
সুপারমার্কেটের তাকে তাকে এখন প্রোটিন — সিরিয়াল, কফি, এমনকি পানিতেও “হাই প্রোটিন” ট্যাগ। গত এক দশক ধরে পুষ্টি জগতে একটাই বার্তা প্রবলভাবে প্রচারিত হয়েছে: পেশি গঠন করতে চান, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, সুস্থ থাকতে চান — তাহলে প্রোটিন বাড়ান। কিন্তু ৩১ জুলাই ২০২৬-এ Cell Press Blue সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি ব্যাপক পর্যালোচনা এই প্রচলিত ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
গবেষণাটি আসলে কী বলছে
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজিস্ট ও বায়োমেডিক্যাল গবেষক ডাডলি ল্যামিং এবং তাঁর সহকর্মী বেইলি নফ একত্রে ৩৫০টিরও বেশি প্রকাশিত গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছেন — যেগুলোতে ইস্ট, ফলের মাছি, ইঁদুর ও মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণী ও জীবের ওপর প্রোটিন সীমিতকরণের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাঁদের সিদ্ধান্ত: কম প্রোটিন গ্রহণ বিপাক উন্নত করতে, কোষীয় ক্ষতি কমাতে এবং স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত জৈবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় করতে পারে।
ল্যামিং নিজেই বলেছেন, যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ তুলনামূলকভাবে বসে থাকা জীবনযাপন করেন, তাই তাঁরা আসলে যতটা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি প্রোটিন গ্রহণ করছেন — যা সম্ভবত স্বাস্থ্যের জন্য নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনছে।
এর পেছনের প্রক্রিয়া: একটি হরমোনের ভূমিকা
গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক নিয়ামক হিসেবে উঠে এসেছে FGF21 (ফাইব্রোব্লাস্ট গ্রোথ ফ্যাক্টর ২১) নামের একটি হরমোন, যা লিভার থেকে নিঃসৃত হয় এবং প্রোটিন গ্রহণ কমলে এর মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন শরীরের শক্তি ব্যয় বাড়াতে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ইঁদুরের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরের শরীরে FGF21-এর মাত্রা বেশি, তারা তুলনামূলক দীর্ঘজীবী হয়েছে — এবং এই সুফল পুরুষ ইঁদুরদের মধ্যে নারী ইঁদুরদের তুলনায় বেশি স্পষ্ট ছিল।
মানুষের ক্ষেত্রে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে কম প্রোটিন গ্রহণের সঙ্গে ওজন হ্রাস, চর্বির পরিমাণ কমা এবং উপবাসকালীন রক্তে শর্করার মাত্রা কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে সবার জন্য নয় — গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
গবেষকরা নিজেরাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই ফলাফলের অর্থ এই নয় যে সবাইকে নাটকীয়ভাবে প্রোটিন গ্রহণ কমাতে হবে। বয়স, স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ধরনভেদে পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হয়। বিশেষত তিনটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য নয়:
- বয়স্ক ব্যক্তি — পেশি ক্ষয় ঠেকাতে তাঁদের বেশি প্রোটিন প্রয়োজন হতে পারে
- গর্ভবতী নারী — ভ্রূণের বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত প্রোটিন প্রয়োজন
- শারীরিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি ও ক্রীড়াবিদ — পেশি গঠন ও মেরামতে প্রোটিনের ভূমিকা এখানে “সম্পূর্ণ স্পষ্ট”, ল্যামিং নিজেই এই কথা জোর দিয়ে বলেছেন
অর্থাৎ, গবেষণার মূল বার্তা প্রোটিন বর্জনের আহ্বান নয়, বরং একই মাপের পুষ্টি-পরামর্শ সবার জন্য প্রযোজ্য কিনা — সেই প্রশ্ন তোলা।
প্রমাণের শক্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
বিজ্ঞান সাংবাদিকতার একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, একটি পর্যালোচনা নতুন কোনো ট্রায়াল নয় — এটি বিদ্যমান গবেষণার সংশ্লেষণ মাত্র। এই ক্ষেত্রেও তাই। প্রক্রিয়াগত (mechanistic) প্রমাণের একটি বড় অংশ এসেছে প্রাণী ও কোষ-পর্যায়ের গবেষণা থেকে, মানুষের ওপর সরাসরি পরীক্ষা থেকে নয়। মানুষের ট্রায়ালে যেসব ফলাফল পাওয়া গেছে, তা উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এখনো সীমিত।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রচলিত দৈনিক প্রোটিন গ্রহণের সুপারিশ (RDA) শরীরের ওজনের প্রতি কেজিতে প্রায় ০.৮ গ্রাম — যা নাইট্রোজেন ভারসাম্য সংক্রান্ত পুরনো গবেষণা থেকে নির্ধারিত। বাজারে প্রচলিত অনেক জনপ্রিয় “হাই প্রোটিন” লক্ষ্যমাত্রা এই মানের চেয়ে অনেক বেশি।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ
এই পর্যালোচনা এককভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি প্রশ্ন তোলে — বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হওয়া পুষ্টি-প্রবণতা কি সবসময় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাদ্যপণ্যের বাজার যেভাবে বাড়ছে, তার বিপরীতে এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয় — পুষ্টি বিজ্ঞানে “যত বেশি তত ভালো” নীতি সবসময় কাজ করে না, এবং ব্যক্তিভেদে চাহিদার পার্থক্য বিবেচনায় না নিলে সরলীকৃত পরামর্শ বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
গবেষণাটি ১১টি prospective cohort study-তে মোট ৩,৫০,৪৫২ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। ফলগুলো সম্পর্ক নির্দেশ করে, সরাসরি কার্যকারণ নয়। মূল গবেষণা
[এই প্রতিবেদনটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি। ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে একজন চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।]
আপনার মতামত জানানঃ