
ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির চলমান আন্দোলনের তাৎপর্য শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। আন্দোলনটি এমন এক রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে, যার উত্তর নির্বাচনী জয়ের হিসাব দিয়ে দেওয়া কঠিন: যে প্রতিষ্ঠান ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার বৈধতা নির্ধারণ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে?
ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপিকে এখানে একটি দেশব্যাপী তরুণনির্ভর প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে বোঝা জরুরি। নামের মধ্যে ‘পার্টি’ থাকলেই প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনী দলের সঙ্গে এর সাংগঠনিক কাঠামো এক হয়ে যায় না। এর শক্তি এখন প্রতিবাদ সংগঠিত করা, জনমনোযোগ তৈরি করা এবং সরকারের ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করার মধ্যে।
১১ অক্টোবরও দিল্লিতে বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ ও আটক হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং অন্য দুই নেতা মুক্তি পেয়েছেন; আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। আগের দিনের বিধিনিষেধের পর মেট্রো ও মোবাইল ইন্টারনেট পুনরায় চালু হয়েছে। নেতৃত্বকে আটকে রাখা আন্দোলন থামানোর নিশ্চয়তা দেয়নি—তবে বিক্ষোভ চলা মানেই সরকার রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তও এখনই টানা যায় না।
আন্দোলনের প্রতীকটি নিজেই রাজনৈতিক। অনলাইন ব্যঙ্গ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে তরুণেরা তাঁদের প্রতি অবমাননাকর ভাষার জবাবে ককরোচকে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আগের প্রতিবাদও আন্দোলনটির পরিচিতি বাড়িয়েছে। সামাজিক উপহাসকে আত্মপরিচয়ে রূপান্তর করার এই কৌশল প্রতিষ্ঠিত দলীয় ভাষার বাইরে একটি প্রতিবাদী পরিসর তৈরি করেছে।
এই ভাষার আকর্ষণ বোঝার জন্য তরুণদের শুধু ভবিষ্যৎ ভোটার হিসেবে দেখলে চলবে না। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তাঁদের অভিযোগ শুনছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের বক্তব্যে একটি মৌলিক দাবি দেখা যায়: নাগরিককে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এই ব্যাখ্যায় সিজেপির বর্তমান লড়াই ভোটার তালিকার পাশাপাশি রাজনৈতিক মর্যাদারও প্রশ্ন।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। কমিশন ও বিজেপির ব্যাখ্যায় এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত এবং খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ব্যক্তির নাম রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রক্রিয়াটি বৈধ ভোটারদেরও বাদ দিয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে বিজেপিকে সুবিধা দিয়েছে। বিজেপি ও কমিশন সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এখানে সংখ্যাটির অর্থ পরিষ্কার রাখা জরুরি। তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রতিটি নামকে একজন জীবিত ও যোগ্য নাগরিকের স্থায়ী ভোটাধিকার হারানোর সমার্থক বলা যায় না। একইভাবে, নামের বড় অংশ প্রশাসনিক কারণে বাদ পড়েছে—এই ব্যাখ্যাও অবশিষ্ট ভুল বা বৈষম্যের প্রশ্ন মিটিয়ে দেয় না।
স্বচ্ছতার পরীক্ষাটি হবে আরও নির্দিষ্ট। কার নাম কেন বাদ পড়েছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যথাযথ নোটিশ পেয়েছেন কি? আপত্তি জানানোর সুযোগ কার্যকর ছিল কি? ভুল সংশোধন ভোটের আগে হয়েছে কি? কোন অঞ্চল বা জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? রাজনৈতিক সুবিধার অভিযোগ যাচাই করতে এসব তথ্য প্রয়োজন; শুধু মোট সংখ্যা দিয়ে ইচ্ছাকৃত কারচুপির সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে অন্য দুই কমিশনারের আপত্তির কথা উঠে আসে। এটি কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে অভ্যন্তরীণ আপত্তি থাকা এবং নির্বাচনী কারচুপি প্রমাণিত হওয়া একই বিষয় নয়।
কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য তাই শুধু রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করা যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্তের যুক্তি, সংশোধনের ফল এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য প্রকাশ করতে হবে। একটি নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানকে সরকারের সমর্থকদের পাশাপাশি সরকারের বিরোধীদের কাছেও নিজের প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
সরকারের প্রতিক্রিয়ায় দুটি অবস্থান দৃশ্যমান। একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা রক্ষার দাবি; অন্যটি আন্দোলনকে আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি হিসেবে মোকাবিলা করা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মসূচির অনুমতি প্রত্যাখ্যানের পেছনে প্রক্রিয়াগত নিয়ম না মানা, আগের নির্দেশ অমান্য করা এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার যুক্তি দিয়েছে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা আন্দোলনকে বিরোধীদের রাজনৈতিক অরাজকতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং সাধারণ মানুষের কাজ, চিকিৎসা ও চলাচলে অসুবিধার প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সিজেপিকে বিরোধীদের সহযোগী শক্তি হিসেবেও আক্রমণ করেছেন। এটি সরকারের রাজনৈতিক বক্তব্য; আন্দোলনটি বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে—তার স্বাধীন প্রমাণ নয়।
এই অবস্থানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বোঝা যায়। সরকার চায় বিতর্কটি নির্বাচনী স্বচ্ছতার প্রশ্ন থেকে জনশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগের প্রশ্নে সরে আসুক। আন্দোলনকে নাগরিকের অধিকার রক্ষার উদ্যোগের বদলে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির অস্থিরতা হিসেবে দেখাতে পারলে তার গ্রহণযোগ্যতা কমানো সহজ হয়।
কিন্তু এখানেই সরকারের জন্য ঝুঁকি। প্রতিবাদের কারণে সৃষ্টি হওয়া অসুবিধা এবং প্রতিবাদ ঠেকাতে প্রশাসনের আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে সৃষ্টি হওয়া অসুবিধা আলাদা করে দেখতে হবে। রাষ্ট্রের ব্যাপক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আন্দোলনের দাবির চেয়েও বড় সংবাদ হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভোটার তালিকার বিতর্ক নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় আচরণের বিতর্কে রূপ নেয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্বের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজনীয়, সীমিত এবং ব্যাখ্যাযোগ্য তার ওপর। একটি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বৃহত্তর নাগরিক জীবন বাধাগ্রস্ত হলে সরকারের নিজের জনদুর্ভোগের যুক্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিরোধীদের অবস্থানেও একাধিক হিসাব রয়েছে। কংগ্রেস ও ইন্ডিয়া জোটের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদে সক্রিয় হয়েছেন। রাহুল গান্ধী ও অন্য নেতাদের কর্মসূচি দেখায়, প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে একটি যৌথ রাজনৈতিক ইস্যু করতে চাইছে।
তৃণমূল, আম আদমি পার্টি ও বামপন্থী নেতৃত্বের অংশগ্রহণও দৃশ্যমান হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ বিরোধী নেতাদের আটক হওয়ার সংবাদ এসেছে। এই অংশগ্রহণ আন্দোলনের পরিসর বাড়ায়; একই সঙ্গে সরকারকে একে দলীয় বিরোধিতার সম্প্রসারণ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়।
বিরোধীদের জন্য এটি সুযোগ, কারণ দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্ম একই প্রশ্ন তুলছে। নির্বাচনী পরাজয়ের অভিযোগ হিসেবে যে বক্তব্যকে সরকার খারিজ করতে পারে, নাগরিক অধিকার ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার দাবি হিসেবে তা বৃহত্তর সমর্থন পেতে পারে।
তবে বিরোধীদেরও সতর্ক থাকতে হবে। সব পরাজয়ের ব্যাখ্যা ভোটার তালিকার অভিযোগে সীমিত করলে নিজেদের সংগঠন, নেতৃত্ব এবং ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্কের দুর্বলতা আড়ালে পড়ে। নির্বাচনী অনিয়মের তদন্ত দাবি করা এবং প্রমাণের আগেই প্রতিটি ফলকে অবৈধ বলা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান। প্রথমটি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়; দ্বিতীয়টি প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করলে জনআস্থা আরও ক্ষয় হতে পারে।
সিজেপির সামনে তাই স্বাধীনতা ও সহযোগিতার দ্বৈত প্রশ্ন। বিরোধীদের সমর্থন আন্দোলনকে জনবল, দৃশ্যমানতা ও সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব ও দাবি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর হাতে চলে গেলে তার স্বতন্ত্র আবেদন কমতে পারে। তরুণদের আন্দোলন তখন নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন তোলার বদলে পুরোনো ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে পড়বে।
আবার শুধু সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা ও প্রতিবাদের প্রতীক দিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন চালানো কঠিন। যাচাইযোগ্য অভিযোগ সংগ্রহ, ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারকে সহায়তা, স্পষ্ট কর্মসূচি এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি দরকার। দৃশ্যমান ক্ষোভকে ফলপ্রসূ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে আন্দোলনকে নিজের দাবির প্রমাণও সংগঠিত করতে হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি সহজে বোঝানো যায় এবং প্রতিবাদের একটি স্পষ্ট লক্ষ্য দেয়। কিন্তু ব্যক্তির পরিবর্তনই সব সমস্যার সমাধান নয়। ভোটার যাচাইয়ের নিয়ম, নোটিশ, আপিল, তথ্য প্রকাশ ও ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে নতুন নেতৃত্বের সময়েও একই সংকট তৈরি হতে পারে। আন্দোলনের কার্যকারিতা তাই পদত্যাগের দাবির পাশাপাশি প্রক্রিয়াগত সংস্কার আদায় করার সক্ষমতায় মাপা উচিত।
বর্তমান পরিস্থিতিকে সরকারের পতনের পূর্বাভাস বলা অতিরঞ্জন হবে। আবার একে নিছক অনলাইন ব্যঙ্গ বা বিরোধীদের সাজানো নাটক বলে উড়িয়ে দেওয়াও বিশ্লেষণ নয়। এটি এমন একটি রাজনৈতিক চাপ, যেখানে তরুণদের ক্ষোভ, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা এক জায়গায় এসে মিলেছে।
এই আন্দোলনের পরিণতি নির্ভর করবে তিন পক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। সরকার কি অভিযোগের জবাব তথ্য ও সীমিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দেবে? বিরোধীরা কি যাচাইযোগ্য প্রমাণকে রাজনৈতিক স্লোগানের ওপরে রাখবে? সিজেপি কি নিজের স্বাধীনতা বজায় রেখে প্রতিবাদকে সংগঠিত নাগরিক দাবিতে রূপ দিতে পারবে?
ভারতের গণতান্ত্রিক সক্ষমতার পরীক্ষা এখানেই। সরকার কত দ্রুত রাস্তা খালি করতে পারে, সেটিই শেষ কথা নয়। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্র কীভাবে কথা বলে এবং ভুল হলে কীভাবে তা সংশোধন করে—দীর্ঘমেয়াদে সেটিই রাজনৈতিক বৈধতার আরও কঠিন পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ