একটি ফোনকল। ওপাশে ১০ বছরের এক শিশু। কণ্ঠে অসহ্য কষ্ট, আতঙ্ক আর বাড়ি ফেরার আকুতি। মাকে সে বলছিল, ‘মা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। পেট ব্যথা করছে। আমাকে নিয়ে যাও। আমি এখানে থাকতে পারব না।’ একজন মায়ের কাছে সন্তানের এমন আকুতি কতটা অসহায় করে দিতে পারে, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই ফোনকলের পেছনে যে অভিযোগ, যে ভয়াবহতার কথা উঠে এসেছে, তা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, অভিভাবকদের আস্থা এবং আমাদের সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে একটি মাদ্রাসার ১০ বছর বয়সী আবাসিক ছাত্রকে প্রায় তিন মাস ধরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় তথ্য গোপনের চেষ্টা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর হামলায় ছাত্রদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপালকেও আটক করা হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। অভিযুক্ত শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসা এই ঘটনা আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা হাজির করে, যেখানে একটি শিশুর শিক্ষার স্বপ্ন, পরিবারের বিশ্বাস এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যে প্রতিষ্ঠানটিকে পরিবার সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ভেবেছিল, সেখানেই যদি সে ভয় ও নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে সেই আস্থার জায়গাটি কোথায় থাকবে?
মির্জাপুর উপজেলা সদরের বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা ভাড়া নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় মারকাজুল উম্মাহ মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মনিরুজ্জামান। প্রায় তিন বছর আগে সেখানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আল আমিন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্যা এলাকার ওই শিশু নাজেরা বিভাগে ভর্তি হয়। পরে তাকে রাখা হয় মাদ্রাসার আবাসিক শাখায়।
একটি শিশুকে আবাসিক মাদ্রাসায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত পরিবারের জন্য সাধারণত সহজ নয়। সন্তানের পড়াশোনা, ধর্মীয় শিক্ষা, চরিত্র গঠন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকেরা অনেক আশা করেন। কেউ কেউ মনে করেন, বাড়ির বাইরে থাকলেও মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে নিজের সন্তানের মতো দেখভাল করবেন। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস আরও গভীর হতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যদি কোনো শিক্ষক একটি শিশুকে ভয় দেখান, তার অসহায়ত্বকে কাজে লাগান, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি একটি শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদার ওপর আঘাত।
পরিবারের অভিযোগ, মাদ্রাসায় থাকার সময় শিক্ষক আল আমিন শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ও বিভিন্নভাবে ফুসলিয়ে যৌন নির্যাতন করে আসছিলেন। প্রায় তিন মাস ধরে চলা এই নির্যাতনের ফলে শিশুটি পেটব্যথা ও মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগতে শুরু করে বলে পরিবার জানিয়েছে। একজন শিশুর শরীরে এমন উপসর্গ দেখা দিলে তা কোনোভাবেই অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। অথচ অনেক সময় শিশু নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা কাউকে বলতে পারে না। ভয়, লজ্জা, অপরাধীর হুমকি কিংবা বড়দের অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে সে নীরব হয়ে যায়।
শিশুটিও প্রথমে তার কষ্টের কথা মাকে জানায়। অসুস্থতার কথা শুনে মা তাকে ছুটিতে বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়িতে থাকার সময় শিশুটির নানা বাথরুমে রক্ত দেখতে পান বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। এরপর তাকে জামুর্কী, মির্জাপুর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। সামান্য সুস্থ হওয়ার পর প্রায় ১১ দিন আগে তাকে আবার মাদ্রাসায় রেখে আসেন মা।
এই জায়গাটিই ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে। একটি পরিবার যখন অসুস্থ সন্তানকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করে, তখন তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই থাকে—এবার হয়তো সে নিরাপদে থাকবে। কিন্তু পরিবারের দাবি, মাদ্রাসায় ফেরার পরও শিশুটির ওপর পুনরায় নির্যাতন চালানো হয়। তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত সে মাকে ফোন করে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানায়।
‘মা, আমাকে নিয়ে যাও।’
এই কথার মধ্যে একটি শিশুর নিরাপত্তাহীনতা কতটা গভীর ছিল, তা বোঝা যায়। একটি শিশু যখন নিজের ঘর, নিজের বিছানা, নিজের মায়ের কাছে ফিরতে চায়, তখন তার সেই চাওয়াকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সে হয়তো জানে না কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, কোথায় সাহায্য চাইতে হয় কিংবা তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার কীভাবে হবে। সে শুধু জানে, সে কষ্ট পাচ্ছে এবং মাকে দরকার।
শিশুর এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিষ্ঠানটি শিশুটির অভিযোগ বা অসুস্থতার লক্ষণগুলো কীভাবে দেখেছে, কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করেছে। কোনো আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা, অভিভাবককে জানানো এবং প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে নেওয়া—এসব বিষয় যথাযথভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। আর যদি কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা ধামাচাপা দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুকে সুরক্ষিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার মির্জাপুর সদরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে শিশুটির বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। চিকিৎসা ও পরীক্ষার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে শিশুটির শারীরিক অবস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এরপর শিশুর বক্তব্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় সামনে আসার পর পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেন।
একজন বাবা-মা যখন সন্তানের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের দরজায় যান, তখন তাঁদের প্রথম প্রত্যাশা থাকে সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচার। তাঁরা চান, যে ব্যক্তি তাঁদের সন্তানের ক্ষতি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁরা চান, অন্য কোনো শিশু যেন একই বিপদের মুখে না পড়ে। কিন্তু অভিযোগের পর যদি প্রতিষ্ঠান বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করে, অথবা ভুক্তভোগী শিশুর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই ঘটনায় মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধেও তথ্য গোপনের চেষ্টা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর হামলায় ছাত্রদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গেট বন্ধ করে ছাত্রদের লাঠি হাতে স্থানীয় লোকজনের ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে প্রিন্সিপাল দাবি করেছেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় তিনি কেবল আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। এই অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ঘটনার পর শুক্রবার সকালে শিশুটির মা, নানা ও মামা মাদ্রাসায় গিয়ে বিচার দাবি করেন। পরে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজনও মাদ্রাসার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আল আমিনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে অভিযুক্ত শিক্ষক ও প্রিন্সিপালকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর যথাযথ তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কোনো অভিযোগের পর জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। গণপিটুনি কোনো শিশুকে ন্যায়বিচার এনে দেয় না; বরং তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা আদালতে প্রমাণিত হবে। আইন নিজের হাতে না তুলে দিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা, শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তদন্তে সহযোগিতা করাই সঠিক পথ।
মির্জাপুর থানার ওসি জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক ও প্রিন্সিপালকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এই বক্তব্যের পর এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, মামলাটি যথাযথভাবে গ্রহণ করা, শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং তদন্তকে প্রভাবমুক্ত রাখা।
শিশুটির পরিচয় প্রকাশ না করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর নাম, ছবি, ঠিকানা কিংবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যাতে তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়। কারণ নির্যাতনের শিকার শিশুকে সমাজের কৌতূহল, অপমান বা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না; তার প্রয়োজন নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও ন্যায়বিচার। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সবারই এই দায়িত্ব রয়েছে।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার কাঠামো। একটি মাদ্রাসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পড়াশোনার পরিবেশ থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা, শারীরিক সুস্থতা, মানসিক বিকাশ এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই, আবাসিক কক্ষের তদারকি, শিশুদের সঙ্গে একান্তে আচরণের নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর গোপন ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুরা অনেক সময় পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকে। ফলে তারা বিপদে পড়লে দ্রুত সাহায্য পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। একজন শিশু যদি শিক্ষককে ভয় পায়, তাহলে সে নিজের কষ্টের কথা অন্য শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে বলতেও সাহস নাও করতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে বলতে পারে—কেউ তাকে আঘাত করেছে, ভয় দেখিয়েছে, অস্বস্তিকর আচরণ করেছে কিংবা তার সঙ্গে অন্যায় করেছে।
শিশুদেরও বয়স অনুযায়ী নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ, ভয় দেখিয়ে কোনো কথা গোপন রাখতে বলা, শরীরের ব্যক্তিগত অংশে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং বিপদের সময় কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে—এসব বিষয়ে তাদের সহজ ভাষায় শেখানো দরকার। তবে শিশুকে সচেতন করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকেও এই কাজে যুক্ত হতে হবে।
অভিভাবকদের জন্যও এই ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। সন্তানকে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার আগে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া, শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের পরিচয় যাচাই করা, আবাসিক ব্যবস্থাপনা দেখা এবং নিয়মিত সন্তানের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। সন্তান অসুস্থ হলে বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। শিশু কোনো অভিযোগ করলে তাকে দোষারোপ না করে শান্তভাবে শুনতে হবে। ‘তুমি কেন আগে বলোনি?’—এই প্রশ্নের বদলে বলা উচিত, ‘তুমি আমাকে বলেছ, এটা খুব ভালো করেছ। আমি তোমার পাশে আছি।’
শিশুরা অনেক সময় নির্যাতনের জন্য নিজেদের দায়ী মনে করে। অপরাধী তাদের ভয় দেখাতে পারে, বলতে পারে কাউকে জানালে আরও বিপদ হবে। তাই পরিবারকে শিশুকে বোঝাতে হবে—যা ঘটেছে তার জন্য সে দায়ী নয়। দায় অপরাধীর। তার কথা বিশ্বাস করা, তাকে নিরাপদ রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া পরিবারের প্রথম দায়িত্ব।
মির্জাপুরের এই ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়, তা সময়ই বলবে। অভিযুক্ত শিক্ষক ও প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে যদি কোনো তথ্য গোপন, শিশুকে ভয় দেখানো বা তদন্তে বাধা দেওয়ার ঘটনা প্রমাণিত হয়, সেগুলোরও যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের আপস ভবিষ্যতে আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুটির চিকিৎসা ও নিরাপত্তা। তার শারীরিক কষ্টের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে শিশুবান্ধব পরিবেশে মানসিক সহায়তা দিতে হবে। তাকে বারবার ঘটনার বর্ণনা দিতে বাধ্য করা যাবে না। তদন্তকারীদের উচিত শিশুর প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করা এবং তার বক্তব্য নেওয়ার ক্ষেত্রে শিশু সুরক্ষার নীতিমালা অনুসরণ করা।
একটি শিশুর মুখে যখন শোনা যায়, ‘মা, খুব কষ্ট হচ্ছে, আমাকে নিয়ে যাও’, তখন সেই আহ্বান শুধু তার মায়ের কাছে নয়; এটি আমাদের সবার কাছে একটি প্রশ্ন। আমরা কি শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারছি? যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্তানদের রেখে আসি, সেগুলো কি যথেষ্ট জবাবদিহির মধ্যে আছে? কোনো শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আমরা কি সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করি, নাকি প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার নামে বিষয়টি চেপে যেতে চাই?
শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ—এই কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ার আগে তাদের বর্তমানকে নিরাপদ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, আবাসিক জীবন—সবকিছুর আগে একটি শিশুর অধিকার হলো নিরাপদ থাকা। সে যেন ভয় ছাড়া ঘুমাতে পারে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পায়, কষ্ট হলে মাকে ফোন করতে পারে এবং অভিযোগ করলে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়।
মির্জাপুরের শিশুটির জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়; এটি সমাজেরও দায়িত্ব। তার কষ্ট যেন কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম, কোনো ব্যক্তির প্রভাব কিংবা কোনো সামাজিক চাপের আড়ালে হারিয়ে না যায়। তদন্ত হোক নিরপেক্ষভাবে, চিকিৎসা হোক যথাযথভাবে, শিশুটি ফিরে পাক নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন। আর এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের প্রতিটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হোক।
কারণ কোনো শিশুর মুখে আর যেন বলতে না হয়—‘মা, খুব কষ্ট হচ্ছে, আমাকে নিয়ে যাও।’
আপনার মতামত জানানঃ