আপনার প্রশ্নের মূল জায়গাটা হলো—শেখ হাসিনার বিচার, দণ্ড বা বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়; কিন্তু তিনি বর্তমানে ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করায় তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তে ভারতেরও আইনি ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যকে তাই “হাসিনার ভাগ্য ঠিক করবে ভারত” হিসেবে পড়ার চেয়ে “প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা দরকার”—এই অর্থে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নিচে প্রায় ১,৫০০ শব্দের ফিচারটি দিলাম—কোনো সাবহেডিং ছাড়া।
শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারত কেন সিদ্ধান্ত দেবে? বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত প্রসঙ্গ কেন
শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। নিউ ইয়র্কে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে বাংলাদেশ ও ভারত শেখ হাসিনার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে কী হওয়া উচিত—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়নি।
এখানেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে—শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারত কেন সিদ্ধান্ত নেবে? তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। তাহলে তাঁর কী হবে, সেটি বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা নয় কি?
এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমটি হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারিক ও আইনগত সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়টি হলো তাঁকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। এই দুই বিষয় এক নয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার, অভিযোগ, রায় এবং বাংলাদেশের আইনের অধীনে পরবর্তী পদক্ষেপ—এসব বাংলাদেশের নিজস্ব বিচারিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিষয়। কিন্তু একজন ব্যক্তি যদি অন্য একটি দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করেন, তাহলে তাঁকে জোর করে সেই দেশ থেকে নিয়ে আসা যায় না। তাঁকে ফেরত পাঠানোর জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, সেটিই মূলত প্রত্যর্পণ বা extradition। আর প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে যে দেশটির ভূখণ্ডে ওই ব্যক্তি অবস্থান করছেন, সেই দেশের আইন, আদালত ও সরকারের ভূমিকা তৈরি হয়।
শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থানই এখানে মূল বিষয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে। ভারতও বিষয়টি গ্রহণ করেছে এবং জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ বিষয়ে একাধিকবার বলেছেন, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, এখানে ভারতকে শেখ হাসিনার বিচার করার অধিকার দেওয়া হচ্ছে না। বরং প্রশ্নটি হলো—ভারতের ভূখণ্ডে থাকা একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের নিজস্ব আইন ও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি কী বলে?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একই বছরের ২৩ অক্টোবর চুক্তিটি কার্যকর হয়। ভারতের সরকারি নথিতেও বলা হয়েছে, এই চুক্তির উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে অপরাধ দমনে সহযোগিতা বাড়ানো এবং অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা করা।
চুক্তির অর্থ দাঁড়ায়—বাংলাদেশ চাইলে ভারতে অবস্থানরত কোনো অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করতে পারে। আবার ভারত সেই অনুরোধ পাওয়ার পর নিজের আইন ও চুক্তির শর্ত পরীক্ষা করবে। তাই বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে—এটি বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাঁকে ভারত থেকে বাস্তবে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নে ভারতের সম্মতি ও আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
এখানেই ‘বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত’ এবং ‘ভারতের সিদ্ধান্ত’—এই দুইয়ের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, বাংলাদেশের কোনো আদালত কোনো ব্যক্তিকে দণ্ড দিয়েছে। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি যুক্তরাজ্য, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশে অবস্থান করেন, বাংলাদেশের আদালতের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দেশের পুলিশকে তাকে ধরে বাংলাদেশে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারে না। বাংলাদেশকে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন করতে হয়। এরপর সেই দেশের আইন ও চুক্তি অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি এগোয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব প্রত্যর্পণ আইনেও একই ধরনের কাঠামো দেখা যায়। ১৯৭৪ সালের Extradition Act-এ বিদেশে থাকা কোনো অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। আইনে ‘extradition treaty’ বলতে বাংলাদেশ ও বিদেশি রাষ্ট্রের মধ্যে এমন চুক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন বলল বাংলাদেশ ও ভারত মিলে সিদ্ধান্ত নেবে?
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের কূটনৈতিক ভাষাটিও বুঝতে হবে। মার্কিন কর্মকর্তা বলেননি যে শেখ হাসিনার বিচার কীভাবে হবে, বাংলাদেশ তা ঠিক করতে পারবে না। বরং তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনার উপস্থিতি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আশা করে দুই দেশ আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে। একই ব্রিফিংয়ে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে যে শেখ হাসিনার বিষয়ে তারা কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
অর্থাৎ বক্তব্যটির কেন্দ্রবিন্দু সম্ভবত বিচার নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি কেবল আইনি নয়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও দেখছে। আগস্টে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি তোলা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ভারতকে প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এরপর সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেন, ভারতে থাকা শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ অন্য পলাতক ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এতে বোঝা যায়, ঢাকার দৃষ্টিতে এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে ফেরত আনার প্রশ্ন নয়; ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি বড় দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে দিল্লির অবস্থান এখন পর্যন্ত হচ্ছে—বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা পরীক্ষা করছে এবং বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচিত হবে। অর্থাৎ ভারতও এটিকে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করছে না।
প্রত্যর্পণ চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ গেলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না। চুক্তিতে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। চুক্তির বিভিন্ন ধারায় রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রে বিচার হওয়ার সম্ভাবনা এবং কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণ না করার বিধান রয়েছে।
এখানেই ভারতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বাংলাদেশ তার আদালতের রায় ও প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে বলবে—কেন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন। ভারত এরপর দেখবে সেই অনুরোধ চুক্তির শর্ত পূরণ করছে কি না এবং ভারতের প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত শেখ হাসিনার বিচার করবে। আবার এর অর্থ এটিও নয় যে বাংলাদেশ চাইলে ভারতকে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁকে হস্তান্তর করতেই হবে। বিষয়টি দুই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে এগোয়।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাংলাদেশ ও ভারত মিলে সিদ্ধান্ত নেবে’ কথাটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সরল ভাষায় বললে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারিক সিদ্ধান্তের অংশীদার ভারত নয়। কিন্তু তাঁকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে ভারতকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। কারণ ব্যক্তিটি বর্তমানে ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন।
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া প্রায়ই আলাদা হয়ে যায়। একটি দেশ নিজের আদালতে রায় দিতে পারে, কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি বিদেশে থাকে, তখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক যোগাযোগ, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের আইনি সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও মূল জটিলতা এখানেই। বাংলাদেশ বলছে, তিনি বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে দিতে হবে। ভারত বলছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের নির্ধারিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই ইস্যুটি দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং তারা চায় ঢাকা ও দিল্লি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাক।
তাই ‘হাসিনার বিষয়ে ভারত কেন সিদ্ধান্ত দেবে’—এই প্রশ্নের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: ভারত শেখ হাসিনার বিচার বা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আইনগত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে না; কিন্তু ভারত থেকে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়া হবে কি না, সেই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় ভারতের সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।
আর ‘যুক্তরাষ্ট্র কেন বলল বাংলাদেশ ও ভারত মিলে সিদ্ধান্ত নেবে’—এর উত্তর হলো, ওয়াশিংটন বিষয়টিকে মূলত একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বলেছে, তারা শেখ হাসিনার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছাক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচার, রায় এবং তাঁর ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান নির্ধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও বিচারিক কাঠামোর বিষয়। ভারতের ভূমিকা মূলত সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত—বিশেষ করে যখন তাঁকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনার প্রশ্ন আসে।
অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে বাংলাদেশকে নিজের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ভারতের অনুমতি নিতে হবে। বরং বাস্তবতা হলো, একজন ব্যক্তিকে এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে ফেরত পাঠানো একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। সেখানে যে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ব্যক্তি অবস্থান করছেন, সেই রাষ্ট্রের আইন ও সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই পার্থক্যটি না বুঝলে মার্কিন বক্তব্যকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রশ্ন হিসেবে দেখা সহজ। কিন্তু বক্তব্যটির বাস্তব কূটনৈতিক অর্থ হলো—বাংলাদেশের দাবি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন, আর সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিষয়ে তিনটি স্তর আলাদা করে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়: প্রথমত, বাংলাদেশের আদালত ও আইন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কী ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিচ্ছে; এবং তৃতীয়ত, ভারত তার ভূখণ্ডে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজস্ব আইন, চুক্তি ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী কী সিদ্ধান্ত নেয়।
এই তিনটি স্তরকে এক করে ফেললেই মনে হয় ভারত বাংলাদেশের বিচারিক সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছে। বাস্তবে প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে; এখন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে ভারতীয় ভূখণ্ড ও ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার কারণেই ওয়াশিংটন বিষয়টিকে বাংলাদেশ-ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিষয় হিসেবে দেখছে।
আপনার মতামত জানানঃ