
কেউ রাস্তায় একটি টাকাভর্তি মানিব্যাগ পেলেন। আশপাশে কেউ নেই, কোনো ক্যামেরাও নেই। মানিব্যাগটি রেখে দিলে তাঁর তাৎক্ষণিক লাভ; মালিককে ফিরিয়ে দিলে হয়তো কোনো পুরস্কারই মিলবে না। তিনি কী করবেন?
নৈতিকতার সবচেয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোর একটি এই ছোট্ট ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে: কেউ দেখছে না—তবু মানুষ ভালো কাজ করবে কেন?
আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো, ভালো মানুষ হয়ে লাভ কী? সৎ ব্যবসায়ী সুযোগ হারাতে পারেন, নীতিবান কর্মী পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, সত্যবাদী মানুষ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারেন। বিপরীতে প্রতারণা, চাটুকারিতা বা নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে অনেককে দৃশ্যত সফল হতে দেখা যায়।
তবে নৈতিকতার মূল্য কি তাহলে কেবল পরকালের পুরস্কার, সামাজিক প্রশংসা অথবা শাস্তির ভয়? নাকি ভালোভাবে বেঁচে থাকার মধ্যেই এমন এক লাভ আছে, যেটি টাকা, ক্ষমতা বা তাৎক্ষণিক সাফল্যে মাপা যায় না?
নৈতিকতা কোথা থেকে এলো?
মানুষ নৈতিকতার কথা বলার বহু আগে থেকেই দলবদ্ধভাবে বেঁচে ছিল। শিকার, খাদ্য ভাগাভাগি, সন্তান লালন, বিপদ থেকে রক্ষা—এসবের জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। যে গোষ্ঠীর সদস্যরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারত, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
এখানেই নৈতিকতার একটি বিবর্তনীয় ভিত্তি পাওয়া যায়। সহযোগিতা শুধু মহৎ আবেগ নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি বেঁচে থাকার কৌশল।
পরিবারের সদস্যকে সাহায্য করলে নিজের জিনের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হতে পারে। কেউ আজ আমাকে সাহায্য করলে ভবিষ্যতে আমি তাকে সাহায্য করতে পারি—এটি প্রত্যক্ষ পারস্পরিকতা। আবার একজন সৎ ও সহযোগী হিসেবে পরিচিত হলে অন্যরা ভবিষ্যতে আমার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে—এটি পরোক্ষ পারস্পরিকতা।
মানুষের সহযোগিতাবিষয়ক গবেষণায় খ্যাতি, পারস্পরিকতা এবং সুযোগসন্ধানীদের নিয়ন্ত্রণকে বড় উপাদান হিসেবে দেখা হয়। মানুষের সহযোগিতার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে গবেষণা এবং খ্যাতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা দেখায়, ‘ভালো’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার সঙ্গে সামাজিক আস্থা ও সহযোগিতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে বিবর্তন নৈতিকতার উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে; কোন কাজ নৈতিক হওয়া উচিত, তা একা নির্ধারণ করতে পারে না। মানুষের মধ্যে প্রতিশোধ, পক্ষপাত এবং গোষ্ঠীবিদ্বেষও বিবর্তিত হয়েছে। কোনো প্রবণতা প্রাকৃতিক হলেই সেটি ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।
নৈতিকতা তাই শুধু প্রবৃত্তি নয়। এটি প্রবৃত্তির বিচারও।
গাইজিসের আংটি: ধরা না পড়লে কেন সৎ থাকব?
প্লেটোর রিপাবলিক-এ গ্লকন ‘গাইজিসের আংটি’র গল্প বলেন। আংটিটি পরলে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। ফলে তার অপরাধ দেখার বা তাকে শাস্তি দেওয়ার কেউ থাকে না।
গ্লকনের চ্যালেঞ্জ ছিল নির্মম: ন্যায়পরায়ণ ও অন্যায়কারী—উভয়কে যদি এমন আংটি দেওয়া হয়, তারা কি শেষ পর্যন্ত একই কাজ করবে না? মানুষ কি ন্যায়কে ভালোবাসে, নাকি শুধু ধরা পড়ার ভয়েই ন্যায়পরায়ণ থাকে?
আজকের ভাষায় এটি হতে পারে অদৃশ্য ব্যাংক লেনদেন, পরিচয়হীন অনলাইন অ্যাকাউন্ট, ক্ষমতাবান কর্মকর্তার দায়মুক্তি কিংবা এমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে জবাবদিহি নেই।
প্লেটোর উত্তর ছিল—অন্যায় কেবল ভুক্তভোগীর ক্ষতি করে না; অন্যায়কারীর আত্মাকেও বিশৃঙ্খল করে। লোভ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কামনা যখন যুক্তি এবং ন্যায়বোধকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন মানুষ বাইরে সফল হলেও নিজের ভেতরে স্বাধীন থাকে না।
এই উত্তর অর্থনৈতিক লাভের হিসাব দেয় না। বরং ‘লাভ’ শব্দটির অর্থই বদলে দেয়। সবকিছু পাওয়া যদি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিনিময়ে হয়, তবে তাকে কি সত্যিকার লাভ বলা যায়?
অ্যারিস্টটল: ভালো কাজ নয়, ভালো জীবন
অ্যারিস্টটলের কাছে নৈতিকতার মূল প্রশ্ন ছিল না—‘কোন নিয়মটি মানব?’ তাঁর প্রশ্ন ছিল—‘আমি কেমন মানুষ হয়ে উঠব?’
একটি সৎ কাজ করলেই কেউ সৎ মানুষ হয়ে যায় না। ন্যায়, সাহস, সংযম ও উদারতার মতো গুণ বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে চরিত্রে পরিণত হয়। যেমন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কেউ সুরকার হয়, তেমনি ন্যায়সংগত কাজের অভ্যাস মানুষকে ন্যায়পরায়ণ করে।
অ্যারিস্টটলের নৈতিকতার লক্ষ্য ইউডাইমোনিয়া—যাকে শুধু ‘সুখ’ বললে অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি ভালোভাবে বিকশিত, অর্থপূর্ণ ও পরিপূর্ণ জীবন। সম্পদ, বন্ধুত্ব, স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিবেশের প্রয়োজন তিনি অস্বীকার করেননি; তবে এগুলোকে ভালো জীবনের উপকরণ হিসেবে দেখেছেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নয়।
তাঁর মতে, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; যথার্থ কারণে, যথার্থ সময়ে, যথার্থ মাত্রায় ভয়কে অতিক্রম করা। উদারতা মানে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া নয়; উপযুক্ত মানুষকে উপযুক্ত পরিমাণে দেওয়া। গুণ প্রায়ই দুই বিপরীত বিচ্যুতির মাঝামাঝি বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন অবস্থান।
অ্যারিস্টটলের নৈতিকতা সম্পর্কে Stanford Encyclopedia of Philosophy ব্যাখ্যা করে, তাঁর নৈতিক গুণগুলো একই সঙ্গে যুক্তিনির্ভর, আবেগগত ও সামাজিক দক্ষতা। সুতরাং ভালো মানুষ হওয়া কোনো নিষ্ক্রিয় কোমলতা নয়; এটি সঠিকভাবে বিচার ও কাজ করার অর্জিত সক্ষমতা।
এই দৃষ্টিতে ভালো মানুষের লাভ হলো—তিনি শুধু মাঝে মাঝে ভালো ফল পান না; ভালোভাবে জীবন পরিচালনার যোগ্য হয়ে ওঠেন।
কান্ট: লাভের জন্য ভালো হলে সেটি কি নৈতিকতা?
ধরা যাক, একজন দোকানি কখনো ক্রেতাকে ঠকান না। তিনি কি সৎ?
ইমানুয়েল কান্ট বলবেন, উত্তর নির্ভর করবে তাঁর উদ্দেশ্যের ওপর। দোকানি যদি সুনাম ও ব্যবসা রক্ষার জন্য সততা পালন করেন, কাজটি নিয়মসম্মত হলেও তার নৈতিক মূল্য সীমিত। কিন্তু লাভ না হলেও প্রতারণা অন্যায়—এই কর্তব্যবোধ থেকে সৎ থাকলে কাজটি প্রকৃত নৈতিক মর্যাদা পায়।
কান্টের কাছে একমাত্র শর্তহীন ভালো বিষয় হলো ‘সৎ ইচ্ছা’—এমন ইচ্ছা, যা সুবিধার কারণে নয়, নৈতিক আইনের প্রতি সম্মান থেকে কাজ করে। কান্টের নৈতিক দর্শনের ব্যাখ্যায় ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার ওপরে নৈতিক নীতিকে স্থান দেওয়াই সৎ ইচ্ছার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য।
তাঁর বিখ্যাত নীতির একটি রূপ হলো: এমন নিয়মে কাজ করো, যেটিকে তুমি সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়ম হিসেবে চাইতে পারো।
আমি বিপদে পড়লে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেব—এটি যদি সর্বজনীন নিয়ম হয়, তবে প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাসই বিলীন হবে। ফলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ধারণাটিও নিজেকে ধ্বংস করে।
কান্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন: মানুষকে কখনো শুধু নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিটি মানুষ নিজেই একটি উদ্দেশ্য।
এই নীতির আলোকে শ্রমিককে কেবল মুনাফার যন্ত্র, ভোটারকে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি অথবা বন্ধুকে সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে দেখা অনৈতিক—এমনকি তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া গেলেও।
কান্টের উত্তর তাই কঠোর: লাভের প্রত্যাশায় ভালো হওয়া ব্যবসায়িক বিচক্ষণতা হতে পারে, কিন্তু সেটিই নৈতিকতার সম্পূর্ণ অর্থ নয়।
উপযোগবাদ: ফল ভালো না হলে সদিচ্ছার মূল্য কত?
অন্যদিকে জেরেমি বেন্থাম ও জন স্টুয়ার্ট মিলের সঙ্গে যুক্ত উপযোগবাদ বলবে—কাজের নৈতিকতা বিচার করতে হলে তার ফল দেখতে হবে। যে সিদ্ধান্ত সামগ্রিক সুখ ও কল্যাণ বাড়ায় এবং কষ্ট কমায়, সেটিই অধিকতর নৈতিক।
একজন চিকিৎসক যদি শুধু ‘সৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে এমন চিকিৎসা দেন যা রোগীর ক্ষতি করে, সদিচ্ছা তাঁকে দায়মুক্ত করে না। রাষ্ট্র যদি নীতিগত পবিত্রতার দাবি করে এমন সিদ্ধান্ত নেয় যা লাখো মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে, তবে ফলাফল উপেক্ষা করা যায় না।
উপযোগবাদের ইতিহাস এবং পরিণামবাদ সম্পর্কিত আলোচনায় কাজ বা নীতির মূল্যকে তার উৎপাদিত সামগ্রিক ফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সুখের জন্য সংখ্যালঘুর অধিকার কেড়ে নেওয়া কি বৈধ? পাঁচজনকে বাঁচানোর জন্য একজন নির্দোষ মানুষকে বলি দেওয়া যাবে? যদি শুধু মোট ফলই গুরুত্বপূর্ণ হয়, ব্যক্তি কখনো হিসাবের একটি সংখ্যায় পরিণত হতে পারেন।
এ কারণেই আধুনিক নৈতিক সিদ্ধান্তে ফল, অধিকার ও চরিত্র—তিনটি মাত্রাই বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ভালো মানুষ কি সব সময় হারেন?
বাস্তবে সততার তাৎক্ষণিক মূল্য দিতে হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে সৎ কর্মী একঘরে হতে পারেন। প্রতারণা প্রত্যাখ্যান করলে ব্যবসা হাতছাড়া হতে পারে। অন্যায়ের প্রতিবাদ চাকরি, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক সম্পর্ক বিপন্ন করতে পারে।
সক্রেটিস নিজের দর্শন ও নৈতিক অবস্থান ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ নেননি। মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা অসংখ্য নামহীন প্রতিবাদকারী নৈতিক অবস্থানের জন্য মূল্য দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনে নৈতিকতা কোনো লাভজনক বিনিয়োগ ছিল না।
অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ, নিষ্ঠুর ও প্রতারক মানুষকে দীর্ঘদিন ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী থাকতেও দেখা যায়। পৃথিবী এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় নৈতিক যন্ত্র নয়, যেখানে প্রতিটি ভালো কাজের সঙ্গে তাৎক্ষণিক পুরস্কারের রসিদ বেরিয়ে আসে।
সুতরাং ‘ভালো হলেই ভালো ফল পাব’—এটি দর্শন নয়; বরং সান্ত্বনামূলক বিশ্বাস।
তবে অন্য একটি সত্যও আছে। বিশ্বাসযোগ্যতা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, ব্যবসা ও সহযোগিতার মূলধন। যে সমাজে মানুষ পরস্পরের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করতে পারে না, সেখানে প্রতিটি লেনদেনে পাহারা, জামানত, মামলা ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়। অবিশ্বাসেরও বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে ভালো চরিত্রের লাভ প্রায়ই পরোক্ষ—বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু, স্থায়ী সম্পর্ক, মানসিক সামঞ্জস্য এবং এমন একটি পরিচয়, যার সঙ্গে মানুষকে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় না।
নৈতিকতা কি কেবল উন্নত স্বার্থপরতা?
যদি সৎ হওয়ার কারণে সুনাম, সম্পর্ক এবং মানসিক শান্তি পাওয়া যায়, তবে কি নৈতিকতা আসলে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থপরতা?
আংশিকভাবে হতে পারে। সমাজ মানুষের ভালো আচরণকে পুরস্কৃত করার জন্যই প্রশংসা, সম্মান ও খ্যাতির ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু নৈতিকতার সবটুকু এতে ধরা পড়ে না।
কেউ ডুবে যাওয়া অচেনা মানুষকে বাঁচাতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেন। কেউ গোপনে দান করেন—যেখানে পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ নেই। কেউ পরিবার, গোষ্ঠী বা দেশের বিরুদ্ধে গিয়েও নির্যাতিত অপরিচিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ান।
এ ধরনের কাজকে শুধু ভবিষ্যৎ সুবিধার হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, পরিচয়ের বিস্তার এবং নিজের চেয়ে বড় কোনো মূল্যবোধের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নৈতিকতার প্রেরণা মিশ্র হতে পারে। একজন মানুষ একই সঙ্গে কর্তব্য, সহানুভূতি, সুনাম এবং আত্মসম্মানের কারণে ভালো কাজ করতে পারেন। মিশ্র উদ্দেশ্য কাজটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যহীন করে না।
‘ভালো’ হওয়া মানে কি দুর্বল হওয়া?
আমাদের সমাজে ভালো মানুষকে প্রায়ই এমন একজন হিসেবে কল্পনা করা হয়, যিনি প্রতিবাদ করেন না, সবাইকে সন্তুষ্ট রাখেন এবং নিজের অধিকার ছেড়ে দেন। এটি নৈতিকতার বিপজ্জনক বিকৃতি।
অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা দয়া নয়। নির্যাতনকারীকে বাধা না দেওয়া ক্ষমাশীলতা নয়। নিজের সীমা রক্ষা করা স্বার্থপরতা নয়।
গুণনৈতিকতার ভাষায় ভালো মানুষের সহমর্মিতার পাশাপাশি সাহস, ন্যায়বোধ এবং বাস্তব প্রজ্ঞাও দরকার। কখন নম্র হতে হবে, কখন ‘না’ বলতে হবে এবং কখন সংঘাতের ঝুঁকি নিতে হবে—নৈতিকতা এসবের বিচার।
ভালো মানুষ হওয়া মানে ব্যবহৃত হওয়ার অনুমতি দেওয়া নয়। বরং নিজের ও অন্যের মানবিক মর্যাদাকে একই নৈতিক গুরুত্ব দেওয়া।
সমাজের জন্য নৈতিকতা কেন প্রয়োজন?
একটি সমাজ কেবল আইন দিয়ে চলে না। আইন প্রতিটি প্রতিশ্রুতি, বন্ধুত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা দৈনন্দিন বিনিময় পাহারা দিতে পারে না। অধিকাংশ সামাজিক কাজ সম্ভব হয়, কারণ আমরা ধরে নিই—সবাই প্রতিটি সুযোগে প্রতারণা করবে না।
চিকিৎসক রোগীর দুর্বলতার সুযোগ নেবেন না, শিক্ষক মূল্যায়নে পক্ষপাত করবেন না, সাংবাদিক তথ্য বিকৃত করবেন না, বিচারক ক্ষমতাবানের নির্দেশ মানবেন না—এই প্রত্যাশাগুলোই প্রতিষ্ঠানকে অর্থবহ করে।
নৈতিকতা ভেঙে পড়লে আইনও অকার্যকর হয়ে যায়। কারণ আইন প্রয়োগকারী, সাক্ষী, তদন্তকারী এবং বিচারক—সবাই যদি ব্যক্তিগত সুবিধাকে চূড়ান্ত মানদণ্ড মনে করেন, তবে নিয়ম কাগজে থাকলেও ন্যায়বিচার থাকে না।
নৈতিকতা তাই ব্যক্তিগত সৌন্দর্য মাত্র নয়; এটি সামাজিক অবকাঠামো।
রাস্তা, সেতু বা বিদ্যুতের মতোই আস্থা একটি জনসম্পদ। পার্থক্য হলো—আস্থা নির্মাণে বহু মানুষের দীর্ঘদিন লাগে, অথচ ধ্বংস করতে কয়েকটি বিশ্বাসঘাতকতাই যথেষ্ট।
তাহলে ভালো মানুষ হওয়ার লাভ কোথায়?
প্রশ্নটির একক উত্তর নেই, কারণ লাভের ধারণাই বহুমাত্রিক।
অর্থ ও ক্ষমতার বিচারে ভালো মানুষ সব সময় লাভবান হন না। সামাজিক সুনামের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়তা নেই; কোনো কোনো সমাজে অন্যায়ই পুরস্কৃত হয়। এমনকি মানসিক শান্তিও নিশ্চিত নয়—বিবেকবান মানুষ অন্যায়ের যন্ত্রণা কখনো বেশি অনুভব করেন।
তবু ভালো হওয়ার অন্তত তিন ধরনের মূল্য রয়েছে।
প্রথমত, ব্যক্তিগত মূল্য—নিজের সিদ্ধান্ত, চরিত্র ও জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। আয়নায় দেখা মানুষটির প্রতি সম্মান হারাতে না হওয়া।
দ্বিতীয়ত, সম্পর্কগত মূল্য—বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা যেখানে সবাইকে সারাক্ষণ আত্মরক্ষা করতে হয় না।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য—এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেখানে দুর্বল মানুষের অধিকার ক্ষমতাবানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।
কিন্তু নৈতিকতার সর্বোচ্চ মূল্য সম্ভবত এখানেও নয়। প্রকৃত নৈতিকতা শুরু হয় তখন, যখন মানুষ স্বীকার করে—অন্য মানুষের সুখ, যন্ত্রণা ও মর্যাদা আমার লাভের হিসাবের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, ভালো মানুষ হওয়া কোনো নিশ্চিত লাভের প্রকল্প নয়। নৈতিকতা অনুসরণ করলে অর্থ, ক্ষমতা কিংবা নিরাপত্তা পাওয়া যাবে—দর্শন এমন প্রতিশ্রুতি দেয় না।
অ্যারিস্টটল বলবেন, গুণ ছাড়া আমরা ভালোভাবে বাঁচতেই শিখি না। কান্ট বলবেন, লাভের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদাকে স্বীকার করাই নৈতিকতার পরীক্ষা। উপযোগবাদ মনে করিয়ে দেবে, মহৎ উদ্দেশ্যের পাশাপাশি কাজের বাস্তব ফলও দেখতে হবে। বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা দেখাবে, সহযোগিতা ও বিশ্বাস ছাড়া মানুষের সমাজ টেকেই না।
তাই ‘ভালো মানুষ হওয়া কি লাভজনক?’—এই প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো: সব সময় নয়, অন্তত বাজারের প্রচলিত হিসাবে নয়।
তবে যে সমাজে কেউ ভালো হওয়ার ঝুঁকি নেয় না, সেখানে শেষ পর্যন্ত লাভবান হওয়ার মতো সমাজও অবশিষ্ট থাকে না। আর যে মানুষ প্রতিটি সিদ্ধান্তে শুধু লাভ খোঁজেন, তিনি হয়তো অনেক কিছু অর্জন করেন—কিন্তু কোন ধরনের মানুষ হয়ে উঠছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর হারিয়ে ফেলেন।
নৈতিকতার প্রয়োজন এখানেই: এটি আমাদের শুধু কী পাওয়া উচিত বলে না; আমরা কেমন মানুষ এবং কেমন পৃথিবীতে বাঁচতে চাই—সেই সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়।
আপনার মতামত জানানঃ