একই উপমহাদেশ, কাছাকাছি সংস্কৃতি, একই ভাষার মানুষের বসবাস—তবু গণপরিবহনের ভাড়ার বাস্তবতায় যেন দুই শহরের দুই গল্প। কলকাতায় ২০১৮ সাল থেকে বেসরকারি বাসের সরকারি নির্ধারিত ভাড়া কার্যত অপরিবর্তিত। অথচ বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসভাড়া নিয়ে নতুন করে হিসাব শুরু হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানেও ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে—কলকাতা আট বছর ভাড়া না বাড়িয়ে কীভাবে টিকে আছে, আর বাংলাদেশে কেন জ্বালানি তেলের দামের পরিবর্তন এত দ্রুত যাত্রীর পকেটে এসে ঠেকে?
প্রশ্নটি কেবল বাসভাড়ার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দর্শন, রাষ্ট্রের ভূমিকা, পরিবহন ব্যবসার কাঠামো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সাধারণ মানুষের যাতায়াতের খরচ।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনাই তার সর্বশেষ উদাহরণ। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নতুন করে বাসভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় ঢাকাসহ চট্টগ্রাম মহানগরে বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসেও প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে। অর্থাৎ জ্বালানি ব্যয়ের পরিবর্তনের একটি অংশ সরাসরি যাত্রীর ওপর স্থানান্তরিত হয়েছে।
অন্যদিকে কলকাতার চিত্রটি ভিন্ন। সেখানে ২০১৮ সাল থেকে বেসরকারি বাসের সরকারি নির্ধারিত ভাড়া বাড়েনি। প্রথম ধাপের সরকারি ভাড়া ৭ রুপি। যদিও বাস্তবে কিছু বাসে ১০ রুপি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাসমালিকদের সংগঠন অবশ্য বলছে, বর্তমান ভাড়ায় বাস চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, প্রথম ধাপের ভাড়া ২০ রুপি করা হোক।
অর্থাৎ কলকাতায়ও সমস্যা নেই—এমন নয়। বরং আট বছর ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার ফল হিসেবে বাসমালিকদের ওপর ব্যয়ের চাপ জমেছে। জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। বাসমালিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, কলকাতার রাস্তায় বাসের সংখ্যাও কমেছে। কোভিডের আগে যেখানে প্রায় ৬ হাজার বাস চলাচল করত, বর্তমানে তা প্রায় ৩ হাজার ৫০০-তে নেমে এসেছে বলে তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তাহলে কলকাতার আট বছরের গল্পকে কি বাংলাদেশের সামনে সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়?
পুরোপুরি নয়।
কারণ কম ভাড়া মানেই সবসময় ভালো গণপরিবহন নয়। ভাড়া কম রাখতে গিয়ে যদি বাসমালিকরা নতুন বাস না কেনেন, পুরোনো বাসের রক্ষণাবেক্ষণ কমে যায় কিংবা রুট থেকে বাস তুলে নেন, তাহলে কাগজে যাত্রী সস্তায় ভ্রমণ করলেও বাস্তবে তাকে দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভিড় কিংবা কম বাসের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
কলকাতার বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে। পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার পর বেসরকারি বাসের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। তবে একই সঙ্গে যাত্রীসেবার মান উন্নত করার কথাও বলা হয়েছে।
এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।
বাংলাদেশে যখন বাসভাড়া বাড়ে, তখন সাধারণ যাত্রীর প্রথম প্রশ্ন থাকে—ভাড়া বাড়ল, কিন্তু সেবা কি বাড়ল?
বাস কি সময়মতো আসে? নির্ধারিত স্টপেজে থামে? অতিরিক্ত যাত্রী বহন কমে? বাসের ভেতরের পরিবেশ উন্নত হয়? চালক ও সহকারীদের আচরণ বদলায়? যাত্রী কি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন?
বাসভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে যদি এসব প্রশ্নের কোনো সম্পর্ক না থাকে, তাহলে ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কাছে কেবল ব্যয়ের বৃদ্ধি হিসেবেই ধরা পড়ে।
বাংলাদেশের গণপরিবহনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভাড়া নির্ধারণ এবং বাস্তবে ভাড়া আদায়ের মধ্যে ব্যবধান। সরকারি কাঠামোতে নির্ধারিত ভাড়া থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে নতুন ভাড়া নির্ধারণের পরও প্রশ্ন থাকে—বাস্তবে যাত্রী কত টাকা দেবেন?
এর সঙ্গে যোগ হয় রুট ব্যবস্থাপনার সমস্যা। একই সড়কে একাধিক বাস কোম্পানি, অনিয়মিত বাস চলাচল, প্রতিযোগিতামূলকভাবে যাত্রী তোলার চেষ্টা এবং সড়কে বিশৃঙ্খল থামার প্রবণতা—সব মিলিয়ে গণপরিবহনকে একটি সমন্বিত সেবা হিসেবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কলকাতার ক্ষেত্রেও অবশ্য এমন সমস্যা নেই—এমন দাবি করা যায় না। বরং সেখানে দীর্ঘদিন ভাড়া স্থির রাখার পাশাপাশি বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ার দাবি দেখিয়ে দেয়, গণপরিবহনকে টেকসই করতে শুধু ভাড়া নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়।
তাহলে বাংলাদেশ কী করতে পারে?
প্রথম কাজ হতে পারে পরিবহন খাতের প্রকৃত ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব তৈরি করা। একটি বাস প্রতিদিন কত কিলোমিটার চলে, কত লিটার ডিজেল ব্যবহার করে, চালক ও সহকারীর বেতন কত, রক্ষণাবেক্ষণে কত ব্যয় হয়, টোল ও কর কত, বাসের মূল্য কত এবং নির্দিষ্ট সময় পর বাস প্রতিস্থাপনে কত অর্থ প্রয়োজন—এসব তথ্য প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য হওয়া দরকার।
তাহলেই বোঝা যাবে, একটি নির্দিষ্ট ভাড়া বাস্তবে কতটা যৌক্তিক।
দ্বিতীয়ত, ভাড়া বাড়ানোর সঙ্গে সেবার মানের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। ভাড়া বাড়বে, কিন্তু বাসের সংখ্যা বা মান বাড়বে না—এমন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীর আস্থা তৈরি করতে পারে না।
পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রীও ভাড়া বাড়ানোর সঙ্গে উন্নত যাত্রীসেবা, ভালোভাবে পরিচালিত বাস এবং এসি বাসসহ গণপরিবহনের মান উন্নয়নের কথা বলেছেন। অর্থাৎ সেখানে আলোচনাটি শুধু ‘ভাড়া কত হবে’—এতে আটকে নেই; ‘ভাড়া বাড়লে যাত্রী কী পাবেন’—সেটিও আলোচনার অংশ।
বাংলাদেশেও এমন কাঠামো তৈরি করা সম্ভব কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তৃতীয়ত, জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামাকে কেন্দ্র করে বারবার ভাড়া পুনর্নির্ধারণের পরিবর্তে একটি স্বচ্ছ সূত্র তৈরি করা যেতে পারে। জ্বালানি, শ্রম, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তনের ভিত্তিতে ভাড়া সমন্বয়ের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকলে প্রতিবার নতুন করে দরকষাকষির প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে—জ্বালানির দাম কমলে কি বাসভাড়াও কমবে?
যদি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া বাড়ে, কিন্তু দাম কমলে ভাড়া অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
আবার শুধু বাসমালিকদের দিকটিও দেখা যাবে না। পরিবহন ব্যবসা যদি লাভজনক না হয়, তাহলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। বাসের সংখ্যা কমতে পারে, রক্ষণাবেক্ষণ কমতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত যাত্রীসেবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুতরাং সমস্যার একপাশে যাত্রী, অন্যপাশে বাসমালিক। মাঝখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ভূমিকা।
রাষ্ট্র যদি বলে গণপরিবহন সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী রাখতে হবে, তাহলে তাকে শুধু ভাড়া আটকে রাখলেই হবে না। প্রয়োজনে পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, রুট ব্যবস্থাপনা, কর ও টোল কাঠামো পুনর্বিবেচনা, গণপরিবহনের জন্য সড়কে অগ্রাধিকার এবং আধুনিক টিকিটিং ব্যবস্থার মতো বিষয়েও কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে বাসমালিকদের কাছ থেকেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ভাড়া বাড়ানোর অনুমতি মানেই যাত্রীকে সীমাহীন চাপ দেওয়ার সুযোগ নয়।
কলকাতার অভিজ্ঞতা তাই বাংলাদেশের জন্য একটি সরল ‘ওরা পারে, আমরা পারি না’ গল্প নয়। বরং এটি দেখায়, গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আরও অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে।
আট বছর ভাড়া না বাড়ানোর পর কলকাতার বাসমালিকেরা যখন এখন ভাড়া বাড়ানোর দাবি করছেন, তখন বোঝা যায়—ভাড়া দীর্ঘদিন স্থির রাখারও একটি সীমা আছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে জ্বালানি ব্যয় বাড়লেই দ্রুত ভাড়া সমন্বয়ের প্রবণতা দেখায়—যাত্রীর ওপর অতিরিক্ত চাপও একটি বাস্তব সমস্যা।
দুই ব্যবস্থার মাঝখানে তাই হয়তো রয়েছে তৃতীয় একটি পথ।
সেটি হলো—ভাড়া হবে বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু যাত্রীর সামর্থ্যও বিবেচনায় থাকবে; বাসমালিকের ব্যবসা টেকসই হবে, কিন্তু যাত্রীসেবার মানও নিশ্চিত করতে হবে; জ্বালানির দাম বাড়লে ভাড়া সমন্বয় হতে পারে, কিন্তু দাম কমলে তার প্রভাবও ভাড়ায় প্রতিফলিত হবে; আর ভাড়া বাড়লে তার বিনিময়ে কী সেবা বাড়ল, সেটিও পরিমাপ করা হবে।
কারণ গণপরিবহন কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এটি মানুষের কর্মস্থলে যাওয়া, সন্তানের স্কুলে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানো, হাসপাতালে যাওয়া এবং প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি মৌলিক সেবা।
ঢাকার একজন যাত্রী যখন প্রতিদিন বাসে ওঠেন, তখন তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের জন্য টাকা দেন না। তিনি সময়, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও স্বস্তির জন্যও অর্থ ব্যয় করেন।
তাই বাংলাদেশের গণপরিবহন নীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘ভাড়া কত’ নয়; বরং ‘এই ভাড়ার বিনিময়ে যাত্রী কী পাচ্ছেন?’
কলকাতা আট বছর বাসভাড়া না বাড়িয়ে যে সমস্যাগুলো পার করেছে, বাংলাদেশ সেগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারে। আর বাংলাদেশে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে দ্রুত ভাড়া বাড়ানোর যে বাস্তবতা তৈরি হয়, সেটিও কলকাতার নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ভিন্ন শিক্ষা হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কোনো শহরের জন্যই শুধু ভাড়া কম রাখা যথেষ্ট নয়। একটি বাস সস্তা হলেই গণপরিবহন সস্তা হয় না; যদি সেই বাস সময়মতো না আসে, পর্যাপ্ত বাস না থাকে, যাত্রীকে দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করে যেতে হয় কিংবা নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অর্থ দিতে হয়।
আবার ভাড়া বাড়িয়ে বাসমালিকের হিসাব মেলালেই গণপরিবহন সফল হয় না; যদি যাত্রীর আয় সেই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে।
সফল গণপরিবহনের আসল পরীক্ষা তাই ভাড়ার অঙ্কে নয়—সিস্টেমের ভারসাম্যে।
কলকাতার আট বছরের ভাড়া-অপরিবর্তন বাংলাদেশকে সেই প্রশ্নই নতুন করে করতে বাধ্য করছে: আমরা কি শুধু ভাড়া বাড়ানোর হিসাব করছি, নাকি এমন একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবছি যেখানে যাত্রী, শ্রমিক, বাসমালিক এবং রাষ্ট্র—চার পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে?
কারণ শেষ পর্যন্ত বাসের ভাড়া যত কমই হোক, যদি মানুষ স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারে, সেই কম ভাড়ার সাফল্য কতটা—সেটিই আসল প্রশ্ন। আর ভাড়া যতই বাড়ুক, যদি তার সঙ্গে নিরাপদ, নিয়মিত ও মানসম্মত সেবা না বাড়ে, তাহলে সেই বাড়তি টাকার যৌক্তিকতাও যাত্রীর কাছে স্পষ্ট হবে না।
বাংলাদেশের গণপরিবহনকে তাই ‘ভাড়া বাড়ানো’ বনাম ‘ভাড়া না বাড়ানো’—এই দুই মেরুর বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে ভাড়ার প্রতিটি টাকার পেছনে থাকবে স্বচ্ছ হিসাব এবং প্রতিটি বাড়তি টাকার বিনিময়ে থাকবে দৃশ্যমান সেবা।
সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই কলকাতার সঙ্গে তুলনাটি আর শুধু প্রশ্ন হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে বাংলাদেশের গণপরিবহন সংস্কারের একটি বাস্তব শিক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ