই একটি পার্থক্য করা দরকার। শব্দ না থাকা আর ভাষা না থাকা এক নয়। ইশারাভাষা…

Read More

একটি মানিব্যাগ পড়ে আছে নির্জন পথে। আশপাশে কেউ নেই। কোনো ক্যামেরায় আপনার মুখ ধরা পড়বে না। মালিকও জানতে পারবেন না, মানিব্যাগটি কে পেয়েছিল। আপনি সেটি ফিরিয়ে দেবেন, নাকি টাকা রেখে চলে যাবেন? প্রশ্নটি টাকার পরিমাণ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ দেখছে না—এই নিশ্চয়তা আমাদের সিদ্ধান্ত কতটা বদলে দেয়। আমরা সাধারণত নিজেদের ভালো মানুষ ভাবতে পছন্দ করি। কিন্তু নিজের নৈতিকতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং সুবিধা পেলে আমরা কী করব—এই দুটির মধ্যে দূরত্ব থাকতে পারে। শাস্তির ভয় সেই দূরত্ব আড়াল করে রাখতে পারে। আবার এমন আচরণও কল্পনা করা যায়, যেখানে কোনো পুরস্কার বা শাস্তির হিসাব ছাড়াই একজন মানুষ অন্যের অধিকারকে গুরুত্ব দেন।…

Read More

একটি ঘটনার কথা ভাবুন। কোনো সংগঠনের কর্মী একজনকে প্রকাশ্যে অপমান করেছেন। ঘটনাটি শুনে আপনি বললেন, এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কিছুক্ষণ পর জানা গেল, কর্মীটি আপনার পছন্দের সংগঠনের। তখন কি আপনার বিচার একই থাকবে? নাকি মনে হবে, পুরো ঘটনাটি জানা দরকার, নিশ্চয়ই উসকানি ছিল, হয়তো অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে? পুরো ঘটনা জানতে চাওয়া অবশ্যই যুক্তিসংগত। সমস্যা শুরু হয় যখন এই সতর্কতা শুধু নিজের পক্ষের জন্য বরাদ্দ থাকে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগকেই যথেষ্ট মনে করি, অথচ নিজের পক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ এলেও নতুন ব্যাখ্যা খুঁজি। তখন আমরা শুধু তথ্য যাচাই করছি না; একই কাজের জন্য দুই ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করছি। এই…

Read More

হঠাৎ কোনো বড় সংকট শুরু হলে খবরের অভাবের চেয়ে ব্যাখ্যার ভিড় অনেক সময় বেশি চোখে পড়ে। একই ভিডিও দেখে কেউ বলেন, ‘এবার সত্য বেরিয়ে এসেছে’; অন্যজন বলেন, ‘এটি সাজানো’। একই পরিসংখ্যানে কারও কাছে ব্যর্থতার প্রমাণ, কারও কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাফল্যের চিহ্ন। তথ্যটি হয়তো সবার সামনে একই। তবু মানুষ যেন ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। কেন? প্রশ্নটি কেবল কে ঠিক আর কে ভুল, তা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের অনিশ্চয়তা সহ্য করার ক্ষমতা, নিজের দল ও পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য, কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা এবং ভুল স্বীকারের মানসিক মূল্য। সংকট যত গভীর হয়, নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন তত বাড়ে। একই সঙ্গে এমন…

Read More

গণহত্যার ছবি দেখলে একটি স্বস্তিদায়ক ধারণা মনে জন্মায়: যারা এমন কাজ করেছে, তারা নিশ্চয়ই আমাদের মতো মানুষ ছিল না। তারা ছিল উন্মাদ, নিষ্ঠুর কিংবা জন্মগত অপরাধী। এই ব্যাখ্যা আমাদের নিরাপদ বোধ করায়। কারণ হত্যাকারী যদি সম্পূর্ণ আলাদা কোনো প্রজাতির মানুষ হয়, তবে নিজেদের সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও বিবেককে পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না। ইতিহাস অবশ্য আরও অস্বস্তিকর কথা বলে। গণহত্যা শুধু কয়েকজন উন্মত্ত নেতার হাতে ঘটে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় আইন লেখার মানুষ, তালিকা তৈরির কেরানি, রেল চালানো কর্মী, সম্পত্তি দখলকারী প্রতিবেশী, প্রচার ছড়ানো সাংবাদিক, নির্দেশ মানা পুলিশ, দরজা বন্ধ রাখা কর্মকর্তা এবং এমন অসংখ্য দর্শক—যারা হত্যায় সরাসরি হাত না…

Read More

মানুষ কেন ভালো হবে—শাস্তির ভয় থেকে, পুরস্কারের আশায়, নাকি ভালো কাজ নিজেই মূল্যবান বলে? প্রশ্নটি যতটা ধর্মীয়, ততটাই দার্শনিক। বহু বিশ্বাসীর কাছে নৈতিকতার চূড়ান্ত ভিত্তি ঈশ্বর: তিনি ভালো-মন্দ নির্ধারণ করেন, মানুষের বিবেককে জবাবদিহির অনুভূতি দেন এবং এমন এক ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি রাখেন যা পার্থিব আদালত দিতে পারে না। অন্যদিকে, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদীরা বলেন, সহমর্মিতা, যুক্তি, পারস্পরিক স্বার্থ এবং মানুষের মর্যাদাবোধ থেকেই নৈতিকতা গড়ে উঠতে পারে। তাহলে নৈতিকতার জন্য ঈশ্বর কি সত্যিই অপরিহার্য? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রথমেই দুটি আলাদা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এক, মানুষ নৈতিক বিশ্বাস কোথা থেকে পায়। দুই, সেই বিশ্বাস সত্য বা বাধ্যতামূলক হওয়ার ভিত্তি কী। কোনো ব্যক্তি…

Read More

ধরা যাক, একই রাজনৈতিক ঘটনার দুটি সংবাদ আপনার সামনে রাখা হলো। একটিতে আপনার পছন্দের দলকে সফল বলা হয়েছে, অন্যটিতে সেই দলের ব্যর্থতার প্রমাণ হাজির করা হয়েছে। কোন প্রতিবেদনটি আপনি আগে খুলবেন? কোনটির তথ্যসূত্র বেশি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবেন? আর কোনটির দুর্বলতা খুঁজতে আপনার মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় হবে? অধিকাংশ মানুষই বলবে, তারা নিরপেক্ষভাবে দুটিই বিচার করবে। বাস্তবে আমরা প্রায়ই তা করি না। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন সংবাদে ছোটখাটো ত্রুটি উপেক্ষা করি। বিপরীত সংবাদে শব্দের ব্যবহার, লেখকের পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে শুরু করে সম্ভাব্য উদ্দেশ্য—সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করি। পছন্দের বক্তব্যে একটি দুর্বল সূত্রও যথেষ্ট মনে হয়; অপছন্দের বক্তব্যে দশটি শক্তিশালী সূত্রেও…

Read More