
একটি ঘটনার কথা ভাবুন। কোনো সংগঠনের কর্মী একজনকে প্রকাশ্যে অপমান করেছেন। ঘটনাটি শুনে আপনি বললেন, এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কিছুক্ষণ পর জানা গেল, কর্মীটি আপনার পছন্দের সংগঠনের। তখন কি আপনার বিচার একই থাকবে? নাকি মনে হবে, পুরো ঘটনাটি জানা দরকার, নিশ্চয়ই উসকানি ছিল, হয়তো অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে?
পুরো ঘটনা জানতে চাওয়া অবশ্যই যুক্তিসংগত। সমস্যা শুরু হয় যখন এই সতর্কতা শুধু নিজের পক্ষের জন্য বরাদ্দ থাকে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগকেই যথেষ্ট মনে করি, অথচ নিজের পক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ এলেও নতুন ব্যাখ্যা খুঁজি। তখন আমরা শুধু তথ্য যাচাই করছি না; একই কাজের জন্য দুই ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করছি।
এই প্রবণতা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের একজনের অসততাকে আমরা অসহায় পরিস্থিতির ফল বলি, অন্য পরিবারের কাউকে বলি অসৎ মানুষ। পছন্দের প্রতিষ্ঠানের অনিয়মকে দেখি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে, অপছন্দের প্রতিষ্ঠানের একই অনিয়মকে তার চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে। নিজের প্রিয় খেলোয়াড়ের রূঢ় আচরণে আবেগ দেখি, প্রতিপক্ষের আচরণে দেখি ঔদ্ধত্য। পরিচিত মানুষের জন্য ব্যাখ্যার যে জায়গা রাখি, অপরিচিত মানুষের জন্য তা রাখি না।
নিজের পক্ষের অন্যায় মেনে নেওয়া অনেক সময় শুধু একটি ঘটনা সম্পর্কে মত বদলানো নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিজের আগের সিদ্ধান্তও। আমি যাকে ভালো বলেছি, যার পক্ষে তর্ক করেছি, যার সঙ্গে নিজের মূল্যবোধ মিলিয়েছি—তার আচরণ ভুল হলে আমার বিচার নিয়েও প্রশ্ন আসে। তখন ঘটনার পক্ষে যুক্তি তৈরি করা নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার কাজ হয়ে উঠতে পারে। অন্যের অন্যায় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা আসলে নিজের অতীত অবস্থানকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
ধরা যাক, আপনি বহু বছর একটি সংগঠনকে সমর্থন করেছেন। তার কারও অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সামনে এসেছে। তথ্যটি স্বীকার করলে মনে হতে পারে, এত দিনের সমর্থন কি তাহলে অর্থহীন ছিল? অথচ একটি নির্দিষ্ট অন্যায় স্বীকার করা এবং নিজের সব বিশ্বাস পরিত্যাগ করা এক বিষয় নয়। একজন নেতার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেও কোনো নীতিকে সমর্থন করা যায়। আমরা যখন এই পার্থক্য হারাই, তখন সংশোধনের সুযোগও সংকুচিত হয়।
সামাজিক মনস্তত্ত্বের একটি গবেষণা এই বিচারগত অসাম্যের আরেকটি দিক দেখায়। ২০১৪ সালে পিএনএএস-এ প্রকাশিত গবেষণায় কিছু রাজনৈতিক ও জাতিগত-ধর্মীয় সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মানুষ নিজের গোষ্ঠীর আক্রমণাত্মক আচরণকে নিজেদের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখিয়েছে; প্রতিপক্ষের আচরণকে ব্যাখ্যা করেছে বিদ্বেষ দিয়ে। একই আচরণের পেছনে উদ্দেশ্য অনুমান করার পদ্ধতিই বদলে গেছে।
এখানে পরিচিত ভাষা হচ্ছে, আমাদের লোকটি রাগের মাথায় করেছে, কিন্তু ওদের লোকটি পরিকল্পনা করে করেছে। আমাদের কঠোরতা প্রয়োজনের কারণে, ওদের কঠোরতা নিষ্ঠুরতার কারণে। উদ্দেশ্য অবশ্যই বিচার করার বিষয়। কিন্তু নিজের পক্ষের ভালো উদ্দেশ্য প্রমাণ ছাড়াই ধরে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষের খারাপ উদ্দেশ্য একইভাবে ধরে নেওয়া ন্যায্য বিচার নয়। মানুষের মনে কী ছিল, তা অনুমান করার আগে তার কাজ, প্রমাণ ও পরিণতি দেখা প্রয়োজন।
অন্যায়কে ছোট করার একটি পথ হলো তার ভাষা বদলে দেওয়া। অপমানকে বলা হয় একটু কঠোর কথা, হুমকিকে বলা হয় সতর্কবার্তা, অনিয়মকে বলা হয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে চলা। শব্দ বদলালে ঘটনার নৈতিক ভারও হালকা মনে হতে পারে। যে আচরণের বিবরণ শুনে আমরা আপত্তি করতাম, তার নতুন নাম শুনে আপত্তি কমে যায়।
আলবার্ট বান্দুরার নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার ধারণা এই ধরনের আত্মপক্ষসমর্থন বোঝার একটি কাঠামো দেয়। ক্ষতিকর আচরণকে ভালো উদ্দেশ্যের অংশ বলা, নিজের দায় অন্যের ওপর সরিয়ে দেওয়া, ক্ষতির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই দায়ী করা—এসবের মাধ্যমে মানুষ নিজের নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা এই প্রক্রিয়াগুলো আলোচনা করেছে; তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মনোভাব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।
আরেকটি পরিচিত যুক্তি হলো, ওরা আরও খারাপ করেছে। কথাটি সত্যও হতে পারে। কিন্তু অন্যের বড় অন্যায় নিজের ছোট অন্যায়কে বৈধ করে না। দুটি ঘটনার মাত্রা, উদ্দেশ্য ও ক্ষতির তুলনা করা দরকার হতে পারে; সেই তুলনা দিয়ে একটি ঘটনার দায় মুছে ফেলা আলাদা বিষয়। প্রতিপক্ষের অপরাধের বিচার চাওয়া এবং নিজের পক্ষের দায় স্বীকার করা একই সঙ্গে সম্ভব।
এখানে ভয়ও কাজ করতে পারে। নিজের পক্ষের সমালোচনা করলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পাবে, বন্ধুরা দূরে সরে যাবে, সংগঠনে অবস্থান দুর্বল হবে—এমন আশঙ্কা মানুষকে নীরব রাখতে পারে। এই নীরবতা সবসময় ভেতরের সমর্থনের প্রমাণ নয়। কখনো মানুষ অন্যায় চিনতে পারেন, কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে সাহস পান না। তাই কারও চুপ থাকা দেখে তাঁর সম্পূর্ণ নৈতিক অবস্থান ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না।
তবে দীর্ঘদিন নীরব থাকার মধ্যে একটি বিপদ আছে। যে কাজটি শুরুতে অস্বস্তিকর লাগত, বারবার তার পক্ষে যুক্তি দিতে দিতে সেটিকেই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। নিজের পক্ষের প্রতিটি ভুলকে সাময়িক প্রয়োজন হিসেবে দেখলে প্রয়োজনের সীমা আর থাকে না। গোষ্ঠীর সুবিধাই তখন বিচার করার প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে। নীতির ভাষা টিকে থাকে, কিন্তু প্রয়োগ বদলে যায়।
২০২০ সালে সায়েন্সে প্রকাশিত ‘Political sectarianism in America’ প্রবন্ধে গবেষকেরা প্রতিপক্ষকে আলাদা ও ঘৃণ্য গোষ্ঠী হিসেবে দেখা, তাদের প্রতি বিরাগ এবং রাজনৈতিক বিভেদকে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্নে রূপ দেওয়ার সম্পর্ক আলোচনা করেন। এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে তৈরি। বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রমাণ হিসেবে তা ব্যবহার করা যায় না; তবে নিজের পক্ষকে ভালো এবং অন্য পক্ষকে স্বভাবতই খারাপ ধরে নেওয়ার বিপদ বোঝার ক্ষেত্রে এটি প্রাসঙ্গিক।
এই আলোচনায় গবেষণার সীমাও মনে রাখা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের একটি পূর্বনিবন্ধিত পুনরাবৃত্তি গবেষণায় গোষ্ঠীগত নৈতিক দ্বিচারিতা বিষয়ে আগের পরীক্ষার ফল একইভাবে পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে নিজের গোষ্ঠীর প্রতি অনুকূলতা এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া গেলেও সামগ্রিক ফল ছিল মিশ্র। অর্থাৎ নিজের পক্ষের অন্যায় সবাই সব পরিস্থিতিতে ছোট করে দেখেন—এমন অবধারিত নিয়ম নেই।
এই সীমাটি আমাদের আশা দেয়। পক্ষপাত থাকলেই মানুষ সংশোধনের অযোগ্য হয়ে যান না। নিজের পক্ষের কাউকে আমরা কখনো বেশি কঠোরভাবেও বিচার করতে পারি, কারণ তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি। একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি ভুল স্বীকারকে সম্মান করে, সমালোচনাকে বিশ্বাসঘাতকতা না বলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা শোনে, তাহলে আনুগত্য জবাবদিহির সহায়কও হতে পারে। সমস্যা পক্ষ থাকা নয়; পক্ষের সুবিধাকে নীতির ওপরে বসানো।
ন্যায্য বিচার মানে সব পক্ষকে সমান দোষী ঘোষণা করাও নয়। দুটি ঘটনায় প্রমাণ, ক্ষমতার সম্পর্ক, উদ্দেশ্য এবং ক্ষতির মাত্রা ভিন্ন হলে সিদ্ধান্তও ভিন্ন হবে। একই মানদণ্ড প্রয়োগ করার অর্থ হলো, এই পার্থক্যগুলো একই সতর্কতা দিয়ে বিচার করা। একটি ঘটনা বড় অপরাধ, অন্যটি ছোট ভুল হতে পারে—কিন্তু সিদ্ধান্তটি ঘটনার বৈশিষ্ট্য থেকে আসতে হবে, অভিযুক্তের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থেকে নয়।
নিজের বিচার পরীক্ষা করার একটি উপায় হলো পরিচয় বদলে কল্পনা করা। একই কাজটি যদি প্রতিপক্ষের কেউ করতেন, আমি কী বলতাম? তাঁর বিরুদ্ধে কোন প্রমাণকে যথেষ্ট মনে করতাম? নিজের পক্ষের ক্ষেত্রে কি সেই প্রমাণই অকারণে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন বিচারকে নির্ভুল করে না, কিন্তু মানদণ্ডের অসংগতি চোখে আনার সুযোগ দেয়।
আরেকটি উপায় হলো সিদ্ধান্তের আগে নিয়ম নির্ধারণ করা। কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে কী তথ্য চাই, কীভাবে উৎস যাচাই করব, কোন আচরণকে গ্রহণযোগ্য বলব এবং কোন ক্ষতির জন্য প্রতিকার চাইব—সেগুলো আগেই স্পষ্ট করা। অভিযুক্তের পরিচয় জানার পর নিয়ম বানালে নিজের পক্ষের জন্য ছাড় রাখার সুযোগ বাড়ে। ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সতর্কতা যেমন প্রয়োজন, সত্য তথ্যের বিরুদ্ধে অন্তহীন সন্দেহও তেমনি সমস্যা।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দিকে মনোযোগ দেওয়াও জরুরি। যে মানুষটি অপমানিত হয়েছেন, যাঁর টাকা হারিয়েছে বা যাঁর অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাঁর অভিজ্ঞতা আমাদের দলীয় হিসাবের বাইরে থাকে। তাঁর ক্ষতির জায়গায় নিজের প্রিয় গোষ্ঠীর সম্মান বসিয়ে দিলে বিচার অন্যদিকে সরে যায়। দায় নির্ধারণের আগে অবশ্যই প্রমাণ যাচাই করতে হবে; কিন্তু প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষতিকে স্বীকার করার ভাষাও থাকতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজন এখানেই। মানুষের ব্যক্তিগত সততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু তার ওপর নির্ভর করে ন্যায়বিচার টেকে না। স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছ অভিযোগপ্রক্রিয়া, জবাব দেওয়ার সুযোগ এবং একই নিয়মে সিদ্ধান্ত—এসব পক্ষপাতের প্রভাব সীমিত করতে পারে। নিজের লোককে তদন্তের বাইরে রাখার ব্যবস্থা থাকলে ভালো উদ্দেশ্যের ঘোষণাও কার্যকর জবাবদিহি তৈরি করতে পারে না।
নিজের পক্ষের অন্যায় স্বীকার করা মানে নিজেকে নিখুঁত ঘোষণা করা নয়। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সংশোধনের জায়গা তৈরি করা। আজ যে মানুষটি ভুল ধরছেন, কাল তাঁর নিজের ভুলও ধরা পড়তে পারে। সেই সম্ভাবনা মেনে নেওয়াই ন্যায্য মানদণ্ডের শক্তি: নিয়মটি আমার সুবিধার জন্য যেমন থাকবে না, আমার অসুবিধার জন্যও বদলাবে না।
আমরা নিজের পক্ষের অন্যায় ছোট করে দেখি, কারণ কখনো তার মধ্যে নিজেদের পরিচয়, সম্পর্ক ও নিরাপত্তা রক্ষার পথ খুঁজি। কিন্তু যে আনুগত্য ভুল স্বীকারের জায়গা বন্ধ করে দেয়, তা শেষ পর্যন্ত প্রিয় গোষ্ঠীকেও দুর্বল করে। নিজের পক্ষকে ভালোবাসার মধ্যে তার কাছ থেকে ভালো আচরণ দাবি করার সাহসও থাকা প্রয়োজন। নৈতিকতার কঠিন পরীক্ষা তখনই আসে, যখন সত্য স্বীকারের মূল্য নিজের দিকেও দিতে হয়।
আপনার মতামত জানানঃ