
সি কে জি নায়ার
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা বিবেচনা করুন। একদল সন্ন্যাসীর সফরের সময় নারী কর্মীদের আলাদা রাখার মতো আপাত সাধারণ, যদিও সংবেদনশীল, একটি প্রশাসনিক ঘটনায় আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা প্ল্যাটফর্মসের ৬১ শতাংশ ভোটাধিকার নিয়ন্ত্রণকারী আলোচিত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে এক ডলারও খোয়াতে হয়নি—যদিও আদালত তাঁর কোম্পানির বিরুদ্ধে শিশুদের নিরাপত্তা, তথ্যের অপব্যবহার এবং প্ল্যাটফর্মে আসক্তি তৈরিসংক্রান্ত গুরুতর ও ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘনের বিষয়গুলো স্বীকার করেছে। জবাবদিহি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।
আগস্টে মেটা যুক্তরাষ্ট্রের চারটি অঙ্গরাজ্যকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার দিতে রাজি হয়ে একগুচ্ছ মামলা নিষ্পত্তি করে। দুই মাস পর তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে অসাধু কৌশল অবলম্বনের অভিযোগে দায়ের করা পৃথক একটি মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের আরেক আদালত মেটাকে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যকে ২৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেন। সংবাদ অনুযায়ী, বিচারক উদারতা না দেখালে এই জরিমানার পরিমাণ ২৬০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারত।
মেটার ক্ষেত্রে এগুলো প্রথমবারের লঙ্ঘন নয়। গোপনীয়তা লঙ্ঘনের জন্য কোম্পানিটি এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগের জরিমানার মধ্যে রয়েছে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সঙ্গে ৫ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা, ২০২২ সালে আইরিশ কর্তৃপক্ষের ৪০ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর জরিমানা এবং ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৩৯ কোটি ইউরোর জরিমানা—এগুলো মাত্র কয়েকটি উদাহরণ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতাবিধি লঙ্ঘনের বিষয় বাদ দিলেও একই ধরনের অপরাধ ধারাবাহিকভাবে ঘটছে।
তবে কোম্পানির ওপর নগদ জরিমানা চাপিয়ে সমঝোতার এই নতুন ধারার সুবিধাভোগী শুধু মার্ক ও মেটা নয়। কখনো কোম্পানির ব্যবসায়িক চর্চায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়, কখনো তা-ও হয় না। বিষয়টি এমন, যেন কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের—যাঁদের বিবেক ও নৈতিকতার রক্ষক হওয়ার কথা—এসব লঙ্ঘনের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। বড় প্রধান নির্বাহী এবং শীর্ষ নেতৃত্ব যেন এতই ক্ষমতাবান যে তাঁদের জেলে পাঠানো, এমনকি ব্যক্তিগতভাবে জরিমানা করাও সম্ভব নয়।
কয়েকটি বড় উদাহরণ দেখা যাক। ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক ‘মাস্টার সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে বৃহৎ তামাক কোম্পানিগুলো ধূমপানজনিত সমস্যায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যয় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬টি অঙ্গরাজ্যকে ২০৬ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করে। ডিপওয়াটার হরাইজনের তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিপি ২০১৬ সালে ২০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে সমঝোতা করে। একই বছরে গাড়ির নিঃসরণ পরীক্ষায় প্রতারণার ব্যবস্থার কারণে ফক্সভাগেনের ওপর ১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের দায় বর্তায়।
আর্থিক খাতে ২০১৪ সালে ব্যাংক অব আমেরিকার রেকর্ড ১৬ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা এবং ২০১৩ সালে জেপিমরগান চেজের ১৩ বিলিয়ন ডলারের নিষ্পত্তির পেছনে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ বন্ধকঋণভিত্তিক সিকিউরিটিজের বিস্তার। নিষেধাজ্ঞাধীন দেশ ও অঞ্চলের লেনদেন বেআইনিভাবে সম্পন্ন করার ঘটনায় বিএনপি পারিবা ২০১৪ সালে ৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করতে সম্মত হয়। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া এসব কোম্পানির প্রধান নির্বাহী বা শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়নি।
সমঝোতার পক্ষে প্রধান যুক্তি হলো জনস্বার্থ এবং দ্রুত বিচার। সেই যুক্তি অনুসরণ করে রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো মানুষের—শিশুসহ—ওপর এবং অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক ক্ষতির প্রতিকার করার প্রধান উপায় হিসেবে নজিরবিহীন শত শত কোটি ডলারের আর্থিক সমঝোতাকে ব্যবহার করেছে।
আদালতের বাইরে সমঝোতা এবং দোষ স্বীকারের বিনিময়ে শাস্তি বা অভিযোগে ছাড়ের চুক্তির দিকে ক্রমবর্ধমান ঝোঁক অপরাধ ও শাস্তির সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। ফৌজদারি জবাবদিহিকে আর্থিক, বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক লেনদেনে পরিণত করে এটি ন্যায়বিচারের সীমারেখা অস্পষ্ট করছে। বিচারের প্রতি এমন শিথিল দৃষ্টিভঙ্গি এবং অপরাধের গুরুতরতার সঙ্গে পরিণতির এই উল্টো অনুপাতের পেছনে বাস্তব যুক্তিও রয়েছে: বড় কোম্পানির পতন উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে, এবং ক্রমবর্ধমান বড় ও জটিল লঙ্ঘন মোকাবিলায় তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার ঘাটতি।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টও ২০২৫ সালে স্টার্লিং বায়োটেকের ব্যাংক জালিয়াতির মামলা বন্ধ করার সময় এই পথে হেঁটেছে। কোম্পানির প্রোমোটাররা অর্থ পুনরুদ্ধারের একটি প্যাকেজ দিতে সম্মত হওয়ার পর মামলা বন্ধ করা হয়। অথচ এর আগে আদালতের দৃঢ় অবস্থান ছিল, ফৌজদারি অপরাধে সমঝোতা করা সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ। সেই অবস্থানের গুরুত্বই হয়তো আদালতকে জোর দিয়ে বলতে বাধ্য করেছিল যে এই রায়কে নজির হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তা সত্ত্বেও মামলাটি একটি বাস্তব উদাহরণ: বাস্তববাদী বিবেচনা যখন ফৌজদারি জবাবদিহির সঙ্গে মেশে, তখন অপরাধ ও শাস্তির সীমারেখা কীভাবে ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
ফৌজদারি বিচারের প্রচলিত আদর্শে একটি সরল কাঠামো কল্পনা করা হয়: অপরাধ সংঘটিত হবে এবং প্রমাণিত হবে; এরপর তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি দেওয়া হবে। কোনো কোনো বিচারব্যবস্থায় ছোট অপরাধেও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। যেমন ভিক্টর হুগোর লে মিজেরাবল উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জঁ ভালজাঁকে একখানা রুটি চুরির জন্য তৎকালীন ফরাসি বিচারব্যবস্থা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।
কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা, দোষ স্বীকারের চুক্তি এবং নির্দিষ্ট শর্তে ফৌজদারি বিচার স্থগিত রাখার চুক্তির দিকে আধুনিক ঝোঁক বহু দেশে এই কাঠামোকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। এই পরিবর্তন অপরাধ ও শাস্তির সীমারেখাকে ক্রমেই অস্পষ্ট করছে এবং বিচারকে লেনদেনে পরিণত করছে—ন্যায়বিচারের অর্থমূল্যায়ন ঘটাচ্ছে। জনসাধারণের কাছে বার্তাটি দাঁড়াচ্ছে: করপোরেট ব্যাংক হিসাবে অর্থের পরিমাণ যত বড়, অপরাধের গুরুতরতার প্রভাব ততটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
পশ্চিমা এই মডেল বিচারব্যবস্থাকে এমন একটি বাজারে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করে, যেখানে বন্ধ দরজার আড়ালে দর-কষাকষির মাধ্যমে ফৌজদারি দায় থেকে রেহাই পাওয়া যায় এবং ক্ষমতাবানেরা প্রায়ই প্রকৃত জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা পান। সমঝোতা বিচারশাস্ত্রকে পুরোপুরি মুছে না দিলেও বিচার দেওয়ার প্রক্রিয়াকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। শাস্তি আর অপরাধের নিশ্চিত ও স্বচ্ছ পরিণতি থাকে না; তা হয়ে ওঠে দর-কষাকষির বিষয়। সমঝোতায় শুধু কোম্পানিকে অর্থ দিতে হবে—এমন পদ্ধতি পুনরাবৃত্ত লঙ্ঘন কমাচ্ছে না। বরং তা বারবার লঙ্ঘনকে উৎসাহিত করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিস্থিতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে। এআই খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরাই জোরালোভাবে সতর্ক করেছেন যে কিছু এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অন্য ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এত দিন এআইয়ের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন যাঁরা, তাঁদের কাছ থেকেই এমন সতর্কবার্তা কেন আসছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। অনেকে ‘মানবজাতির অবসান’ ধরনের যুক্তিও গ্রহণ করছেন না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন এআই সরঞ্জাম সম্পর্কে ইতিমধ্যে প্রকাশিত ঘটনাগুলো বিবেচনা করলেও বলা যায়, এআইয়ের দখল যত বিস্তৃত হবে, এসব ঘটনা সংখ্যা ও ব্যাপ্তিতে তত বাড়বে। এর অনেকগুলো বড় বিরোধে রূপ নেবে। এসব লঙ্ঘনের শাস্তি কীভাবে হবে? সেই নিয়ন্ত্রণহীন এআইকে শাস্তি দেওয়া হবে? নাকি তার স্রষ্টাদের—মানুষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, অথবা আইনগত সত্তা হিসেবে কোম্পানিকে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলবেন, আমরা তো আগেই সতর্ক করেছিলাম।
শেষ পর্যন্ত অপরাধের ধরন যা-ই হোক, দেওয়ানি সমঝোতার সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। কাল্পনিকভাবে, নিয়ন্ত্রণহীন কোনো এআই সরঞ্জামের কারণে পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটলেও তা এই তালিকায় পড়তে পারে। যত দিন এসব সমঝোতা দায়ী ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব ফেলবে না, তত দিন সরকারি কোষাগারে বিপুল অর্থ আসতে থাকবে। কোম্পানির সঙ্গে দেওয়ানি সমঝোতা অর্থ দিয়ে পূরণযোগ্য ক্ষতি কিছুটা লাঘব করতে পারে। কিন্তু যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষের জীবনের ক্ষতি জড়িত, সেখানে শুধু কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা অসম্পূর্ণ ন্যায়বিচার। দায়ী ব্যক্তিদেরও তাঁদের দায়ের অনুপাতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
বিচারের জগৎ এমন উল্টো হওয়া উচিত নয়—যেখানে ব্যক্তির ছোট অপরাধেও কঠোর শাস্তি হয়, অথচ বড় করপোরেট অপরাধের নিষ্পত্তি হয় শুধু কোম্পানিকে জরিমানা করে। আর্থিক সমঝোতার এই ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মূল প্রকাশনা: The New Indian Express—Justice inverted between crime and settlement
সি কে জি নায়ার, ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সিকিউরিটিজ মার্কেটসের সাবেক পরিচালক এবং সিকিউরিটিজ আপিলেট ট্রাইব্যুনালের সাবেক সদস্য
আপনার মতামত জানানঃ