
ধরা যাক, একই রাজনৈতিক ঘটনার দুটি সংবাদ আপনার সামনে রাখা হলো। একটিতে আপনার পছন্দের দলকে সফল বলা হয়েছে, অন্যটিতে সেই দলের ব্যর্থতার প্রমাণ হাজির করা হয়েছে। কোন প্রতিবেদনটি আপনি আগে খুলবেন? কোনটির তথ্যসূত্র বেশি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবেন? আর কোনটির দুর্বলতা খুঁজতে আপনার মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় হবে?
অধিকাংশ মানুষই বলবে, তারা নিরপেক্ষভাবে দুটিই বিচার করবে। বাস্তবে আমরা প্রায়ই তা করি না।
নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন সংবাদে ছোটখাটো ত্রুটি উপেক্ষা করি। বিপরীত সংবাদে শব্দের ব্যবহার, লেখকের পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে শুরু করে সম্ভাব্য উদ্দেশ্য—সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করি। পছন্দের বক্তব্যে একটি দুর্বল সূত্রও যথেষ্ট মনে হয়; অপছন্দের বক্তব্যে দশটি শক্তিশালী সূত্রেও সংশয় কাটে না।
এটি কেবল কম শিক্ষিত, আবেগপ্রবণ কিংবা ‘অন্য পক্ষের’ মানুষের সমস্যা নয়। মানুষ হিসেবে আমাদের চিন্তার কাঠামোর মধ্যেই এর শিকড় রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত। আমরা এমন তথ্য খুঁজি, মনে রাখি ও ব্যাখ্যা করি, যা আমাদের বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। আর বিপরীত তথ্যকে উপেক্ষা করি, ছোট করে দেখি অথবা এমনভাবে ব্যাখ্যা করি যাতে পুরোনো বিশ্বাস অক্ষত থাকে।
মনোবিজ্ঞানী রেমন্ড নিকারসনের বহুল উদ্ধৃত পর্যালোচনায় নিশ্চিতকরণ পক্ষপাতকে মানুষের যুক্তিবোধের প্রায় সর্বব্যাপী একটি প্রবণতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞান থেকে রাজনীতি, চিকিৎসা থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক—প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষ বিদ্যমান ধারণার অনুকূলে প্রমাণ বাছাই করতে পারে। Nickerson, Review of General Psychology
কিন্তু মানুষ কেন এমন করে? সত্য জানাই যদি আমাদের লক্ষ্য হয়, তবে মস্তিষ্ক সত্যের বিপরীত পথে হাঁটে কেন?
সত্য সব সময় আরামদায়ক নয়
সত্যকে আমরা সাধারণত একটি নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখি। সত্য সুন্দর, সত্য মুক্তি দেয়—এমন কথা আমরা শৈশব থেকে শুনি। কিন্তু বাস্তব জীবনে সত্য প্রায়ই অস্বস্তিকর।
কোনো সত্য মেনে নেওয়ার অর্থ হতে পারে—আমি ভুল ছিলাম। যাকে বিশ্বাস করেছি, সে বিশ্বাসযোগ্য নয়। যে দলকে সমর্থন করেছি, সে অন্যায় করেছে। যে মতবাদকে নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়েছি, তার ভিত্তি দুর্বল। যে সিদ্ধান্ত নিয়ে গর্ব করেছি, সেটি ক্ষতিকর ছিল।
অর্থাৎ একটি নতুন তথ্য শুধু পুরোনো একটি ধারণা বদলাতে আসে না; কখনো সেটি আমাদের আত্মমর্যাদা, সামাজিক পরিচয় ও অতীত সিদ্ধান্তের ওপরও আঘাত করে।
মানুষ তাই একই সঙ্গে দুটি চাহিদা নিয়ে চিন্তা করে। প্রথমটি হলো যথার্থ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। দ্বিতীয়টি হলো নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা, সামাজিক সম্পর্ক এবং পরিচিত পৃথিবীটিকে অক্ষত রাখা। যখন এ দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তখন সত্য প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানী জিভা কুন্ডা এই প্রক্রিয়াকে ‘মোটিভেটেড রিজনিং’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যুক্তিবিচার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষ সব সময় নির্বিচারে মিথ্যা বিশ্বাস করে না। বরং কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে স্মৃতি, যুক্তি ও প্রমাণকে এমনভাবে ব্যবহার করে—যাতে সিদ্ধান্তটি নিজের কাছেও যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। Kunda, Psychological Bulletin
আমাদের মস্তিষ্ক তখন বিচারকের মতো কাজ করে না; কাজ করে একজন দক্ষ আইনজীবীর মতো। তার দায়িত্ব সত্য নির্ধারণ নয়, নিজের পক্ষকে জেতানো।
আগে সিদ্ধান্ত, পরে যুক্তি
আমরা সাধারণত ভাবি—প্রথমে তথ্য সংগ্রহ করি, পরে তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। অনেক ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি উল্টো।
প্রথমে পছন্দ, ভয়, আনুগত্য বা পরিচয় থেকে একটি সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। তারপর মস্তিষ্ক সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি সংগ্রহ করে।
এ কারণেই একই কাজ নিজের পছন্দের নেতা করলে ‘কৌশল’, প্রতিপক্ষ করলে ‘প্রতারণা’ মনে হয়। নিজের দলের সহিংসতা হয়ে ওঠে ‘উসকানির প্রতিক্রিয়া’, অন্য দলের একই আচরণ হয় ‘সন্ত্রাস’। নিজের ধর্মীয় বা আদর্শিক গোষ্ঠীর অপরাধকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হয়; বিরোধী গোষ্ঠীর কারও অপরাধকে পুরো সম্প্রদায়ের চরিত্র হিসেবে দেখা হয়।
এখানে তথ্যের মান বদলায় না; বদলে যায় তথ্য গ্রহণের মানদণ্ড।
ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই ঘটনা ঘটে। যাকে পছন্দ করি, তার নীরবতাকে গভীরতা ভাবি। যাকে অপছন্দ করি, তার নীরবতা অহংকার মনে হয়। নিজের ভুলের ব্যাখ্যায় পরিস্থিতিকে দায়ী করি; অন্যের ভুলে তার চরিত্রকে।
মানুষ মিথ্যা বলছে—বিষয়টি সব সময় এত সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে সে নিজের পক্ষপাত বুঝতেই পারে না। তার কাছে নির্বাচিত ব্যাখ্যাটিই সত্য মনে হয়।
বিশ্বাস যখন পরিচয় হয়ে ওঠে
সব বিশ্বাস সমান শক্তিশালী নয়। আগামীকাল বৃষ্টি হবে কি না—এ নিয়ে ভুল প্রমাণিত হলে সাধারণত আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হয় না। কিন্তু রাজনীতি, ধর্ম, জাতীয়তা, নৈতিকতা বা সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাস বদলানো অনেক কঠিন।
কারণ এসব ক্ষেত্রে একটি মত শুধু মত থাকে না; সেটি বলে দেয়, আমি কে, কার পক্ষে, কোন গোষ্ঠীর সদস্য এবং আমার আপন মানুষ কারা।
গবেষণায় এই প্রবণতাকে ‘আইডেন্টিটি-প্রোটেকটিভ কগনিশন’ বলা হয়। মানুষ এমন প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে, যা তার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও কাঙ্ক্ষিত সামাজিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করে। Kahan, Misconceptions, Misinformation, and the Logic of Identity-Protective Cognition
কোনো তথ্য সত্য বলে মেনে নিলে যদি নিজের গোষ্ঠীতে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় থাকে, তবে সেটি প্রত্যাখ্যান করা সামাজিকভাবে লাভজনক হতে পারে। ভুল বিশ্বাস ধরে রাখার বৈজ্ঞানিক মূল্য আছে; কিন্তু গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষত রাখার সামাজিক মূল্যও আছে।
এই বাস্তবতায় অনেক মানুষ সত্যকে অস্বীকার করে নির্বুদ্ধিতার কারণে নয়; বরং তাদের সামাজিক পরিবেশে সেই অস্বীকারই নিরাপদ।
বুদ্ধিমান মানুষ কি পক্ষপাত থেকে মুক্ত?
একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, বেশি শিক্ষিত বা বুদ্ধিমান মানুষ সহজে সত্য চিনতে পারে। শিক্ষা অবশ্যই তথ্য যাচাই ও যুক্তি বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়াতে পারে। কিন্তু একই দক্ষতা নিজের বিশ্বাসকে রক্ষার ক্ষমতাও বাড়াতে পারে।
কম দক্ষ ব্যক্তি হয়তো একটি দুর্বল যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান রক্ষা করে। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তি একই অবস্থানের পক্ষে অনেক বেশি জটিল ব্যাখ্যা, ব্যতিক্রম, ঐতিহাসিক উদাহরণ ও নির্বাচিত পরিসংখ্যান হাজির করতে পারেন।
অর্থাৎ বুদ্ধিমত্তা সব সময় পক্ষপাত দূর করে না; কখনো পক্ষপাতের জন্য উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করে।
তবে এ থেকে শিক্ষা বা বিশ্লেষণী দক্ষতার মূল্য নেই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল হবে। যথার্থতা খোঁজার আন্তরিক প্রেরণা থাকলে জ্ঞান ও দক্ষতা ভালো সিদ্ধান্তে সাহায্য করে। কিন্তু লক্ষ্য যদি নিজের পূর্বনির্ধারিত অবস্থানকে বিজয়ী করা হয়, তখন একই দক্ষতা আত্মপ্রতারণাকে আরও পরিশীলিত করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের কী দিচ্ছে?
আগে মানুষের তথ্যের উৎস সীমিত ছিল। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর প্রায় যেকোনো মতের পক্ষে সংবাদ, ভিডিও, বিশেষজ্ঞ, পরিসংখ্যান কিংবা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।
ইন্টারনেট তাই কেবল জ্ঞানের ভান্ডার নয়; এটি যেকোনো পূর্ববিশ্বাসের পক্ষে প্রমাণ জোগাড় করার অসীম বাজার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যেসব পোস্টে থামি, প্রতিক্রিয়া দিই বা শেয়ার করি, প্ল্যাটফর্ম সেসব আচরণ থেকে আমাদের পছন্দ শেখে। এরপর একই ধরনের আরও কনটেন্ট সামনে আনে। আমরা যা বিশ্বাস করি, সেটিই বারবার দেখি; বারবার যা দেখি, সেটিকে আরও স্বাভাবিক ও জনপ্রিয় বলে মনে হয়।
তবে অ্যালগরিদম একাই সব বিভাজন সৃষ্টি করে—এ কথাও অতিসরলীকরণ। মানুষ নিজেও পছন্দমতো বন্ধু, পৃষ্ঠা, বক্তা ও সংবাদমাধ্যম বেছে নেয়। প্রযুক্তি আমাদের পুরোনো মানসিক প্রবণতাকে আবিষ্কার করে, তারপর মনোযোগ ধরে রাখার ব্যবসায়িক স্বার্থে সেটিকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ফলে সত্যের বাজারে সবচেয়ে যাচাইযোগ্য বক্তব্য নয়, বরং সবচেয়ে পরিচয়সমর্থক ও আবেগ-উদ্দীপক বক্তব্য এগিয়ে যেতে পারে।
প্রমাণ বাড়লেও বিশ্বাস কেন বদলায় না?
একটি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তথ্য হাজির করলে আমরা ধরে নিই, মানুষ তা সংশোধন করবে। বাস্তবে প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে তথ্যটি কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে তার ওপর।
নতুন প্রমাণ যদি বিশ্বাসকে সামান্য সংশোধন করে, মানুষ তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সেটি যদি তার নৈতিকতা, বুদ্ধিমত্তা বা গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ওপর আক্রমণ বলে মনে হয়, তখন আত্মরক্ষার প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়।
সে সূত্রকে অবিশ্বাস করতে পারে, তথ্যদাতার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, ব্যতিক্রম খুঁজতে পারে অথবা দাবি করতে পারে—সব প্রমাণই একটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ।
তবে ভুল সংশোধন করলে মানুষ সর্বদা আরও দৃঢ়ভাবে ভুল বিশ্বাস করে—এমন বহুল প্রচলিত ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’ ধারণাটিও অতিরঞ্জিত। পরবর্তী গবেষণা বলছে, সত্যনির্ভর সংশোধন সাধারণত কার্যকর হয় এবং বিশ্বাস উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। Swire-Thompson ও অন্যরা, Nyhan ও অন্যরা, PNAS
অর্থাৎ মানুষ সংশোধনযোগ্য। কিন্তু অপমান, বিদ্রূপ ও গোষ্ঠীগত আক্রমণের ভাষা সত্য গ্রহণের পথ কঠিন করে দিতে পারে।
আমরা কি সত্য একেবারেই চাই না?
মানুষ শুধু বিশ্বাসের নিশ্চয়তা চায়—এ সিদ্ধান্তও মানুষের বিরুদ্ধে আরেকটি সরল পক্ষপাত হবে।
দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য ক্ষেত্রে আমরা সত্য চাই। চিকিৎসায় সঠিক রোগ নির্ণয়, ব্যবসায় প্রকৃত হিসাব, যাত্রায় নির্ভুল পথ কিংবা বিপদ সম্পর্কে যথার্থ তথ্য—এসব বিষয়ে ভুল বিশ্বাসের মূল্য সরাসরি দিতে হয়। বিমানের পাইলট, শল্যচিকিৎসক বা প্রকৌশলী কেবল পছন্দের তথ্য গ্রহণ করলে তার পরিণতি দ্রুত দৃশ্যমান হয়।
মানুষের সত্য অনুসন্ধান দুর্বল হয়ে পড়ে মূলত তখন, যখন ভুল হওয়ার বাস্তব মূল্য দূরের কিন্তু পরিচয় হারানোর সামাজিক মূল্য তাৎক্ষণিক।
এই কারণেই একই ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে প্রমাণনির্ভর হতে পারেন, অথচ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রবল পক্ষপাতী। বুদ্ধি বদলায়নি; বদলেছে কোন স্বার্থটি তখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
মানুষের ভেতর সত্য ও নিশ্চয়তা—দুই আকাঙ্ক্ষাই আছে। প্রশ্ন হলো, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে কোনটি বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে।
সত্য চাওয়ার প্রথম শর্ত: ভুল হওয়ার অনুমতি
নিজের ধারণা ভুল হতে পারে—এটি স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; সত্য অনুসন্ধানের প্রাথমিক শর্ত।
সক্রেটিসের দর্শনে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতনতাই জ্ঞানের সূচনা। বিজ্ঞানও কোনো ব্যক্তিকে ভুলহীন ধরে এগোয় না। পরীক্ষা, পুনরাবৃত্তি, পিয়ার রিভিউ এবং খণ্ডনযোগ্যতার ব্যবস্থা করা হয়েছে কারণ বিজ্ঞান জানে—একজন গবেষক নিজের প্রত্যাশায় প্রভাবিত হতে পারেন।
সত্য খোঁজার জন্য তাই শুধু সৎ ব্যক্তি যথেষ্ট নয়; এমন পদ্ধতি প্রয়োজন, যা সৎ ব্যক্তির অচেতন পক্ষপাতকেও শনাক্ত করতে পারে।
ব্যক্তিজীবনেও কয়েকটি প্রশ্ন এই ভূমিকা পালন করতে পারে:
আমি কী প্রমাণ পেলে মত বদলাব? বিরোধী পক্ষ একই কাজ করলে আমি কি একইভাবে বিচার করতাম? এই তথ্যটি সত্য বলে মনে হচ্ছে, নাকি সত্য হোক বলে চাইছি? পছন্দের সংবাদটির সূত্রও কি অপছন্দের সংবাদের মতো কঠোরভাবে যাচাই করেছি?
সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো—আমার বিশ্বাস ভুল হলে আমি কী হারাব?
উত্তর যদি হয় দল, বন্ধু, সামাজিক মর্যাদা বা নিজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা—তবে বোঝা যায়, বিতর্কটি আর শুধু তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ডিজিটাল যুগে সত্য খোঁজার অভ্যাস
অনলাইনে সত্য যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি হলো ‘ল্যাটারাল রিডিং’। কোনো ওয়েবসাইটের ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে তার নিজের দাবি পড়ার পরিবর্তে নতুন ট্যাব খুলে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে স্বাধীন সূত্র কী বলছে, তা দেখা।
স্ট্যানফোর্ডের গবেষণায় পেশাদার তথ্য যাচাইকারীদের এই কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তারা ওয়েবসাইটের বাহ্যিক চাকচিক্য বা ‘অ্যাবাউট’ পাতার দাবি বিশ্বাস না করে দ্রুত অন্য উৎসে গিয়ে তার পরিচয় ও বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা করেন। Stanford University
কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে শুধু “এটি আমার মতের পক্ষে কি না” না ভেবে “এটি সত্য কি না” প্রশ্ন করাও কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্ভুলতার দিকে সামান্য মনোযোগ আকর্ষণ করলেও মানুষ যে সংবাদ শেয়ার করতে চায় তার গুণমান উন্নত হতে পারে। Pennycook ও অন্যরা
সত্য অনুসন্ধানের জন্য আরও প্রয়োজন ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে এমন সম্পর্ক, যেখানে মত বদলালে অপমানিত হওয়ার ভয় নেই। মানুষকে ভুল স্বীকারের নিরাপদ জায়গা না দিলে সে ভুল বিশ্বাসকেই আত্মরক্ষার দেয়াল বানাবে।
সত্যের চেয়ে জয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে
আধুনিক রাজনৈতিক বিতর্কে একটি সমস্যাই সবচেয়ে স্পষ্ট—আমরা প্রায়ই সত্য আবিষ্কারের জন্য কথা বলি না; প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য কথা বলি।
সে ক্ষেত্রে নতুন তথ্য শেখা লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো নিজের পক্ষকে বিজয়ী দেখানো, দর্শকের প্রশংসা পাওয়া এবং বিরোধীকে নৈতিকভাবে নিচু প্রমাণ করা। যুক্তি তখন জ্ঞানের পথ না হয়ে ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে ওঠে।
এই পরিবেশে ভুল স্বীকার করা পরাজয়, সংশয় প্রকাশ দুর্বলতা এবং প্রতিপক্ষের কোনো যুক্তি মেনে নেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে প্রত্যেকে নিজের শিবিরের সবচেয়ে সুবিধাজনক সত্য এবং প্রতিপক্ষের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য সংগ্রহ করে।
দুই পক্ষের কাছেই কিছু সত্য থাকতে পারে; কিন্তু কেউ সম্পূর্ণ সত্যের দায়িত্ব নেয় না।
সত্য কি আমাদের মুক্ত করতে পারে?
সত্যের প্রতি আনুগত্য মানে প্রতিটি বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পাওয়া নয়। বরং যেখানে প্রমাণ অসম্পূর্ণ, সেখানে অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করা; নতুন তথ্য এলে মত পরিবর্তনের অধিকার রাখা; এবং নিজের গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য একই কাজের ভিন্ন নৈতিক মানদণ্ড ব্যবহার না করা।
আমরা কখনো সম্পূর্ণ পক্ষপাতমুক্ত হতে পারব না। কারণ পৃথিবীকে দেখার জন্য আমাদের স্মৃতি, ভাষা, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের প্রয়োজন। কোনো মানুষই শূন্য অবস্থান থেকে বিচার করে না।
কিন্তু পক্ষপাত থাকা এবং পক্ষপাতের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা এক নয়।
সত্য চাওয়ার অর্থ নিজের বিশ্বাসহীন হয়ে যাওয়া নয়। অর্থ হলো বিশ্বাসকে এমনভাবে ধারণ করা, যাতে প্রমাণের আলো তার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মানুষ সত্যও চায়, নিশ্চয়তাও চায়। নিশ্চয়তা আমাদের মানসিক আশ্রয় দেয়; সত্য সেই আশ্রয়ের ভিত্তি পরীক্ষা করে। তাই সত্যের পথ প্রায়ই কঠিন, নিঃসঙ্গ ও অস্বস্তিকর। সেখানে নিজের ভুলের মুখোমুখি হতে হয়।
মানুষের বড় পরীক্ষা সে কী বিশ্বাস করে, শুধু তা নয়। বরং নিজের সবচেয়ে প্রিয় বিশ্বাসটি ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে সে কতটা সততার সঙ্গে বসতে পারে।
যে বিশ্বাস কোনো প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, সেটি হয়তো সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে সত্য হারানোর ভয়ের ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ