সীমান্তে একটি ভুল পরিচয় কি একজন মানুষের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে? কুড়িগ্রামের উলিপুর সীমান্তে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশি নাগরিক ভেবে ভারতের দুই নাগরিককে গুলি করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ফেলে রেখে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই ব্যক্তি এখন চিকিৎসাধীন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকদের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ঘটনাটি শুধু দুই ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি সীমান্তে শক্তি প্রয়োগ, মানবিকতা, জবাবদিহি এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত অপরাধ ঠেকানোও রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। কিন্তু কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলেই তার পরিচয় নিশ্চিত না করে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু একটি নিরাপত্তা অভিযানের বিষয় থাকে না—তা পরিণত হয় মানবাধিকারের প্রশ্নে।
৫ অক্টোবর প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহত দুই ব্যক্তি ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণ সালমারা-মানকাচর এলাকার বাসিন্দা। তাদের নাম ইসমাইল হোসেন, বয়স ৩৫, এবং খাজা আব্দুল আলীম, বয়স ৩৯। তারা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দইখাওয়া সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হন। পরে তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশি নিরাপত্তায় তাদের চিকিৎসা চলছে।
ঘটনার বিবরণ নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আহতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে তারা ভারতের নারায়ণপুর স্থলবন্দর-সংলগ্ন এলাকায় গরু পারাপারের সময় বিএসএফের গুলির শিকার হন। তাদের বাংলাদেশি নাগরিক ভেবে বিএসএফ ককটেল ও শর্টগানের গুলি ছোড়ে বলে আহতদের দাবি। পরে তাদের একটি চর এলাকায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
অন্যদিকে আহতদের একজনের বর্ণনা আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার দাবি, ভারতীয় ভূখণ্ডে তাদের বাংলাদেশি গরু চোরাচালানকারী হিসেবে আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের একটি চরে নিয়ে গিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেছেন।
অর্থাৎ ঘটনার পুরো সত্যতা নির্ধারণে এখনো তদন্ত প্রয়োজন। তারা ঠিক কোথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কারা গুলি করেছে, কী পরিস্থিতিতে গুলি ছোড়া হয়েছে এবং তাদের কীভাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাওয়া গেল—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত: দুই ভারতীয় নাগরিক গুলিবিদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে চিকিৎসাধীন এবং তাদের শরীরে গুলির আঘাত রয়েছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে। একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলেও তাকে আইন অনুযায়ী আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচার করার সুযোগ রয়েছে। অপরাধের অভিযোগ কোনো মানুষকে বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার অনুমতি দেয় না। আর যদি তারা ভুলভাবে সন্দেহভাজন হয়ে থাকেন, তাহলে ঘটনাটি আরও গুরুতর। কারণ সীমান্তে একটি ভুল পরিচয় তখন একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দুই দেশের সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ সীমান্তগুলোর একটি। সীমান্তের দুই পাশে একই ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের মানুষ বসবাস করেন। অনেক জায়গায় নদীর গতিপথ, চর জেগে ওঠা, কৃষিকাজ কিংবা গবাদিপশু চরানোর কারণে স্থানীয় মানুষের চলাচল জটিল হয়ে ওঠে। ফলে সীমান্তরক্ষীদের দায়িত্ব যেমন কঠিন, তেমনি ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও থাকে।
কিন্তু এই বাস্তবতা সীমান্তে গুলি চালানোর ঘটনাকে স্বাভাবিক করে দিতে পারে না। বরং সীমান্ত যত জটিল, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তত বেশি পেশাদার, নির্ভুল ও মানবিক হতে হয়। অস্ত্রধারী বাহিনীর হাতে থাকা ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও সমানভাবে বড়। একটি গুলি ছোড়ার আগে পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ, পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ এবং সম্ভব হলে প্রাণঘাতী নয় এমন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ।
কুড়িগ্রামের এই ঘটনাকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে আরেকটি বিষয়—আহত দুই ব্যক্তি নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ অভিযোগ সত্য হলে এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে একটি বাহিনী নিজেদের দেশের নাগরিককেও ভুল পরিচয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে। একজন মানুষ কোন দেশের নাগরিক—এটি যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল কি না, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। আহতদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অর্থাৎ একদিকে তারা গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে মামলাও হয়েছে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের ওপর কীভাবে গুলি চালানো হলো, কেন তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেল এবং এই ঘটনার পেছনে সীমান্তের কোন পরিস্থিতি কাজ করেছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা জরুরি।
কারণ শুধু আহত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করলেই ঘটনার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। যদি তারা সত্যিই অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে, কেন তারা গুলিবিদ্ধ হলেন? যদি তারা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? আর যদি তাদের ভুল করে বাংলাদেশি মনে করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভুলের দায় কার?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের কাছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী রাষ্ট্রের দৃশ্যমান প্রতিনিধি। তাদের আচরণ স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাবোধকে সরাসরি প্রভাবিত করে। একজন কৃষক, জেলে, রাখাল কিংবা সীমান্তবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন ভুল সন্দেহে তাদের ওপর গুলি চালানো হতে পারে, তাহলে সীমান্তে নিরাপত্তার পাশাপাশি ভয়ও তৈরি হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির ইতিহাসও এই উদ্বেগকে আরও গভীর করে। বণিক বার্তার প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে ১৫১ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন; তাদের মধ্যে অন্তত ১১৮ জন গুলিতে নিহত হন এবং ওই ১১৮ জনের ১১৭ জন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হন বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন প্রায় ৬১১ জন বাংলাদেশি।
এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি জীবিকা, একটি অসমাপ্ত জীবন এবং অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। সীমান্তে একজন মানুষ নিহত বা গুরুতর আহত হলে তার প্রভাব সীমান্তের কাঁটাতারের মধ্যে আটকে থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার থেকে সমাজে, স্থানীয় মানুষের মানসিকতায় এবং দুই দেশের সম্পর্কের ওপর।
তবে কুড়িগ্রামের বর্তমান ঘটনাটি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও প্রয়োজন। কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন ২২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহাবুব উল হক বলেছেন, সীমান্তে গুলির কোনো ঘটনা তাদের জানা নেই। অন্যদিকে পুলিশ, হাসপাতাল এবং একাধিক সংবাদমাধ্যম আহত দুই ভারতীয় নাগরিকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। ফলে ঘটনার স্থান, সময় ও গুলিবর্ষণের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
এই বিরোধপূর্ণ তথ্যই দেখিয়ে দেয়, সীমান্তের প্রতিটি গুরুতর ঘটনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত কতটা প্রয়োজন। কে প্রথম গুলি চালিয়েছে, কোন ভূখণ্ডে গুলি চালানো হয়েছে, আহতরা কীভাবে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে এলেন এবং বিএসএফের সদস্যরা সেখানে কী করছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিভুক্ত প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে বের করা দরকার।
সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষার নামে প্রাণহানি বন্ধ করতে হলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সন্দেহভাজনদের আটক করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রটোকল অনুসরণ করা এবং প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত যৌথ তদন্ত বা তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকলে গুজব ও উত্তেজনা কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সীমান্তে মানুষকে প্রথমে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। সে বাংলাদেশি হোক বা ভারতীয়, চোরাচালানের অভিযোগ থাকুক কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ থাকুক—আইন প্রয়োগের আগে তার জীবন রক্ষার মৌলিক নীতিটি অক্ষুণ্ন থাকা দরকার। অপরাধের অভিযোগের বিচার আদালতে হতে পারে; কিন্তু গুলির ক্ষত অনেক সময় আর ফেরত নেওয়া যায় না।
কুড়িগ্রামের দইখাওয়া সীমান্তে গুলিবিদ্ধ দুই ভারতীয় এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলেন, কেন তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পাওয়া গেল এবং অভিযোগের পেছনে আসল ঘটনা কী—তার পূর্ণ উত্তর এখনো সামনে আসেনি। কিন্তু এই ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছে: সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব কি মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বের চেয়ে আলাদা?
সীমান্ত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রেখা। কিন্তু সেই রেখার দুই পাশে মানুষ বাস করে। তাদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনো কাঁটাতারের চেয়ে ছোট নয়। ভুল পরিচয়, সন্দেহ কিংবা অপরাধের অভিযোগ—কোনোটিই একটি মানুষের জীবনের মূল্য কমিয়ে দিতে পারে না। তাই কুড়িগ্রামের এই ঘটনার সত্য উদঘাটন শুধু দুই আহত ভারতীয় নাগরিকের জন্য নয়; সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তার জন্যই জরুরি।
আপনার মতামত জানানঃ