একসময় মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি শিক্ষিত হবে, বেশি তথ্য জানবে এবং জটিল সমস্যার সমাধানে আরও দক্ষ হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল স্বাভাবিক। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, মহাকাশ গবেষণা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় অগ্রগতি মানুষের সেই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার এই সাফল্যের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, যা মানুষের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। কয়েকটি উন্নত দেশে তরুণ প্রজন্মের আইকিউ পরীক্ষার স্কোর কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যে ধারায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের পরীক্ষাভিত্তিক বুদ্ধিমত্তার স্কোর বেড়েছিল, কিছু দেশে সেই ধারাই যেন উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কি সত্যিই আগের প্রজন্মের তুলনায় কম বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে? আধুনিক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে? নাকি এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত অবনতি নয়, বরং জীবনযাত্রা ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে পরীক্ষার ফলাফলে দেখা দেওয়া একটি নতুন প্রবণতা? বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এসব প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সময় ধরে মানুষের বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার ফলাফলে একটি ধারাবাহিক উন্নতির প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ, পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ একই ধরনের আইকিউ পরীক্ষায় আগের প্রজন্মের তুলনায় ভালো ফল করছিল। এই প্রবণতার নাম দেওয়া হয় ‘ফ্লিন ইফেক্ট’। নিউজিল্যান্ডের গবেষক জেমস ফ্লিনের নাম অনুসারে এই ধারণার নামকরণ করা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন দেশের আইকিউ পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পরীক্ষাভিত্তিক বুদ্ধিমত্তার স্কোর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
ফ্লিন ইফেক্টকে দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলা হয়। উন্নত পুষ্টি, শিশুর স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, পরিবারের আকার ছোট হওয়া, নগরায়ণ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জটিল তথ্য ও সমস্যার সঙ্গে পরিচিতি বাড়ার মতো বিষয়গুলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা বিকাশে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। আগের প্রজন্মের তুলনায় নতুন প্রজন্মের শিশুরা বিদ্যালয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে, বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের যৌক্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী কাজের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে আইকিউ পরীক্ষায় তাদের ভালো করার প্রবণতাও বেড়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকে কিছু দেশে এই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী *Intelligence*-এ প্রকাশিত গবেষণায় এই পরিবর্তনকে ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’ বা ফ্লিন প্রভাবের বিপরীত প্রবণতা হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো কয়েকটি উন্নত দেশে পরিচালিত গবেষণায় তরুণ প্রজন্মের আইকিউ স্কোর স্থবির হয়ে পড়া কিংবা কিছু ক্ষেত্রে কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব দেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে বিশ্বের অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। যেখানে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা আরও উন্নত হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো প্রবণতা দেখা দেওয়ায় গবেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে বিষয়টিকে সরলভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আইকিউ পরীক্ষার স্কোর এবং মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা এক বিষয় নয়। আইকিউ বা Intelligence Quotient মূলত নির্দিষ্ট কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা পরিমাপের একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সাধারণত যুক্তি প্রয়োগ, স্মৃতিশক্তি, সমস্যা সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ, ভাষাগত দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট ধরনের চিন্তাশক্তি মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু একজন মানুষ কতটা সৃজনশীল, কতটা আবেগীয়ভাবে বুদ্ধিমান, বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতি কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারেন কিংবা নতুন কোনো ধারণা উদ্ভাবনে কতটা সক্ষম—এসব বিষয় আইকিউ পরীক্ষায় পুরোপুরি পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
তাহলে কেন মানুষের আইকিউ স্কোর কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে? গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে আধুনিক জীবনযাত্রার একাধিক পরিবর্তন কাজ করতে পারে। এর মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অন্যতম আলোচিত বিষয়। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং সার্চ ইঞ্জিন মানুষের তথ্য পাওয়ার পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আগে কোনো একটি বিষয় জানতে মানুষকে বই পড়তে হতো, বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো এবং নিজের মতো করে সেগুলো বিশ্লেষণ করতে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইন্টারনেট থেকে অসংখ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাবের ফলে এই প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়েছে। একটি প্রশ্ন করলেই পাওয়া যাচ্ছে সাজানো উত্তর, তৈরি হচ্ছে প্রতিবেদন, এমনকি জটিল সমস্যার সমাধানও করে দিচ্ছে প্রযুক্তি।
তথ্যপ্রাপ্তির এই সহজলভ্যতা নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য বড় সুবিধা। কিন্তু এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—মানুষ কি নিজে চিন্তা করার প্রয়োজন আগের তুলনায় কম অনুভব করছে? কোনো সমস্যার সমাধান নিজে বের করার আগেই যদি ইন্টারনেট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাস কতটা বজায় থাকবে? প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের জায়গা সংকুচিত করতে পারে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে আইকিউ কমে যাওয়ার সরাসরি কারণগত সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারও মানুষের মনোযোগের ধরন পরিবর্তন করছে বলে আলোচনা রয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে মানুষ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট গ্রহণ করছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, দ্রুত পরিবর্তিত দৃশ্য, ছোট ছোট লেখা এবং অবিরাম নোটিফিকেশন মানুষের মনোযোগকে বারবার এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া, কোনো জটিল বিষয় নিয়ে চিন্তা করা কিংবা একটি সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজার অভ্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একটি বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় মনোযোগ দিয়ে পড়ার পরিবর্তে অনেকেই একই সময়ে একাধিক ডিজিটাল কনটেন্ট দেখছেন। একটি বিষয়ে গভীরভাবে জানার পরিবর্তে দ্রুত অনেক বিষয় সম্পর্কে সামান্য তথ্য সংগ্রহ করছেন। এতে তথ্যের পরিমাণ বাড়লেও সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গভীর জ্ঞান তৈরি করার সক্ষমতা কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অবশ্য ডিজিটাল মাধ্যম নিজেই যে মানুষের মনোযোগ নষ্ট করে, এমন সিদ্ধান্তও এককভাবে দেওয়া যায় না। প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, কত সময় ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ব্যবহারকারী কী ধরনের কনটেন্ট গ্রহণ করছেন, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়াকে সম্ভাব্য আরেকটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়া মানুষের ভাষাগত দক্ষতা, স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং বিশ্লেষণী চিন্তাকে সক্রিয় রাখে। একটি বই পড়ার সময় পাঠককে চরিত্র, ঘটনা, যুক্তি ও তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। কোনো জটিল বিষয় বুঝতে গিয়ে আগের তথ্য মনে রাখতে হয় এবং নতুন তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর সংযোগ ঘটাতে হয়। এই প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন।
অন্যদিকে, দ্রুতগতির ডিজিটাল কনটেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয় না। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রেখে পড়াশোনা বা বিশ্লেষণ করার অভ্যাস কতটা বজায় থাকছে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। তবে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়াকে আইকিউ স্কোর হ্রাসের একমাত্র কারণ বলা যাবে না। মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশে পরিবার, শিক্ষা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতি, পরীক্ষার ধরন এবং মূল্যায়নব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখস্থনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, আবার কোথাও পরীক্ষার প্রস্তুতি ও নির্দিষ্ট দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার মান উন্নত হলেও সব শিক্ষার্থী সমানভাবে বিশ্লেষণী চিন্তা, গাণিতিক যুক্তি, ভাষাগত দক্ষতা কিংবা সমস্যা সমাধানের সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে পরীক্ষার ফলাফলে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। তাই আইকিউ স্কোরের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে গেলে শিক্ষার ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
এর বাইরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। একটি শিশুর শৈশবের পরিবেশ তার মস্তিষ্কের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবারের মানসিক সহায়তা শিশুর শেখার ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের অনেক শিশু এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অপুষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা এবং শিক্ষার সীমিত সুযোগ তাদের বিকাশে বাধা তৈরি করতে পারে। ফলে একটি দেশের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
পরিবেশদূষণ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার বিষয়টিও বিজ্ঞানীদের আলোচনায় রয়েছে। বায়ুদূষণ, সিসার মতো বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ, ঘুমের সমস্যা এবং কিছু দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত জটিলতা মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শৈশবে মস্তিষ্কের বিকাশের সময় পরিবেশগত ঝুঁকি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশ যদি দূষিত হয় কিংবা সে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা না পায়, তাহলে তার শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়ে গবেষণায় শুধু প্রযুক্তি বা শিক্ষাব্যবস্থা নয়, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে সব দেশেই যে মানুষের আইকিউ স্কোর কমছে, বিষয়টি এমন নয়। বিভিন্ন দেশের গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও স্কোর স্থিতিশীল রয়েছে, কোথাও আবার উন্নতির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার পরিবর্তন কোনো একক বৈশ্বিক নিয়ম অনুসরণ করছে না। একটি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্যনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে এই পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণার নমুনা, পরীক্ষার পদ্ধতি এবং কোন সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, সেগুলোও ফলাফলের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে বিবর্তনের বিষয়টিও পরিষ্কার করা জরুরি। মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমার প্রবণতাকে সরাসরি জৈবিক বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ বুদ্ধিহীন হয়ে যাচ্ছে বলে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি জৈবিক প্রক্রিয়া, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনসংখ্যার বংশগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে। কয়েক দশকের আইকিউ পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে মানুষের জিনগত বুদ্ধিমত্তা কমে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং গবেষণায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থা এবং পরীক্ষার ধরনসহ নানা বিষয় কাজ করতে পারে।
মানুষের মস্তিষ্কের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর শেখার ও পরিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা। নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, যুক্তি প্রয়োগ, ভাষা চর্চা, সৃজনশীল কাজ এবং নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারে। তাই আইকিউ স্কোরের সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও একে অপরিবর্তনীয় অবনতি হিসেবে দেখার কারণ নেই। বরং এটি শিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আধুনিক জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ধরে রাখার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআই এখন তথ্য বিশ্লেষণ, অনুবাদ, লেখালেখি, গণনা এবং জটিল সমস্যার সমাধানে সহায়তা করছে। চিকিৎসা থেকে শিক্ষা, ব্যবসা থেকে গবেষণা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এআইয়ের দেওয়া উত্তর যাচাই করার ক্ষমতা, ভুল শনাক্ত করা, যুক্তি বিশ্লেষণ করা এবং নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখনো মানুষের ওপরই রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিকে মানুষের চিন্তার বিকল্প না বানিয়ে চিন্তাশক্তি বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাব্যবস্থায়ও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানো নয়, বরং প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে উত্তর খুঁজতে উৎসাহিত করা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা, গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সুষম ব্যবহার শেখানো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি উন্নত দেশে আইকিউ স্কোর স্থবির হওয়া বা কমে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের সামনে জ্ঞানের বিশাল দরজা খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে নিজের চিন্তা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কাজে লাগানোর সক্ষমতা কতটা বাড়ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। মানুষ যত বেশি তথ্য পাচ্ছে, তত বেশি জ্ঞানী হচ্ছে কি না—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি।
সভ্যতার অগ্রগতি শুধু নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার কিংবা তথ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, কতটা যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নতুন সমস্যার সমাধান বের করতে পারে তার ওপরও। তাই প্রযুক্তির যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো আরও বেশি তথ্য সংগ্রহ করা নয়, বরং চিন্তা করার ক্ষমতা ধরে রাখা। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে স্বাভাবিকভাবে ঘটে যাওয়া কোনো নিশ্চিত প্রক্রিয়া হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, সুস্থ পরিবেশ, বই পড়ার অভ্যাস এবং প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহার। মানুষ সত্যিই বুদ্ধিহীন হয়ে যাচ্ছে কি না, তা সময় ও গবেষণাই বলবে। তবে নিজের চিন্তাশক্তিকে প্রযুক্তির হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যে বুদ্ধিমানের কাজ নয়, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম।
আপনার মতামত জানানঃ