মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য। জন্মের পর একদিন প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সব মৃত্যু কি একই রকম? কেউ দীর্ঘ জীবন শেষে স্বাভাবিকভাবে চলে যান, কেউ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে মৃত্যুকে গ্রহণ করেন। আবার কেউ হঠাৎ সড়কের ধাক্কায়, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায়, অগ্নিকাণ্ডে, ভবনধসে কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় প্রাণ হারান। এই শেষের মৃত্যুগুলো শুধু একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; এগুলো একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়, অসংখ্য স্বপ্ন থামিয়ে দেয়, আর রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থার সামনে রেখে যায় কঠিন প্রশ্ন। বাংলাদেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো—অনেক মৃত্যুই যেন আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, আমরা আর সেগুলোকে প্রশ্নই করি না।
প্রতিদিনের সংবাদে সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মৃত্যু, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, নৌযান দুর্ঘটনা কিংবা কর্মক্ষেত্রে প্রাণহানির খবর এখন আর খুব বেশি চমকে দেয় না। সকালে পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার খবর চোখে পড়ে। কয়েকজন মারা গেছেন, কয়েকজন আহত হয়েছেন, পরিবারের স্বজনেরা হাসপাতালে ছুটছেন—এই দৃশ্য যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এসব খবরের অনেকগুলোই কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে আর মানুষের মনে থাকে না। নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। অথচ যে পরিবারটি একজন মানুষকে হারিয়েছে, তাদের কাছে সেই মৃত্যু কখনো পুরোনো হয় না।
ছবিটির বার্তা আমাদের সেই জায়গাতেই থামিয়ে দেয়—“স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার, এই রাষ্ট্র যা স্বীকার করে না।” বাক্যটি নিছক আবেগের নয়; এর ভেতরে রয়েছে একটি বড় সামাজিক প্রশ্ন। একজন মানুষ কি শুধু বেঁচে থাকার অধিকারই রাখেন, নাকি নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারও রাখেন? একজন শ্রমিক সকালে কাজে বের হয়ে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরবেন—এটা কি অতিরিক্ত কোনো প্রত্যাশা? একজন শিক্ষার্থী রাস্তা পার হয়ে নিরাপদে স্কুলে পৌঁছাবে—এটা কি ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয়? একজন বাবা কিংবা মা কর্মস্থলে গিয়ে সন্ধ্যায় সন্তানের কাছে ফিরে আসবেন—এটুকু নিশ্চয়তা কি আমাদের নাগরিক জীবনে অপ্রাপ্য?
বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। ছবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ও বিভিন্ন পরিসংখ্যানের হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর দুর্ঘটনাজনিত কারণে আট হাজারের বেশি মানুষ মারা যেতে পারেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটার মতো একটি ভয়াবহ বাস্তবতার কথা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত গল্প। একজন নিহত ব্যক্তির সঙ্গে হয়তো একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে যায়। কোনো শিশুর মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে যায়। কোনো মায়ের কাছে সন্তানের ঘরে ফেরার অপেক্ষা চিরতরে শেষ হয়ে যায়। কোনো স্বামী বা স্ত্রীর জীবনে হঠাৎ তৈরি হয় দীর্ঘ এক শূন্যতা।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান আমাদের কাছে অনেক সময় অমানবিকভাবে ছোট মনে হয়। “আজ ৫ জন নিহত”, “আজ ১২ জন নিহত”, “আজ ২০ জন নিহত”—সংবাদে এই সংখ্যাগুলো দ্রুত চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু যদি সংখ্যার বদলে আমরা প্রত্যেক মানুষের গল্প দেখি, তাহলে বিষয়টি আর এত সহজ থাকে না। যে তরুণটি বাসে উঠেছিল, সে হয়তো প্রথম চাকরির বেতন দিয়ে মায়ের জন্য কিছু কিনতে চেয়েছিল। যে শ্রমিকটি নির্মাণস্থলে গিয়েছিল, হয়তো তার ঘরে অপেক্ষা করছিল ছোট সন্তান। যে মোটরসাইকেল আরোহীটি রাস্তায় বের হয়েছিল, হয়তো সে জানতই না যে কয়েক মিনিট পর তার পরিবার একটি ফোন পাবে—“দুর্ঘটনা হয়েছে।”
আর এখানেই দুর্ঘটনা ও অপরাধের মধ্যে সামাজিক উপলব্ধির একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়। একটি হত্যাকাণ্ড ঘটলে আমরা হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার দাবি তুলি। মামলা হয়, তদন্ত হয়, বিচার দাবি করা হয়। কিন্তু কোনো অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো, অনিরাপদ যানবাহন, প্রশিক্ষণের অভাব কিংবা নিয়ম না মানার কারণে একজন মানুষ মারা গেলে অনেক সময় সেটিকে শুধু “দুর্ঘটনা” বলে থামিয়ে দেওয়া হয়। অথচ দুর্ঘটনা মানেই যে সবসময় কারও দায় নেই—তা নয়। অনেক দুর্ঘটনা হয়তো একাধিক অবহেলা, অনিয়ম ও ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার ফল।
ছবিতে পুলিশের হিসাবের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে চার হাজারের কিছু বেশি হত্যা মামলা হয়েছিল। একই সময়ে যেসব মৃত্যুকে আমরা দুর্ঘটনা হিসেবে দেখি, সেগুলোর সংখ্যা আরও বড় হতে পারে—এমন একটি তুলনা সামনে আনা হয়েছে। এখানে পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা, উৎস ও গণনার পদ্ধতি নিয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকা দরকার। কারণ হত্যা মামলা এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পরিসংখ্যান একই পদ্ধতিতে তৈরি হয় না। তবু তুলনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে: অপরাধের কারণে মৃত্যু নিয়ে আমাদের যে পরিমাণ আলোচনা হয়, প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ব্যাপারে কি আমরা ততটাই উদ্বিগ্ন?
সমস্যার আরেকটি দিক হলো, দুর্ঘটনাকে আমরা প্রায়ই ভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখি। “দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই”—এই কথার মধ্য দিয়ে যেন দায় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সব দুর্ঘটনা কি সত্যিই অনিবার্য? একটি বাসের চালক অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে সেটি কি শুধু দুর্ঘটনা? একটি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে আগুনে মানুষের মৃত্যু কি কেবল দুর্ভাগ্য? নির্মাণস্থলে শ্রমিকের মাথায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকলে ওপর থেকে কোনো বস্তু পড়ে তার মৃত্যু হলে সেটি কি নিছক দুর্ঘটনা? রাস্তার পাশে অবৈধভাবে পার্ক করা গাড়ির কারণে দৃশ্যমানতা কমে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে সেটি কি কেবল ভাগ্য?
প্রশ্নগুলো কঠিন, কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু একজন চালক, একজন পথচারী কিংবা একজন শ্রমিকের নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন মালিক, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক—সবাই কোনো না কোনোভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। কোথাও নিয়ম তৈরি হয়, কোথাও নিয়ম প্রয়োগ হয়, কোথাও অবকাঠামো তৈরি হয়, আবার কোথাও সেই অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকে। একটি জায়গায় ব্যর্থতা অন্য জায়গায় গিয়ে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
সড়ক দুর্ঘটনার কথাই ধরা যাক। চালকের বেপরোয়া গতি অবশ্যই বড় কারণ হতে পারে। কিন্তু শুধু চালককে দায়ী করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়? যানবাহনের ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা, রাস্তার নকশা, সড়কের আলো, ফুটপাত, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ—সবকিছুর সঙ্গে নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। একটি নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে একজন মানুষের ছোট ভুলও তার জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করবে না।
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আগুন লাগার ঘটনা হয়তো সবসময় ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু আগুন লাগার পর একটি ভবন থেকে মানুষ বের হতে পারবে কি না, পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ আছে কি না, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কার্যকর কি না, বিদ্যুৎব্যবস্থা নিরাপদ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নির্ধারণ করে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়; এটি শ্রমিকের মৌলিক নিরাপত্তার অংশ।
দুর্ঘটনার পর আমরা সাধারণত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলি। কেউ আর্থিক সহায়তা পায়, কেউ চিকিৎসা পায়, কেউ আইনি সহায়তার আশ্বাস পায়। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একই ধরনের দুর্ঘটনা যেন আবার না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করা। একজন মানুষের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ তার পরিবারের জন্য কিছুটা সহায়তা হতে পারে, কিন্তু সেই অর্থ কোনোভাবেই মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই দুর্ঘটনার পর শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, কারণ অনুসন্ধান ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ করা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটল, আগে কোনো সতর্কতা ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করেছে, নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াল—এসব প্রশ্নও সংবাদে থাকা দরকার। একটি দুর্ঘটনাকে যদি কেবল “মর্মান্তিক ঘটনা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে পাঠক হয়তো কিছুক্ষণের জন্য কষ্ট পাবেন, কিন্তু সমস্যার কাঠামোগত কারণ সামনে আসবে না।
আমাদের সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন দরকার। ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো থেকে শুরু করে রাস্তা পারাপারে নিয়ম না মানা, মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহার না করা, গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, চালকের হাতে মোবাইল দেওয়া—এসব ছোট বলে মনে হলেও একসঙ্গে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরি হয় অসংখ্য ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে। আইন থাকা জরুরি, কিন্তু আইন মানার সামাজিক সংস্কৃতিও জরুরি।
তবে সব দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। একজন পথচারী নিরাপদে রাস্তা পার হতে চাইলে তাকে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা দিতে হবে। একজন শ্রমিক নিরাপদে কাজ করতে চাইলে কর্মস্থলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকতে হবে। একজন যাত্রী নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চাইলে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নিরাপদ হতে হবে। নাগরিককে শুধু সতর্ক হতে বললেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
“স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার”—এই কথাটির গভীরতা এখানেই। মানুষ একদিন স্বাভাবিকভাবে মারা যাবেন, সেটি জীবনের নিয়ম। কিন্তু একটি ভুল নকশা, একটি অনিরাপদ যানবাহন, একটি অবহেলিত ভবন, একটি অরক্ষিত কর্মক্ষেত্র কিংবা একটি অকার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে মানুষকে অকালে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো স্বাভাবিক পরিণতি হতে পারে না।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু নতুন সেতু, উড়ালসড়ক, ভবন কিংবা প্রযুক্তির সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো—সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে তার দৈনন্দিন জীবন কাটাতে পারছে। একজন শ্রমিক সকালে বের হয়ে সন্ধ্যায় ফিরছেন কি না, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে স্কুলে যাচ্ছে কি না, একজন যাত্রী বাসে উঠে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রের উন্নয়নের গল্পের অংশ।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কয়েক দিনের শোক, কিছু ক্ষতিপূরণ, কিছু তদন্ত এবং তারপর সবকিছু আগের মতো হয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দুর্ঘটনাকে শুধু দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখা হবে না; প্রতিটি মৃত্যুকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হবে। কোথায় ব্যর্থতা ছিল, কেন ছিল, কে দায়িত্বে ছিল, ভবিষ্যতে কীভাবে একই ঘটনা ঠেকানো যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ একটি সংখ্যা কখনো শুধু সংখ্যা নয়। আট হাজার মানে আট হাজারটি পরিবার। হাজার হাজার আহত মানুষ মানে হাজার হাজার অসম্পূর্ণ জীবন। আর প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকা পরিবারের কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন।
একজন মানুষ যখন সকালে ঘর থেকে বের হন, তার পরিবারের মানুষটি স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন—তিনি ফিরে আসবেন। সেই প্রত্যাশার মধ্যে কোনো অতিরিক্ত দাবি নেই। রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের চাওয়া খুব সাধারণ: তিনি যেন রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে ফিরতে পারেন, কর্মস্থলে গিয়ে জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারেন, একটি ভবনে ঢুকে আগুন লাগলে বের হওয়ার সুযোগ পান, একটি যানবাহনে উঠে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
এই নিশ্চয়তাটুকুই আসলে নিরাপদ জীবনের ভিত্তি। দুর্ঘটনা হয়তো সবসময় বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু অনেক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর যে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, সেটিকে শুধু ভাগ্য বলে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি বদলানোই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ।
মৃত্যু জীবনের অনিবার্য সমাপ্তি। কিন্তু অবহেলা, অনিয়ম আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে অকালে মৃত্যু অনিবার্য নয়। তাই প্রশ্নটা শুধু কতজন মারা গেলেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কতজনকে বাঁচানো যেত? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব শুধু নিহতের পরিবারের নয়; রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম এবং পুরো সমাজের।
স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার কোনো বিলাসী দাবি নয়। এটি এমন এক মৌলিক প্রত্যাশা, যেখানে একজন মানুষ অন্তত এই বিশ্বাস নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেন—তার জীবন কেবল ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
আপনার মতামত জানানঃ