বাংলাদেশে অপরাধের চিত্র নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে হত্যা ও অপহরণের ধারাবাহিক ঘটনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের খবর যেমন সামনে আসছে, তেমনি নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনাও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। তবে এসব ঘটনার সামগ্রিক চিত্র বুঝতে হলে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা নয়, বরং পরিসংখ্যান, অপরাধের ধরন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তন—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—এই আট মাসে সারাদেশে হত্যার ঘটনায় ২ হাজার ৩৬২টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি করে হত্যা মামলা হয়েছে। একই সময়ে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯১টি, যা দৈনিক গড়ে প্রায় তিনটি। তবে মামলা হওয়ার সংখ্যা সরাসরি নিহত বা অপহৃত মানুষের মোট সংখ্যা বোঝায় না; এটি পুলিশের কাছে নথিভুক্ত মামলার হিসাব।
মাসভিত্তিক হিসাবেও হত্যার ঘটনায় ওঠানামা দেখা যায়। জানুয়ারিতে সারাদেশে হত্যা মামলা হয়েছে ২৮৭টি। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৫০টিতে। মার্চে আবার বেড়ে হয় ৩১৭টি। এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০ এবং জুনে ৩২৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ২৯৮টি। আগস্টে ২৮৬টি। অর্থাৎ এই আট মাসের মধ্যে জুনে হত্যার মামলা সবচেয়ে বেশি এবং ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে কম ছিল।
ঢাকার হিসাবও আলাদা করে নজর দেওয়ার মতো। আট মাসে রাজধানীতে ১৬৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি, মে মাসে ১৬টি, জুনে ২৩টি, জুলাইয়ে ৩১টি এবং আগস্টে ২০টি হত্যা মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে ঢাকায় হত্যা মামলার সংখ্যা ছিল আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অপহরণের ক্ষেত্রেও মাসভেদে পার্থক্য রয়েছে। জানুয়ারিতে সারাদেশে অপহরণের মামলা হয়েছে ৮৭টি। ফেব্রুয়ারিতে ৬৪টি, মার্চে ১০২টি, এপ্রিলে ৯৪টি, মে ও জুনে ৯০টি করে, জুলাইয়ে ৭২টি এবং আগস্টে ৯২টি মামলা হয়েছে। আট মাসে ঢাকায় অপহরণের মামলা হয়েছে ১২৯টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ২০টি, এপ্রিলে ২১টি, মে মাসে ১৩টি, জুনে ১৭টি, জুলাইয়ে ১১টি এবং আগস্টে ২১টি মামলা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলোকে গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে সারাদেশে হত্যা মামলা হয়েছিল ২ হাজার ৬১৪টি। চলতি বছরের একই সময়ে তা ২ হাজার ৩৬২টিতে নেমেছে। অর্থাৎ মামলা কমেছে ২৫২টি। অপহরণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে সারাদেশে অপহরণের মামলা ছিল ৭১৫টি, চলতি বছর তা হয়েছে ৬৯১টি—কমেছে ২৪টি। ঢাকাতেও গত বছরের তুলনায় উভয় ধরনের মামলায় কমতি রয়েছে।
তবে সংখ্যাগতভাবে মামলা কমেছে বলেই মানুষের নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিতভাবে বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অপরাধের প্রকৃতি, মামলা করার প্রবণতা, থানায় অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার হার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ঘটনার সামাজিক প্রভাব—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়। একটি বছরের আট মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো দেশের অপরাধ পরিস্থিতির সব দিক ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়।
তারপরও সাম্প্রতিক কিছু হত্যাকাণ্ড মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আগস্টে রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনা আলোচনায় আসে। এর আগের দিন মাদারীপুরের শিবচরের বাখরেরকান্দি এলাকার একটি জঙ্গলে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। পরে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে তার এক বছর বয়সী শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় শুধু একটি পরিবার নয়, আশপাশের মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়।
অপহরণের ঘটনাও একইভাবে উদ্বেগ তৈরি করে। রাজধানীর পল্লবীতে ইব্রাহিম নামে এক শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তার একটি উদাহরণ। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে বাসায় ঢুকতে দেখা গেলেও তার পেছনে অন্য একজনকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তিকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর শিশুটির আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। আবার আগস্টে মাদরাসায় যাওয়ার কথা বলে মিরপুরের রূপনগরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর ১০ বছর বয়সী তানভীর আহমেদ নিখোঁজ হয়। শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো পরিবারকে যে ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে, তা পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো কঠিন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সাম্প্রতিক অপরাধের পেছনে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুকের মতে, চাঁদাবাজি বাড়ার সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধ, অপহরণ ও হত্যার যোগসূত্র রয়েছে। তিনি অপরাধ প্রতিরোধে আইনের শাসন কার্যকর করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক অপরাধ মোকাবিলায় প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বড় ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে; কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য ধারাবাহিক ও কাঠামোগত ব্যবস্থা প্রয়োজন। তার মতে, সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব মানুষের আচরণ ও আইন মানার প্রবণতার ওপরও পড়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য অবশ্য পরিস্থিতির আরেকটি দিক তুলে ধরে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, অপরাধ প্রতিরোধে মোবাইল ডিউটি, মোটরসাইকেল ও ফুট প্যাট্রোল, পিকেট ডিউটি, তল্লাশি, কমিউনিটি পুলিশিং এবং বিট পুলিশিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও পুলিশ কাজ করে বলে তিনি জানিয়েছেন।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো অপরাধ ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা। কোনো এলাকায় বারবার চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ কিংবা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে সেখানে অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্কুল, মাদরাসা, বাজার, পরিবহনকেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকার মতো জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় নজরদারি ও সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা বড়। শিশুরা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাসায় ফিরছে এবং অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে শুধু পরিবারের অসতর্কতার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—সব পক্ষের দায়িত্ব।
অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মামলার সংখ্যা এবং অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা সবসময় এক নয়। কোনো ঘটনায় মামলা নাও হতে পারে, আবার একই ঘটনার বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার কারণে পরিসংখ্যানে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। ফলে পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে অপরাধ পরিস্থিতির একমাত্র সূচক হিসেবে দেখা উচিত নয়।
গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে হত্যা ও অপহরণের মামলা কমেছে—এটি পরিসংখ্যানগতভাবে স্পষ্ট। কিন্তু একই সঙ্গে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা এবং ৬৯১টি অপহরণ মামলা নথিভুক্ত হওয়ার বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি সামাজিক পরিমণ্ডল এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও আর্থিক ক্ষতি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে তাই শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। অপরাধের কারণ চিহ্নিত করা, সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ, সিসিটিভি ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত বাড়ানো এবং মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পুলিশের সক্ষমতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো গেলে অপরাধ প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সবশেষে, আট মাসের এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অপরাধ পরিস্থিতির একটি আংশিক ছবি তুলে ধরে। গত বছরের তুলনায় হত্যা ও অপহরণের মামলা কমলেও সংখ্যাটি এখনও উল্লেখযোগ্য। আবার মাসভেদে ওঠানামাও রয়েছে। তাই শুধু কোনো একটি বড় ঘটনা কিংবা একটি পরিসংখ্যান দেখে পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বদলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা, অপরাধের ধরন, মামলা নিষ্পত্তির হার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা—সবকিছুকে পাশাপাশি বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানুষের নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত শুধু মামলার সংখ্যা কমার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে এমন একটি পরিবেশ তৈরির ওপর, যেখানে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ কমে, অপরাধের দ্রুত তদন্ত হয় এবং আইনের প্রয়োগ সবার জন্য কার্যকর ও ধারাবাহিক থাকে।
আপনার মতামত জানানঃ