
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুলিশ। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বাহিনীর কার্যকারিতা শুধু তার জনবল, অস্ত্র কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর ভিত্তি হচ্ছে পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা। সেই ভিত্তিই যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনগণের আস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরে গোপন তথ্য পাচার এবং দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের খবর সামনে এসেছে। দেশ রূপান্তরের ৬ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত দুই হাজার কর্মকর্তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত আইজিপি থেকে শুরু করে উপপরিদর্শক (এসআই) পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধা পাওয়া কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। তাঁদের কেউ কেউ পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্য বাইরে সরবরাহ করছেন বলেও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিযোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশ প্রশাসনের অবস্থার দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বাহিনীতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে বাহিনীটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, পুলিশ ও আনসার সদস্যসহ বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন থানা ও আদালতে পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সাবেক পুলিশপ্রধানসহ একাধিক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবার অনেক কর্মকর্তা আত্মগোপনে চলে যান।
এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ছিল সময়ের অন্যতম বড় দাবি। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি পেশাদার পুলিশ প্রশাসন গড়ে উঠবে, যেখানে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সততা গুরুত্ব পাবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, তা নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একই ধরনের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হন। এমনকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তাঁদের অবস্থানের বড় পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাও আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ ক্ষমতার পালাবদল হলেও প্রশাসনের ভেতরে সুবিধাভোগী একটি অংশ নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—সরকার পরিবর্তনের পরও যদি প্রশাসনের ভেতরে একই ধরনের প্রভাবশালী বলয় টিকে থাকে, তাহলে প্রকৃত সংস্কার কতটা সম্ভব?
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, পুলিশের ভেতরে দলবাজির সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি; বরং বিভিন্ন সরকারের আমলেই এটি ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে একাধিক গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। এসব গ্রুপের নেতারা অনেক সময় নিজেদের প্রভাবের কারণে প্রশাসনিক নির্দেশনাকেও উপেক্ষা করতেন। বর্তমানে যাঁরা দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন, তাঁদের কেউ কেউ অতীতে দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও পদায়ন থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
এই বক্তব্য পুলিশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। অর্থাৎ সমস্যা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক চর্চা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এক সরকারের আমলে যাঁরা ক্ষমতাবান, অন্য সরকারের আমলে তাঁরাই আবার নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগই এখন সামনে আসছে।
পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরে তথ্য পাচারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একটি দেশের পুলিশ বাহিনী প্রতিদিন অসংখ্য সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কাজ করে। অপরাধ তদন্ত, আসামির অবস্থান, অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এসব তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা বাহিনীর দায়িত্বের অংশ। এসব তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে গেলে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে, অপরাধীরা আগাম সতর্ক হওয়ার সুযোগ পেতে পারে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো অভিযানের তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে গেলে অপরাধী চক্র তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। তদন্তের গোপন নথি বাইরে চলে গেলে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীরা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। আবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব তথ্য ব্যবহার করা হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। ফলে তথ্য পাচারের অভিযোগকে নিছক বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সরাসরি জড়িত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে চারজন অতিরিক্ত আইজিপি, আটজন ডিআইজি, ১৭ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, শতাধিক পুলিশ সুপার, ১৫০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ২০০ জন ইন্সপেক্টর এবং প্রায় এক হাজার সাব-ইন্সপেক্টর রয়েছেন। সব মিলিয়ে অন্তত দুই হাজার কর্মকর্তার বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির গভীরতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও অতীত রাজনৈতিক পরিচয়, কোনো সরকারের সময়ে ভালো পদে দায়িত্ব পালন কিংবা পদোন্নতি পাওয়াই অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না। সরকারি চাকরিতে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তাই কাউকে কেবল অতীতের পদায়ন বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং নির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ, তথ্যপ্রযুক্তিগত উপাত্ত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করার বিষয়টিও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে আলোচনার দাবি রাখে। পুলিশ বাহিনীতে বিভিন্ন পদে পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত প্রভাব কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানো। কিন্তু বাস্তবে যদি কোনো কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় বদলি এড়িয়ে যান, তাহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তার বক্তব্যে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, পুলিশ সদর দপ্তরের বিভিন্ন ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁদের কেউ কেউ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতার কারণে বদলি এড়িয়ে চলেছেন। আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই দুর্বল করে না, বরং সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে পেশাগত দক্ষতা কিংবা সততার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে তাঁর কর্মস্পৃহা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাহিনীর ভেতরে হতাশা, বিভক্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তে পারে।
পুলিশ বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার, আন্দোলন দমন কিংবা প্রশাসনিক পদায়নে দলীয় বিবেচনার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। ফলে কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর চরিত্র বদলে যাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি, বদলি, নিয়োগ এবং দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছ নীতিমালা কার্যকর থাকবে। কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশে যেন গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নির্ধারিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের পেশাগত স্বাধীনতা এবং আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
তথ্য পাচারের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে ব্যাপক নজরদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাহিনীর ভেতরে আরও ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বরং অভিযোগের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট তদন্ত দল গঠন, ডিজিটাল তথ্যের ফরেনসিক বিশ্লেষণ, যোগাযোগের রেকর্ড যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনতে হবে। তদন্তের ফলাফলও যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে জনগণ বুঝতে পারে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে।
এ ক্ষেত্রে জবাবদিহির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকার রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অযথা হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ একটি পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হলে সৎ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশকে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ হিসেবে নয়, জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। সরকার পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলাবে, কিন্তু পুলিশের দায়িত্ব ও সাংবিধানিক অবস্থান একই থাকবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এই বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে নতুন আচরণ প্রত্যাশা করেছিল। তারা চেয়েছিল এমন একটি পুলিশ ব্যবস্থা, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবে না, আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কেউ হয়রানির শিকারও হবে না। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর নিরপরাধ ব্যক্তি যে মতাদর্শেরই হোক, তার অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
বর্তমানে পুলিশের ভেতরে তথ্য পাচার, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের নিয়ে যে অনুসন্ধানের কথা সামনে এসেছে, তা তাই কেবল কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এই অনুসন্ধান কতটা নিরপেক্ষ হবে, প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত হবে কি না এবং প্রশাসনের ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর জন্য কার্যকর সংস্কার আসবে কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পুলিশের পোশাক বদলালেই পুলিশের চরিত্র বদলায় না। সরকার পরিবর্তন হলেই প্রশাসনের সংস্কৃতি পাল্টে যায় না। প্রকৃত পরিবর্তন আসে তখনই, যখন একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ব্যক্তির চেয়ে নিয়ম, আনুগত্যের চেয়ে পেশাদারত্ব এবং রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সামনে এখন সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।
আপনার মতামত জানানঃ