বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখা সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের দাবিনামায় এসেছে বড় পরিবর্তন। ২০১৩ সালে ঘোষিত ১৩ দফা থেকে সরে এসে গত আগস্টে সরকারকে দেওয়া নতুন ৯ দফায় নারীর বিষয়ে আগের অবস্থান থেকে দৃশ্যত নমনীয় হয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে বাদ পড়েছে নারী-পুরুষের অবাধ চলাফেরা, সাংস্কৃতিক চর্চা, মূর্তি-ভাস্কর্য, গণমাধ্যমে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গসহ বেশ কিছু পুরোনো দাবি। বিপরীতে গুরুত্ব পেয়েছে শাপলা চত্বর, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচার, কওমি শিক্ষার স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে আলেমদের অংশগ্রহণ।
হেফাজতের এই পরিবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। এটি কি কেবল দাবির ভাষা ও পরিধি পরিবর্তন, নাকি সংগঠনটির রাজনৈতিক কৌশল ও চিন্তাভাবনায়ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত? বিষয়টি নিয়ে হেফাজত নেতাদের বক্তব্যের পাশাপাশি বিশ্লেষকদের মতামতও সামনে এসেছে।
২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম যখন ১৩ দফা দাবি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তখন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। ওই দাবিনামায় সংবিধান সংশোধন, নারীনীতি বাতিল, শিক্ষানীতির পরিবর্তন, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ বন্ধ, মূর্তি-ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা এবং গণমাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে ব্যঙ্গ বন্ধের মতো বিষয়গুলো ছিল। ধর্মীয় অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান, শাহবাগ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের দাবিও ছিল ওই তালিকায়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং পরবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় হেফাজতও তাদের দাবিনামা পুনর্বিন্যাস করেছে। গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সংগঠনটির আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী নতুন ৯ দফা দাবি তুলে দেন। এর আগে হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিটি দাবিগুলো পর্যালোচনা করে। পরে আমিরের অনুমোদনে তা চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন দাবিনামায় নারীদের বিষয়ে আগের মতো সরাসরি বিধিনিষেধের কথা বলা হয়নি। ২০১৩ সালের চতুর্থ দফায় ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার এবং প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ বন্ধের দাবি ছিল। একই সঙ্গে মোমবাতি প্রজ্বালনসহ তথাকথিত বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কথাও বলা হয়েছিল। নতুন ৯ দফায় এসব বিষয়ে কোনো দাবি রাখা হয়নি।
একইভাবে আগের দাবিনামায় থাকা নারীনীতি বাতিলের বিষয়টিও বাদ পড়েছে। ২০১৩ সালের পঞ্চম দফায় ইসলামবিরোধী নারীনীতি ও ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল। নতুন তালিকায় শিক্ষানীতি বা নারীনীতি বাতিলের দাবি না রেখে শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি রাখা হয়েছে।
এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক। তাঁর মতে, হেফাজত বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, যা তাদের চিন্তার জায়গাতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। যদিও হেফাজত নেতারা বিষয়টিকে আদর্শিক পরিবর্তন হিসেবে দেখতে নারাজ।
সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমানের বক্তব্য, ইসলাম নারীদের বিষয়ে সব সময় উদার। হেফাজত ইসলামের মূলনীতি বজায় রেখে নারীর শালীনতায় বিশ্বাস করে। তাই দাবিনামা থেকে কিছু বিষয় বাদ পড়াকে সংগঠনের অবস্থান পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, সময়ের প্রয়োজনে দাবিগুলো সংক্ষিপ্ত ও পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, এই পরিবর্তনের পেছনে কৌশলগত বিবেচনাও থাকতে পারে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরীর মতে, সরকারের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে হেফাজত তাদের দাবিনামায় পরিবর্তন এনে থাকতে পারে। রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সংগঠনটির এমন অবস্থান নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
নতুন দাবিনামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় আইনসংক্রান্ত অবস্থানে। ২০১৩ সালের প্রথম দফায় সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিলের দাবি ছিল। নতুন ৯ দফায় সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তনের দাবি রাখা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস করা যাবে না।
হেফাজত নেতাদের দাবি, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ কারণে নতুন দাবিনামায় সংবিধানের ওই সংশোধনসংক্রান্ত দাবি আর রাখা হয়নি। এর ফলে আগের অবস্থানের তুলনায় নতুন দাবিতে সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নটি অনেকটাই আড়ালে চলে এসেছে।
ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের দাবিও দুই তালিকায় রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও ভাষাগত পরিবর্তন দেখা গেছে। পুরোনো ১৩ দফায় আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলামের অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান চাওয়া হয়েছিল। নতুন দাবিতে সর্বোচ্চ শাস্তির কথা থাকলেও মৃত্যুদণ্ড শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধের বিষয়টিও আগের মতো স্পষ্টভাবে রাখা হয়নি।
শাহবাগ আন্দোলন, ব্লগার ও কথিত নাস্তিক-মুরতাদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও বাদ পড়েছে। ২০১৩ সালের দাবিনামায় শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল। নতুন তালিকায় এই বিষয়টি অনুপস্থিত। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি, ইসলামী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পোশাক নিয়ে হাসিঠাট্টা বন্ধের দাবিও আর রাখা হয়নি।
মূর্তি ও ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থান ছিল হেফাজতের ২০১৩ সালের আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। সে সময় ঢাকাকে মসজিদের নগর থেকে মূর্তির নগরে রূপান্তরের অভিযোগ তুলে রাস্তার মোড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করা হয়েছিল। নতুন ৯ দফায় মূর্তি বা ভাস্কর্য নিয়ে কোনো দাবি নেই। হেফাজত নেতাদের বক্তব্য, আগের সরকারের সময়ে ভাস্কর্য নির্মাণের প্রতিবাদ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার এমন উদ্যোগ নেবে না বলে তারা মনে করেন।
তবে ধর্মীয় সংগঠন ও মতাদর্শসংক্রান্ত কিছু দাবি নতুন তালিকায় আরও বিস্তৃত হয়েছে। কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করার দাবি পুরোনো ও নতুন উভয় তালিকায় রয়েছে। নতুন করে হিযবুত তওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবিও যুক্ত করা হয়েছে। হেফাজতের নেতাদের অভিযোগ, সংগঠনটি ইসলামের ব্যাখ্যা বিকৃত করছে এবং বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য নতুন দাবিনামার প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় কার্যক্রম নিয়েও দাবির ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। পুরোনো তালিকায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যক্রম বন্ধের দাবি ছিল। নতুন তালিকায় বিষয়টি সীমিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আগের বিস্তৃত দাবি এখন নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
অন্যদিকে, নতুন দাবিনামায় বিচারসংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিচার দাবি করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। নতুন দাবিতে ওই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবিও যুক্ত হয়েছে। এতে হেফাজতের পুরোনো দাবিনামার মামলা প্রত্যাহার ও নেতাকর্মীদের হয়রানি বন্ধের বিষয়টি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার বিচারকে কেন্দ্র করে নতুন একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
শিরীন পারভীন হক শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে নতুন করে তদন্তের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ওই দিনের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং প্রকৃত সত্য জানার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। অতীতের ঘটনাগুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হলে রাজনৈতিক বিতর্কের অবসানে তা ভূমিকা রাখতে পারে।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন দাবিনামায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ১৩ দফায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা, হুমকি ও হয়রানি বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। নতুন তালিকায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির সুযোগ। দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি বাস্তবায়ন এবং সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এই ডিগ্রিকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, হেফাজতের দাবিনামা এখন শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংগঠনটি তাদের অনুসারীদের শিক্ষাগত ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মূলধারার উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরির দাবি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন দাবির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেমদের অংশগ্রহণ। ৯ দফার শেষ দিকে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি আলেম-ওলামাদের রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করার কথা বলা হয়েছে। পুরোনো দাবিনামায় মূলত আলেমদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ ও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। নতুন তালিকায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকার দাবি যুক্ত হয়েছে।
তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা নিয়েও নতুন দাবিনামায় স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে হেফাজত। সংগঠনটির দাবি, বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম এবং বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়া উচিত। ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গীর ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার দাবিও তোলা হয়েছে। তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি হেফাজতের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী মনে করেন, দাবিনামায় কোন বিষয় রাখা হলো বা বাদ দেওয়া হলো, সেটিই মুখ্য নয়। তাঁর বক্তব্য, ইসলাম নারীদের ব্যাপক অধিকার দিয়েছে। তবে নারীর অধিকার ও আধুনিকতার নামে তাদের পণ্যে পরিণত করার যে প্রবণতা রয়েছে, হেফাজত তার বিরোধিতা করে। তিনি আরও বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ এবং শাহবাগ আন্দোলন ঘিরে আগের দাবিগুলোর প্রেক্ষাপট ছিল আলাদা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলো নতুন দাবিনামায় রাখার প্রয়োজন মনে করেনি সংগঠনটি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও হেফাজতের এই পরিবর্তনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের দৃশ্যমান বোঝাপড়া তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সংগঠনটির দাবিতে পরিবর্তন শুরু হলেও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে দাবিগুলো পুনর্বিন্যাস করা হয়। তবে এই রাজনৈতিক বোঝাপড়ার প্রকৃতি ও এর প্রভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সীমিত।
সব মিলিয়ে হেফাজতের নতুন ৯ দফা একদিকে পুরোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধের দাবি কমিয়েছে, অন্যদিকে ধর্মীয় অবমাননার বিরুদ্ধে আইন, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো অবস্থান বহাল রেখেছে। একই সঙ্গে বিচার, কওমি শিক্ষার স্বীকৃতি, আলেমদের রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণ এবং তাবলিগ জামাতের নেতৃত্বসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে।
এই পরিবর্তনকে কেউ দেখছেন সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে, কেউ আবার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। নারীদের বিষয়ে সরাসরি বিধিনিষেধ বাদ পড়া অবশ্যই দাবিনামার একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তন বাস্তবে সংগঠনটির সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ডে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ অবস্থান ও কার্যক্রমের ওপর। হেফাজতের নতুন দাবিনামা তাই শুধু কয়েকটি দাবি কমানো বা বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আপনার মতামত জানানঃ