টাঙ্গাইলের একটি মাদ্রাসায় ২০২৬ সালের ৭ জুন সকালেও ক্লাস চলছিল। নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম ইকরা মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকদের একজন ওবায়দুল্লাহ। কয়েক মাস আগে চালু হওয়া এই মাদ্রাসায় তার ভাষ্য অনুযায়ী ১০ জন ছেলে পড়াশোনা করছিল। ভবনের অন্য একটি কক্ষে দুই বোরকা পরা মেয়ে কোরআন পড়ছিল।
দৃশ্যটি বাইরে থেকে আর দশটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতোই স্বাভাবিক। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ভবন এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষটি মোটেও নতুন নন। এর আগেও একই ব্যক্তি একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন। আর সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই উঠে এসেছিল শিশুদের যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে নয় বছর বয়সী এক আবাসিক ছাত্রী ওবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা এবং অশালীন ভিডিও ধারণে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ তোলে। শিশুটির অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে একটি মোবাইল ফোন দিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে নিজের ভিডিও ধারণ করতে বলা হয়েছিল। পরে শিশুটি পরিবারের কাছে বিষয়টি জানালে তার এক বড় কাজিনও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এরপর আরও বহু শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে সামনে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ২৫ বা ২৬ জন শিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা এবং নিজেদের ভিডিও ধারণ করতে বলার মতো অভিযোগ করেছে। পুলিশ ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়। তবে কারাগারে থাকার সময় দীর্ঘ হয়নি। প্রায় দুই মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যেই একই ভবনে নতুন নামে নতুন একটি মাদ্রাসা চালু করেন তিনি।
এখানেই ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের গল্প থাকে না; বরং বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদারকি এবং ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যকার একটি বড় ফাঁক সামনে আসে। কারণ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠা এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়া সত্ত্বেও জামিনের পর তিনি আবার শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন কি না, কোথায় কাজ করছেন—এসব বিষয় নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই বলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ রুহুল আমিন বলেছেন, শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ জামিনে বের হওয়ার পর কোথায় কাজ করছেন বা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন, পুলিশ সাধারণত তা অনুসরণ করে না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভিক্টর ব্যানার্জির বক্তব্যও ছিল কাছাকাছি। আদালত কোনো নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ না করলে একজন জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তির কর্মকাণ্ড সীমিত করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের খুবই সীমিত।
অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি শিশুদের সঙ্গে কাজ করতেন, তার বিরুদ্ধে একাধিক শিশুর গুরুতর অভিযোগ উঠল, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল, মামলা হলো, তিনি জামিনে বের হলেন—এরপর তিনি আবার শিশুদের কাছে ফিরে গেলেন কি না, তা দেখার জন্য স্বয়ংক্রিয় কোনো ব্যবস্থা নেই।
আইনজীবীদের মতে, এখানেই আদালতের সুরক্ষামূলক ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের জেন্ডার জাস্টিস ও উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট ক্লাস্টারের আইনজীবী আয়েশা আখতার জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যুক্ত কিছু বিধানের মাধ্যমে তদন্ত বা বিচার চলাকালে অভিযোগকারী, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষায় ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আইনের ৩২(বি) ধারার আওতায় প্রয়োজন মনে করলে ট্রাইব্যুনাল সুরক্ষামূলক আদেশ দিতে পারে।
কিন্তু ওবায়দুল্লাহর ঘটনায় জামিনের পর কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন একটি মাদ্রাসা চালু হয়ে যায়। অর্থাৎ, একটি অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া অবস্থাতেই অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার এমন একটি পরিবেশে ফিরে আসেন যেখানে শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে।
তবে এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ওবায়দুল্লাহ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতও এখন পর্যন্ত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। ফলে আইনগতভাবে তিনি একজন অভিযুক্ত, দণ্ডিত ব্যক্তি নন। কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল দোষ প্রমাণের পর শুরু হবে—এমন ধারণা শিশু সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগের বিচার চলাকালে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন—বিশেষ করে যখন অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের পেশাগত পরিসর একই থাকে।
ঘটনার আরও একটি দিক উদ্বেগ তৈরি করে। ওবায়দুল্লাহ ও তার ভাই মাহমুদুল্লাহ টাঙ্গাইলের পৃথক দুটি স্থানে একই নামে মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন। ওবায়দুল্লাহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়। মাহমুদুল্লাহর প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় আল মানার মাদ্রাসা ফর গার্লস। আর ওবায়দুল্লাহর প্রতিষ্ঠান নতুন নামে পরিচিত হয় ইকরা মাদ্রাসা।
নাম পরিবর্তনের কারণ হিসেবে ওবায়দুল্লাহ গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের কারণে আগের মাদ্রাসার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইকরা মাদ্রাসা ছেলেদের জন্য। প্রতিবেদনে অবশ্য মাদ্রাসা ভবনের একটি কক্ষে দুই মেয়েকে কোরআন পড়তে দেখা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওবায়দুল্লাহ তাদের শিক্ষার্থী হিসেবে অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ওই অংশে একটি পরিবার বসবাস করে এবং সেটি মাদ্রাসার অংশ নয়।
নয় বছর বয়সী শিশুটির অভিযোগ নিয়েও ওবায়দুল্লাহর বক্তব্য ছিল ভিন্ন। এক পর্যায়ে তিনি শিশুটিকে টাকা চুরির জন্য অভিযুক্ত করেন। পরে শিশুটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বাইরে ছেলেদের সঙ্গে তার অনুপযুক্ত সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেন। শিশুটির মা সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার প্রশ্ন ছিল, নয় বছরের একটি শিশু ‘চরিত্র’ সম্পর্কে কী-ই বা জানে?
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতা সামনে আসে—যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ভুক্তভোগী শিশুকেই দায়ী বা সন্দেহ করার প্রবণতা। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ, সম্মানহানির ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ পরিবারগুলোকে আরও দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে।
শিশুটির মা বলেছেন, তিনি দরিদ্র। একদিন তাকে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে—এই সামাজিক বাস্তবতাও তাকে ভয় দেখায়। অর্থাৎ অভিযোগ করার পর বিচার পাওয়ার প্রশ্নের পাশাপাশি পরিবারের সামনে থাকে সামাজিক নিরাপত্তা, মেয়ের ভবিষ্যৎ এবং সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে একটি মাদ্রাসার একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ হিসেবেই মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি কর্তৃক সংবাদ প্রতিবেদন থেকে সংকলিত তথ্য বৃহত্তর একটি চিত্র দেখায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এমন ৩৯টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল।
এর মধ্যে ২৩টি বা ৫৯ শতাংশ ঘটনা মাদ্রাসাকে ঘিরে, আর ১৬টি বা ৪১ শতাংশ স্কুল ও কলেজকে ঘিরে। অথচ শিক্ষার্থীর সংখ্যার হিসাবে চিত্রটি উল্টো। বাংলাদেশে স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ, আর মাদ্রাসায় প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১৬ শতাংশ মাদ্রাসায় পড়লেও ওই তথ্যভান্ডারে রিপোর্ট হওয়া ঘটনার প্রায় ৫৯ শতাংশ মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট।
প্রতি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর হিসাবে ওই সময়ের সংবাদভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী মাদ্রাসায় রিপোর্ট হওয়া ঘটনার হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৩টি, যেখানে স্কুল ও কলেজে তা প্রায় ১ দশমিক ১টি। অর্থাৎ সংবাদভিত্তিক রিপোর্টের হিসাবে পার্থক্য প্রায় সাড়ে সাত গুণ।
তবে এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি প্রকৃত যৌন নির্যাতনের হার হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ তথ্যগুলো সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অনেক ঘটনা হয়তো সংবাদে আসে না, আবার কোথাও রিপোর্টিংয়ের প্রবণতা বেশি বা কম হতে পারে। ফলে এগুলো নির্যাতনের প্রকৃত ব্যাপকতা নয়; বরং প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোর একটি চিত্র।
তারপরও প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—কোনো প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ ওঠার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে কীভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানে শিশুদের কাছে ফিরে যাওয়া থেকে ঠেকানো হবে?
বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সরাসরি তদারকির বাইরে। আলিয়া ধারার মাদ্রাসাগুলো সরকারি কাঠামোর অধীনে থাকলেও হিফজ ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর বড় অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা তদারকির আওতায় নেই। সরকারের কাছে দেশের হিফজ ও কওমি মাদ্রাসার মোট সংখ্যারও নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।
কওমি মাদ্রাসাগুলোর নিবন্ধন ও তদারকিতে বিভিন্ন বোর্ড রয়েছে। ওবায়দুল্লাহ জানিয়েছেন, ইকরা মাদ্রাসা দেশের সবচেয়ে বড় কওমি মাদ্রাসা বোর্ডগুলোর একটি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সঙ্গে যুক্ত। বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নাদভীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার। ছয়টি কওমি বোর্ড মিলিয়ে সংখ্যাটি প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
কিন্তু নিবন্ধন মানেই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্রীয় নজরদারি নয়। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিভাবক অভিযোগ করলে তারা অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি দেখতে পারে। কিন্তু অপরাধ তদন্ত বা আইনগত শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
একটি মাদ্রাসা থেকে কোনো শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হলে তিনি অন্য কোথাও গিয়ে আবার কাজ শুরু করতে পারেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম হতে পারে ভিন্ন, নিবন্ধন হতে পারে কোনো আত্মীয়ের নামে, এমনকি যোগাযোগের নম্বরও বদলে যেতে পারে। বেফাকের পক্ষ থেকেই স্বীকার করা হয়েছে, এমন ঘটনা ঘটে। নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য কক্ষ, জমির লিজ এবং কয়েকটি স্থানীয় মাদ্রাসার সুপারিশপত্র যাচাই করা হলেও শিক্ষকটির বিরুদ্ধে পূর্বের অভিযোগের কোনো কেন্দ্রীয় রেকর্ড থাকলে তা দেখে তাকে নিষিদ্ধ করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
এ অবস্থায় একটি মাদ্রাসা থেকে অভিযুক্ত বা অপসারিত শিক্ষক অন্য মাদ্রাসায় চলে যাওয়া খুব কঠিন নয়। আর শিশুরা তখন একই ঝুঁকির মধ্যে আবার পড়ে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় কয়েকজন ইসলামি চিন্তাবিদও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মুফতি হাবিবুল্লাহ মেসবাহ মনে করেন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষককে বহিষ্কার করলে সমস্যার সমাধান হয় না; তিনি অন্য গ্রামে গিয়ে আবার একই কাজ করতে পারেন। তার প্রস্তাব হলো, উলামাদের পরিচালনায় একটি কেন্দ্রীয় ও বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রি থাকা উচিত, যেখানে গুরুতর নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী ব্যক্তিদের তথ্য থাকবে এবং প্রয়োজনে শিক্ষকতার অনুমতি দেশব্যাপী প্রত্যাহার করা হবে।
ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান মুসা আল হাফিজ শিশুদের নিজেদের শরীরের সীমানা, ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি আবাসিক মাদ্রাসায় প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষক ও শিশুর মধ্যে ব্যক্তিগত ও নজরদারিবিহীন একান্ত সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করার কথাও বলেছেন।
এসব প্রস্তাবের মূল জায়গাটি খুব পরিষ্কার—শিশু সুরক্ষা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একজন শিক্ষক যদি একটি প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের অভিযোগে পড়েন, তাহলে সেই তথ্য এমন কোনো ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকা দরকার যাতে তিনি সহজে অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একই দায়িত্ব নিতে না পারেন। একই সঙ্গে অভিযোগকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না; বিচারিক প্রক্রিয়া অবশ্যই চলবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকারও বজায় থাকবে। কিন্তু বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
টাঙ্গাইলের ঘটনাটি তাই শুধু একটি মাদ্রাসার নাম পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি দেখায়, একটি অভিযোগ, একটি মামলা এবং একটি জামিনের পর কীভাবে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি আবার শিশুদের শিক্ষার পরিবেশে ফিরে আসতে পারেন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই ফিরে আসার পথ আরও সহজ হয়ে যেতে পারে, যদি কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক যাচাই, অভিযোগের রেকর্ড, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের তথ্য এবং শিশু সুরক্ষার বাধ্যতামূলক নীতিমালা না থাকে।
সবচেয়ে অসহায় অবস্থানে থাকে শিশুরাই। তারা শিক্ষককে বিশ্বাস করে, প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে এবং অনেক সময় আবাসিক ব্যবস্থায় পরিবার থেকে দূরে থাকে। সেই বিশ্বাসের জায়গাটিই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে শুধু নতুন ভবন, নতুন নাম বা নতুন সাইনবোর্ড কোনো সমাধান নয়।
ইকরা মাদ্রাসার দরজায় হয়তো একটি নতুন নাম ঝুলছে। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি নামের নয়—জবাবদিহির। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিচার শেষ হওয়ার আগেই তিনি যদি আবার শিশুদের কাছে ফিরে আসতে পারেন, তাহলে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম বদলালেই কি শিশুদের ঝুঁকি বদলে যায়?
টাঙ্গাইলের নয় বছর বয়সী শিশুটির পরিবারের ভয় এবং অনিশ্চয়তা সেই প্রশ্নেরই কঠিন উত্তর সামনে আনে। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগের পর শুধু মামলা করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিচার চলবে একদিকে, আর শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর প্রহরা থাকবে অন্যদিকে। কারণ কোনো শিশুর জন্য নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তার মৌলিক অধিকার।
আপনার মতামত জানানঃ