
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কোনো দলের প্রচার করবেন না, শিক্ষার্থীকে মিছিলে যেতে বাধ্য করবেন না, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নম্বর দেবেন না—এ প্রত্যাশা ন্যায্য। কিন্তু সেই শিক্ষক স্কুলের বাইরে শিক্ষানীতি নিয়ে আপত্তি জানাতে পারবেন কি না, পেশাগত দাবিতে সংগঠিত হতে পারবেন কি না, কিংবা চাকরি বজায় রেখে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন কি না—এগুলো পৃথক প্রশ্ন। সবকিছুকে একসঙ্গে ‘রাজনীতি’ বললে সমস্যার সংজ্ঞা বিস্তৃত হয়; সমাধান অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গে ভবিষ্যতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এই পার্থক্যগুলোকে সামনে এনেছে। প্রশ্ন শুধু শিক্ষক দল করবেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করবে এবং সেই ক্ষমতার জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে।
ঘোষণায় কী আছে, কী এখনো অস্পষ্ট
দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্য মন্ত্রিসভা ভবিষ্যৎ SSC-নিযুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ সীমিত করার উদ্যোগ অনুমোদন করেছে। প্রতিবেদনে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ের কথা রয়েছে। পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপরও বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকদের এই নতুন শর্তের বাইরে রাখার ঘোষণা এসেছে।
তবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং সম্পূর্ণ কার্যকর চাকরিবিধি এক নয়। এবিপি লাইভের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় বিধি তৈরি করা হবে। এই লেখার জন্য চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন বা পূর্ণাঙ্গ সংশোধিত বিধির পাঠ যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিষেধাজ্ঞার সংজ্ঞা, প্রয়োগের পদ্ধতি ও প্রতিকারের সুযোগ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যাচ্ছে না।
এই সীমাটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘পশ্চিমবঙ্গের সব শিক্ষকের রাজনীতি নিষিদ্ধ’ বলা ঘোষণার পরিধিকে বাড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রাথমিক শিক্ষক, বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক—সবার ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়ারও ভিত্তি নেই।
নিরপেক্ষতার যুক্তি কেন গুরুত্ব পায়
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক সমান ক্ষমতার সম্পর্ক নয়। শিক্ষক মূল্যায়ন করেন, শৃঙ্খলা রক্ষা করেন এবং শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস গঠনে ভূমিকা রাখেন। সেই অবস্থান দলীয় আনুগত্য তৈরিতে ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। অভিভাবকেরও উদ্বেগ তৈরি হয়—নিজের রাজনৈতিক মতের কারণে সন্তানের প্রতি বৈষম্য হবে কি না।
দলীয় দায়িত্ব ও বিদ্যালয়ের দায়িত্বের মধ্যে সময়ের সংঘাতও ঘটতে পারে। নিয়মিত ক্লাসের সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, বিদ্যালয়ের সম্পদ প্রচারে ব্যবহার করা কিংবা প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব এড়ানো নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এখানে সরকারের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি আছে: শিক্ষার্থীর শিক্ষা এবং সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা সুরক্ষিত রাখতে হবে।
কিন্তু কোনো শিক্ষকের দলীয় পরিচয় থাকা এবং তাঁর পেশাগত দায়িত্বে পক্ষপাত করা অভিন্ন ঘটনা নয়। দলীয় সদস্যপদহীন শিক্ষকও পক্ষপাত করতে পারেন; রাজনৈতিক মতসম্পন্ন শিক্ষকও ন্যায়সংগতভাবে পাঠদান করতে পারেন। তাই নিয়মের সাফল্য মাপতে হবে আচরণ ও ফলাফল দিয়ে।
দলীয় প্রভাবের দরজা শুধু শিক্ষকের কাছে নয়
ধরা যাক, কোনো বিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষক নির্বাচনে দাঁড়াতে পারলেন না। কিন্তু তাঁর বদলি নির্ভর করল রাজনৈতিক সুপারিশের ওপর, পরিচালন ব্যবস্থায় প্রভাবশালীদের অনানুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব রইল এবং অভিযোগের নিষ্পত্তিতে দলীয় পরিচয় গুরুত্ব পেল। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকের ওপর বিধিনিষেধ বাড়লেও প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো দলমুক্ত হবে না।
এগুলো বর্তমান সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রমাণিত ঘটনার তালিকা নয়; প্রস্তাবিত নীতির কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রশ্ন। শিক্ষা ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় পক্ষপাত ঢুকতে পারে, সেই পুরো প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
নিয়োগে প্রকাশ্য মানদণ্ড, বদলিতে লিখিত কারণ, পদোন্নতিতে যাচাইযোগ্য মূল্যায়ন এবং পরিচালন ব্যবস্থায় স্বার্থের সংঘাত প্রকাশের বাধ্যবাধকতা সেই কাজের অংশ হতে পারে। বিদ্যালয়ে দলীয় কর্মসূচি বন্ধ করার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক আনুগত্য দাবি করা বন্ধ রাখতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকের জন্য এক নিয়ম, বিরোধী মতের শিক্ষকের জন্য আরেক নিয়ম হলে নিরপেক্ষতার দাবি বিশ্বাস হারাবে।
‘সরাসরি রাজনীতি’র সীমানা কোথায়
একজন শিক্ষক দলের প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন—এটি শনাক্ত করা সহজ। কিন্তু শিক্ষকসংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া, বেতনবৈষম্যের প্রতিবাদ করা কিংবা পাঠ্যবইয়ের কোনো পরিবর্তনের সমালোচনা করা কি একই শ্রেণির কাজ?
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে শিক্ষক সংগঠনগুলোর আপত্তির কেন্দ্রে এই অস্পষ্টতা রয়েছে। পেশাগত দাবি ও শিক্ষানীতি নিয়ে দলনিরপেক্ষ বক্তব্যও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে ধরা হবে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে একটি শিক্ষক সংগঠন সিদ্ধান্তকে সমর্থনও জানিয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষকসমাজের প্রতিক্রিয়াকে একক অবস্থান হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
অস্পষ্ট বিধি প্রয়োগকারীর হাতে বড় ধরনের বিবেচনাধীন ক্ষমতা দেয়। তখন শিক্ষক জানতেই পারেন না কোন বক্তব্যের জন্য শাস্তির মুখে পড়বেন। এই অনিশ্চয়তা তাঁকে এমন কথাও বলা থেকে বিরত রাখতে পারে, যা বিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য প্রয়োজন।
শিক্ষককে পেশাগতভাবে দায়বদ্ধ রাখা এবং তাঁর কাছ থেকে নীরব আনুগত্য প্রত্যাশা করার মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি কার্যকর বিধিতে দলীয় প্রচার, নির্বাচনী দায়িত্ব, পেশাগত সংগঠন এবং শিক্ষা বিষয়ে মতপ্রকাশ আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়া প্রয়োজন।
একই বিদ্যালয়ে দুই ধরনের শর্ত
নতুন শর্ত পুরোনো কর্মীদের ওপর না চাপানোর যুক্তি বোধগম্য: নিয়োগের সময়কার শর্ত ও প্রত্যাশা হঠাৎ বদলে দিলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু নতুনদের জন্য নিষেধাজ্ঞা রেখে পুরোনোদের ছাড় দিলে একই বিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিষয়ে দুই ধরনের চাকরিশর্ত চলবে।
এতে সিদ্ধান্তটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্যায্য হয়ে যায় না। তবে সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে, শিক্ষার মানের জন্য যে কর্মকাণ্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছে, একই পরিবেশে সেটি একদল শিক্ষকের জন্য অনুমোদিত থাকবে কেন। পরিবর্তনের সময়সীমা, দায়িত্বের সংঘাত এবং সমানভাবে প্রযোজ্য পেশাগত আচরণবিধি নিয়ে পরিষ্কার নীতি প্রয়োজন।
‘অন্য রাজ্যে এমন নিয়ম আছে’—এ যুক্তিও একা যথেষ্ট নয়। অন্য রাজ্যের কোন শ্রেণির শিক্ষক, কী ধরনের চাকরির মর্যাদায়, কোন বিধির অধীনে কাজ করেন—সেগুলো তুলনা করতে হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের আচরণবিধিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় কর্মীর বিধান দেখিয়েই পশ্চিমবঙ্গের সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম সরাসরি প্রযোজ্য বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি ও প্রতিষ্ঠানের আইনগত অবস্থান পরীক্ষা প্রয়োজন।
শিক্ষা দলমুক্ত করার বাস্তব পরীক্ষা
নতুন নিয়ম মূল্যায়নের প্রথম মানদণ্ড হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা। ক্লাস কি নিয়মিত হচ্ছে? মূল্যায়নে বৈষম্য কমছে? শিক্ষার্থী কি ভয় ছাড়া প্রশ্ন করতে পারছে? রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের সম্পদ বা শিক্ষার্থী ব্যবহারের অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে কি?
দ্বিতীয় মানদণ্ড প্রশাসনিক আচরণ। নিয়োগ ও বদলির সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করা হচ্ছে কি? অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন ও স্বাধীন পর্যালোচনার সুযোগ আছে কি? একই আচরণের জন্য রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি?
তৃতীয় মানদণ্ড শিক্ষার বাস্তব পরিবেশ। শিক্ষকপদ পূরণ, পাঠদানের সময়, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোর উন্নতি ছাড়াই শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করলে শিক্ষার মান কতটা বাড়বে, তা প্রমাণ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়কে শিক্ষকের দক্ষতার সহজ বিকল্প সূচক বানালে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে।
চাকরি বজায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্ত নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু তা থেকে শিক্ষকের সব সামাজিক বক্তব্য, পেশাগত দাবি ও সমালোচনাকে একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত আসে না। বিধি যত নির্দিষ্ট হবে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের স্বার্থের ভারসাম্য তত ভালোভাবে বিচার করা যাবে।
শিক্ষা দলমুক্ত হওয়ার অর্থ হলো, বিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে দলীয় আনুগত্যের বদলে শিক্ষার্থীর স্বার্থ, পেশাগত যোগ্যতা ও প্রকাশ্য নিয়ম গুরুত্ব পাবে। শিক্ষক নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিশেষ সুবিধা পাবেন না; কর্তৃপক্ষও তাঁর কাছ থেকে রাজনৈতিক আনুগত্য দাবি করতে পারবে না।
সুতরাং নতুন সিদ্ধান্তের বিচার শুধু কতজন শিক্ষক নির্বাচনে দাঁড়াতে পারলেন না, সেই হিসাবে হবে না। বিচার হবে—বিদ্যালয়ে দলীয় ক্ষমতার প্রভাব কমল কি না, পাঠদানের পরিবেশ উন্নত হলো কি না এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করার স্বাধীনতা টিকে থাকল কি না। শিক্ষকের কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনিকভাবে সহজ হতে পারে; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনা অনেক বড় কাজ।
আপনার মতামত জানানঃ