পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বিশাল পর্বতমালা হিমালয়। তুষারে ঢাকা সুউচ্চ চূড়া, বরফে জমাট বাঁধা হিমবাহ, পাহাড়ি নদী আর সবুজ উপত্যকা—প্রকৃতির এই বিস্ময় শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করে না, দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীনসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি, কৃষি, বিদ্যুৎ, পর্যটন ও অর্থনীতি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এই পর্বতমালার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সেই হিমালয় এখন নিজেই গভীর সংকটে। দ্রুত গলে যাচ্ছে বরফ, বাড়ছে হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের ঝুঁকি, অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে পাহাড়ি ঢাল। আর এই পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের জীবন থেকে জাতীয় অর্থনীতির গভীরে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরামর্শদাতা সংস্থা সিস্টেমিকের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের হিমবাহগুলো বর্তমানে এক দশক আগের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুতগতিতে বরফ হারাচ্ছে। প্রতিবেদনটি ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র—ইসিমোড এবং ভারতের জি বি পন্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব দ্য হিমালয়ান এনভায়রনমেন্টের কারিগরি সহায়তা ছিল। গবেষণার এই তথ্য হিমালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ বরফ গলে যাওয়া মানে শুধু পাহাড়ের চেহারা বদলে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি সরবরাহ, খাদ্য উৎপাদন, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো এবং কোটি মানুষের নিরাপত্তা।
প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন নেপাল ও তিব্বতে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বন্যার পর হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকি নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। ওই বন্যায় ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, দ্রুত বরফ গলে যাওয়া এবং হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের অস্থিতিশীলতা—সব মিলিয়ে হিমালয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এসব ঘটনা তারই সতর্কবার্তা।
হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলে আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহ রয়েছে। কিন্তু এসবের মধ্যে মাত্র ২১টির ওপর নিয়মিত ও বিস্তৃত নজরদারি চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক হিমবাহের পরিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এই নজরদারির ঘাটতি বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়া সব জায়গায় একই রকম নয়। কোথাও বরফ পাতলা হয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, কোথাও আবার গলিত পানি জমে নতুন হ্রদ তৈরি করছে। এসব পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা না হলে কোন হ্রদ কখন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন।
হিমবাহের পিছু হটার সময় অনেক ক্ষেত্রে পাথর, মাটি ও বরফের তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমে হ্রদ সৃষ্টি হয়। এসব হ্রদকে বলা হয় হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ। বাইরে থেকে শান্ত ও স্থির মনে হলেও এগুলোর অনেকগুলো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় থাকে। অতিরিক্ত পানি, ভূমিধস, বরফধস কিংবা প্রাকৃতিক বাঁধের দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে হঠাৎ হ্রদের পানি বেরিয়ে যেতে পারে। তখন সৃষ্টি হয় হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড। পাহাড়ি উপত্যকায় এমন বন্যার গতি ভয়াবহ হতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যেতে পারে সড়ক, সেতু, বসতি, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মানুষের বহু বছরের সঞ্চয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু হিমবাহের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ের মাটির নিচে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বরফ বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় অনেক জায়গায় ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে ভূমিধস, পাথরধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে একটি দুর্যোগ আরেকটি দুর্যোগকে ডেকে আনতে পারে। অতিবৃষ্টিতে ভূমিধস হলে নদীর গতিপথ আটকে যায়, আবার সেই বাধা ভেঙে গেলে নিচের জনপদে আকস্মিক বন্যা নেমে আসে। এই জটিল ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু একটি দুর্যোগের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত পাহাড়ি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা।
ভারতের জন্য এই সংকটের গুরুত্ব আরও বেশি। দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৮ শতাংশ হিমালয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রায় ৩৫ শতাংশ এই পর্বতমালায় ঘটে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের আয়তনের তুলনায় হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকি অনেক বেশি। পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে বসবাসকারী মানুষের পাশাপাশি সমতলের কোটি কোটি মানুষও এর প্রভাবের বাইরে নয়। পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলোই সমতলের কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও পানির অন্যতম প্রধান উৎস।
হিমালয়ের পরিবর্তনের ভয়াবহতা ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ করেছে। ২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৭০ জন নিহত হন। সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের ঋষিগঙ্গা ও ধৌলীগঙ্গা উপত্যকায় ভয়াবহ প্লাবনে ২০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ে দুর্যোগের ক্ষতি কেবল স্থানীয় মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।
ভারতের সরকারও হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। গত বছরের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে চিহ্নিত ১৮৯টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে ৫৬টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কথা গত জুলাইয়ে সংসদকে জানানো হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পানি কমিশন হিমালয়ের নদী অববাহিকাজুড়ে ১০ হেক্টরের চেয়ে বড় ২ হাজার ৪৮৫টি হিমবাহ হ্রদের ওপর নজর রাখছে। এই নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হলেও গবেষণার তথ্য বলছে, পুরো হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলের তুলনায় পর্যবেক্ষণের আওতা এখনও সীমিত। হিমবাহ ও হ্রদের সংখ্যা, অবস্থান এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় আরও বিস্তৃত ও আধুনিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন।
হিমালয়ের পানি ভারতের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ইসিমোডের হিসাব থেকে। সংস্থাটির মতে, গম, ধান, চা, জলবিদ্যুৎ এবং তীর্থযাত্রানির্ভর অর্থনীতির ওপর ভর করে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হিমালয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল। এই হিসাব কেবল একটি অঞ্চলের অর্থনীতিকে বোঝায় না; বরং হিমালয় কীভাবে ভারতের জাতীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত, তা স্পষ্ট করে।
কৃষির জন্য পানি সরবরাহে হিমালয়ের নদীগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। বর্ষার বাইরে অনেক নদীর প্রবাহ বজায় রাখতে হিমবাহ ও তুষার গলার পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পানি সেচব্যবস্থা সচল রাখে, কৃষিজমিতে উৎপাদন নিশ্চিত করে এবং খাদ্য সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু হিমবাহ ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীর পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইসিমোডের হিসাবে, চলতি শতকের মাঝামাঝি সময়ে অধিকাংশ নদী অববাহিকায় বরফগলা পানিপ্রবাহ সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পর হিমবাহ সংকোচনের কারণে প্রবাহ দ্রুত কমতে থাকবে।
এই পরিবর্তনকে বিজ্ঞানীরা অনেক সময় ‘পিক ওয়াটার’ বা পানিপ্রবাহের সর্বোচ্চ পর্যায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। হিমবাহ গলার কারণে প্রথমদিকে নদীতে পানির পরিমাণ বাড়তে পারে। কিন্তু বরফের মজুত ক্রমাগত কমে গেলে একসময় সেই বাড়তি পানির উৎসও সংকুচিত হবে। তখন নদীর পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে কৃষি, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ আজকের অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের পানিসংকটের পূর্বাভাসও হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও ক্ষতির প্রভাব সমতল ও শহরাঞ্চলেও পৌঁছাবে। কৃষিতে সেচের খরচ বাড়তে পারে, খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে, জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অনিয়মিত পানিপ্রবাহের মুখে পড়তে পারে। পানির ওপর নির্ভরশীল শিল্প ও নগরব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হবে। নদীর পানির ভাগাভাগি নিয়ে আন্তঃরাজ্য ও আন্তঃসীমান্ত বিরোধ বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থনৈতিক মূল্যের বিপরীতে পাহাড়ি রাজ্যগুলো যে অংশ ধরে রাখতে পারে, তা খুবই কম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল বিশাল অর্থনৈতিক মূল্যের মাত্র ৫ শতাংশ স্থানীয় পাহাড়ি রাজ্যগুলো ধরে রাখতে পারে। এর অর্থ হলো, পাহাড় থেকে উৎপন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশ অন্যত্র চলে যায়, অথচ পরিবেশগত ক্ষতি ও দুর্যোগের বোঝা বহন করতে হয় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে। এই বৈষম্য দূর করতে পাহাড়ি এলাকার উন্নয়ন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
হিমালয়ের সংকটের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো কালো কার্বন বা কালো ধোঁয়া। গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ের বরফ গলনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী সমতলের ইটভাটা ও কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া। এই ধোঁয়ার সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ভেসে হিমালয়ের তুষার ও বরফের ওপর জমা হয়। সাদা বরফ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে পারে। কিন্তু কালো কার্বনের স্তর জমলে বরফ বেশি তাপ শোষণ করে। ফলে গলনের গতি বেড়ে যায়।
এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কালো কার্বন নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক পর্যায়ে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উদ্যোগের পাশাপাশি ইটভাটা, শিল্পকারখানা, যানবাহন ও অন্যান্য দূষণকারী উৎস থেকে কালো ধোঁয়া কমানো গেলে হিমালয়ের বরফ গলার গতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলো একযোগে এই উদ্যোগ নিলে তার সুফল সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তৃত অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
তবে শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোই যথেষ্ট নয়। সিস্টেমিকের গবেষণার প্রধান লেখক আরুশি চোপড়া হিমবাহের ওপর নজরদারি বাড়ানো, দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা এবং পাহাড়ে পর্যটন পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিজ্ঞানী, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
পর্যটনও হিমালয়ের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের হিমালয় অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটক ভ্রমণ করেন। পর্যটন স্থানীয় মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই যে পাহাড়ের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, এমন নয়। অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে বর্জ্য, পানির সংকট, যানজট, পাহাড় কাটা এবং পরিবেশদূষণ বাড়তে পারে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
গবেষকদের মতে, পর্যটনের লক্ষ্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হওয়া উচিত নয়। বরং পর্যটন এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে তার অর্থনৈতিক মূল্য স্থানীয়ভাবে থেকে যায় এবং পুনরায় উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা যায়। পাহাড়ি এলাকায় পর্যটন অবকাঠামো তৈরির আগে পরিবেশগত সক্ষমতা, পানির প্রাপ্যতা এবং দুর্যোগঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
হিমালয়ের এই সংকট কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। হিমালয়ের নদী ও পর্বতব্যবস্থা একাধিক দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিস্তৃত। একটি দেশে হিমবাহ গলে হ্রদ তৈরি হলে কিংবা পাহাড়ি বন্যা দেখা দিলে তার প্রভাব অন্য দেশেও পড়তে পারে। সীমান্তের কাঁটাতার নদীর পানিপ্রবাহ কিংবা দুর্যোগের গতিপথ থামাতে পারে না। ফলে ভারত, নেপাল, ভুটান, চীনসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ প্রস্তুতি অপরিহার্য।
ইসিমোডের মহাপরিচালক পেমা গিয়ামৎসো বলেছেন, ঝুঁকি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে। দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না এবং কোনো একক দেশের পক্ষে একা এসব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই সীমান্তপারের নজরদারি, ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে যৌথ বিনিয়োগ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
হিমালয়ের ভবিষ্যৎ রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই। কোন হিমবাহ কত দ্রুত গলছে, কোন হ্রদ ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় ভূমিধসের আশঙ্কা বেশি এবং কোন নদীর পানিপ্রবাহ ভবিষ্যতে কমতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া তথ্য, নদীর পানির পরিমাপ এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা একত্র করে একটি সমন্বিত ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে। এতে দুর্যোগের আগে সতর্কতা জারি করা সহজ হবে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষরাই সবার আগে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বরফধস, নদীর পানির অস্বাভাবিকতা কিংবা ভূমিধসের লক্ষণ দেখতে পান। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে। একইসঙ্গে পাহাড়ি মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ আবাসন ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।
হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়ার বিষয়টি কেবল ভারতের অর্থনীতির জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের জন্যই সতর্কবার্তা। এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানি বাংলাদেশসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। উজানে পানিপ্রবাহের পরিবর্তন হলে ভাটির দেশগুলোর ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। অতিরিক্ত বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি পানিসংকট কিংবা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন—সবই আঞ্চলিক অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে চাপ তৈরি করতে পারে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান লর্ড নিকোলাস স্টার্ন সতর্ক করে বলেছেন, কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও অবকাঠামোর ভিত্তি হিমালয় বা ‘তৃতীয় মেরু’ পরিবেশগত মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তাঁর এই সতর্কবার্তা হিমালয়কে শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অঞ্চল হিসেবে দেখার সীমাবদ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। এটি একইসঙ্গে একটি জলভাণ্ডার, অর্থনৈতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল এবং বহু দেশের মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূপ্রাকৃতিক ব্যবস্থা।
হিমালয়ের সংকট মোকাবিলা করতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। কালো কার্বন নিঃসরণ কমানো, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের ঝুঁকি নিরূপণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং পর্যটনকে পরিবেশবান্ধব করা—সব উদ্যোগকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক দায়িত্ববোধ বাড়ানো জরুরি।
হিমালয়কে রক্ষা করা মানে শুধু বরফঢাকা পাহাড়কে রক্ষা করা নয়। এর অর্থ হলো নদী, কৃষি, বিদ্যুৎ, খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাকে রক্ষা করা। আজ যদি বরফ গলার গতি থামাতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে আরও বড় দুর্যোগ, পানিসংকট এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে। হিমালয়ের বরফে যে সংকটের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, তা আসলে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গভীর সতর্কবার্তা।
আপনার মতামত জানানঃ