ঢাকার রাজনীতির আকাশে আবারও জমছে অস্বস্তির মেঘ। রাজপথে বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, নেই দৃশ্যমান জনসমাবেশও। তবু রাজধানীর অলিগলি, আবাসিক এলাকার মেস, সস্তা হোটেল আর ভাড়া বাসাগুলো ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, দেশের বাইরে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীদের একটি অংশ ঢাকায় আত্মগোপনে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিভিন্ন ধরনের ঝটিকা কর্মসূচি ও নাশকতার পরিকল্পনা করছে। অভিযোগের তালিকায় আছে ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে আগুন, আকস্মিক মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড।
এই পরিস্থিতির কেন্দ্রে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। দেশের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল এই শহরে প্রতিদিন লাখো মানুষের আসা-যাওয়া। ব্যস্ত সড়ক, অসংখ্য আবাসিক এলাকা, মেস, হোটেল ও ভাড়া বাসার বিশাল নেটওয়ার্কের মধ্যে কাউকে শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সহজ নয়। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে পালিয়ে আসা রাজনৈতিক কর্মীদের কেউ মেসে, কেউ আত্মীয়ের বাসায়, কেউবা সাধারণ হোটেলে অবস্থান করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি। তাদের কেউ নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কেউ চাকরিপ্রার্থী, কেউ হকার, কেউবা সাধারণ বাসিন্দার পরিচয়ে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন—এমন তথ্যও উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মুগদা, শাহজাহানপুর, সবুজবাগ, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ী এবং পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি এলাকার কয়েকটি মেস ও ফ্ল্যাটে সন্দেহজনক যাতায়াত ও বৈঠকের কথা বলা হয়েছে। এসব জায়গায় কারা যাতায়াত করছেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে কি না, কোনো বৈঠকে কী আলোচনা হচ্ছে—এসব বিষয় নজরদারিতে রাখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ দেশের বাইরে অবস্থান করছে—এমন বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে তাদের তৎপরতার অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কেউ কেউ দেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাদের বিরুদ্ধে দেশে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা ও অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে। তবে কারা অর্থ পাঠাচ্ছেন, কত অর্থ পাঠানো হয়েছে, অর্থের উৎস কী এবং কোন কোন ঘটনায় সেই অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের বিষয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি ও সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন।
ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাও এই কথিত নেটওয়ার্কের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সিগন্যাল, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিরা দেশে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। প্রযুক্তির এই ব্যবহার নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন ও বিভিন্ন ধরনের সংগঠিত কর্মকাণ্ডে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি সহিংসতা বা নাশকতার পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ক্ষেত্রে ‘হিট অ্যান্ড রান’ বা ঝটিকা কর্মসূচির কৌশলের কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বড় ধরনের সমাবেশ করার সক্ষমতা বা জনসমর্থন না থাকলেও অল্পসংখ্যক মানুষ হঠাৎ রাস্তায় নেমে মিছিল করবে, ব্যানার প্রদর্শন করবে, ছবি ও ভিডিও ধারণ করবে এবং দ্রুত সরে যাবে। পরে সেই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। কয়েক মিনিটের একটি ঘটনা এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে ছোট আকারের কোনো ঘটনাও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে বড় প্রভাব তৈরি করতে পারে।
এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী ছিলেন—এমন কিছু পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন এবং তাদের কেউ কেউ গোপনে তথ্য সরবরাহ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কয়েকজন কর্মকর্তা ওএসডি বা বরখাস্ত অবস্থায় থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে তৎপরতার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ একজন কর্মকর্তার কাছে থাকা অপারেশনাল তথ্য বাইরে চলে গেলে একটি অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি অপরাধী চক্রও আগাম সতর্ক হয়ে যেতে পারে। তবে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তা প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ, অর্থের উৎস অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ। রাজনৈতিক পরিচয়, অতীতের পেশাগত অবস্থান কিংবা কোনো দলের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব একা কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না।
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান এলাকায় ঘটে যাওয়া ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকা হিসেবে গুলশানে সাধারণত উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। সেখানে এমন ঘটনা ঘটায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ের কমান্ড কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার পর গুলশান বিভাগের ডিসি ও গুলশান থানার ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরদিন গুলশান জোনের এডিসিকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শুধু মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়—সবগুলো ধাপ কার্যকর না হলে নিরাপত্তাব্যবস্থায় ফাঁক তৈরি হতে পারে। গুলশানের ঘটনার পর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার বা বদলি সেই ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
এরপর রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। গুলশানের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এ পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, যোগাযোগ এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি বড় নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছেন একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা। তদন্তকারীরা বলছেন, ওই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তদন্তের এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তথ্য-প্রমাণের যথাযথ যাচাই। কার সঙ্গে কার যোগাযোগ ছিল, সেই যোগাযোগের উদ্দেশ্য কী ছিল, অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে এবং কোনো সহিংস ঘটনার সঙ্গে সেই যোগাযোগের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা এবং নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার বিষয় এক নয়। তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জনআস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার প্রবেশপথগুলোতেও বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। গাবতলী, সায়েদাবাদ, আব্দুল্লাহপুর ও বাবুবাজার ব্রিজসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। কূটনৈতিক এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাতের দিকে বিভিন্ন মেস ও সন্দেহভাজন হোটেলে ব্লক রেইড বা আকস্মিক তল্লাশি চালানোর কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
এই ধরনের অভিযান নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির পরিচয় যাচাই বা সন্দেহের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তা যেন আইনানুগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকে—এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক প্রত্যাশা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের হয়রানি ঠেকানোও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করা এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্যেও আইনি পার্থক্য রয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় গুজবও বড় ভূমিকা পালন করে। একটি ছোট ঘটনার সঙ্গে নানা ধরনের তথ্য, অডিও, ভিডিও কিংবা পুরোনো ছবি জুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন গল্প তৈরি হতে পারে। কোনো পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার ভিডিও হিসেবে প্রচার করা কিংবা যাচাই না করা তথ্যকে ‘গোয়েন্দা তথ্য’ হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। ফলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো দাবি যাচাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বাস্তব জীবনেও আতঙ্ক তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু নাশকতা ঠেকানো নয়; একই সঙ্গে সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, মাঠপর্যায়ের কর্মী এবং ভেতরের সহযোগিতার অভিযোগ—সবকিছুর পৃথক প্রমাণ খুঁজে বের করা। একটি ঘটনার সঙ্গে কারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই তাকে নাশকতার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ অপরাধ করলে তার দায়ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অস্বীকার করা যায় না। তদন্তকে তাই ব্যক্তি, প্রমাণ ও ঘটনার ভিত্তিতে এগোতে হবে।
ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আরও একটি বিষয় সামনে এনেছে—নগর নিরাপত্তার পুরোনো ধারণা বদলে যাচ্ছে। শুধু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা মোড়ে পুলিশ মোতায়েন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এখন প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ, দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও জরুরি।
বিদেশে বসে কেউ যদি দেশে সহিংসতা বা নাশকতার পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে সেই নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা প্রয়োজন। একইভাবে দেশের ভেতরে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য ব্যবহার করে অপরাধীদের সহযোগিতা করে থাকে, সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে বেরিয়ে আসা দরকার। কিন্তু এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বক্তব্য নয়।
রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে ছোট একটি নাশকতাও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। একটি গাড়িতে আগুন, কয়েক মিনিটের একটি ঝটিকা মিছিল কিংবা একটি বিস্ফোরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন সাধারণ মানুষ, যাদের রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
সেই কারণে সামনে সবচেয়ে প্রয়োজন সতর্কতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং আইনের শাসন। নাশকতার অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা হবে—এটাই স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে যেন রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে হয়রানি করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
ঢাকার রাস্তায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়তো তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, বিরোধ থাকবে, আন্দোলনও হতে পারে। তবে সেই মতপার্থক্য যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। তাই নাশকতার পরিকল্পনা থাকলে তা প্রতিরোধ যেমন জরুরি, তেমনি রাজনৈতিক বিরোধকে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পথে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো এখন তদন্তের পর্যায়ে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য, পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং কথিত অর্থ লেনদেনের তথ্য—সবকিছুই যাচাইয়ের অপেক্ষায়। এই তদন্ত কতদূর এগোয়, বিদেশে থাকা কথিত পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে দেশের ভেতরের ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে কারও সংশ্লিষ্টতা আদৌ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করবে।
ঢাকার রাজপথে তাই এখন শুধু পুলিশের টহল নয়, নজর রয়েছে গোয়েন্দা তথ্যের দিকেও। কোথা থেকে নির্দেশ আসছে, অর্থের উৎস কোথায়, কারা মাঠে নামছে এবং কারা তাদের সহযোগিতা করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সেই উত্তর যেন রাজনৈতিক অনুমান নয়, নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আসে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপত্তার নামে যেমন নাশকতার সুযোগ দেওয়া যায় না, তেমনি নিরাপত্তার অজুহাতে আইনি ও নাগরিক অধিকার উপেক্ষা করেও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত ঢাকার রাজপথে শান্তি ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় শর্ত হবে—অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা, তদন্তে স্বচ্ছতা এবং আইনের প্রতি সবার সমান আস্থা।
আপনার মতামত জানানঃ