বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কথিত ফোনালাপকে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের আবহে এই ফোনালাপ হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি উঠেছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া খবরে বলা হচ্ছে, নয়াদিল্লিতে অবস্থানকালে পুতিন প্রায় ২০ মিনিট শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এমনকি ওই সময় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ফোনালাপের খবর এখনো ভারত সরকার, রাশিয়া কিংবা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জল্পনার জায়গাতেই অবস্থান করছে।
তবুও এই খবরকে ঘিরে এত আলোচনা কেন? এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, শেখ হাসিনার শাসনামলে মস্কোর সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পকে ঘিরে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সেটি এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে পুতিন ও হাসিনার মধ্যে সত্যিই কোনো ফোনালাপ হয়ে থাকলে, তা শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান, রাশিয়ার বিনিয়োগ, ভারতের ভূমিকা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির নানা প্রশ্ন জড়িয়ে যেতে পারে।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার শাসনামলের শেষদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এরপর থেকেই শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ব্রিকস সম্মেলনের সময় কয়েকজন রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি উঠলেও এসব তথ্যের স্বাধীন ও সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ থাকায় এমন ফোনালাপের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
শেখ হাসিনার সঙ্গে পুতিনের যোগাযোগের খবরটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে মূলত রাশিয়া ও বাংলাদেশের সম্পর্কের কারণে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়। দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উপস্থিতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
রূপপুর প্রকল্পের মতো বড় অবকাঠামোগত বিনিয়োগ কোনো দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ককে কেবল অর্থনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, ঋণ, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমন্বয়। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাশিয়ার বিনিয়োগ ও স্বার্থ কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে মস্কোর আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। পুতিন-হাসিনা ফোনালাপের খবর সত্যি হলে, সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রূপপুর প্রকল্প, রাশিয়ার বিনিয়োগ কিংবা দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না—সেটিই এখন কৌতূহলের বড় বিষয়। যদিও কথোপকথনের কোনো বিবরণ প্রকাশ্যে আসেনি, তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ভারতের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। কারণ কথিত ফোনালাপের সময় শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে ছিলেন এবং পুতিনও নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উপস্থিতির কথাও বলা হচ্ছে। যদি এসব দাবি সত্যি হয়, তাহলে ঘটনাটি কেবল রাশিয়া ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ভারতও এর কোনো না কোনো পর্যায়ে অবগত ছিল কি না, সে প্রশ্ন সামনে আসবে। তবে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের উপস্থিতি কিংবা অবস্থানকে কেন্দ্র করে সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। এ ধরনের সংবেদনশীল যোগাযোগের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পেতে সরকারি বক্তব্য বা নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র প্রয়োজন।
ভারত, রাশিয়া ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও প্রধান আঞ্চলিক শক্তি। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নানা সময়ে সহযোগিতা ও টানাপোড়েন—দুইয়ের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সময় রাশিয়ার সঙ্গেও ঢাকার সম্পর্ক দৃঢ় হয়। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত ও রাশিয়ার অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক।
কথিত ফোনালাপের খবর এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশটির পররাষ্ট্রনীতি কোন দিকে যাবে, পুরোনো চুক্তি ও প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকবে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠিত হবে—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশকে একই সঙ্গে ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য পক্ষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান সময়ে যেকোনো উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগই রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে উঠছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপের খবরের আরেকটি দিক হলো—এটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। ক্ষমতার বাইরে থাকার পরও তিনি আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারছেন কি না, তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কতটা আগ্রহী, কিংবা কোনো দেশ তাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে কি না—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনায় আসছে। তবে কোনো ফোনালাপের দাবি থেকেই কারও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা কোনো রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। রাজনৈতিক যোগাযোগ ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও তার সত্যতা যাচাই করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা আন্তর্জাতিক কূটনীতি সম্পর্কিত খবরের ক্ষেত্রে গুজব, অনুমান ও রাজনৈতিক প্রচারণা সহজেই বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। পুতিন-হাসিনা ফোনালাপের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। খবরটি প্রথম কোথা থেকে এসেছে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আছে কি না, নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
তবে ফোনালাপটি সত্যি হয়ে থাকলে এর তাৎপর্য কম নয়। রাশিয়া হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিশেষ করে রূপপুর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশ্বস্ত হতে চাইতে পারে। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে পুতিন ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে থাকতে পারেন। আবার বিষয়টি ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার কৌশলগত সমন্বয়ের অংশও হতে পারে। অন্যদিকে এটি কেবল সৌজন্য বিনিময় বা পুরোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে হওয়া একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগও হতে পারে। তাই সম্ভাবনার একাধিক দিক থাকলেও প্রমাণ ছাড়া কোনো একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দেশের পররাষ্ট্রনীতি যেন জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ, ব্যয়, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে জনসমক্ষে পরিষ্কার তথ্য থাকা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকলে তার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে গুজব কমবে এবং জনগণের আস্থা বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত পুতিন ও শেখ হাসিনার কথিত ফোনালাপের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে সতর্ক থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু এই খবর বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, রাশিয়ার বিনিয়োগ, ভারতের ভূমিকা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো যোগাযোগই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর পেছনে থাকে স্বার্থ, সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশল। তাই এই ফোনালাপ সত্যি হয়ে থাকলে এর পূর্ণ তাৎপর্য বুঝতে হলে শুধু কথোপকথনের খবর নয়, বরং বাংলাদেশকে ঘিরে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণও বিশ্লেষণ করতে হবে। আর যদি খবরটি ভিত্তিহীন হয়, তাহলেও তা দেখিয়ে দেয়—বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে কতটা আগ্রহ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ