
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শুধু তার ফটকে কতজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছেন, তা দিয়ে বোঝা যায় না। বোঝা যায় একজন শিক্ষার্থী কতটা নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন, একজন শিক্ষক কতটা স্বাধীনভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন এবং একজন সাংবাদিক কতটা নিরাপদে ক্ষমতাবান কারও কর্মকাণ্ডের ছবি তুলতে পারেন। ক্যামেরা চালু করার কারণে যদি হামলার মুখে পড়তে হয়, তাহলে সংকটটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সীমা ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা ও জবাবদিহির পরিবেশে পৌঁছে যায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে হামলায় চার সাংবাদিকসহ প্রায় দশজন আহত হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। প্রথম দিকের সংবাদে আহতের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে; তাই যাচাই ছাড়া কোনো একটি সংখ্যাকে চূড়ান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিবেদনে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধরের অভিযোগ এবং ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম এসেছে। অন্যদিকে চ্যানেল টোয়েন্টিফোর জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ঘটনার দায় ছাত্রশিবিরের ওপর দিয়েছেন। পরবর্তী সংবাদে ছাত্রদলের তিন নেতাকে বহিষ্কার ও ছয়জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা এসেছে। অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য ও সাংগঠনিক পদক্ষেপ—এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। বহিষ্কারকে আদালতের রায় হিসেবে দেখা যায় না; আবার পাল্টা অভিযোগও স্বাধীন তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।
এই ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে সংবাদ সংগ্রহের কাজটিকে দেখতে হবে। কোনো সংঘাতের ভিডিও ধারণ করা শুধু তাৎক্ষণিক খবর তৈরির উপাদান নয়। এটি পরে ঘটনার সময়ক্রম, উপস্থিত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাইয়ে সহায়তা করতে পারে। তবে একটি ভিডিওর খণ্ডাংশও সম্পূর্ণ সত্যের সমার্থক নয়; মূল ফুটেজ, সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট পরীক্ষা করা জরুরি। সাংবাদিকের ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া সেই যাচাইয়ের সুযোগই সংকুচিত করে।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকের অবস্থান বিশেষভাবে সংবেদনশীল। অনেকেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি। যাঁদের নিয়ে প্রতিবেদন করেন, তাঁদের পাশেই ক্লাস করতে হয়, হলে থাকতে হয় কিংবা প্রতিদিন চলাচল করতে হয়। সংবাদ প্রকাশের পর সম্পাদকীয় দপ্তর দূরে থাকতে পারে, কিন্তু স্থানীয় চাপ তাঁর জীবনে থেকে যায়। এই অবস্থায় নিরাপত্তা মানে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী দিনগুলোতে পড়াশোনা, আবাসন ও চলাচল স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থাও।
এই দ্বৈত পরিচয় থেকে স্বার্থের সংঘাতও তৈরি হতে পারে। কোনো সাংবাদিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল আছে কি না—এসব প্রশ্ন করা যায়। সংশোধন চাওয়া, প্রতিবাদ পাঠানো এবং প্রমাণসহ অভিযোগ তোলাও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কাউকে পক্ষপাতদুষ্ট বললেই তাঁর ওপর হামলা বৈধ হয়ে যায় না। সাংবাদিকের কাজের জবাবদিহি এবং তাঁর শারীরিক নিরাপত্তা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
হামলার প্রত্যক্ষ ক্ষতি দৃশ্যমান: আহত মানুষ, ভাঙা যন্ত্রপাতি, থেমে যাওয়া সংবাদ সংগ্রহ। পরোক্ষ ক্ষতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। একজন প্রতিবেদক পরেরবার ক্যামেরা বের করার আগে ভাবতে পারেন, এই খবরের মূল্য কি নিজের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি? কেউ হয়তো অভিযোগ শুনেও অনুসন্ধান করবেন না। এই ঘটনাতেই কতজন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার তথ্য আমাদের হাতে নেই। তবে ভয় থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গুরুতর।
ফলে একটি ক্যামেরার ওপর হামলার প্রভাব অন্যদের কাছেও পৌঁছাতে পারে। সাধারণ শিক্ষার্থী যদি দেখেন, প্রকাশ্যে তথ্য সংগ্রহ করা মানুষটিও সুরক্ষা পাচ্ছেন না, তাহলে নিজের অভিযোগ জানাতে তাঁর দ্বিধা বাড়তে পারে। হয়রানি, হলের অনিয়ম, আর্থিক অস্বচ্ছতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য বাইরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। যে পরিবেশে অভিযোগ প্রকাশের খরচ বেশি, সেখানে অনিয়ম টিকে থাকার সুবিধা পায়।
এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব কেন্দ্রীয়। দলগুলোর বক্তব্য সংগ্রহ করে একটি বিবৃতি দেওয়াতেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রশাসনকে ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই মানদণ্ড প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেটিও দৃশ্যমান হওয়া দরকার। নইলে প্রতিটি সিদ্ধান্তকে দলীয় সুবিধা বা প্রতিপক্ষ দমনের পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে।
দলীয় বহিষ্কারের তাৎপর্য আছে। এটি সংগঠনের ভেতরে আচরণের সীমা নির্ধারণের বার্তা দিতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধের তদন্ত ও বিচার পৃথক দায়িত্ব। কোনো সংগঠন নিজের সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার সম্পূর্ণ হয় না। আবার সাংগঠনিক শাস্তি হয়েছে বলেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্ত শাস্তি দিতে পারে না। প্রত্যেক পর্যায়ে ন্যায্য প্রক্রিয়া বজায় রাখতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ৫ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তির শিরোনামে ঘটনাটিকে কর্তৃত্বের সহিংস লড়াই হিসেবে উল্লেখ করে বিএনপি ও জামায়াতকে নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠন নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছে। এটি সংগঠনটির মূল্যায়ন। সেই মূল্যায়ন থেকে বৃহত্তর প্রশ্নটি ওঠে: ছাত্রসংগঠনের শক্তি কি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বে ব্যবহৃত হবে, নাকি ক্যাম্পাসে কে প্রশ্ন করতে পারবেন তা নির্ধারণে?
ছাত্ররাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। শিক্ষার্থীদের দাবি সংগঠিত করা, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক এবং প্রতিনিধিত্বের চর্চা তার বৈধ ভূমিকা। এই ভূমিকা দুর্বল হয় যখন সংগঠনের পরিচয় জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদে সমালোচনা এলে প্রমাণ দিয়ে উত্তর দেওয়ার বদলে ভয় দেখানো শুরু হলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও যুক্তির জায়গা হারায়।
স্বাধীন তদন্তের দাবি তাই বাস্তব ব্যবস্থায় রূপ নিতে হবে। তদন্তকারীদের সঙ্গে অভিযুক্ত পক্ষের স্বার্থের সম্পর্ক আছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। মূল ভিডিও, সম্ভাব্য সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসার নথি ও সাক্ষ্য দ্রুত সংরক্ষণ করতে হবে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। তদন্তের সময়সীমা এবং অগ্রগতি জানানোও জরুরি; তবে সাক্ষীর নিরাপত্তা বা সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা উচিত হবে না।
একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসার ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামের প্রতিকার এবং নতুন হুমকি এলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম মিলে যোগাযোগের নির্দিষ্ট ব্যক্তি ঠিক করতে পারে। নিরাপত্তার নামে সাংবাদিকদের চলাচল বা সংবাদ সংগ্রহে অযৌক্তিক বাধা দেওয়া হলে তারাও কাজ করতে পারবেন না। সুরক্ষার উদ্দেশ্য হবে স্বাধীনভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধির কাছ থেকে দ্রুত ছবি ও খবর চাইলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সম্পাদকীয় সহায়তা, ফুটেজের নিরাপদ সংরক্ষণ, আইনি সহযোগিতা এবং হামলার পরে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি কম পারিশ্রমিকে কাজ করেন বলে তাঁর নিরাপত্তার মূল্য কমে যায় না। প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত সংবাদ থেকে প্রতিষ্ঠান যে গুরুত্ব পায়, তার সঙ্গে প্রতিবেদকের প্রতি দায়িত্বও যুক্ত থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিরাপত্তার পরীক্ষা হবে ঘটনার পরের আচরণ। আহত সাংবাদিক আবার নির্ভয়ে কাজে ফিরতে পারছেন কি না, সাক্ষীরা চাপমুক্ত আছেন কি না, তদন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি পাচ্ছে কি না এবং অভিযুক্তের পরিচয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে কি না—এসবই দেখাবে নিন্দার বিবৃতি কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনল। শুধু কয়েক দিনের প্রতিবাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা মাপা সম্ভব নয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে তাই আহতের সংখ্যা কিংবা বহিষ্কারের খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বড় প্রশ্নটি হারিয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান হওয়ার কথা, যেখানে অস্বস্তিকর তথ্যও পরীক্ষা করা যায় এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা যায়। সাংবাদিকের নিরাপত্তা সেই পরিবেশের একটি জরুরি শর্ত। কারণ যে ক্যাম্পাসে প্রশ্ন করার সাহসকে সুরক্ষা দেওয়া হয় না, সেখানে জ্ঞানের স্বাধীনতাও ক্রমে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আপনার মতামত জানানঃ