বাংলাদেশের আটটি পোশাক কারখানায় ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত তাপ গড়ে বার্ষিক আয়ের ৪.১ শতাংশ মুছে দিচ্ছে। অথচ প্রতিফলক রং, ছাদ নিরোধক ও উন্নত বায়ুপ্রবাহের মতো ব্যবস্থার খরচ চার বছরের মধ্যেই উঠে আসতে পারে। তারপরও শ্রমিকের শরীর কেন বৈশ্বিক পোশাক ব্যবসার সবচেয়ে সস্তা ‘কুলিং সিস্টেম’ হয়ে আছে?
ঢাকার আশপাশের কোনো পোশাক কারখানায় দুপুর গড়ালে বাইরের তাপমাত্রা আর ভেতরের তাপমাত্রা এক থাকে না। টিন বা কংক্রিটের ছাদ সারাদিন সূর্যের তাপ শোষণ করে। সারি সারি সেলাই মেশিন, আলো, মোটর, ইস্ত্রি ও মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া তাপ ঘরের মধ্যে জমতে থাকে। জানালা বা সাধারণ ফ্যান থাকলেও অনেক ফ্লোরে সেই গরম বাতাসই কেবল ঘুরে বেড়ায়। বিশেষ করে ইস্ত্রি ও ফিনিশিং বিভাগে কাজ করা শ্রমিকের কাছে কর্মক্ষেত্র তখন উৎপাদনের জায়গা নয়, সহনশীলতার পরীক্ষা।
এই বাস্তবতা নতুন নয়। নতুন হলো এর অর্থনৈতিক হিসাব। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ঢাকার আটটি পোশাক কারখানায় ছয় মাস ধরে তাপমাত্রা পরিমাপ ও উৎপাদন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের হিসাবে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে কারখানাগুলোর বার্ষিক আয়ের গড়ে ৪.১ শতাংশ হারিয়ে গেছে। একই গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদে সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করে এমন রং, ছাদে নিরোধক এবং উন্নত বায়ুপ্রবাহের ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাণিজ্যিকভাবেই লাভজনক; খরচ চার বছরের মধ্যে উঠে আসতে পারে।
প্রশ্নটি তাই আর শুধু মানবিক নয়। শ্রমিককে অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশ দেওয়া যদি জীবন রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ও আয়ও বাড়ায়, তবে বিনিয়োগ হচ্ছে না কেন?
শ্রমিকের শরীর দিয়ে যে ক্ষতি শোষণ করা হয়
তাপজনিত অসুস্থতা মানেই কেবল হিটস্ট্রোক নয়। দীর্ঘ সময় গরমে কাজ করলে পানিশূন্যতা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, পেশিতে টান, ক্লান্তি, বমি বমি ভাব এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়। গুরুতর অবস্থায় কিডনির ক্ষতি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা প্রাণহানিও ঘটতে পারে। শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা যুক্ত হলে ঘাম শরীরকে কার্যকরভাবে ঠান্ডা করতে পারে না। ফলে বাইরের তাপমাত্রা খুব চরম না দেখালেও কর্মীর শরীর বিপজ্জনক তাপচাপের মধ্যে পড়তে পারে।
সেলাইয়ের কাজকে বাইরে থেকে বসে করার কাজ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে দ্রুত কাজ, নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের চাপ, বিরতি নেওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং গরম ফ্লোর—সব মিলিয়ে শরীর ও মস্তিষ্ক দুটিই ক্লান্ত হয়। ভুল বাড়ে, গতি কমে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। একজন শ্রমিক হয়তো অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান, অনুপস্থিত থাকেন বা চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু এসবের বড় অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবে ‘তাপজনিত ক্ষতি’ হিসেবে ধরা পড়ে না। ক্ষতিটিকে ব্যক্তির দুর্বলতা, কম দক্ষতা বা অনুপস্থিতি হিসেবে দেখানো সহজ হয়।
নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বোঝাটি আরও জটিল। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উৎপাদন লাইনের বড় অংশ নারী হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তদারকির স্তর মূলত পুরুষনিয়ন্ত্রিত। মাসিক, গর্ভাবস্থা, পানি ও শৌচাগারে প্রবেশের প্রয়োজন কিংবা বাড়িতে যত্নের অতিরিক্ত দায়িত্ব—এসব কারণে তাপের প্রভাব নারী শ্রমিকের জীবনে আলাদা মাত্রা পায়। উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ না হলে মৌখিক অপমান বা হয়রানির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অর্থাৎ তাপ কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বিদ্যমান ক্ষমতার অসমতাকেও তীব্র করে।
চার বছরের হিসাবও কেন যথেষ্ট নয়
একজন কারখানামালিকের দৃষ্টিতে চার বছরে বিনিয়োগ উঠে আসা আকর্ষণীয় মনে হওয়ার কথা। কিন্তু পোশাক সরবরাহব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত কেবল কারখানার হাতে নেই। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অর্ডারের দাম, সরবরাহের সময় এবং মান নির্ধারণ করে। অনেক সময় তারা পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কম কার্বন নিঃসরণ ও শ্রমিক সুরক্ষার দাবি জানালেও ক্রয়মূল্যে সেই অতিরিক্ত খরচের যথেষ্ট জায়গা রাখে না। ফলে সরবরাহকারীকে একই সঙ্গে কম দামে পণ্য দিতে, দ্রুত সরবরাহ করতে এবং নতুন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে বলা হয়।
এখানেই চার বছরের ‘পেব্যাক’ হিসাবের সীমা। গবেষণায় গড় ফল পাওয়া গেলেও সব কারখানার ভবন, ছাদ, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও অর্থায়নের সুযোগ এক নয়। বড় ও সরাসরি রপ্তানিকারক কারখানা ঋণ বা নিজস্ব অর্থে বিনিয়োগ করতে পারলেও ছোট উপঠিকাদার কারখানার পক্ষে তা কঠিন। আবার কোনো ব্র্যান্ড যদি এক বা দুই মৌসুম পর সরবরাহকারী বদলে ফেলে, তবে চার বছরের বিনিয়োগের ঝুঁকি কারখানার ওপরই থেকে যায়।
তাই গবেষকেরা ব্র্যান্ডগুলোকেও খরচ ভাগ করে নিতে বলেছেন। এর অর্থ সরাসরি অনুদানই হতে হবে, এমন নয়। দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি, ন্যায্য মূল্য, স্বল্পসুদের অর্থায়ন, কুলিং বিনিয়োগের জন্য পৃথক মূল্য-প্রিমিয়াম কিংবা যৌথ তহবিল—বিভিন্ন পথ থাকতে পারে। মূল নীতি হওয়া উচিত: যে বৈশ্বিক ব্যবসা বাংলাদেশের সস্তা উৎপাদন থেকে লাভ করে, জলবায়ু অভিযোজনের খরচও তাকে বহন করতে হবে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণই একমাত্র উত্তর নয়
কারখানা ঠান্ডা করার কথা উঠলেই এয়ার কন্ডিশনারের কথা মনে আসে। কিন্তু হাজার শ্রমিকের বড় উৎপাদন ফ্লোরে সর্বত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যয়বহুল এবং বিদ্যুৎনির্ভর। বিদ্যুতের বড় অংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এলে একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে অন্য সমস্যাকে তীব্র করা হতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ পড়বে।
সেজন্য প্রথম ধাপে তুলনামূলক কম খরচের ‘প্যাসিভ কুলিং’ গুরুত্বপূর্ণ। সাদা বা প্রতিফলক ছাদ সূর্যের তাপ শোষণ কমাতে পারে; ছাদের নিরোধক ভেতরে তাপ ঢোকা ধীর করে; ক্রস-ভেন্টিলেশন ও দক্ষ এক্সহস্ট গরম বাতাস বের করে; যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন লাইন পুনর্বিন্যাস তাপের উৎস থেকে শ্রমিককে দূরে রাখতে পারে। গাছ, ছায়া, বায়ু চলাচলের পথ এবং রাতের ঠান্ডা বাতাস ব্যবহারের পরিকল্পনাও ভবনের নকশায় যুক্ত করা যায়। যেখানে এগুলো যথেষ্ট নয়, সেখানে দক্ষ ও কম-কার্বন যান্ত্রিক কুলিং প্রয়োজন হবে।
কিন্তু ভবন বদলালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিরাপদ পানীয় জল, ইলেকট্রোলাইট, নিয়মিত বিশ্রাম, ঠান্ডা বিশ্রামকক্ষ, কাজের গতি সাময়িক কমানো, নতুন কর্মীর জন্য তাপে অভ্যস্ত হওয়ার সময় এবং উপসর্গ দেখা দিলে শাস্তি ছাড়া কাজ থামানোর অধিকার—এসবই তাপ কর্মপরিকল্পনার অংশ। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা একসঙ্গে মাপতে হবে; কেবল মোবাইল ফোনের আবহাওয়া অ্যাপ বা বাইরের তাপমাত্রা দিয়ে কারখানার ঝুঁকি বোঝা যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রমিকের কথা শোনা। কোন ফ্লোরে কখন গরম সবচেয়ে বেশি, পানি নিতে গেলে উৎপাদনের লক্ষ্যে সমস্যা হয় কি না, গর্ভবতী বা অসুস্থ কর্মীর জন্য কী ব্যবস্থা আছে—এই তথ্য ব্যবস্থাপনা দপ্তরের চেয়ে শ্রমিকেরা ভালো জানেন। কিন্তু অভিযোগ করলে মজুরি, উপস্থিতি বোনাস বা চাকরি হারানোর ভয় থাকলে সত্যিকারের ঝুঁকি কখনো নথিভুক্ত হবে না।
স্বেচ্ছাসেবী নীতি নয়, প্রয়োগযোগ্য মানদণ্ড
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার নির্দেশনা কর্মক্ষেত্রে তাপ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেয়। বাংলাদেশের শ্রম আইন ও ভবননিরাপত্তা ব্যবস্থায় বায়ু চলাচল ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিধান থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে তাপের জন্য আরও নির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য এবং প্রয়োগযোগ্য মান দরকার।
প্রথমত, পোশাক কারখানায় নিয়মিত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও তাপচাপ পরিমাপ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকির স্তর অনুযায়ী পানি, বিশ্রাম ও কাজের গতি সমন্বয়ের নিয়ম থাকতে হবে। তৃতীয়ত, তাপজনিত অসুস্থতা ও অনুপস্থিতির তথ্য প্রকাশ করতে হবে—তবে কোনো শ্রমিককে চিহ্নিত না করে। চতুর্থত, পরিদর্শনের ফল ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের কাছেও দৃশ্যমান করতে হবে। পঞ্চমত, অতিরিক্ত গরমে কাজ বন্ধ বা ধীর করার কারণে শ্রমিক যেন মজুরি বা চাকরি না হারান, সেই সুরক্ষা দিতে হবে।
শুধু কারখানার ওপর দায় চাপালেও সমাধান অসম্পূর্ণ থাকবে। সরকার মান নির্ধারণ ও প্রয়োগ করবে; কারখানামালিক অবকাঠামো ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন; ব্র্যান্ড ন্যায্য ক্রয়মূল্য ও অর্থায়ন দেবে; ব্যাংক সবুজ ও তাপ-সহনশীল কারখানার জন্য সাশ্রয়ী ঋণ দেবে; আর ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এই দায়িত্বের শৃঙ্খলে কোনো একটি পক্ষ বাদ পড়লে খরচ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের শরীরেই এসে পড়ে।
রপ্তানি প্রতিযোগিতার নতুন সংজ্ঞা
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন কম মজুরি, বিপুল শ্রমশক্তি ও দ্রুত সরবরাহের ওপর প্রতিযোগিতা করেছে। কিন্তু উষ্ণ পৃথিবীতে একটি কারখানার প্রতিযোগিতার ক্ষমতা নির্ধারণ করবে সেটি কত কম দামে পোশাক বানায়—শুধু তা নয়; কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন চালাতে পারে, শ্রমিক ধরে রাখতে পারে এবং জলবায়ু ঝুঁকি সামলাতে পারে, সেটিও।
কর্নেল–আইএফসি–বেটার ওয়ার্কের আগের গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছিল, অভিযোজন না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের পোশাকশিল্প সম্মিলিতভাবে সম্ভাব্য রপ্তানি আয়ের ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার হারাতে পারে এবং দশ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না-ও হতে পারে। ২০৫০ সালে এই চার দেশে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান ৮৬ লাখ ৪০ হাজার পর্যন্ত কম হতে পারে। এগুলো ভবিষ্যদ্বাণীর নিশ্চয়তা নয়; বর্তমান পথে চললে ঝুঁকির মাত্রা বোঝানোর দৃশ্যপট। তবু বার্তাটি স্পষ্ট—তাপ অভিযোজনকে ‘অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স খরচ’ ভাবার সময় শেষ।
রানা প্লাজা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে শিখিয়েছিল, ভবনের দৃশ্যমান ফাটল উপেক্ষা করার মূল্য ভয়াবহ। জলবায়ুজনিত তাপের ফাটল চোখে দেখা যায় না। তা দেখা যায় শ্রমিকের ক্লান্তিতে, উৎপাদন কমে যাওয়ায়, ভুলে, অসুস্থতায় এবং চাকরি ছাড়ায়। এই অদৃশ্য সংকেতগুলোকে উপেক্ষা করা হলে পরবর্তী বিপর্যয় কোনো এক দিনের ধসের মতো নাও হতে পারে; সেটি ধীরে ধীরে মানুষের শরীর, পরিবারের আয় এবং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ক্ষয় করবে।
কারখানা ঠান্ডা রাখার বিনিয়োগ চার বছরে উঠে আসতে পারে—এটি আশাবাদের খবর। একই সঙ্গে এটি অস্বস্তিকর এক প্রশ্নও তোলে। যে ব্যবস্থা শ্রমিকের জীবন রক্ষা করে এবং ব্যবসার আয় বাড়ায়, সেটিও যদি বাস্তবায়িত না হয়, তবে বাধা প্রযুক্তি বা অর্থনীতি নয়; বাধা হলো কে আগে টাকা দেবে এবং কার কষ্টকে কতটা মূল্যবান বলে ধরা হবে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পরবর্তী সংস্কার তাই শুধু ভবন ঠান্ডা করার প্রকল্প নয়। এটি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় শ্রমিকের শরীরকে আর বিনা মূল্যের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার না করার রাজনৈতিক ও নৈতিক অঙ্গীকার।
আপনার মতামত জানানঃ