কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের চাহিদা বাড়ছে। প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর কাছে এখন ডেটা সেন্টার কেবল সার্ভার রাখার অবকাঠামো নয়; এটি ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল্য যদি দিতে হয় শত শত হেক্টর বন উজাড় করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—ডিজিটাল অগ্রগতির এই পথ কতটা টেকসই?
উত্তর ফিনল্যান্ডের মুহোস এলাকায় গুগলের নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে এমনই এক বিতর্ক সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পটির জন্য ৩০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি পরিষ্কার করা হয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৪২০টি ফুটবল মাঠের সমান। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই এই বিপুল পরিমাণ বন উজাড় করা হয়েছে।
ঘটনাটি এখন ফিনল্যান্ডের তদারকি সংস্থা ফিনিশ সুপারভাইজরি এজেন্সির তদন্তের আওতায়। অভিযোগটি করেছে ফিনিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর নেচার কনজারভেশন। সংগঠনটির দাবি, প্রকল্পটি আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ স্থগিত রাখা উচিত।
ঘটনাস্থলের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে পরিবেশবাদীদের দাবি, এমন কিছু এলাকাতেও গাছ কাটা হয়েছে যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষণের কথা ছিল। সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপারসন হান্না হালমিনপা নির্মাণস্থলের পাশে দাঁড়িয়ে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে মূল প্রশ্নটি স্পষ্ট—একটি প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত সুরক্ষার সীমা কোথায়?
অবশ্য অভিযোগের জবাবে গুগল বলেছে, বন আইনের প্রয়োজনীয়তা মেনেই গাছ কাটার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, জমি বিন্যাস ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুরো এলাকায় বিস্তারিত প্রাকৃতিক জরিপ করা হয়েছিল। মূল্যবান প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও তারা নজর রেখেছে বলে জানিয়েছে গুগল। এখন তারা তদারকি সংস্থার পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।
এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই প্রকল্পটির প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়। এটি কোনো ছোট আকারের প্রযুক্তি স্থাপনা নয়। ইউরোপে গুগলের একক বৃহত্তম বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী দুই বছরে ফিনল্যান্ডে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ইউরো বা ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। মুহোসের পাশাপাশি কাজানি, ভালা এবং হামিনাতেও গুগলের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, গুগলের মতো একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এত বড় বিনিয়োগ ফিনল্যান্ডের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তরটি খুঁজতে গেলে ফিনল্যান্ডের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়। দেশটি সাম্প্রতিক সময়ে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রেকর্ড বেকারত্বের মতো সমস্যার মুখোমুখি। ফলে বড় বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী পেতেরি অর্পোর ডানপন্থি সরকারও ডেটা সেন্টারের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।
মুহোসের মতো ছোট একটি পৌরসভার জন্য বিষয়টি আরও বড়। মাত্র প্রায় ৮ হাজার ৮০০ মানুষের এই এলাকায় বর্তমানে ভারী শিল্পের উপস্থিতি খুবই সীমিত। সেখানে গুগলের মতো একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিশাল বিনিয়োগ স্থানীয় অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। পৌর মেয়র কিম্মো হিনোর ভাষায়, এই বিনিয়োগ পুরো পৌরসভা এবং ওউলু অঞ্চলের চিত্রই বদলে দিতে পারে।
নির্মাণকাজে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আসতে পারেন। তাঁদের জন্য আবাসন, পরিবহন, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধার প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ একটি ডেটা সেন্টার শুধু একটি ভবন তৈরি করে না; এটি একটি ছোট শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের কাছেও বিষয়টি একেবারে একপাক্ষিক নয়। ৩৬ বছর বয়সী কৃষক জোনি পিতকানেন প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক। তাঁর মতে, এত বড় বিনিয়োগ স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য আনতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি জ্বালানি ব্যবহারের প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন।
এখানেই ডেটা সেন্টার নিয়ে ফিনল্যান্ডের বৃহত্তর বিতর্কটি সামনে আসে। আধুনিক ডেটা সেন্টার অত্যন্ত বিদ্যুৎনির্ভর স্থাপনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড সেবার ব্যবহার যত বাড়ছে, সার্ভার ও কুলিং সিস্টেম চালাতে তত বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে একদিকে এসব প্রকল্প নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ফিনল্যান্ডকে ডেটা সেন্টারের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে দেশটির ঠান্ডা জলবায়ু এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও কম কার্বন নির্ভর বিদ্যুৎ সরবরাহ। দেশটিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ, বায়ু ও জলবিদ্যুতের সমন্বয়ে বিদ্যুতের একটি শক্তিশালী উৎস রয়েছে। ঠান্ডা আবহাওয়া ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যয়ও কমাতে সাহায্য করে। এ কারণেই বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ফিনল্যান্ডকে ডেটা অবকাঠামোর জন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে দেখছে।
কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। মাইক্রোসফট ও টিকটকের মতো প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কোম্পানির ডেটা সেন্টার প্রকল্প নিয়ে দেশটিতে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে দেশের জাতীয় গ্রিড এত বিপুল অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদা কতটা সামলাতে পারবে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ভূমি ও বন ব্যবহারের প্রশ্ন। ফিনল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম বনসমৃদ্ধ দেশ। দেশটির প্রকৃতি ও বন শুধু কাঠ বা অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এগুলো জীববৈচিত্র্য, কার্বন শোষণ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে কয়েক শ হেক্টর বন পরিষ্কার করে একটি প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করা হলে সেটি শুধু জমির ব্যবহার পরিবর্তনের ঘটনা থাকে না—এর সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
গুগলের মুহোস প্রকল্পকে ঘিরে তাই বিতর্কটি কেবল ‘গুগল বন কাটল কি না’—এই সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: সবুজ জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া একটি ডিজিটাল অর্থনীতি কি ভূমি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে টেকসই হতে পারে?
ফিনল্যান্ডে এ প্রশ্ন নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর বিধিমালার দাবিতে শুরু হওয়া একটি নাগরিক আবেদনে মাত্র তিন দিনেই ৫০ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। এত বিপুল সমর্থনের ফলে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনায় বসতে হবে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বটে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন—এ বিষয়ে খুব কম মানুষই দ্বিমত করবেন। কিন্তু বিনিয়োগের ধরন, পরিবেশগত মূল্য এবং স্থানীয় জনগণের ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গুগলের মতো কোম্পানির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। একদিকে তারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির কথা বলছে; অন্যদিকে সেই প্রযুক্তি চালানোর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিশাল ডেটা সেন্টার, বিপুল বিদ্যুৎ এবং কখনও কখনও বিপুল পরিমাণ জমি।
এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে আরও বড় হবে বলেই মনে হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার যত দ্রুত ঘটবে, ডেটা সেন্টারের প্রয়োজনও তত বাড়বে। ফলে সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ হবে এমন জায়গা নির্বাচন করা, যেখানে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতিও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
মুহোসের ঘটনাটি সেই ভবিষ্যতের একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। স্থানীয় মেয়রের কাছে এটি অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা, স্থানীয় কৃষকের কাছে একই সঙ্গে সুযোগ ও উদ্বেগ, পরিবেশবাদীদের কাছে এটি আইন ও প্রকৃতি রক্ষার পরীক্ষা, আর গুগলের কাছে এটি ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বিনিয়োগের অংশ।
এই চারটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমন্বয় করাই এখন ফিনল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণ কয়েক বছরের প্রকল্প হতে পারে, কিন্তু একটি বনভূমি হারিয়ে গেলে তার পরিবেশগত প্রভাব বহু দশক পর্যন্ত থেকে যেতে পারে।
ফিনল্যান্ডের সামনে তাই প্রশ্নটি কেবল বিনিয়োগ গ্রহণ করা না করার নয়। বরং প্রশ্ন হলো—কী ধরনের বিনিয়োগ গ্রহণ করা হবে, কী শর্তে তা গ্রহণ করা হবে এবং উন্নয়নের নামে পরিবেশের কতটা মূল্য দিতে হবে।
গুগলের মুহোস প্রকল্প নিয়ে তদন্তের ফলাফল হয়তো সেই প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেবে না। তবে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে সার্ভার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড প্রযুক্তির পাশাপাশি বন, পানি, বিদ্যুৎ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ হয়তো ডেটা সেন্টারে নির্মিত হবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ কতটা সবুজ থাকবে, তার উত্তর নির্ভর করবে আজকের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো প্রকৃতি ও মানুষের জন্য কতটা দায়িত্বশীলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ