একটি শহর কেবল তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে নিরাপদ হয়ে ওঠে না। মানুষের নির্বিঘ্নে চলাফেরা, নিজের সম্পদের ওপর অধিকার, কর্মস্থলে নিশ্চিন্তে যাওয়া এবং দিন শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তাই একটি শহরের প্রকৃত নিরাপত্তার পরিচয়। অথচ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলা ও হত্যার মতো অপরাধের খবর জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জমি দখলের বিরোধে দলবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, অস্ত্রের মহড়া কিংবা সামান্য একটি মুঠোফোন ছিনিয়ে নিতে কিশোরকে হত্যা—এসব ঘটনা নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরও গভীর করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গত ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর ও ইসিবি চত্বর এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, দখল ও লুটপাটের একাধিক ঘটনা ঘটে। কোথাও শত শত মানুষের উপস্থিতিতে একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবাসন প্রকল্পে হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়েছে। আবার কোথাও জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একদিকে যেমন সংঘবদ্ধ অপরাধের চিত্র সামনে এসেছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। মানবজমিনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে ১৬০টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ১৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি, মার্চে ২২টি, এপ্রিলে ১৬টি, মে মাসে ১৮টি, জুনে ২৩টি, জুলাইয়ে ৩০টি এবং আগস্টে ২টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৯৯টি। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে রাজধানীতে মোট ৫২৩টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬৪টি।
তবে শুধু মামলা সংখ্যার ভিত্তিতে অপরাধের প্রকৃত প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর আগ্রহ, পুলিশের কাছে অভিযোগ পৌঁছানোর সুযোগ, অপরাধের সংজ্ঞা ও নথিভুক্তির প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। তারপরও এসব পরিসংখ্যান রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যাও উদ্বেগের বিষয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতে মোট ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৪৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৫৮টি, এপ্রিলে ৭১টি, মে মাসে ৬৫টি, জুনে ৪৭টি, জুলাইয়ে ৪৯টি এবং আগস্টে ৬৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর প্রায় ৮৫ শতাংশে চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তুলনায়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের মামলা হয়েছিল ৪১৯টি।
চাঁদাবাজি কেবল আর্থিক অপরাধ নয়; এটি ব্যক্তি, ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করে। ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যবসায়ী, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান কিংবা আবাসন খাতের উদ্যোক্তা—বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করে। কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা কিংবা প্রাণনাশের হুমকির আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফলে অপরাধের প্রভাব শুধু সরাসরি ভুক্তভোগীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর বিস্তার ঘটে পুরো সমাজে।
রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রোপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলার ঘটনা এই বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাঁচটি পিকআপে করে আসা একদল দুর্বৃত্ত প্রকল্পটিতে প্রবেশ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ভেতরে ঢুকে ৬ থেকে ৭টি স্থাপনা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর করে। পরে নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এ ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ঘটনাটির পেছনে জমিসংক্রান্ত বিরোধের কথা উঠে এসেছে। নিউগিনি প্রোপার্টিজের মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিনের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিনসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আদালতে প্রমাণের আগে কারও দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের সমাজে নতুন নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত বিরোধ যখন দলবদ্ধ হামলা, অস্ত্রের ব্যবহার কিংবা স্থাপনা ধ্বংসের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা আর নিছক মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ থাকে না। এটি জননিরাপত্তার বিষয় হয়ে ওঠে। সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালত ও আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে প্রভাব, জনবল কিংবা অস্ত্রের শক্তি প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হলে আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনাও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েকশ মানুষ দেশীয় অস্ত্র ও এক্সকাভেটর নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভবনে হামলা চালায়। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্যে বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও হামলার নির্দেশদাতা বা ইন্ধনদাতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ধ্বংসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমির মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ থাকলে তার সমাধান আইনগত প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। কিন্তু হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষও।
একই দিনে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে কয়েকশ মানুষের হামলার ঘটনা ঘটে। ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে সংঘটিত এ ঘটনায় স্থাপনা ও হাউজিং অফিস ভাঙচুরের পাশাপাশি নগদ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি বিট পুলিশিং অফিসের সামনে ঘটলেও সে সময় পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। পরে এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের উপস্থিতি বা নিকটবর্তী অবস্থান সত্ত্বেও এমন ঘটনা ঘটার অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অপরাধের এই চিত্র শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। কুমিল্লার কোটবাড়ীতে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনাটি তার নির্মম উদাহরণ। ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাইফুল তাকে পরিকল্পিতভাবে জঙ্গলে নিয়ে যায়। ফোন নেওয়ার সময় বাধা দিলে সাইফুল ও দুই কিশোর বাঁশের লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করে। পরে ফোনটি নিয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মাত্র একটি মুঠোফোনের জন্য একটি শিশুর প্রাণ হারানোর ঘটনা অপরাধের ভয়াবহতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক যোগাযোগ, অপরাধী চক্রের প্রভাব, অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাবের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীরা যখন অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ দেখে, তখন তাদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবের অপব্যবহার অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে বলে তাঁদের বক্তব্য। কিছু ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা জরুরি।
রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের দায় থেকে কাউকে অব্যাহতি দিতে পারে না—এমন নীতিগত অবস্থান আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যে পরিচয়েরই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোরও উচিত নিজ নিজ সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান নেওয়া।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। মিরপুরের ঘটনায় কোনো সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের এই বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা নির্ভর করবে তদন্তের স্বচ্ছতা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা এবং জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে ও দ্রুত আইন প্রয়োগ করতে পারে না। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কেবল অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অপরাধের উৎস শনাক্ত করা, সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রদানও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জমি দখল ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়, যদিও আইন প্রয়োগের প্রধান দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই বর্তায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। তবে নাগরিক উদ্যোগ যেন কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে অপরাধের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি এলাকায় সংঘটিত সহিংসতা অন্য এলাকার মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। সন্ধ্যার পর চলাচল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, জমি বা বাড়ির নিরাপত্তা এবং সন্তানদের বাইরে যাওয়া নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং নগরজীবনের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন জনআস্থা পুনর্গঠন। পুলিশি সেবা সহজলভ্য করা, অভিযোগ গ্রহণে হয়রানি বন্ধ করা, তদন্তের মান উন্নত করা এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরলে পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি হতে পারে।
দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের খবর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করেছে। মানুষ এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে সম্পত্তির বিরোধ আদালতে নিষ্পত্তি হবে, ব্যবসা পরিচালনায় চাঁদার ভয় থাকবে না এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না।
একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার জন্য অপরাধের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন অপরাধের পেছনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, আইনের প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হতে পারে সেই পথের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কারণ নিরাপত্তা কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের অধিকার নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক প্রত্যাশা।
আপনার মতামত জানানঃ