
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের একটি চুনাপাথরের গুহায় পড়ে ছিল কয়েকটি ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত ও চোয়ালের অংশ। চোখে দেখলে সেগুলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আর দশটি ভগ্নাবশেষের মতোই। কিন্তু দাঁতের গায়ে ছিল অস্বাভাবিক গভীর, গোলাকার খাঁজ—যেন বহু বছর ধরে শক্ত কোনো বস্তু একই জায়গায় চেপে ধরা হয়েছিল।
সেই ক্ষুদ্র ক্ষতচিহ্নই শেষ পর্যন্ত মানুষের নেশা, চিকিৎসা ও অভ্যাসের ইতিহাসকে হাজার হাজার বছর পেছনে নিয়ে গেছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে Science Advances–এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সুলাওয়েসির প্রাচীন শিকারি–সংগ্রাহকেরা সম্ভবত ২৫ হাজার বছর আগেও গোটা সুপারি মুখে রেখে নিয়মিত চুষতেন। সুপারির বৈজ্ঞানিক নাম Areca catechu। এর প্রধান স্নায়ুসক্রিয় উপাদান অ্যারেকোলিন মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরে উত্তেজক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা সঠিক হলে, এটি মানুষের নিয়মিত স্নায়ুসক্রিয় উদ্ভিদ ব্যবহারের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্যক্ষ প্রমাণ হতে পারে। মূল গবেষণা: Science Advances
দুই মানুষ, দুই সময়, একই রহস্য
গবেষণায় দুটি প্রাক-কৃষি যুগের মানবকঙ্কাল পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রথম ব্যক্তির দেহাবশেষ পাওয়া যায় লিয়াং বুলু বেত্তু গুহায়। তিনি আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছর আগে বেঁচে ছিলেন—শেষ বরফযুগের একটি পর্যায়ে। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর।
দ্বিতীয় ব্যক্তির দেহাবশেষ তুলনামূলক নতুন—প্রায় ৭ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ বছরের পুরোনো। তাঁর বয়সও চল্লিশের বেশি ছিল বলে ধারণা করা হয়েছে। দুজনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হাজার হাজার বছর, কিন্তু দাঁতের ক্ষয়ের ধরন ছিল বিস্ময়করভাবে মিল।
তাঁদের কয়েকটি দাঁতে গভীর ও গোলাকার খাঁজ তৈরি হয়েছিল। স্বাভাবিক খাবার চিবানো, পাথরের সরঞ্জাম দাঁতে ধরে রাখা কিংবা প্রচলিত দাঁতের রোগ দিয়ে এই বিশেষ ক্ষয় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।
খাঁজগুলোর আকার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, এক থেকে দুই সেন্টিমিটার ব্যাসের শক্ত ও প্রায় গোল কোনো বস্তু দীর্ঘ সময় ধরে দাঁতের একই জায়গায় রাখা হতো। সুলাওয়েসির পরিবেশ, স্থানীয় উদ্ভিদ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সুপারির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিবেচনা করে গবেষকদের সন্দেহ যায় সুপারির দিকে।
দাঁত কীভাবে সাক্ষী হলো
প্রাগৈতিহাসিক মানুষ কী খেত বা ব্যবহার করত, তা জানার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সাধারণত বীজ, পরাগ, পাত্রের অবশেষ কিংবা পোড়া উদ্ভিদ খোঁজেন। কিন্তু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র পরিবেশে উদ্ভিজ্জ বস্তু সহজেই পচে যায়। সুপারির মতো জৈব পদার্থ হাজার হাজার বছর টিকে থাকা আরও কঠিন।
দাঁত সেখানে এক ধরনের জৈব আর্কাইভ। দাঁতের এনামেল মানবদেহের সবচেয়ে কঠিন অংশ। দীর্ঘদিনের কাজ, খাদ্যাভ্যাস ও মুখে ধরে রাখা বস্তুর ঘর্ষণ সেখানে স্থায়ী চিহ্ন রেখে যেতে পারে। দাঁতের টিস্যু ও জমাট ক্যালকুলাসে রাসায়নিক অণুও কখনো সংরক্ষিত থাকে।
গবেষকেরা শুধু খাঁজের আকৃতির ওপর নির্ভর করেননি। দাঁতের টিস্যুতে সুপারির প্রধান স্নায়ুসক্রিয় অ্যালকালয়েড অ্যারেকোলিনের উপস্থিতিও শনাক্ত করা হয়েছে।
একটি দৃশ্যমান শারীরিক চিহ্ন এবং একটি রাসায়নিক সংকেত—দুই ধরনের প্রমাণ একই ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করেছে।
তবু বিজ্ঞানের ভাষায় এটি শতভাগ নিশ্চিত কোনো ভিডিওচিত্র নয়। গবেষণাটি মাত্র দুই ব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে। সবচেয়ে প্রাচীন নমুনাটির বয়সও একটি পরিসর—২৫ থেকে ১৬ হাজার বছর। তাই “২৫ হাজার বছর আগে” কথাটি সেই পরিসরের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য বয়স; ঘটনাটি ঠিক ২৫ হাজার বছর আগের বলে নির্দিষ্ট করা যায় না।
চিবানো নয়, সম্ভবত চুষে রাখা
আজ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চলে সুপারি পানের পাতা, চুন, তামাক কিংবা অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে চিবানো হয়। চুন রাসায়নিক পরিবেশ বদলে অ্যারেকোলিন দ্রুত শোষিত হতে সাহায্য করে।
কিন্তু প্রাচীন দাঁতের চিহ্ন আধুনিক পান–সুপারি চিবানোর পরিচিত ক্ষয়ের মতো ছিল না। গবেষকদের ধারণা, ওই মানুষেরা গোটা সুপারি অনেকক্ষণ মুখে রেখে চুষতেন—কঠিন মিষ্টির মতো।
এই অনুমান যাচাই করতে গবেষকেরা কৃত্রিম লালায় গোটা সুপারি ভিজিয়ে দেখেন। পরে সেই তরল এমন ব্যাঙের ডিম্বকোষে পরীক্ষা করা হয়, যেগুলোতে মানুষের স্নায়ুগ্রাহক বা রিসেপ্টর তৈরি করা হয়েছিল।
পরীক্ষায় দেখা যায়, চুন ছাড়াই গোটা সুপারি থেকে পর্যাপ্ত অ্যারেকোলিন বের হতে পারে এবং তা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। প্রভাব আধুনিক পান–সুপারির তুলনায় দুর্বল হতে পারে, কিন্তু একেবারে নিষ্ক্রিয় নয়।
এই পরীক্ষাই দাঁতের খাঁজ, রাসায়নিক অবশেষ এবং সম্ভাব্য ব্যবহারের পদ্ধতিকে একটি যৌক্তিক সূত্রে যুক্ত করেছে। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়
নেশা, নাকি প্রাচীন ওষুধ?
“মাদক” শব্দটি শুনলে আধুনিক অবৈধ নেশাদ্রব্যের ছবি মনে আসে। কিন্তু স্নায়ুসক্রিয় উদ্ভিদের মানব ইতিহাস অনেক বেশি জটিল। একই পদার্থ কখনো উত্তেজক, কখনো ব্যথানাশক, কখনো সামাজিক আচার, আবার কখনো ধর্মীয় বা চিকিৎসাগত উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সুপারি হালকা উচ্ছ্বাস, সতর্কতা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে। অ্যারেকোলিনের ব্যথা কমানোর বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। গবেষকদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, প্রাচীন মানুষেরা দাঁত বা মুখের ব্যথা কমাতে সুপারি চুষতেন।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে এক নির্মম চক্র। শক্ত সুপারি নিয়মিত দাঁতে ঘষা খেয়ে খাঁজ আরও গভীর করত। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষয় দাঁতের ভেতরের পাল্প বা স্নায়ুযুক্ত অংশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এতে ব্যথা, খেতে সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার কথা।
যে বস্তু সাময়িক আরাম দিচ্ছিল, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে ব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে; নতুন ব্যথা আবার সেই বস্তু ব্যবহারের প্রয়োজন বাড়িয়েছে।
এটি আসক্তির নিশ্চিত চিকিৎসাগত নির্ণয় নয়। কঙ্কাল দেখে কারও মানসিক নির্ভরতা মাপা যায় না। কিন্তু বহু বছরের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার ও তার শারীরিক ক্ষতি অভ্যাসগত ব্যবহারের শক্ত প্রমাণ দেয়।
কৃষির আগেই কি নেশার সংস্কৃতি ছিল?
দীর্ঘদিন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে মানুষ স্থায়ী বসতি ও কৃষি গড়ে তোলার পরই নিয়মিত স্নায়ুসক্রিয় পদার্থ ব্যবহারের সংস্কৃতি তৈরি করে। কৃষি শস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ সহজ করেছিল; সেই উদ্বৃত্ত শস্য থেকেই গাঁজন করা পানীয় সম্ভব হয়েছিল।
ইসরায়েলে প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের বিয়ার তৈরির প্রমাণ এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। সুলাওয়েসির আবিষ্কার অবশ্য ভিন্ন ছবি দেখায়। সবচেয়ে পুরোনো ব্যক্তিটি কৃষি আসার বহু হাজার বছর আগে বেঁচে ছিলেন।
অর্থাৎ শিকারি–সংগ্রাহকেরাও পরিবেশের উদ্ভিদ, তাদের ঔষধি গুণ এবং চেতনা পরিবর্তনের ক্ষমতা সম্পর্কে সূক্ষ্ম জ্ঞান রাখতেন।
এতে প্রমাণ হয় না যে সব প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একই অভ্যাস ছিল। বরং বোঝা যায়, স্নায়ুসক্রিয় উদ্ভিদ ব্যবহারের ইতিহাস কৃষির সঙ্গে একবারে শুরু হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় উদ্ভিদ ও সংস্কৃতির ভেতর আলাদাভাবে এসব অভ্যাস জন্ম নিতে পারে।
একটি বাদাম নয়, আসলে বীজ
ইংরেজি “বেটেল নাট” নামটি কিছুটা বিভ্রান্তিকর। এটি প্রকৃত বাদাম নয়, অ্যারেকা পামের ফলের বীজ। “বেটেল” আবার পানের লতাকে বোঝায়। আধুনিক ব্যবহারে পানপাতা ও সুপারি প্রায়ই একসঙ্গে থাকে বলে দুটি নাম মিশে গেছে।
ভারত থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত সুপারি আতিথেয়তা, সামাজিক বন্ধন, বিবাহ, ধর্মীয় আচার ও পরিচয়ের অংশ। ফলে এটিকে কেবল “নেশা” বললে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক অর্থ বাদ পড়ে যায়।
আবার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলেও এর স্বাস্থ্যক্ষতি অস্বীকার করা যায় না।
বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ সুপারি ব্যবহার করেন। আধুনিক গবেষণায় সুপারি ও পান–সুপারির ব্যবহার মুখগহ্বরের ক্ষত, পেরিয়োডন্টাল রোগ, নির্ভরতা এবং মুখের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার তামাক না থাকলেও সুপারিকে মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। IARC পর্যালোচনা
এই নতুন আবিষ্কার তাই কোনো প্রাচীন অভ্যাস অনুসরণ করার আহ্বান নয়। এটি বরং দেখায়, একটি উদ্ভিদের সাময়িক উপকার, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কীভাবে একই ইতিহাসের অংশ হতে পারে।
ছোট নমুনা, বড় সম্ভাবনা
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা তার নমুনা—মাত্র দুই ব্যক্তি। তাঁদের দাঁতের চিহ্ন দেখে পুরো সুলাওয়েসি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা সমগ্র মানবজাতির অভ্যাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।
রাসায়নিক দূষণ, সংরক্ষণের অবস্থা এবং ক্ষয়ের বিকল্প কারণও প্রত্নবিজ্ঞানে সব সময় বিবেচনায় রাখতে হয়।
তবে দুই ভিন্ন সময়ের মানুষের দাঁতে একই অস্বাভাবিক চিহ্ন এবং অ্যারেকোলিনের উপস্থিতি একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক প্রথার সম্ভাবনা তৈরি করে। ভবিষ্যতে অন্য কঙ্কাল, দাঁতের ক্যালকুলাস এবং গুহাস্থল পরীক্ষা করলে জানা যেতে পারে—এই অভ্যাস কতটা বিস্তৃত ছিল, কীভাবে ছড়িয়েছিল এবং এর সামাজিক অর্থ কী ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এখন হয়তো এমন অনেক পুরোনো দাঁত নতুন চোখে দেখবেন, যেগুলোর খাঁজ আগে খাদ্য বা কাজের সাধারণ ক্ষয় হিসেবে ধরা হয়েছিল।
নতুন রাসায়নিক প্রযুক্তি আরও পুরোনো নমুনা থেকেও কোকা, তামাক, আফিমজাত উদ্ভিদ কিংবা অজানা স্নায়ুসক্রিয় পদার্থের চিহ্ন শনাক্ত করার পথ খুলতে পারে।
দাঁতের ভেতর মানুষের চিরচেনা গল্প
সুলাওয়েসির দাঁত আমাদের শুধু বলে না যে মানুষ হাজার হাজার বছর আগে সুপারি চুষত। এগুলো মানুষের একটি চিরচেনা বৈপরীত্যও দেখায়: আমরা ব্যথা কমাতে চাই, সতর্ক থাকতে চাই, আনন্দ অনুভব করতে চাই এবং সামাজিক বন্ধনের অংশ হতে চাই। কিন্তু যে উপায়টি সাময়িক স্বস্তি দেয়, সেটিই কখনো নতুন ক্ষতি ও নির্ভরতা তৈরি করে।
প্রাগৈতিহাসিক ওই মানুষরা তাঁদের অভ্যাস নিয়ে কোনো লেখা রেখে যাননি। তাঁদের ভাষা, বিশ্বাস বা উদ্দেশ্যও আমাদের অজানা। রয়ে গেছে দাঁতের গভীর খাঁজ এবং কয়েকটি রাসায়নিক অণু।
সেই নীরব চিহ্নগুলো বলছে, চেতনা বদলানো উদ্ভিদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সভ্যতা, কৃষি কিংবা লিখিত ইতিহাসের চেয়েও পুরোনো হতে পারে।
ইতিহাস কখনো পাথরের দেয়ালে লেখা থাকে, কখনো মাটির পাত্রে। আবার কখনো মানুষের নিজের শরীরই হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দলিল।
আপনার মতামত জানানঃ