বাংলাদেশে আত্মহত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক ঘটনা নয়; এটি ক্রমেই বড় একটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও একজন মানুষ চরম মানসিক সংকটের মধ্যে নিজের জীবন শেষ করে দিচ্ছেন। পেছনে থেকে যাচ্ছে পরিবার, স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও একটি সমাজের জন্য অসংখ্য প্রশ্ন। কেন একজন মানুষ এমন সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যান? কেন তাঁর সংকটটি সময়মতো শনাক্ত করা যায় না? আর কেন সংকটে থাকা একজন মানুষকে সহায়তা করার বদলে অনেক সময় সামাজিক stigma, ভয় কিংবা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়?
পুলিশের নথি বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে আত্মহত্যা করেছেন ৭৬ হাজার ৩৬১ জন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। এই সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের অনুমিত হিসাবের তিন গুণের বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪ হাজার ৭১৪ জন আত্মহত্যা করেন। দুই উৎসের পরিসংখ্যানে এত বড় পার্থক্যই দেখিয়ে দেয়—দেশে আত্মহত্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্য সংগ্রহ কতটা জরুরি।
বাংলাদেশ জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০-এর খসড়ায় পুলিশের নথির ভিত্তিতে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতেও পরিস্থিতির ব্যাপকতা স্পষ্ট। ২০২৪ সালে আত্মহত্যার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ছিল—১৩ হাজার ৯৭৫টি। বিপরীতে ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ, ১৬ হাজার ৮৮৬। ২০২১ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ১৫ হাজার ৭৭৪টি। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে সংখ্যাটি ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে।
তবে সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষগুলো। আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনায় একজন মানুষ হারিয়ে যান, কিন্তু তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও। স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় অপরাধবোধ, সামাজিক চাপ, মানসিক আঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা। অনেক পরিবার সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে ঘটনাটি নিয়ে কথা বলতে চায় না। ফলে আত্মহত্যা নিয়ে বাস্তব আলোচনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ কাজ করে না। পারিবারিক ও সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, বেকারত্ব, আর্থিক সংকট, পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা নানা ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা একজন মানুষকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
তরুণ বয়স এমনিতেই জীবনের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, চাকরি, সম্পর্ক, পরিবার ও সামাজিক প্রত্যাশা—সবকিছু একসঙ্গে চাপ তৈরি করতে পারে। বাইরে থেকে একজন তরুণকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে তিনি হয়তো গভীর মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে মানসিক সমস্যাকে এখনও অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে অনেকে সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করেন।
এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক stigma। শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণত চিকিৎসকের কাছে যেতে দ্বিধা করে না। কিন্তু মানসিক সমস্যার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই ভয় পান—মানুষ কী বলবে, পরিবার কীভাবে নেবে, সমাজে তাঁর অবস্থান কী হবে। এই ভয় একজন সংকটে থাকা মানুষকে আরও একা করে দিতে পারে।
আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাও অনেক সময় সঠিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ—আইসিডিডিআরবির গবেষকরা জানিয়েছেন, ভয় ও সামাজিক stigma-এর কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানেও সব ঘটনা ধরা পড়ে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য ধরনের মৃত্যুকেও আত্মহত্যা হিসেবে বা আত্মহত্যার ঘটনাকে অন্যভাবে নথিভুক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য হাসপাতাল, থানা এবং স্থানীয় কমিউনিটির তথ্য সমন্বয় করা প্রয়োজন।
কমিউনিটি পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষের আচরণে পরিবর্তন অনেক সময় তাঁর কাছের মানুষ, শিক্ষক, প্রতিবেশী, স্থানীয় ধর্মীয় নেতা কিংবা পরিচিতরাই আগে বুঝতে পারেন। কিন্তু এসব পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো সচেতনতা না থাকলে সংকট গভীর হতে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধকে শুধু হাসপাতাল বা পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং স্থানীয় সমাজকেও এর অংশ হতে হবে।
আইনগত কাঠামোও এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তার প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে বর্তমানে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক সাম্প্রতিক সভায় বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এই আইন বাতিল বা সংস্কারের সুপারিশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, আত্মহত্যার চেষ্টা করা একজন ব্যক্তি সাধারণত গভীর সংকটের মধ্যে থাকেন। সেই মুহূর্তে তাঁর প্রয়োজন চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা ও সহানুভূতি—শাস্তি নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭১টি দেশে পরিচালিত এক গবেষণায় আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার সঙ্গে আত্মহত্যার প্রবণতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ এ ধরনের আইন বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরেও আইন পরিবর্তনের পর আত্মহত্যার হার কমার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, আত্মহত্যার হুমকি ব্যবহার করে কাউকে ব্ল্যাকমেল বা চাপে ফেলার মতো পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা দরকার। পুলিশের একজন কর্মকর্তা আবার দাবি করেছেন, আইনের উপস্থিতি কিছু মানুষকে আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে পারে। অর্থাৎ আইন সংস্কারের প্রশ্নটি একেবারে সরল নয়। তবে সংকটে থাকা মানুষের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রাণঘাতী উপকরণের সহজলভ্যতা কমানো। বাংলাদেশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন কীটনাশক, বালাইনাশক ও আগাছানাশক সহজলভ্য হওয়ায় এগুলোর নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিক্রয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। কৃষিকাজে এসব উপকরণের প্রয়োজন থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার, বিক্রি ও সংরক্ষণে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি থাকা জরুরি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, বিপজ্জনক উপকরণে মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার সীমিত করা আত্মহত্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কিছু কৃষি রাসায়নিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর আত্মহত্যা কমার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের কিছু অঞ্চলেও কৃষকদের কাছে সরাসরি এসব উপকরণ না দিয়ে সমবায় বা স্থানীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
তবে শুধু আইন পরিবর্তন কিংবা উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ফল, ব্যর্থতা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। একজন শিক্ষার্থী খারাপ ফল করলে কিংবা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে তার জীবন থেমে যায় না—এই বার্তাটি পরিবার ও শিক্ষকদের দিতে হবে। একইভাবে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, চাকরি না পাওয়া কিংবা আর্থিক সংকটের মতো পরিস্থিতিকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে না দেখে সাময়িক সংকট হিসেবে মোকাবিলা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা জরুরি। অতিরঞ্জিত বা আবেগনির্ভর উপস্থাপন কখনোই কাম্য নয়। বরং আত্মহত্যা প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য, সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা সামনে আনতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরাও তরুণদের ঝুঁকি বোঝার পাশাপাশি গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য তাই সবচেয়ে আগে প্রয়োজন মানুষের সংকটকে গুরুত্ব দেওয়া। একজন মানুষ হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান—এমন ধারণা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। দীর্ঘদিনের চাপ, একাকিত্ব, হতাশা, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা মানসিক অসুস্থতার মতো বিষয় ধীরে ধীরে একজন মানুষকে ভেঙে দিতে পারে। সেই পরিবর্তনগুলো সময়মতো শনাক্ত করা গেলে সহায়তার সুযোগ তৈরি হয়।
পরিবারের সদস্যদের তাই শুধু সন্তানের ফলাফল, আয় বা সামাজিক সাফল্যের দিকে নজর দিলে হবে না; তাঁর মানসিক অবস্থার প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। কেউ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে গুটিয়ে নিলে, স্বাভাবিক জীবনযাপনে আগ্রহ হারালে বা গভীর সংকটে থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে তাঁর সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে বছরে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পুলিশ কিংবা হাসপাতালের সমস্যা নয়। এটি পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র, আইন, গণমাধ্যম এবং পুরো সমাজের সমস্যা। তাই সমাধানও হতে হবে সম্মিলিত।
সবচেয়ে জরুরি হলো আত্মহত্যাকে নিয়ে নীরবতা ভাঙা। মানসিক সংকটে থাকা মানুষকে বিচার না করে শুনতে হবে, অপমান না করে পাশে দাঁড়াতে হবে, ভয় না দেখিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ দেখাতে হবে। আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে দেখার বদলে একজন সংকটাপন্ন মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়াতে হবে।
কারণ একটি জীবন হারানোর পর আফসোস করে লাভ নেই। প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর সময় হলো তার আগেই—যখন একজন মানুষ এখনও সাহায্য চাইতে পারেন, যখন পরিবার তাঁর পরিবর্তন বুঝতে পারে, যখন সমাজ তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারে এবং যখন রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে। বাংলাদেশের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান তাই শুধু উদ্বেগের কারণ নয়; এটি এখনই কার্যকর, মানবিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
আপনার মতামত জানানঃ