
হঠাৎ কোনো বড় সংকট শুরু হলে খবরের অভাবের চেয়ে ব্যাখ্যার ভিড় অনেক সময় বেশি চোখে পড়ে। একই ভিডিও দেখে কেউ বলেন, ‘এবার সত্য বেরিয়ে এসেছে’; অন্যজন বলেন, ‘এটি সাজানো’। একই পরিসংখ্যানে কারও কাছে ব্যর্থতার প্রমাণ, কারও কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাফল্যের চিহ্ন। তথ্যটি হয়তো সবার সামনে একই। তবু মানুষ যেন ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। কেন?
প্রশ্নটি কেবল কে ঠিক আর কে ভুল, তা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের অনিশ্চয়তা সহ্য করার ক্ষমতা, নিজের দল ও পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য, কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা এবং ভুল স্বীকারের মানসিক মূল্য। সংকট যত গভীর হয়, নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন তত বাড়ে। একই সঙ্গে এমন একটি গল্পের প্রয়োজনও বাড়ে, যা বিশৃঙ্খলাকে বোধগম্য করে এবং বলে দেয়—কার দোষ, কার ওপর ভরসা করতে হবে, এরপর কী ঘটবে। এই দুই প্রয়োজন সব সময় একই দিকে যায় না।
ধরা যাক, এক শহরে পানির মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানাল, পরীক্ষার কিছু ফল এখনো আসেনি; আপাতত নির্দিষ্ট এলাকায় পানি ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এটি সতর্ক ও সীমিত তথ্য। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে দুটো সহজ ব্যাখ্যা ছড়াল: ‘কোনো বিপদই নেই, সব ষড়যন্ত্র’ এবং ‘পুরো শহরের পানি বিষাক্ত, সব গোপন করা হচ্ছে’। মাঝখানের অসমাপ্ত সত্যটি অপেক্ষা করতে বলে; দুই প্রান্তের নিশ্চিত গল্প দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফলে নিশ্চিত উচ্চারণ অনেকের কাছে বেশি স্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে, যদিও সেটি বেশি নির্ভরযোগ্য হওয়ার প্রমাণ নয়।
আমরা প্রায়ই ভাবি, বিশ্বাস গড়ে ওঠে এভাবে: আগে তথ্য, পরে বিচার, তারপর মত। বাস্তবে পুরোনো অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ক আগে থেকেই বিচারকে প্রভাবিত করে। যে প্রতিষ্ঠানের ওপর কারও আস্থা নেই, তার সঠিক সতর্কবার্তাও সন্দেহের মুখে পড়তে পারে। আবার প্রিয় রাজনৈতিক দল, পরিচিত বক্তা কিংবা নিজের সামাজিক গোষ্ঠীর ভুল দাবিকে মানুষ বেশি ছাড় দিতে পারে। মনস্তত্ত্বে পরিচিত ‘confirmation bias’ বা পূর্ববিশ্বাসকে সমর্থনকারী তথ্যের প্রতি ঝোঁক এই প্রবণতার একটি নাম। ‘Motivated reasoning’ বোঝায়, কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে যুক্তি সাজানোর প্রবণতা। এগুলো মানুষের সম্ভাব্য আচরণ ব্যাখ্যা করে; প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেক পরিস্থিতিতে একইভাবে আচরণ করে—এমন দাবি করে না।
এখানে একটি অস্বস্তিকর দার্শনিক প্রশ্ন আসে: আমি কি কোনো দাবিকে সত্য বলে মানছি, নাকি সেটি মানলে আমার পরিচিত পৃথিবীটি অটুট থাকে বলে মানছি? নিজের পক্ষের কেউ অন্যায় করেছে—এমন প্রমাণ গ্রহণ করা মানে কখনো শুধু একটি মত সংশোধন নয়। এর অর্থ হতে পারে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, নিজের পুরোনো বক্তব্যের দায় নেওয়া, এমনকি ‘আমি কেমন মানুষ’ সেই ধারণা নতুন করে দেখা। তাই প্রমাণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল জ্ঞানের ঘাটতি থেকে আসে না; সামাজিক ও আবেগগত মূল্যও এর অংশ হতে পারে।
তবে ‘সবাই পক্ষপাতদুষ্ট’ বলেই সব বক্তব্যকে সমান গুরুত্ব দেওয়া যায় না। একটি পক্ষের কাছে অসম্পূর্ণ নথি আছে আর অন্য পক্ষের কাছে যাচাইযোগ্য বহু নথি থাকলে দুই দাবির প্রমাণের ওজন এক নয়। সত্য খোঁজার কাজ হলো প্রমাণের মান, উৎসের স্বাধীনতা, পদ্ধতি ও সংশোধনের সুযোগ যাচাই করা। নিজের অবস্থান সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখলে যেমন ভুল হয়, তেমনি প্রতিটি বিরোধকে নিছক ‘দুই পক্ষের দুই মত’ বানালেও বাস্তব তথ্য আড়ালে পড়ে।
সংকটে ভালো সাংবাদিকতার ভূমিকা এখানেই। কোনো তথ্য জানা, কোনটি এখনো অজানা, কোন দাবিটি কার, এবং নতুন প্রমাণ এলে কোন সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারে—এগুলো স্পষ্টভাবে বলা দরকার। ‘এখনো জানা যায়নি’ বাক্যটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়; এটি বিশ্বাসযোগ্যতার শর্ত হতে পারে। অনিশ্চয়তা স্বীকার করলে পাঠককে অন্ধ আস্থা রাখতে বলা হয় না, বরং যাচাইয়ের পথ দেখানো হয়।
পাঠকের নিজের জন্যও কয়েকটি প্রশ্ন কাজে আসতে পারে। খবরটি আমার বিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে হলে আমি কি দ্রুত বিশ্বাস করছি? একই দাবি আমার পছন্দের কেউ করলে কি একই মানদণ্ড ব্যবহার করতাম? মূল নথি বা প্রত্যক্ষ উৎস কোথায়? ছবিটি কখন এবং কোথায় তোলা? দাবিটি ভুল প্রমাণিত হওয়ার মতো কী প্রমাণ গ্রহণ করতে রাজি আছি? শেষ প্রশ্নটির উত্তর যদি হয় ‘কোনো প্রমাণেই নয়’, তবে সেটি আর অনুসন্ধান থাকে না; বিশ্বাসের রক্ষাকবচ হয়ে যায়।
এই সতর্কতা অবশ্য ব্যক্তির ওপর সব দায় চাপায় না। যখন সরকারি তথ্য দেরিতে আসে, ভুল সংশোধন করা হয় না, সংবাদমাধ্যম দলীয় ভাষায় কথা বলে, আর প্ল্যাটফর্মে উত্তেজনাপূর্ণ পোস্ট দ্রুত ছড়ায়, তখন মানুষকে শুধু ‘আরও যুক্তিবাদী হন’ বলা যথেষ্ট নয়। আস্থা তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠানকেও ধারাবাহিকভাবে সত্য বলা, ভুল স্বীকার করা এবং জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করতে হয়। বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ ছাড়া ব্যক্তিগত বিচক্ষণতারও সীমা আছে।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তথ্যও চায়, ব্যাখ্যাও চায়। সংকটে বিপদ শুরু হয় যখন ব্যাখ্যাটিই তথ্যের বিচারক হয়ে বসে—যা নিজের পক্ষকে রক্ষা করে তা সত্য, আর যা অস্বস্তি তৈরি করে তা মিথ্যা। সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে সব মুহূর্তে নিশ্চিত হওয়া নয়। বরং কোন জায়গায় নিশ্চিত হওয়া যায়, কোন জায়গায় অপেক্ষা করতে হয় এবং কোন প্রমাণ এলে নিজের অবস্থান বদলাতে হবে, তা জানার সাহস। সংকটের সময়ে সেই সাহসই হয়তো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নাগরিক গুণ।
আপনার মতামত জানানঃ