
কোনো সরকার যখন একটি বই নিষিদ্ধ করে, সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে কিংবা প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার করে—ক্ষমতার উপস্থিতি সহজেই বোঝা যায়। সেখানে আদেশ আছে, শাস্তি আছে, দৃশ্যমান শাসক আছে।
কিন্তু ক্ষমতার সবচেয়ে সফল রূপটি হয়তো এতটা দৃশ্যমান নয়।
সেটি আমাদের বলে না কী ভাবতে হবে; বরং কোন বিষয়টি ভাবার যোগ্য, কোন ভাষায় তা ভাবতে হবে এবং কোন প্রশ্নটি ‘অযৌক্তিক’—সেই পরিসরটি আগে থেকেই তৈরি করে দেয়। সেটি সব সময় মুখ বন্ধ করে না; কখনো এমন শব্দ শেখায়, যার বাইরে কথা বলাই কঠিন। কখনো কারাগারে পাঠায় না; বরং এমনভাবে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’-এর সীমা নির্ধারণ করে যে মানুষ নিজেই নিজেকে সংশোধন করতে শুরু করে।
বিদ্যালয় সময়ানুবর্তিতা শেখায়, হাসপাতাল সুস্থতার সংজ্ঞা দেয়, আদালত বৈধতার ভাষা নির্ধারণ করে, সংবাদমাধ্যম বলে কোন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ঠিক করে কোন বক্তব্যটি দৃশ্যমান হবে।
ক্ষমতা তখন কেবল আমাদের ওপর প্রয়োগ করা কিছু নয়। আমরা নিজেদের এবং পৃথিবীকে যেভাবে বুঝি, তার ভেতরেও ক্ষমতা কাজ করে।
রাজা থেকে নিয়মের শাসন
ক্ষমতার প্রচলিত ছবি হলো একটি পিরামিড। ওপরে রাজা, সরকার বা শাসকগোষ্ঠী; নিচে প্রজা। ওপর থেকে আদেশ আসে, নিচে আনুগত্য সৃষ্টি হয়।
ইতিহাসের বহু পর্যায়ে এই ছবিটি যথার্থ। রাজা কর আরোপ করতেন, সেনাবাহিনী বিদ্রোহ দমন করত, আদালত শাস্তি দিত। সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রকাশ ছিল—কে বাঁচবে এবং কে মরবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা।
কিন্তু আধুনিক সমাজ শুধু প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞায় চলে না। একজন শিক্ষার্থী কখন স্কুলে ঢুকবেন, কোথায় বসবেন, কতক্ষণে পরীক্ষা শেষ করবেন—সবই সূচি ও নিয়মে নির্ধারিত। শ্রমিকের কাজ ঘণ্টা ও উৎপাদনে, রোগীর শরীর সূচক ও রিপোর্টে, নাগরিকের পরিচয় কাগজ ও ডেটাবেজে পরিণত হয়।
এখানে কাউকে প্রতিদিন প্রহার করার প্রয়োজন নেই। সময়সূচি, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, রেকর্ড, পদোন্নতি ও তুলনাই আচরণকে গড়ে তোলে।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর বড় অবদান ছিল—ক্ষমতাকে শুধু ‘কে শাসন করছে?’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘কোন পদ্ধতিতে মানুষকে পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস ও গঠন করা হচ্ছে?’—এই প্রশ্ন সামনে আনা।
ফুকো: ক্ষমতা নিষেধ করে, আবার উৎপাদনও করে
ফুকোর কাছে ক্ষমতা কেবল আইন, পুলিশ বা রাষ্ট্রের হাতে থাকা সম্পত্তি নয়। এটি পরিবার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারখানা, কারাগার, সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পেশাগত প্রতিষ্ঠানের ভেতর ছড়িয়ে থাকা সম্পর্ক।
ক্ষমতা অবশ্যই বাধা দেয়। কিন্তু সেটি শুধু দমন করে না; মানুষ, পরিচয়, দক্ষতা এবং জ্ঞানও তৈরি করে।
বিদ্যালয় শুধু অজ্ঞতা দূর করে না। এটি ‘মেধাবী’, ‘দুর্বল’, ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ ও ‘সমস্যাজনক’ শিক্ষার্থীর শ্রেণি তৈরি করে। হাসপাতাল শুধু রোগ সারায় না; কোন শরীর সুস্থ, কোন আচরণ রোগের লক্ষণ এবং কার চিকিৎসা দরকার—তার স্বীকৃত ভাষা তৈরি করে। অপরাধবিজ্ঞান শুধু অপরাধের বর্ণনা দেয় না; ‘অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি’র একটি পরিচয়ও নির্মাণ করে।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান আগে থেকে থাকা মানুষকে শুধু শনাক্ত করছে না। পরিমাপ, নামকরণ ও আচরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধরনের মানুষও তৈরি করছে।
Stanford Encyclopedia of Philosophy-এর ফুকোবিষয়ক আলোচনায় তাঁর ‘normalization’ বা স্বাভাবিকীকরণ ধারণাটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আইনের পুরোনো ব্যবস্থা জিজ্ঞেস করত—কাজটি বৈধ, না অবৈধ? শৃঙ্খলামূলক প্রতিষ্ঠান আরও সূক্ষ্ম প্রশ্ন করে—ব্যক্তিটি স্বাভাবিক মানদণ্ডের তুলনায় কোথায় অবস্থান করছে?
এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি মানুষের পরিচয়ের গভীরে প্রবেশ করে।
‘স্বাভাবিক’ কথাটির রাজনৈতিক জীবন
স্বাভাবিক বলতে আমরা সাধারণত প্রকৃতিগত, নিরপেক্ষ ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা কিছু বুঝি। কিন্তু কোন ওজন স্বাভাবিক, কোন উচ্চারণ শুদ্ধ, কোন পোশাক পেশাদার, কোন পরিবার আদর্শ, কোন আচরণ ভদ্র—এসব মানদণ্ড সব সময় প্রকৃতি থেকে সরাসরি আসে না।
এগুলোর পেছনে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সম্পর্ক থাকে।
এর অর্থ এই নয় যে সব মানদণ্ডই মিথ্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রক্তচাপের পরিমাপ কিংবা প্রকৌশলে নিরাপত্তার মান বাস্তব প্রয়োজন মেটায়। কিন্তু কোনো মানদণ্ড কে তৈরি করেছে, কাদের ওপর পরীক্ষা হয়েছে, কার জীবনকে আদর্শ ধরা হয়েছে এবং বিচ্যুতির মূল্য কে দেয়—এসব প্রশ্নও জরুরি।
সমস্যা মানদণ্ড থাকার মধ্যে নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন ইতিহাসনির্ভর একটি মানদণ্ডকে একমাত্র প্রাকৃতিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং তার বাইরে থাকা মানুষকে অযোগ্য, অসুস্থ বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
‘স্বাভাবিক’ তখন বর্ণনা নয়, নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি হয়ে ওঠে।
প্যানঅপটিকন: প্রহরী না থাকলেও পাহারা
ফুকো তাঁর Discipline and Punish গ্রন্থে জেরেমি বেন্থামের প্রস্তাবিত প্যানঅপটিকন কারাগারের নকশা ব্যবহার করেন। বৃত্তাকার কারাগারের মাঝখানে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। প্রতিটি বন্দিকে দেখা সম্ভব, কিন্তু বন্দি জানেন না ঠিক কোন মুহূর্তে তাঁকে দেখা হচ্ছে।
ফলে প্রহরী সব সময় পর্যবেক্ষণ না করলেও বন্দি এমনভাবে আচরণ করেন যেন তিনি সব সময় দৃশ্যমান। বাইরের পাহারা ধীরে ধীরে ভেতরের আত্মনিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়।
ফুকোর প্যানঅপটিসিজমের মূল আলোচনায় এই নকশাকে শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতার একটি সাধারণ মডেল হিসেবে বিস্তৃত করা হয়েছে।
আজকের কর্মক্ষেত্রে লগ-ইন রেকর্ড, বিদ্যালয়ে উপস্থিতির অ্যাপ, শহরে ক্যামেরা, মোবাইলের অবস্থান, অনলাইন কর্মক্ষমতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্থায়ী দৃশ্যমানতা নতুন ধরনের প্যানঅপটিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এখানে পার্থক্যও আছে। আধুনিক মানুষ শুধু পর্যবেক্ষিত হন না; লাইক, অনুসারী ও দৃশ্যমানতার আশায় স্বেচ্ছায় নিজেকেও প্রদর্শন করেন। নজরদারি ও আত্মপ্রচারের সীমানা মিশে যায়।
মানুষ তখন শুধু নিয়ম মেনে চলে না; অন্যের সম্ভাব্য দৃষ্টির জন্য নিজের জীবন সাজাতে শুরু করে।
জ্ঞান কি ক্ষমতার বিপরীত?
আমরা প্রায়ই ভাবি, ক্ষমতা সত্যকে বিকৃত করে এবং জ্ঞান সেই বিকৃতি সরিয়ে দেয়। ফুকো বিষয়টিকে আরও জটিলভাবে দেখেছেন। তাঁর ‘power/knowledge’ ধারণা অনুযায়ী, জ্ঞান ও ক্ষমতা প্রায়ই একে অপরকে উৎপাদন করে।
একটি রাষ্ট্র জনগণকে জানতে আদমশুমারি করে। সেই জ্ঞান দিয়ে জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর পরিকল্পনা করা যায়। আবার একই শ্রেণিবিন্যাস দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে নজরদারি বা বৈষম্যের লক্ষ্যও করা যায়।
একটি হাসপাতাল রোগীর তথ্য সংগ্রহ করে চিকিৎসা উন্নত করতে পারে। একই তথ্য বীমা, কর্মসংস্থান বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উপকরণ হতে পারে। বিদ্যালয়ের পরীক্ষা শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি শনাক্ত করতে পারে; একই সঙ্গে একটি নম্বর দিয়ে তার বহু বছরের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করতে পারে।
জ্ঞান তাই ক্ষমতার নিছক শত্রু নয়। কোন তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কোন বিভাগে মানুষকে রাখা হবে এবং কোন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যকে বৈধ ধরা হবে—এসবের সঙ্গে ক্ষমতা জড়িত।
তবে এখান থেকে ‘সব সত্যই ক্ষমতার বানানো’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ভুল। একটি রোগজীবাণু রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও তার জৈবিক অস্তিত্ব মুছে যায় না। ফুকোর দরকারি প্রশ্নটি হলো—সত্যের দাবিটি কোন পদ্ধতিতে যাচাই হচ্ছে এবং সেটির ভিত্তিতে কার ওপর কী ধরনের কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা হচ্ছে?
ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক পরীক্ষা করা সত্যকে অস্বীকার নয়; বরং সত্য দাবির প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতিকে জবাবদিহির মধ্যে আনা।
গ্রামসি: মানুষ কেন শাসকের ধারণাকেই নিজের ধারণা ভাবে?
ইতালীয় চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি ফ্যাসিস্ট কারাগারে বসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন: আধুনিক শাসকগোষ্ঠী কেন প্রতিদিন সহিংসতা ব্যবহার না করেও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে?
তাঁর উত্তর ছিল—শাসন শুধু বলপ্রয়োগে নয়, সম্মতির মাধ্যমেও চলে।
গ্রামসি ‘হেজেমনি’ বা আধিপত্য বলতে এমন বৌদ্ধিক ও নৈতিক নেতৃত্ব বুঝিয়েছেন, যার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠীর মূল্যবোধ পুরো সমাজের সাধারণ বুদ্ধি বা common sense হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। Stanford Encyclopedia-এর গ্রামসিবিষয়ক আলোচনায় আধিপত্যকে সমাজজুড়ে শাসকগোষ্ঠীর বৌদ্ধিক ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শুধু রাষ্ট্র নয়—বিদ্যালয়, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং পেশাজীবী সংগঠনও এই সম্মতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
ধরা যাক, একটি সমাজে বলা হয়—ধনী মানুষ অবশ্যই বেশি পরিশ্রমী, দরিদ্রতা মূলত ব্যক্তিগত ব্যর্থতা এবং চাকরি না পাওয়া দক্ষতার ঘাটতি। বক্তব্যগুলো বারবার প্রচারিত হতে হতে কাঠামোগত বৈষম্য, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ কিংবা শ্রমবাজারের সংকট দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে পারে।
আবার বিপরীত রাজনৈতিক শক্তিও নিজেদের ধারণাকে ‘জনগণের স্বাভাবিক কথা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আধিপত্য কেবল সরকারের প্রকল্প নয়; বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অর্থ ও বৈধতা দখলের লড়াই।
সম্মতি মানেই প্রতারণা নয়
গ্রামসির ধারণাকে কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সাধারণ মানুষ কেবল প্রচারণার শিকার এবং তাদের প্রতিটি বিশ্বাস শাসকশ্রেণির হাতে তৈরি। এতে সাধারণ মানুষের বিচারক্ষমতাকে ছোট করা হয়।
মানুষ কোনো ধারণা গ্রহণ করে কারণ সেটি তার অভিজ্ঞতার অন্তত কিছু অংশ ব্যাখ্যা করে, পরিচয়ের অনুভূতি দেয় অথবা বাস্তব সুবিধা পৌঁছে দেয়। আধিপত্য টেকসই হতে হলে শুধু মিথ্যা প্রচার যথেষ্ট নয়; কিছু দাবি মেনে নেওয়া, কিছু সুরক্ষা দেওয়া এবং বিভিন্ন স্বার্থের সঙ্গে সমঝোতাও প্রয়োজন।
একই মানুষের চিন্তায় পরস্পরবিরোধী ধারণা থাকতে পারে। তিনি কর্তৃত্ব মেনে চলেন, আবার নির্দিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। পারিবারিক মূল্যবোধে রক্ষণশীল হলেও কর্মক্ষেত্রে সমতার পক্ষে থাকতে পারেন।
‘সাধারণ বুদ্ধি’ তাই একক মতাদর্শ নয়; ইতিহাস থেকে পাওয়া অসংখ্য ধারণার অসামঞ্জস্যপূর্ণ মিশ্রণ। রাজনীতি সেই মিশ্রণের কোনো অংশকে সক্রিয় করে, কোনো অংশকে নীরব রাখে।
ভাষা যখন চিন্তার সীমা নির্ধারণ করে
কোনো ঘটনার নাম কী দেওয়া হচ্ছে, তা নিরপেক্ষ নয়।
একই মানুষকে ‘বিক্ষোভকারী’, ‘আন্দোলনকারী’, ‘উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলা যায়। একই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে ‘সংস্কার’, ‘কৃচ্ছ্রসাধন’ বা ‘অধিকার সংকোচন’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়। একটি যুদ্ধের মানুষ ‘নিহত’, ‘শহীদ’, ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘পার্শ্বক্ষতি’ হতে পারেন—বক্তার অবস্থান অনুযায়ী।
শব্দ শুধু ঘটনা বর্ণনা করে না; কোন আবেগ অনুভব করব এবং কী ধরনের প্রতিক্রিয়াকে যৌক্তিক মনে হবে, সেটিও প্রভাবিত করে।
তবে ভাষার ক্ষমতা মানে বস্তুগত বাস্তবতা নেই—এমন নয়। কোনো মানুষ নিহত হয়েছেন কি না, সেটি তথ্যের প্রশ্ন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কোন বৃহত্তর গল্পে স্থাপন করা হবে, কার দায় সামনে আসবে এবং কোন জীবনকে শোকযোগ্য ধরা হবে—সেটি ক্ষমতার প্রশ্নও।
তথ্য ও অর্থ আলাদা নয়, আবার অভিন্নও নয়। ক্ষমতা প্রায়ই তথ্য মুছে দেওয়ার পাশাপাশি তার অর্থ নিয়ন্ত্রণ করে।
সংবাদমাধ্যম: কী ভাববেন নয়, কী নিয়ে ভাববেন
সংবাদমাধ্যমের প্রভাব সব সময় সরাসরি মত চাপিয়ে দেওয়ায় নয়। কোন ঘটনা প্রথম পাতায় যাবে, কোনটি তিন দিন আলোচিত হবে, কার বক্তব্য বিশেষজ্ঞ মত হিসেবে আসবে এবং কোন সংকট কোনো ছবিই পাবে না—এসব নির্বাচন জনপরিসরের অগ্রাধিকার তৈরি করে।
একটি বিষয় নিয়মিত দৃশ্যমান হলে মানুষ সেটিকে জাতীয় সংকট ভাবতে শুরু করতে পারেন। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু কম নাটকীয় সমস্যা—শ্রমিকের অসুস্থতা, পরিবেশদূষণ, বিদ্যালয়ত্যাগ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য—অদৃশ্য থেকে যেতে পারে।
এখানে প্রতিটি সম্পাদক ষড়যন্ত্র করছেন—এমন নয়। সময়, অর্থ, দর্শকের আগ্রহ, মালিকানা, পেশাগত রীতি এবং তথ্যপ্রাপ্তির সুবিধা মিলেই সংবাদ নির্বাচন গড়ে ওঠে।
ক্ষমতা ব্যক্তির উদ্দেশ্যের চেয়েও বড় একটি কাঠামো হতে পারে। একজন সাংবাদিক সৎ থেকেও এমন ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে পারেন, যেখানে নির্দিষ্ট ধরনের ঘটনা সহজেই ‘সংবাদ’ হয় এবং অন্যগুলো হয় না।
অ্যালগরিদম: নতুন যুগের অদৃশ্য সম্পাদক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ কাকে অনুসরণ করবেন, সেই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অ্যালগরিদম ঠিক করে অনুসরণ করা মানুষদের কোন পোস্টটি আগে দেখানো হবে।
প্ল্যাটফর্মগুলো বিপুল পরিমাণ বক্তব্যের মধ্যে দৃশ্যমানতা বণ্টন করে। কোনো বক্তব্য নিষিদ্ধ না করেও সেটিকে প্রায় অদৃশ্য করা যায়; আবার কোনো প্রান্তিক বক্তব্যকে ধারাবাহিকভাবে সুপারিশ করে মূলধারার অনুভূতি দেওয়া যায়।
এক্ষেত্রে প্রমাণও সরল নয়। কিছু গবেষণায় সুপারিশব্যবস্থা অনলাইন নেটওয়ার্ক ও মেরুকরণের গতিবিধিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে দেখা গেছে। PNAS-এ প্রকাশিত নেটওয়ার্ক-সুপারিশ গবেষণা এই সম্ভাবনা তুলে ধরে। আবার প্রায় নয় হাজার অংশগ্রহণকারীর কয়েকটি পরীক্ষায় স্বল্পমেয়াদি ‘ফিল্টার বাবল’ ধরনের সুপারিশ মানুষের মতামতে সীমিত প্রভাব ফেলেছে। সেই PNAS গবেষণাটি অতিরঞ্জিত একমুখী দাবির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
অর্থাৎ অ্যালগরিদম মানুষকে যন্ত্রের মতো নিয়ন্ত্রণ করে—এমন দাবি দুর্বল। কিন্তু দৃশ্যমানতা, পুনরাবৃত্তি, সামাজিক সংযোগ এবং আলোচনার আবেগগত তাপমাত্রা বদলে দিয়ে এটি চিন্তার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টে সুপারিশব্যবস্থার প্রধান পরামিতি সম্পর্কে স্বচ্ছতার দাবি এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কমিশনের ব্যাখ্যা অনুসারে, অনলাইন সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো আইনের একটি মূল লক্ষ্য।
আরেন্ট: ক্ষমতা ও সহিংসতা এক নয়
হান্না আরেন্ট ক্ষমতাকে শুধু শাসকের নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি হয় যখন মানুষ একটি সাধারণ উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করে।
Stanford Encyclopedia-এর আরেন্টবিষয়ক আলোচনায় ক্ষমতাকে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও সহিংসতা থেকে আলাদা করা হয়েছে। ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি বহু মানুষের সম্মিলিত কার্যক্ষমতা। আর সহিংসতা নির্ভর করে বাধ্য করার উপকরণের ওপর।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি সরকার অস্ত্র দিয়ে মানুষকে নীরব করতে পারে, কিন্তু নীরবতা সব সময় সম্মতি নয়। সহিংসতা তাৎক্ষণিক আনুগত্য তৈরি করতে পারে; টেকসই রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য বৈধতা ও সম্মিলিত সমর্থন দরকার।
অন্যদিকে নাগরিকেরাও ক্ষমতাহীন নন। শ্রমিকেরা একত্র হলে, শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হলে, সাংবাদিকেরা পেশাগত মান রক্ষা করলে কিংবা সাধারণ মানুষ কোনো সরকারি ভাষ্য প্রত্যাখ্যান করলে নতুন সম্মিলিত ক্ষমতা জন্ম নেয়।
ক্ষমতা শুধু ওপর থেকে নিচে নামে না। নিচ থেকেও সৃষ্টি হয়।
আমরা কি তবে নিজের কোনো চিন্তাই ভাবি না?
ফুকো বা গ্রামসিকে পড়ে একটি হতাশাবাদী সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ: যদি ভাষা, শিক্ষা, সংবাদ ও প্রতিষ্ঠান আমাদের চিন্তা তৈরি করে, তবে স্বাধীন চিন্তা বলে কিছু নেই।
কিন্তু আমরা সামাজিক প্রভাবের বাইরে দাঁড়াতে না পারলেও সেই প্রভাব নিয়ে ভাবতে পারি। আমরা যে ভাষা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, সেই ভাষা দিয়েই ভাষার সীমা সমালোচনা করতে পারি। যে শিক্ষা আমাদের শ্রেণিবিন্যাস করেছে, সেই শিক্ষা দিয়েই শ্রেণিবিন্যাসের অন্যায় শনাক্ত করা যায়।
ক্ষমতার সম্পর্ক স্থির নয়। একই বিদ্যালয় আনুগত্য শেখাতে পারে, আবার প্রশ্ন করার ভাষাও দিতে পারে। একই সংবাদমাধ্যম প্রচারণা চালাতে পারে, আবার ক্ষমতার গোপন তথ্যও প্রকাশ করতে পারে। একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নজরদারি ও বিভ্রান্তির যন্ত্র হতে পারে, আবার নিপীড়িত মানুষের সংগঠনের জায়গাও হতে পারে।
ফুকোর চিন্তায় যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে প্রতিরোধের সম্ভাবনাও থাকে। কারণ ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে কাজ করে; সম্পর্ক বদলালে তার ফলও বদলায়।
সমালোচনামূলক চিন্তা কীভাবে সম্ভব?
সমালোচনামূলক চিন্তা মানে কোনো কিছুতেই বিশ্বাস না করা নয়। সব সংবাদকে মিথ্যা, সব প্রতিষ্ঠানকে ষড়যন্ত্র এবং সব বিশেষজ্ঞকে ক্ষমতার প্রতিনিধি ভাবা সমালোচনা নয়; সেটি আরেক ধরনের সহজ বিশ্বাস।
বরং কয়েকটি প্রশ্ন নিয়মিত করা দরকার:
- এই সমস্যাটি কোন ভাষায় বর্ণনা করা হচ্ছে, এবং অন্য ভাষায় বললে কী বদলাবে?
- কে কথা বলার বৈধতা পাচ্ছেন, আর কার অভিজ্ঞতা বাদ পড়ছে?
- কোন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, কোন তথ্য সংগ্রহই করা হয়নি?
- যে মানদণ্ডে মানুষকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, সেটি কে তৈরি করেছে?
- কার স্বার্থকে ‘সবার স্বার্থ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?
- এই ব্যবস্থার সুবিধা ও ঝুঁকি কার মধ্যে কীভাবে বণ্টিত?
- বক্তব্যটির বিপরীত প্রমাণ কী হতে পারে?
- আমি সত্য বলে মেনে নিচ্ছি কারণ প্রমাণ আছে, নাকি এটি আমার পরিচয়ের সঙ্গে মানানসই?
সমালোচনার লক্ষ্য সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা নয়; প্রতিষ্ঠানকে নিজের পদ্ধতি ও কর্তৃত্ব ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করা।
ক্ষমতার বিরুদ্ধে শুধু ‘সচেতনতা’ যথেষ্ট নয়
ব্যক্তিগত সচেতনতা প্রয়োজন, কিন্তু একা যথেষ্ট নয়। একজন ব্যবহারকারী অ্যালগরিদম সম্পর্কে জানলেও প্ল্যাটফর্মের ডেটা ও নকশার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ সীমিত। একজন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের নজরদারি বুঝলেও চাকরি হারানোর ভয় তাঁকে বাধ্য করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা জানলেও নম্বরের বাইরে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ নাও পেতে পারেন।
তাই চিন্তার স্বাধীনতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও দরকার:
স্বচ্ছ সিদ্ধান্তপদ্ধতি, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, তথ্য অধিকার, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, অ্যালগরিদম নিরীক্ষা, শিক্ষায় প্রশ্নের সুযোগ, গবেষণার স্বাধীনতা এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা।
এগুলো ক্ষমতাহীন সমাজ তৈরি করে না। বরং ক্ষমতাকে দৃশ্যমান, প্রতিদ্বন্দ্বিতাযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করে।
মিডিয়া ও তথ্যসাক্ষরতা নিয়েও ইউনেসকোর কর্মসূচি মানুষের তথ্যকে সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন এবং অনলাইন পরিবেশে সচেতনভাবে অংশগ্রহণের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়।
ক্ষমতা শুধু সংসদ, সচিবালয়, আদালত কিংবা পুলিশ স্টেশনে থাকে না। সেটি শ্রেণিকক্ষের আসনবিন্যাসে, হাসপাতালের ফরমে, পরীক্ষার নম্বরে, সংবাদ শিরোনামে, কর্মক্ষেত্রের মূল্যায়নে এবং মোবাইলের ‘আপনার জন্য’ ফিডেও কাজ করে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি নিয়ম অত্যাচার, প্রতিটি জ্ঞান মিথ্যা কিংবা প্রতিটি সামাজিক প্রভাব গোপন ষড়যন্ত্র। প্রতিষ্ঠান ছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, ন্যায়বিচার ও যৌথ জীবন সম্ভব নয়। আসল প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠান কোন মানুষ তৈরি করছে, কোন আচরণকে স্বাভাবিক করছে এবং তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সুযোগ রাখছে কি না।
ক্ষমতার সবচেয়ে গভীর সাফল্য তখন ঘটে, যখন একটি বিশেষ স্বার্থকে আমরা সাধারণ সত্য, একটি ঐতিহাসিক নিয়মকে প্রাকৃতিক বিধান এবং শেখানো আকাঙ্ক্ষাকে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা বলে ভাবতে শুরু করি।
আর প্রতিরোধের শুরু তখনই, যখন আমরা শুধু ‘কে শাসন করছে?’ জিজ্ঞেস না করে আরও একটি প্রশ্ন করি—
আমরা যেভাবে চিন্তা করছি, সেই চিন্তার ভাষা ও সীমা কে তৈরি করেছে?
আপনার মতামত জানানঃ