১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই। জার্মানির বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সংগীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী প্রথম অ-ইউরোপীয় ব্যক্তি। তাঁদের সেই সাক্ষাৎ পরিণত হয় ইতিহাসের অন্যতম গভীর, উদ্দীপনাময় ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ আলোচনায়। কথোপকথনের মূল বিষয় ছিল বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্ব, সত্যের প্রকৃতি, সৌন্দর্যের সংজ্ঞা, মানুষের চেতনা এবং মহাবিশ্বের অস্তিত্ব।
Science and the Indian Tradition: When Einstein Met Tagore বইটিতে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতে ঘটে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক নবজাগরণের চিত্রও ফুটে উঠেছে। সেই সময় ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মধ্যে এক বিশেষ মেলবন্ধন তৈরি হচ্ছিল।
আইনস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথের কথোপকথন
আইনস্টাইন: আপনি কি মনে করেন, ঈশ্বর বা পরম সত্তা জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অস্তিত্বশীল?
রবীন্দ্রনাথ: না, বিচ্ছিন্নভাবে নয়। মানুষের অসীম সত্তা সমগ্র মহাবিশ্বকে ধারণ করে। এমন কিছু থাকতে পারে না, যা মানুষের সত্তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। আর এ থেকেই প্রমাণিত হয়, মহাবিশ্বের সত্য মূলত মানবিক সত্য।
আমি একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছি। পদার্থ গঠিত হয় প্রোটন ও ইলেকট্রন দিয়ে, যাদের মধ্যে ফাঁকা স্থান রয়েছে। অথচ পদার্থকে আমাদের কাছে কঠিন ও নিরেট মনে হয়। একইভাবে মানবজাতি অসংখ্য ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত। কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন তাদের মধ্যে একটি জীবন্ত ঐক্য তৈরি করে, যা মানবজগৎকে একত্রে ধরে রাখে।
সমগ্র মহাবিশ্বও একইভাবে আমাদের সঙ্গে সংযুক্ত। এটি একটি মানবিক মহাবিশ্ব। শিল্প, সাহিত্য ও মানুষের ধর্মীয় চেতনার মধ্য দিয়ে আমি এই চিন্তাকে অনুসরণ করেছি।
আইনস্টাইন: মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ধারণা রয়েছে।
১. মহাবিশ্ব এমন এক ঐক্য, যার অস্তিত্ব মানবজাতির ওপর নির্ভরশীল।
২. মহাবিশ্ব এমন এক বাস্তবতা, যা মানুষের অস্তিত্ব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।
রবীন্দ্রনাথ: যখন আমাদের মহাবিশ্ব চিরন্তন মানবসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন আমরা তাকে সত্য হিসেবে জানি এবং সৌন্দর্য হিসেবে অনুভব করি।
আইনস্টাইন: এটি মহাবিশ্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ মানবকেন্দ্রিক ধারণা।
রবীন্দ্রনাথ: এর বাইরে অন্য কোনো ধারণা থাকতে পারে না। এই জগৎ একটি মানবিক জগৎ। এমনকি এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও একজন বৈজ্ঞানিক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়।
যুক্তি ও আনন্দের কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে, যা আমাদের কাছে সত্যকে অর্থবহ করে তোলে। সেই মানদণ্ড হলো চিরন্তন মানবসত্তা, যার অভিজ্ঞতা আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়।
আইনস্টাইন: অর্থাৎ এটি মানবসত্তার এক উপলব্ধি।
রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, এক চিরন্তন সত্তার উপলব্ধি। আমাদের আবেগ ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই সত্তাকে উপলব্ধি করতে হয়।
আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই সেই পরম মানবসত্তাকে উপলব্ধি করি, যার কোনো ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নেই।
বিজ্ঞান এমন সব বিষয় নিয়ে কাজ করে, যা কোনো ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সত্যের এক নৈর্ব্যক্তিক মানবিক জগৎ।
ধর্ম এই সত্যগুলোকে উপলব্ধি করে এবং মানুষের গভীরতর প্রয়োজনের সঙ্গে সেগুলোকে যুক্ত করে। সত্য সম্পর্কে আমাদের ব্যক্তিগত চেতনা তখন সর্বজনীন তাৎপর্য লাভ করে।
ধর্ম সত্যের সঙ্গে মূল্যবোধকে যুক্ত করে। সেই সত্যের সঙ্গে আমাদের সামঞ্জস্যের মধ্য দিয়ে আমরা তাকে কল্যাণকর হিসেবে উপলব্ধি করি।
আইনস্টাইন: তাহলে সত্য কিংবা সৌন্দর্য কি মানুষের অস্তিত্ব থেকে স্বাধীন নয়?
রবীন্দ্রনাথ: না, স্বাধীন নয়।
আইনস্টাইন: পৃথিবীতে যদি আর কোনো মানুষ না থাকে, তাহলে বেলভেদেরের অ্যাপোলো মূর্তিটি আর সুন্দর থাকবে না?
রবীন্দ্রনাথ: না, থাকবে না।
আইনস্টাইন: সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে আমি আপনার এই ধারণার সঙ্গে একমত। কিন্তু সত্যের ক্ষেত্রে নই।
রবীন্দ্রনাথ: কেন নন? সত্য তো মানুষের মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করা হয়।
আইনস্টাইন: আমার ধারণাই সঠিক, তা আমি প্রমাণ করতে পারি না। কিন্তু এটাই আমার বিশ্বাস।
রবীন্দ্রনাথ: সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের আদর্শে, যা সর্বজনীন সত্তার মধ্যে বিদ্যমান। আর সত্য হলো সর্বজনীন মনের পূর্ণ উপলব্ধি।
আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের ভুল, বিভ্রান্তি, সঞ্চিত অভিজ্ঞতা এবং আলোকিত চেতনার মধ্য দিয়ে সেই সত্যের দিকে এগিয়ে যাই। অন্যথায় সত্যকে আমরা কীভাবে জানতে পারতাম?
আইনস্টাইন: বৈজ্ঞানিকভাবে আমি প্রমাণ করতে পারি না যে সত্যকে অবশ্যই মানবজাতির অস্তিত্ব থেকে স্বাধীন বলে বিবেচনা করতে হবে। তবে আমি দৃঢ়ভাবে তা বিশ্বাস করি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জ্যামিতিতে পিথাগোরাসের উপপাদ্য এমন একটি সত্য প্রকাশ করে, যা মানুষের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয় বলে আমি মনে করি।
যাই হোক, যদি মানুষের অস্তিত্ব থেকে স্বাধীন কোনো বাস্তবতা থাকে, তাহলে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত সত্যও থাকবে। আর প্রথম ধারণাটিকে অস্বীকার করলে দ্বিতীয় ধারণাটিও অস্বীকার করতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ: সর্বজনীন সত্তার সঙ্গে একীভূত সত্য অবশ্যই মানবিক হতে হবে। অন্যথায় আমরা প্রত্যেকে যা সত্য বলে উপলব্ধি করি, তাকে কখনোই সত্য বলা যাবে না।
অন্তত সেই সত্যকে নয়, যাকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলা হয় এবং যা কেবল যুক্তির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্জন করা সম্ভব। অন্য কথায়, মানুষের চিন্তাশক্তি নামক একটি মানসিক উপকরণের মাধ্যমেই সেই সত্যে পৌঁছানো যায়।
ভারতীয় দর্শন অনুসারে, ব্রহ্মই পরম সত্য। ব্যক্তিমানুষের বিচ্ছিন্ন মন দিয়ে সেই সত্যকে কল্পনা করা যায় না, কিংবা ভাষায় প্রকাশ করাও সম্ভব নয়। ব্যক্তিসত্তাকে সম্পূর্ণভাবে অসীমের মধ্যে বিলীন করার মাধ্যমেই কেবল তাকে উপলব্ধি করা যায়।
কিন্তু এ ধরনের সত্য বিজ্ঞানের বিষয় হতে পারে না।
আমরা যে সত্য নিয়ে আলোচনা করছি, তা আসলে এক ধরনের প্রকাশ বা প্রতিভাস। অর্থাৎ মানুষের মন যা সত্য বলে মনে করে, সেটিই এখানে সত্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তাই একে মানবিক সত্য বলা যায়। একে মায়া বা ভ্রমও বলা যেতে পারে।
আইনস্টাইন: তাহলে আপনার ধারণা অনুযায়ী, যা হয়তো ভারতীয় দর্শনের ধারণাও হতে পারে, এটি কোনো ব্যক্তির নিজস্ব ভ্রম নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির ভ্রম।
রবীন্দ্রনাথ: মানবজাতিও একটি বৃহত্তর ঐক্যের অংশ। তাই সমগ্র মানবমনই সত্যকে উপলব্ধি করে। ভারতীয় কিংবা ইউরোপীয় মন—উভয়ই এক অভিন্ন উপলব্ধিতে মিলিত হয়।
আইনস্টাইন: জার্মান ভাষায় প্রজাতি শব্দটি সব মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে বানর ও ব্যাঙও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞানে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত মনের সীমাবদ্ধতা দূর করার অনুশীলন করি। এভাবেই আমরা এমন এক সত্যের উপলব্ধিতে পৌঁছাই, যা সর্বজনীন মানবমনের মধ্যে বিদ্যমান।
আইনস্টাইন: মূল সমস্যাটি হলো, সত্য কি আমাদের চেতনা থেকে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল?
রবীন্দ্রনাথ: আমরা যাকে সত্য বলি, তা বাস্তবতার বিষয়গত ও বস্তুনিষ্ঠ দিকের মধ্যে যুক্তিসংগত সামঞ্জস্যের ফল। এই দুটি দিকই অতিব্যক্তিক মানবসত্তার অন্তর্ভুক্ত।
আইনস্টাইন: দৈনন্দিন জীবনেও আমরা এমন সব বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হই, যেগুলো মানুষের অস্তিত্ব থেকে স্বাধীন।
আমাদের ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতাগুলোকে যুক্তিসংগতভাবে সংযুক্ত করার জন্যই আমরা এমনটি করি।
ধরুন, এই বাড়িতে যদি কেউ না-ও থাকে, তবুও টেবিলটি তার জায়গায় থেকে যায়।
রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, এটি ব্যক্তিমানুষের মনের বাইরে থেকে যায়, কিন্তু সর্বজনীন মনের বাইরে নয়। আমি যে টেবিলটি উপলব্ধি করি, তা আমার মতোই এক ধরনের চেতনার মাধ্যমে উপলব্ধিযোগ্য।
আইনস্টাইন: যদি বাড়িতে কেউ না থাকে, তবুও টেবিলটির অস্তিত্ব থাকবে। কিন্তু আপনার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এ ধরনের বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমাদের পক্ষে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, আমাদের অস্তিত্ব থেকে স্বাধীনভাবে কোনো টেবিলের সেখানে থাকার অর্থ কী।
মানবজাতির বাইরে সত্যের অস্তিত্ব রয়েছে—এ বিষয়ে আমাদের স্বাভাবিক ধারণাকে ব্যাখ্যা কিংবা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু এটি এমন একটি বিশ্বাস, যা কেউই পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারে না। এমনকি আদিম মানুষও নয়।
আমরা সত্যকে এক অতিমানবিক বস্তুনিষ্ঠতা প্রদান করি। আমাদের কাছে এমন এক বাস্তবতা অপরিহার্য, যা আমাদের অস্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও মন থেকে স্বাধীন। যদিও এর প্রকৃত অর্থ কী, তা আমরা বলতে পারি না।
রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, নিরেট বস্তু হিসেবে টেবিলের অস্তিত্ব আসলে একটি প্রতিভাস। তাই মানুষের মন যদি না থাকত, তাহলে মানুষের কাছে টেবিল হিসেবে প্রতীয়মান বস্তুটিও থাকত না।
একই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, চূড়ান্ত ভৌত বাস্তবতা অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক শক্তিকেন্দ্রের সমষ্টি—এই ধারণাটিও মানুষের মনেরই সৃষ্টি।
সত্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে সর্বজনীন মানবমন এবং ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ একই মনের মধ্যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব রয়েছে।
আমাদের বিজ্ঞান, দর্শন ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে।
যাই হোক, মানবজাতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন কোনো সত্য যদি থেকেও থাকে, তাহলে আমাদের কাছে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
ধরা যাক, এমন এক ধরনের মনের কথা কল্পনা করা হলো, যার কাছে ঘটনাপ্রবাহ স্থানের পরিবর্তে কেবল সময়ের ধারাবাহিকতায় ঘটে। যেমন সংগীতে একের পর এক সুরের আবির্ভাব ঘটে।
এ ধরনের মনের কাছে বাস্তবতার ধারণা সংগীতের বাস্তবতার মতো। সেখানে পিথাগোরাসের জ্যামিতির কোনো অর্থই নেই।
কাগজের বাস্তবতা আর সাহিত্যের বাস্তবতা এক নয়। কাগজ খেয়ে ফেলে এমন একটি মথের কাছে সাহিত্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু মানুষের কাছে সাহিত্যের সত্য ও মূল্য কাগজের চেয়েও অনেক বেশি।
একইভাবে, মানুষের মন ও ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই, এমন কোনো সত্য যদি থেকে থাকে, তাহলে যত দিন আমরা মানুষ হিসেবে অস্তিত্বশীল থাকব, তত দিন সেটি আমাদের কাছে অর্থহীনই থেকে যাবে।
আইনস্টাইন: তাহলে তো আমি আপনার চেয়ে বেশি ধার্মিক!
রবীন্দ্রনাথ: আমার ধর্ম হলো, অতিব্যক্তিক মানবসত্তা—সর্বজনীন মানবিক আত্মা—আমার নিজের ব্যক্তিসত্তার মধ্যে সমন্বিত হওয়া।
আপনার মতামত জানানঃ