একটা স্টুডিও শুধু চারটা দেয়াল, কিছু ক্যামেরা, কম্পিউটার আর আলো দিয়ে তৈরি হয় না। একটা স্টুডিওর ভেতরে জমা থাকে অনেক দিনের পরিশ্রম, স্বপ্ন, ব্যর্থতা, সাফল্য আর অসংখ্য গল্প। তাই ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ইসিবি চত্বরের BrownFish Studio যখন হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হলো, তখন ভাঙা ক্যামেরা আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সরঞ্জামের ছবির আড়ালে আরও বড় একটি গল্প সামনে চলে এলো—সালমান মুক্তাদিরের গল্প।
কারণ সালমান মুক্তাদির কেবল একজন ইউটিউবার নন। বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতি যখন আজকের মতো বিশাল হয়ে ওঠেনি, তখনই তিনি এমন এক প্রজন্মের সামনে হাজির হয়েছিলেন, যারা টেলিভিশনের বাইরে নতুন ধরনের বিনোদন খুঁজছিল। সেই জায়গা থেকে তিনি জনপ্রিয় হয়েছেন, অর্থ উপার্জন করেছেন, ব্যবসা করেছেন, অভিনয় করেছেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে কথা বলেছেন। আবার একই সঙ্গে তাঁর পথ কখনোই বিতর্কমুক্ত ছিল না। তাঁর কিছু কাজ প্রশংসা পেয়েছে, কিছু বক্তব্য তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, কিছু ঘটনায় তাঁকে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। ফলে সালমান মুক্তাদিরকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার গল্প বললে যেমন অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তেমনি শুধু বিতর্কের তালিকা করলেও তাঁর গল্পের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়।
বাংলাদেশের ইউটিউবের শুরুর দিকের যে কনটেন্ট নির্মাতারা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছিলেন, সালমান তাঁদের অন্যতম। ২০১৯ সালে বিতর্কিত ‘অভদ্র প্রেম’ নিয়ে পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। সে সময় তিনি জানান, ভিডিওটি মূলত ভারতীয় দর্শকদের জন্য তৈরি করেছিলেন এবং আলোচনার পর বাংলাদেশে ভিডিওটি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিলেন। ভিডিওটি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অশ্লীলতার’ অভিযোগ উঠেছিল এবং ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছিল। তবে অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়—এই পার্থক্যটি তাঁর গল্প বলতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ‘অভদ্র প্রেম’ ছিল তাঁর প্রথম বা শেষ বিতর্ক নয়। সালমানের ক্যারিয়ারের একটা বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি অনেক সময় এমন জায়গায় কথা বলেছেন, যেখানে অন্যরা নীরব থেকেছেন; আবার সেই একই তাড়াহুড়ো তাঁকে কখনো কখনো সমালোচনার মুখেও ফেলেছে।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সেই সাহসী দিকটি আবার সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান। তিনি এমন শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করার কথা জানান, যারা হামলার শিকার হয়েছিল বা হলে ফিরতে পারছিল না। তাঁর সেই বক্তব্য তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের জন্য এটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানও। কারণ জনপ্রিয়তা যত বড়, প্রকাশ্য অবস্থানের ঝুঁকিও তত বেশি। সালমানের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক ইস্যুতে নিজের মত প্রকাশের কারণে তিনি যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি সমালোচনাও কুড়িয়েছেন।
তাঁর আরেকটি দিক হলো ব্যবসায়ী সালমান। ২০১৮ সালে তিনি GetGoosebumps নামে একটি পোশাকের ব্র্যান্ড চালু করেন। তখন বাংলাদেশের ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডে রূপ দেওয়ার সংস্কৃতি এখনও খুব প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু ব্যবসাটি শুরুতে প্রত্যাশামতো এগোয়নি। নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা কম ছিল এবং একসময় তিনি সেই উদ্যোগ থেকে দূরে সরে যান। পরে ২০২০ সালে ব্যবসাটিকে নতুনভাবে ভাবার চেষ্টা করেন এবং পণ্য, বাজার ও উৎপাদন নিয়ে শেখার কথা বলেন।
এই জায়গাটাই সালমানের চরিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখায়। তিনি শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জনপ্রিয় হতে চাননি; নিজের জনপ্রিয়তাকে ব্যবসা ও সৃষ্টিশীল কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। সফলতা সবসময় এসেছে এমন নয়। কিন্তু চেষ্টা ছিল।
এমনকি ২০২৪ সালে বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তার উদ্দেশ্যে আয়োজিত ‘The Roast of Salman Muqtadir’ অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি তাঁর নিজের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিত্বকে হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছিল এবং সেখানে বন্যাদুর্গতদের সহায়তার বিষয়টিও যুক্ত ছিল।
কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ যতটা আলো পায়, তাঁর ভুলও ততটাই প্রকাশ্যে আসে—বিশেষ করে যখন সেই মানুষটি সোশ্যাল মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন।
২০২৪ সালের একটি ধর্ষণ মামলায় এক কিশোরী গর্ভবতী হওয়ার ঘটনায় সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে DNA পরীক্ষার বিষয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন, যার সময়সীমা নিয়ে পরে ফ্যাক্ট-চেক প্রশ্ন তোলে। Rumor Scanner-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, তখনও DNA পরীক্ষা হয়নি; পরে সন্তান জন্মের পর আদালতের নির্দেশে নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং পরীক্ষায় শিশুটির DNA অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফল একটি নির্দিষ্ট ফল দেখালেও সালমানের আগের বক্তব্যটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা যেমন একজন ইনফ্লুয়েন্সারকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তেমনি যাচাইয়ের আগে মন্তব্য করাও তাঁকে কঠিন সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।
এই জায়গায় সালমানের গল্পটা আরও মানবিক হয়ে ওঠে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ভুল করার সুযোগ খুব কম। একজন সাধারণ মানুষ ভুল কথা বললে হয়তো কয়েকজন মানুষ শুনবে। একজন জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ভুল বললে কয়েক লাখ মানুষ তা দেখতে পারে, শেয়ার করতে পারে, বিশ্বাস করতে পারে। ফলে জনপ্রিয়তার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। সালমানের ক্যারিয়ারে এই দ্বন্দ্ব বারবার দেখা গেছে।
আর এখন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট—BrownFish Studio-তে হামলা।
২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বরের New Gini Properties আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেই স্থাপনার একটি অংশে ভাড়া নিয়ে BrownFish Studio পরিচালনা করতেন সালমান। হামলাকারীরা স্টুডিওতেও ঢুকে ভাঙচুর করে এবং ক্যামেরা, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মামলার এজাহারে প্রায় ৫০ জনের একটি দলের প্রবেশ, গুলিবর্ষণ, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর সালমান নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে তাঁর স্টুডিও ধ্বংসের কথা জানান। তাঁর বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল আকস্মিক এবং ভয়াবহ। তিনি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও তোলেন। কিন্তু তদন্তের শুরুতেই পুলিশের বক্তব্যে ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে। পুলিশ জানায়, স্টুডিওটি হামলার মূল লক্ষ্য ছিল না; বরং New Gini Properties এবং আশপাশের জমির মালিকদের মধ্যে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের একজনকে কথিত মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে ডিবি আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় হামলার পূর্ণ উদ্দেশ্য ও প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনো সময়সাপেক্ষ।
এই জায়গায় সালমান মুক্তাদিরের গল্পটি যেন তাঁর নিজের ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে তাঁর অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত; একদিকে ভেঙে যাওয়া তাঁর স্টুডিও, অন্যদিকে সেই হামলার পেছনে থাকা বৃহত্তর জমি-সংক্রান্ত বিরোধের তদন্ত। অর্থাৎ ঘটনাটি শুধু একজন তারকার ওপর হামলা নয়; বরং এমন একটি ঘটনার অংশ, যার পুরো সত্য এখনও তদন্তের ভেতরে।
তবু সাধারণ মানুষের চোখে যে ছবিটা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে, সেটা হলো—একজন পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্বপ্নের জায়গা ভাঙচুর হয়ে পড়ে আছে।
সালমানকে নিয়ে মানুষের মতভেদ আছে। কেউ তাঁকে সাহসী মনে করেন। কেউ মনে করেন তিনি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ। কেউ তাঁর সামাজিক অবস্থানের প্রশংসা করেন। কেউ তাঁর পুরোনো কনটেন্ট ও বক্তব্যের সমালোচনা করেন। কেউ তাঁকে বাংলাদেশের ইউটিউব সংস্কৃতির পথিকৃৎদের একজন হিসেবে দেখেন। আবার কেউ মনে করেন, জনপ্রিয়তার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ববোধ সবসময় একই গতিতে বাড়েনি।
এই সবগুলো কথার মধ্যেই হয়তো সত্যের কিছু অংশ আছে। কারণ কোনো পাবলিক ফিগারই শুধু তাঁর ভালো কাজ দিয়ে তৈরি হন না, আবার শুধু তাঁর ভুল দিয়েও তাঁকে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
সালমান মুক্তাদিরের গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা সম্ভবত তাঁর ওঠানামা। তিনি জনপ্রিয় হয়েছেন, বিতর্কে পড়েছেন, ব্যবসায় ব্যর্থ হয়েছেন, আবার নতুনভাবে শুরু করার চেষ্টা করেছেন। তিনি সামাজিক ইস্যুতে কথা বলেছেন, আবার সেই কথার জন্য সমালোচিতও হয়েছেন। তাঁর কিছু বক্তব্য মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছে, কিছু বক্তব্য তাঁকেই পরে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এবং শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি সময়ে এসে দাঁড়িয়েছেন, যখন তাঁর নিজের তৈরি জায়গাটিই ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরা একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাছে শুধু একটি যন্ত্র নয়। ক্যামেরার সামনে বসেই তিনি নিজের পরিচয় তৈরি করেন। একটি কম্পিউটার শুধু কম্পিউটার নয়—সেখানে থাকে অসংখ্য ঘণ্টার কাজ, ফুটেজ, পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ কনটেন্ট। একটি স্টুডিও শুধু একটি অফিস নয়—সেটা একজন নির্মাতার সৃষ্টিশীল ঘর।
সেই ঘর যখন ভাঙা পড়ে থাকে, তখন ক্ষতিটা কেবল টাকার হিসাব দিয়ে মাপা যায় না।
তবে এই গল্পের শেষ এখনো লেখা হয়নি।
সালমান মুক্তাদিরকে নিয়ে মানুষের বিচার একেক রকম হতে পারে। তাঁর ভালো কাজগুলো যেমন মনে রাখা দরকার, তেমনি তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও ভুলগুলোকেও প্রশ্নের বাইরে রাখা উচিত নয়। একজন জনপ্রিয় মানুষকে ভালোবাসা মানে তাঁর সব কাজকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। আবার তাঁর ভুলের কারণে তাঁর প্রতিটি ভালো কাজকেও অস্বীকার করা ন্যায্য নয়।
সম্ভবত সালমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় এটাই—তিনি নিখুঁত নন। তিনি আলো এবং ছায়া—দুটো নিয়েই তৈরি একজন পাবলিক ফিগার।
আর আজ, যখন তাঁর BrownFish Studio-র ভাঙা ক্যামেরা আর এলোমেলো সরঞ্জামের ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন প্রশ্নটা শুধু ‘কারা হামলা করল?’—এতেই থেমে থাকে না। প্রশ্নটা আরও ব্যক্তিগত।
যে মানুষটি বছরের পর বছর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গল্প বলেছেন, সেই মানুষটি এবার ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কী গল্প বলেন?
হয়তো সেটাই হবে সালমান মুক্তাদিরের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়।
কারণ জনপ্রিয়তা মানুষকে আলোয় নিয়ে আসে। বিতর্ক তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ভুল তাকে শেখায়। আর কখনো কখনো ধ্বংস মানুষকে বাধ্য করে—আবার শূন্য থেকে শুরু করতে।
BrownFish Studio-র ভাঙা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে সালমানের গল্প তাই এখনো শেষ হয়নি। বরং হয়তো নতুন করে শুরু হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
আপনার মতামত জানানঃ