একটি শিশু স্কুলে গেল, কিন্তু আর বাড়ি ফিরল না। পরিবার অপেক্ষা করল, খোঁজ করল, থানায় গেল, পরিচিতজনদের ফোন করল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হলো। কোথাও নিখোঁজের পোস্ট, কোথাও মাইকিং, কোথাও থানার দরজায় উৎকণ্ঠিত স্বজন। কিন্তু কয়েক দিন পর সেই অপেক্ষার অবসান হলো এমন এক সংবাদে, যা কোনো পরিবারই শুনতে চায় না—শিশুটির মরদেহ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু নিখোঁজের পর একের পর এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগকে আরও গভীর করে তুলেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে—আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের বরাত দিয়ে এমন পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও উঠে এসেছে।
এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটি আসলে একটি করে পরিবারের গল্প। কোনো শিশু ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, কেউ ছিল ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, কেউ স্কুলে যাওয়ার পথে হারিয়ে গেছে, আবার কেউ নিজের পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই সহিংসতার শিকার হয়েছে। পরিসংখ্যানের ভাষায় তারা হয়তো ৩৬ বা ১৫৫ জন; কিন্তু পরিবারগুলোর কাছে তারা প্রত্যেকেই ছিল একটি পূর্ণ পৃথিবী।
শিশুদের মৃত্যুর কারণগুলোও ভয়াবহ। আসকের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতনে ৬৮ শিশু, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ শিশু এবং ধর্ষণের পর ২৬ শিশু নিহত হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার ঘটনাও রয়েছে। এর বাইরে গুলি, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতন, উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা এবং অপহরণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো—শিশুর নিরাপত্তার জন্য যে জায়গাগুলোকে আমরা স্বাভাবিকভাবে নিরাপদ ভাবি, সেখানেও ঘটছে প্রাণহানি। পরিবার, প্রতিবেশী, স্কুল কিংবা পরিচিত মানুষের পরিসরও সবসময় নিরাপদ থাকছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, একটি শিশু যখন ঘর থেকে বের হয়, তখন তার নিরাপত্তার দায়িত্ব আসলে কার?
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু ১০ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর তার মরদেহ সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাবনা সদরেও ঘটেছে একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা। ১০ বছরের একটি শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একই পরিবারের শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে একজনের বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। রংপুরে একটি পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ১২ বছরের এক শিশুও হত্যার শিকার হয়েছে। মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের কয়েক দিন পর নদী থেকে তার এক বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশুকে হত্যার খবরও সামনে এসেছে।
এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, শিশুহত্যা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষা কাঠামোর একাধিক স্তর। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা কতটা কার্যকর, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান কতটা দ্রুত হয়, পুলিশের কাছে পরিবারের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পায়—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন নিখোঁজ শিশুদের সংখ্যা নিয়ে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ ২ হাজার ৩৮ শিশু তখনো নিখোঁজ ছিল।
এই সংখ্যাটি নিছক একটি প্রশাসনিক হিসাব নয়। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর পেছনে রয়েছে একটি উদ্বিগ্ন পরিবার। একটি শিশুকে খুঁজে না পাওয়া মানে একটি পরিবারের প্রতিদিনের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যাওয়া। সে বেঁচে আছে কি না, কোথায় আছে, কার কাছে আছে—এই প্রশ্নগুলোই হয়ে ওঠে পরিবারের প্রতিটি দিনের সঙ্গী।
অবশ্য নিখোঁজ সব শিশুর পরিণতি যে মৃত্যু, তা বলা যাবে না। পুলিশের তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, বিপুলসংখ্যক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার পর কিছু শিশুর মরদেহ উদ্ধার হওয়া দেখিয়ে দেয় যে দ্রুত অনুসন্ধান ও ঝুঁকি শনাক্তকরণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় পরিচিত মানুষের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উদ্বেগজনক। কারণ শিশু সাধারণত অপরিচিত ব্যক্তির চেয়ে পরিচিত মানুষকে বেশি বিশ্বাস করে। স্কুল, প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা পরিচিত কোনো প্রাপ্তবয়স্কের কাছে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার স্বাভাবিকভাবেই বেশি নিশ্চিন্ত থাকে। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে শিশুর নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণাটিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইউনিসেফও চলতি বছর বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি শিশুদের ঘর, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি পরিসরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিশু সুরক্ষা শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়। অপরাধ হওয়ার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা জরুরি। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথ, খেলাধুলার জায়গা, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা—প্রতিটি জায়গাতেই শিশু কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরবে—এসব বিষয়ে বয়স অনুযায়ী সচেতনতা তৈরি করা দরকার। শিশু যেন ভয় না পেয়ে কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা বাবা-মা বা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে পারে, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে। শুধু ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’ ধরনের প্রচলিত শিক্ষা যথেষ্ট নয়; পরিচিত ব্যক্তির অনুপযুক্ত আচরণ সম্পর্কেও শিশুকে বয়সোপযোগী ভাষায় বোঝাতে হবে।
তবে সচেতনতার পুরো দায়িত্ব পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। একটি শিশুকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজেরও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিখোঁজের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো শিশু নিখোঁজ হলে প্রথম কয়েক ঘণ্টাই অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর পাশাপাশি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর হত্যার পর দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকলে পরিবারের কষ্ট আরও দীর্ঘ হয় এবং সমাজেও অপরাধের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত বার্তা দুর্বল হতে পারে। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা জরুরি।
শিশুর মৃত্যুর পর সংবাদ প্রকাশিত হয়, কিছুদিন আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়ায়। তারপর নতুন কোনো ঘটনা সেই আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। এভাবেই একের পর এক ঘটনা আমাদের দৈনন্দিন সংবাদচক্রের অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু একটি শিশুর মৃত্যুকে শুধু আরেকটি সংবাদ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না।
একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের চলে যাওয়া নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, বাবা-মায়ের স্বপ্ন, ভাইবোনের একজন সঙ্গী এবং সমাজের একজন সম্ভাবনাময় সদস্য। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই, খেলনা কিংবা স্কুলব্যাগ, সেই বয়সে তার মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সংবাদ কোনো স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না।
আজকের বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলোর একটি হলো—শিশুরা কোথায় নিরাপদ? স্কুলে? বাড়িতে? রাস্তায়? আত্মীয়ের বাড়িতে? খেলতে গিয়ে? নাকি কোথাওই পুরোপুরি নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আবেগ দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, দ্রুত পুলিশি পদক্ষেপ, শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া এবং পরিবার ও সমাজের সচেতনতা। কারণ একটি শিশুকে হারানোর পর তাকে খুঁজে বের করার চেয়ে তাকে আগে থেকেই নিরাপদ রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৩৬টি মরদেহের হিসাব তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়। ১৫৫ শিশুর মৃত্যুর পরিসংখ্যানও শুধু একটি রিপোর্টের অংশ নয়। এগুলো আমাদের সামনে রাখা সতর্কবার্তা। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ছবি যখন কোনো বাবা-মা হাতে নিয়ে রাস্তায় খোঁজেন, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সেই শিশুকে খুঁজে বের করা নয়—এমন পরিস্থিতি যেন আর কোনো পরিবারকে দেখতে না হয়, সেই ব্যবস্থাও তৈরি করা।
কারণ শিশুর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি তাদের মৌলিক অধিকার। আর একটি সমাজ কতটা মানবিক, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো—সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্য, অর্থাৎ শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ