
একটি শিশুর মৃত্যু সব সময়ই একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু যে রোগ টিকার মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেই রোগে শিশুর মৃত্যু ঘটলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকে না—তা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও দলিল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ এখন তেমনই এক সংকটের মুখোমুখি। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজার ছাড়িয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু। অনেকের ক্ষেত্রে হাম নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং গুরুতর অপুষ্টির মতো জটিলতা তৈরি করছে। তবে মৃত্যুর এই সামগ্রিক সংখ্যার সবকটিই পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু নয়—সরকারি পর্যালোচনায় সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু আলাদা করে দেখা জরুরি। AP-এর প্রতিবেদন
এই সংখ্যাগুলো বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে: বহু দশকের সফল টিকাদান কর্মসূচি থাকার পরও এত শিশু কীভাবে সুরক্ষার বাইরে থেকে গেল?
টিকাদানের সাফল্যে কোথায় ফাটল ধরল
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। ধীরে ধীরে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত টিকা পৌঁছে দেওয়া, কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের অংশগ্রহণ এবং অভিভাবকদের সচেতনতা—সব মিলিয়ে দেশটি শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।
কিন্তু টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য স্থায়ী কোনো অর্জন নয়। প্রতিটি নতুন জন্ম নেওয়া শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় ডোজ দিতে হয়। কয়েক মাসের ঘাটতিও হাজার হাজার অরক্ষিত শিশুর একটি নতুন জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক সংকটে সেটিই ঘটেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশব্যাপী হাম–রুবেলা টিকার মজুত ঘাটতি দেখা দেয়। নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক তৈরি হয় এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম–রুবেলা টিকাদান অভিযানও হয়নি। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক পরিবর্তন, টিকা সংগ্রহের বিলম্ব এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন যুক্ত হয়ে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান হামঝুঁকিকে জাতীয় পর্যায়ে ‘উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। WHO-এর রোগ প্রাদুর্ভাব প্রতিবেদন
প্রকাশিত হিসাবে শিশুদের টিকাদান কভারেজ ২০২৪ সালের ৯৩ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। সাত শতাংশ পয়েন্টের এই পতন সংখ্যায় ছোট মনে হলেও বাংলাদেশের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এর অর্থ—লাখো শিশুর এক বা একাধিক ডোজ বাদ পড়া।
হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে গড় কভারেজ যথেষ্ট নয়। সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে সাধারণত প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় রাখা প্রয়োজন। কোনো জেলা বা শহরের গড় হার ভালো হলেও একটি বস্তি, চর, দুর্গম গ্রাম কিংবা স্থানান্তরিত জনগোষ্ঠীতে কভারেজ কম থাকলে সেখান থেকেই বড় প্রাদুর্ভাব শুরু হতে পারে।
‘টিকা দেওয়া হয়েছে’ আর ‘সব শিশু টিকা পেয়েছে’ এক নয়
সরকারি হিসাবে একটি জেলার টিকাদান হার ৯০ শতাংশের বেশি দেখালেও সেই সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল করতে পারে। টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যাকে অনুমিত শিশুসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে কভারেজ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পুরোনো জনসংখ্যা-প্রক্ষেপণ, জন্মনিবন্ধনের ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কারণে প্রকৃত লক্ষ্যসংখ্যা ভুল হতে পারে।
ঢাকার বস্তি, শিল্পাঞ্চলের শ্রমজীবী পরিবার, নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষ, পার্বত্য ও চরাঞ্চল এবং রোহিঙ্গা শিবিরের মতো এলাকায় শিশুদের নিয়মিত অনুসরণ করা কঠিন। পরিবার স্থান পরিবর্তন করলে টিকাকার্ড হারিয়ে যেতে পারে, পরবর্তী ডোজের তারিখ বাদ পড়তে পারে কিংবা নতুন এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্র শিশুটির আগের তথ্য জানতে পারে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই শুধু জাতীয় গড়ের বদলে উপজেলা, ইউনিয়ন এবং কমিউনিটি পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেয়। টিকাদানের প্রকৃত সাফল্য মোট কত ডোজ দেওয়া হলো, তা দিয়ে নয়; একটি শিশুও সম্পূর্ণ কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেল কি না, তা দিয়ে বিচার করতে হবে। WHO-এর টিকাদান তথ্যপত্র
সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে কারা
টিকাদানের ফাঁকের মূল্য সমাজের সবাই সমানভাবে দেয় না। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে দরিদ্র, অপুষ্ট এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে থাকা শিশুরা।
একটি তুলনামূলক সচ্ছল পরিবার শিশুর জ্বর বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে। দরিদ্র পরিবারকে প্রথমে স্থানীয় ওষুধের দোকান, অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসক কিংবা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়। হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শিশুর নিউমোনিয়া বা পানিশূন্যতা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
হামে আক্রান্ত অপুষ্ট শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বেশি। একই সঙ্গে হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধী স্মৃতির একটি অংশ দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে রোগটি সেরে যাওয়ার পরও শিশু অন্য সংক্রমণের কাছে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বিশেষ উদ্বেগের জায়গা। নিয়মিত সূচিতে টিকা পাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তারা সংক্রমিত হলে নিজেদের টিকায় সুরক্ষিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তাদের সুরক্ষা নির্ভর করে চারপাশের বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ানোর ওপর। অর্থাৎ সমাজে টিকাদান কমে গেলে যারা এখনো টিকা পাওয়ার বয়সেই পৌঁছায়নি, তারাও অন্যদের বাদ পড়া ডোজের মূল্য দেয়।
জরুরি অভিযান সফল হলেও বিপদ কেন কাটেনি
প্রাদুর্ভাবের পর সরকার WHO, UNICEF ও Gavi-এর সহযোগিতায় জরুরি হাম–রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু করে। প্রথমে ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকির উপজেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে লক্ষ্য করা হয়। পরে কর্মসূচি দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়। WHO ও অংশীদারদের এপ্রিলের ঘোষণা
১০ মে পর্যন্ত জরুরি অভিযানে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি শিশু টিকা পায় এবং লক্ষ্যভুক্ত শিশুদের ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানো সম্ভব হয়। WHO Bangladesh
এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জরুরি অভিযান নিয়মিত টিকাদানব্যবস্থার বিকল্প নয়। অভিযান সাধারণত নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও সময়ের মধ্যে পরিচালিত হয়। তার আগের বা পরের বাদ পড়া শিশু, দ্বিতীয় ডোজ না পাওয়া শিশু এবং নতুন জন্ম নেওয়া শিশুকে নিয়মিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই খুঁজে বের করতে হবে।
অভিযান শেষ হওয়ার পর টিকার মজুত আবার কমে গেলে, স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য থাকলে কিংবা পরবর্তী ডোজের অনুসরণ না করলে কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। তখন আজকের সংকট আবার ফিরে আসতে পারে।
দায় কি শুধু অভিভাবকের?
টিকাদান নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই অভিভাবকের অসচেতনতা, কুসংস্কার কিংবা গুজবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়। এগুলো বাস্তব সমস্যা হলেও পুরো দায় পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সুবিধাজনক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।
একজন মা টিকাকেন্দ্রে গিয়ে যদি টিকা না পান, সেটি তার অনীহা নয়—সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা। স্বাস্থ্যকর্মী যদি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করার সময় বা জনবল না পান, সেটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়—প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের সমস্যা। টিকা কেনায় বিলম্ব, কোল্ড চেইনের দুর্বলতা কিংবা তথ্যের অসংগতি—কোনোটিই অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণে নেই।
আবার রাষ্ট্র শুধু টিকা এনে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। কোন এলাকায় কত শিশু বাদ পড়েছে, কেন বাদ পড়েছে এবং পরবর্তী ডোজ নিশ্চিত হলো কি না—প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি প্রয়োজন।
এখন কী করতে হবে
প্রথম প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা। কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে উপজেলা ও কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত মজুতের তথ্য বাস্তব সময়ে নজরদারিতে আনতে হবে। কোথাও ঘাটতির পূর্বাভাস পাওয়া গেলে সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সরবরাহ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাদ পড়া ও আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের নামভিত্তিক তালিকা তৈরি করা জরুরি। শুধু মোট ডোজ গণনা না করে প্রতিটি শিশুর সব ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটি অনুসরণ করতে হবে। জন্মনিবন্ধন, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই তথ্যব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, শহুরে বস্তি, চর, পাহাড়ি এলাকা, অভিবাসী শ্রমিক পরিবার এবং শরণার্থী জনগোষ্ঠীর জন্য একই পদ্ধতি যথেষ্ট হবে না। ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র, সন্ধ্যাকালীন টিকাদান, কর্মস্থলভিত্তিক সেবা এবং বাড়ি বাড়ি অনুসন্ধানের মতো স্থানীয় সমাধান প্রয়োজন।
চতুর্থত, টিকা নিয়ে গুজব প্রতিরোধে শুধু প্রচারপত্র নয়, বিশ্বাসযোগ্য স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী একই বৈজ্ঞানিক বার্তা দিলে অভিভাবকদের আস্থা বাড়বে।
সবশেষে, কত টিকা কেনা হয়েছে তার পাশাপাশি কত শিশু কেন বাদ পড়েছে এবং কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ঘাটতি তৈরি হয়েছে—তার স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। ভুল শনাক্ত না করলে জরুরি অভিযানের সাফল্যের আড়ালে কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে যাবে।
হামের এই প্রাদুর্ভাব একটি সতর্কসংকেত। টিকাদানব্যবস্থায় ছোট একটি ফাঁক কীভাবে কয়েক বছরের মধ্যে বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে, বাংলাদেশ এখন তার নির্মম মূল্য দিচ্ছে।
শিশুর মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে এমন একটি পরিবার, যারা হয়তো জানতেই পারবে না—সময়মতো একটি টিকা পৌঁছালে তাদের শিশুটি বেঁচে থাকতে পারত।
বাংলাদেশ অতীতে প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থা এবং জনগণের আস্থা একসঙ্গে থাকলে প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র এই সংকটকে সাময়িক অভিযান দিয়ে সামাল দেবে, নাকি প্রতিটি শিশুর টিকা পাওয়াকে সত্যিকার অর্থেই একটি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
আপনার মতামত জানানঃ