
গণতন্ত্রের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যটি খুব সহজ—ভোট হয়, ভোট গণনা করা হয়, যে পক্ষ বেশি ভোট পায় তারা জয়ী হয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে সংসদ পর্যন্ত আমরা এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত। একাধিক মতের মধ্যে কোনো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গ্রহণ করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে হয়।
কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়ে যায়: সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যা চায়, সেটিই কি ন্যায়?
ধরা যাক, কোনো গ্রামের একশ বাসিন্দার মধ্যে নব্বই জন সিদ্ধান্ত নিলেন, বাকি দশজন গ্রামের সাধারণ জলাধার ব্যবহার করতে পারবেন না। সিদ্ধান্তটি ভোটে পাস হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের স্পষ্ট সমর্থনও রয়েছে। কিন্তু তাই বলে সিদ্ধান্তটি কি ন্যায়সংগত হয়ে গেল?
আবার একটি রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ যদি মনে করে, একটি নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক মতের মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করা উচিত—তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সেই ইচ্ছা কি রাষ্ট্রের জন্য পালনীয় হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে গণতন্ত্র ও ন্যায়কে আলাদা করে বুঝতে হয়। গণতন্ত্র মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতা বণ্টনের একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি। অন্যদিকে ন্যায় হলো মানুষের প্রতি কেমন আচরণ করা উচিত, কার কী অধিকার থাকবে এবং ক্ষমতা ব্যবহারের নৈতিক সীমা কোথায়—সেই প্রশ্নের উত্তর।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক বৈধতা দিতে পারে; কিন্তু নৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করে না।
সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন কেন প্রয়োজন
একটি সমাজে সবাই সব বিষয়ে একমত হবে না। কর কত হবে, বাজেট কোথায় ব্যয় হবে, কে সরকার গঠন করবে, কোন নীতি গ্রহণ করা হবে—এসব প্রশ্নে মতপার্থক্য অনিবার্য। সর্বসম্মতির অপেক্ষায় থাকলে রাষ্ট্রের পক্ষে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এটি রক্তপাত, উত্তরাধিকার কিংবা শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা নির্ধারণের সুযোগ দেয়। প্রত্যেক নাগরিকের ভোট সমান ধরে নেওয়ার মধ্যেও রাজনৈতিক সাম্যের একটি ধারণা রয়েছে। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-দুর্বল—প্রত্যেকের ভোটের মূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে এক।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রয়োজনীয় বলেই তা সীমাহীন হতে পারে না। হাতুড়ি যেমন একটি প্রয়োজনীয় যন্ত্র, তাই বলে প্রতিটি সমস্যার সমাধান হাতুড়ি দিয়ে করা যায় না। ভোটের মাধ্যমেও সরকার নির্বাচন করা যায়, করের হার নির্ধারণ করা যায় কিংবা জননীতি বেছে নেওয়া যায়। কিন্তু কোনো মানুষের মর্যাদা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা বা বেঁচে থাকার অধিকার ভোটের ফলাফলের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
সক্রেটিসের মৃত্যু এবং জনমতের বিপদ
প্রাচীন এথেন্সকে গণতন্ত্রের জন্মভূমি বলা হয়। অথচ সেই গণতান্ত্রিক নগররাষ্ট্রেই সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে তরুণদের বিপথগামী করা এবং নগরের দেবতাদের অস্বীকার করার অভিযোগ আনা হয়। নাগরিক বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন।
আইন অনুসরণ করা হয়েছিল, ভোটও হয়েছিল। তবু ইতিহাস সক্রেটিসের মৃত্যুকে ন্যায়বিচারের আদর্শ হিসেবে স্মরণ করে না। বরং এটি দেখায়, জনমত উত্তেজনা, ভয় ও প্রচারণায় প্রভাবিত হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিও অন্যায় ফল তৈরি করতে পারে।
প্রাচীন এথেন্সে যারা নাগরিক হিসেবে গণ্য হতেন, তারাও ছিলেন জনসংখ্যার একটি সীমিত অংশ। নারী, দাস এবং বিদেশি বাসিন্দাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত বলা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—কারা সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশ হওয়ার অধিকার পেয়েছিল?
আজও নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণের সময় একই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দল মোট প্রদত্ত ভোটের তুলনায় বেশি ভোট পেয়ে সরকার গঠন করলেই সেটি সমগ্র জনগোষ্ঠীর অভিন্ন ইচ্ছা হয়ে যায় না। যারা ভোট দেয়নি, যারা পরাজিত হয়েছে এবং যাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত ছিল—তারাও রাষ্ট্রের সমান নাগরিক।
সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র
ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য তকভিল গণতান্ত্রিক সমাজে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রের’ ঝুঁকির কথা বলেছিলেন। পরে জন স্টুয়ার্ট মিলও দেখান, নিপীড়ন শুধু রাজা বা সরকারের কাছ থেকে আসে না; সমাজের প্রচলিত মতও ব্যক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারে।
একজন একনায়ক বলপ্রয়োগ করে ভিন্নমত থামাতে পারেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের সামাজিক স্বৈরতন্ত্র আরও অদৃশ্যভাবে কাজ করে। সেখানে মানুষ আইনগত শাস্তির ভয়ে নয়, একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়ে কথা বলা বন্ধ করে। জনপ্রিয় বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করলে তাকে দেশদ্রোহী, ধর্মবিরোধী, সংস্কৃতিবিরোধী কিংবা জনগণের শত্রু বলে চিহ্নিত করা হয়।
এভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস থাকে না; সত্য ও নৈতিকতার একচেটিয়া বিচারক হয়ে ওঠে। তখন যুক্তির বদলে বলা হয়—“এত মানুষ কি ভুল হতে পারে?”
ইতিহাস বলছে, পারে।
একসময় অধিকাংশ সমাজ দাসপ্রথাকে স্বাভাবিক মনে করেছে। নারীর ভোটাধিকার অস্বীকার করেছে। বর্ণভিত্তিক বৈষম্যকে আইন দিয়ে সুরক্ষা দিয়েছে। ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষকে অপরাধী বিবেচনা করেছে। এসব ব্যবস্থার পেছনে শুধু শাসকের ইচ্ছা ছিল না; বহু ক্ষেত্রে সামাজিক সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনও ছিল।
তাই কোনো বিশ্বাস জনপ্রিয় হলেই সত্য হয় না। কোনো আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলে এলেই ন্যায়সংগত হয় না। আর কোনো সিদ্ধান্ত বেশি ভোট পেলেই তা নৈতিক হয়ে যায় না।
ন্যায়ের ভিত্তি কোথায়
দার্শনিক জন রলস ন্যায়সংগত সমাজ কল্পনা করতে গিয়ে একটি চিন্তা-পরীক্ষার প্রস্তাব করেছিলেন। ধরুন, সমাজের নিয়ম তৈরির সময় আপনি জানেন না সেখানে আপনার অবস্থান কী হবে। আপনি ধনী না দরিদ্র, সংখ্যাগুরু না সংখ্যালঘু, নারী না পুরুষ, সুস্থ না প্রতিবন্ধী—কিছুই জানেন না। এই অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আপনি কী ধরনের নিয়ম বেছে নেবেন?
সম্ভবত এমন নিয়ম, যেখানে মৌলিক স্বাধীনতা সবার জন্য সুরক্ষিত এবং সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকা মানুষও সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত নয়। কারণ পর্দা সরে গেলে আপনিই সেই দুর্বল মানুষটি হতে পারেন।
এই চিন্তা আমাদের ন্যায়ের একটি গভীর নীতির কাছে নিয়ে যায়: যে নিয়ম আমরা কেবল নিজের শক্তিশালী অবস্থান থেকে সমর্থন করি, সেটি ন্যায়সংগত নাও হতে পারে। ন্যায়সংগত নিয়ম হলো সেটিই, যা নিজের পরিচয় ও সুবিধা না জেনেও মেনে নিতে রাজি হওয়া যায়।
সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা এই পরীক্ষায় প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জানে, সিদ্ধান্তটির ক্ষতিকর ফল তাদের বহন করতে হবে না। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার বোঝা বহন করবে অন্য ধর্মের মানুষ; ভাষা দমনের ক্ষতি ভোগ করবে অন্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী; মতপ্রকাশ সীমিত করার প্রথম আঘাত আসবে বিরোধীদের ওপর।
কিন্তু ক্ষমতার অবস্থান স্থায়ী নয়। আজকের সংখ্যাগরিষ্ঠ আগামী দিনের সংখ্যালঘু হতে পারে। যে আইন আজ প্রতিপক্ষকে নীরব করার জন্য তৈরি হচ্ছে, ক্ষমতা বদলের পর সেই আইনই নির্মাতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
মানবাধিকার কেন ভোটের বিষয় নয়
আধুনিক সাংবিধানিক গণতন্ত্র তাই শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মৌলিক অধিকার, ক্ষমতার বিভাজন, স্বাধীন আদালত, আইনের শাসন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুর সুরক্ষা।
মানবাধিকারের মূল ধারণা হলো—কিছু অধিকার মানুষ রাষ্ট্র, সমাজ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুগ্রহে পায় না; মানুষ হওয়ার কারণেই সেগুলোর অধিকারী। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাও প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন আইনি সুরক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এখানেই সাংবিধানিক গণতন্ত্র এবং নিছক সংখ্যার শাসনের পার্থক্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার নির্বাচন করতে পারে, কিন্তু কোনো নাগরিকের মানবিক মর্যাদা বাতিল করতে পারে না। সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে, কিন্তু ন্যায়সংগত ব্যবস্থায় সেই আইনও সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
স্বাধীন আদালতের প্রয়োজনও এখানে। আদালত সব সময় নির্ভুল নয় এবং বিচারকেরাও সমাজের প্রভাবের বাইরে নন। তবু সংখ্যাগরিষ্ঠের তাৎক্ষণিক আবেগ থেকে অধিকারকে কিছুটা দূরে রাখার জন্য একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য।
সংখ্যাগরিষ্ঠ কি সব সময় একটি স্থায়ী গোষ্ঠী?
‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ শব্দটি শুনলে মনে হয় এটি একটি নির্দিষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠী। বাস্তবে মানুষ একই সঙ্গে বহু পরিচয় ধারণ করে। ধর্মের বিচারে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারেন, ভাষার বিচারে সংখ্যালঘু। রাজনৈতিক মতের দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শ্রেণি বা অঞ্চলের বিচারে প্রান্তিক হতে পারেন।
রাজনীতি যখন একটি পরিচয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, তখন বিচিত্র মানুষের সমাবেশকে কৃত্রিমভাবে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীতে রূপ দেওয়া হয়। এরপর সেই গোষ্ঠীর নামে কথা বলার অধিকার দাবি করেন কয়েকজন নেতা। “জনগণ চায়”—এই বাক্যটি তখন প্রকৃত জনমতের বিবরণ না হয়ে ক্ষমতার ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচিত সরকারও তাই জনগণের মালিক নয়। তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। নির্বাচনী বিজয় তাদের নীতি বাস্তবায়নের অধিকার দেয়, কিন্তু রাষ্ট্র, ইতিহাস কিংবা নাগরিকের বিবেকের ওপর স্থায়ী মালিকানা দেয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ডিজিটাল সংখ্যাগরিষ্ঠ
বর্তমান সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা আরও জটিল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি লাইক, শেয়ার বা মন্তব্যকে অনেক সময় জনমতের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ অ্যালগরিদম উত্তেজক বক্তব্যকে বেশি দৃশ্যমান করতে পারে; সংগঠিত প্রচারণা কৃত্রিম ঐকমত্য তৈরি করতে পারে; ভয়ে নীরব থাকা মানুষের মতামত কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
ডিজিটাল জনতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করতে পারে। অভিযোগ যাচাই হওয়ার আগেই সামাজিক শাস্তি কার্যকর হয়ে যায়। এখানে আদালত নেই, আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই; আছে শুধু দৃশ্যমান সংখ্যার চাপ।
ফলে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ গোষ্ঠীকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মনে হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কিন্তু শব্দের তীব্রতা জনসমর্থনের নির্ভুল পরিমাপ নয়। একইভাবে ভাইরাল হওয়া কোনো দাবির সত্যতার প্রমাণ নয়।
তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভূমিকা কী
সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন বাতিল করলে বিকল্প হিসেবে প্রায়ই সংখ্যালঘু অভিজাতের শাসন, সামরিক কর্তৃত্ব কিংবা একনায়কতন্ত্র সামনে আসে। সেগুলো ন্যায়ের নিশ্চয়তা তো দেয়ই না, বরং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সমতাও কেড়ে নেয়। কাজেই সমস্যার সমাধান সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি পরিত্যাগ করা নয়; বরং তার সীমানা নির্ধারণ করা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করবে, জননীতি বেছে নেবে এবং নিয়মিত নির্বাচনে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে। কিন্তু তারা এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে না, যাতে পরাজিতরা চিরকাল পরাজিত থাকে। বিরোধী মত প্রকাশ, সংগঠন গঠন এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ক্ষমতা লাভের সুযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
একটি গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা বিজয়ীরা কতটা ক্ষমতা পেলেন, সেটি নয়; তারা পরাজিত, দুর্বল ও অজনপ্রিয় মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছেন।
যে সমাজে সংখ্যালঘু নিরাপদে কথা বলতে পারে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাধীনতাও নিরাপদ। যে রাষ্ট্র আজ অজনপ্রিয় মতকে সুরক্ষা দেয়, সে রাষ্ট্রই আগামীকাল ক্ষমতা হারানো বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠকে রক্ষা করবে।
সংখ্যা সিদ্ধান্ত দিতে পারে, ন্যায় নয়
গণতন্ত্রে ভোটের প্রয়োজন আছে, কিন্তু বিবেকের ভোটগণনা হয় না। পঞ্চাশ শতাংশের সঙ্গে আরও একটি ভোট যোগ হলেই অন্যায় ন্যায় হয়ে যায় না। ন্যায়ের জন্য সংখ্যার পাশাপাশি প্রয়োজন যুক্তি, সমান মর্যাদা, মৌলিক অধিকার এবং ক্ষমতার সীমা।
সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে অগ্রাহ্য করা গণতন্ত্রবিরোধী হতে পারে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিটি ইচ্ছাকে ন্যায় বলে মেনে নেওয়াও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
কারণ গণতন্ত্র শুধু অধিক মানুষের শাসন নয়; এটি প্রত্যেক মানুষের সমান নাগরিক মর্যাদার প্রতিশ্রুতি। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার নির্ধারণ করবে না। রাষ্ট্র জনমত শুনবে, কিন্তু জনতার ক্রোধকে বিচার বলে গ্রহণ করবে না।
শেষ পর্যন্ত ন্যায়কে চেনার সবচেয়ে সহজ পরীক্ষাটি সম্ভবত এই: যে সিদ্ধান্তটি সংখ্যাগরিষ্ঠ নিজের জন্য মেনে নিতে রাজি নয়, সেটি সংখ্যালঘুর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নৈতিক অধিকারও তার নেই।
সংখ্যা বলে দেয় কোন পক্ষ শক্তিশালী। ন্যায় বলে দেয় সেই শক্তি কত দূর যেতে পারে।
____________________________
তথ্যসূত্রের নির্দেশনা
লেখাটির দার্শনিক কাঠামোয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বিষয়ে Stanford Encyclopedia of Philosophy, জন রলসের ন্যায়তত্ত্ব বিষয়ে John Rawls—Stanford Encyclopedia of Philosophy এবং সমতা ও অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুসরণ করা হয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ