
গত প্রায় দুই বছরে নিরাপত্তা হেফাজতে আওয়ামী লীগের ৪৩ জন নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়া এই দাবিটি কতটা তথ্যনির্ভর? statewatch.net একাধিক সূত্র যাচাই করে দেখেছে, এই নির্দিষ্ট সংখ্যাটি—৪৩—কোনো স্বাধীন মানবাধিকার সংগঠন, সরকারি সংস্থা কিংবা আওয়ামী লীগের নিজস্ব ঘোষণার সঙ্গেও পুরোপুরি মেলে না। বরং প্রাপ্ত তথ্য থেকে উঠে আসছে একাধিক পরস্পরবিরোধী সংখ্যা।
দলের নিজস্ব হিসাব বলছে ভিন্ন কথা
আওয়ামী লীগের সরকারি ওয়েবসাইট albd.org-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দলটি নিজেই দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত কারা হেফাজতে তাদের ২১ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন—৪৩ নয়। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, গ্রেপ্তারের আগে সুস্থ থাকা ব্যক্তিদের হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, চিকিৎসায় বিলম্ব হয়েছে এবং অনেককে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, দলটি নিজেই যে সংখ্যা প্রচার করছে, ছড়িয়ে পড়া ৪৩-এর দাবির সঙ্গে তার দ্বিগুণেরও বেশি ফারাক রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের হেফাজত-মৃত্যুর পরিসংখ্যান
রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সামগ্রিক কারা হেফাজতে মৃত্যুর চিত্র আরও জটিল। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৬১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৭ জন বিচারাধীন এবং ২৪ জন দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। এই পরিসংখ্যানে রাজনৈতিক দলভিত্তিক বিভাজন নেই, ফলে এর মধ্যে ঠিক কতজন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট, তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ—মোট নথিভুক্ত ঘটনার একটি বড় অংশ। এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, হেফাজতে মৃত্যু বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা কোনো একক সময়কাল বা দলের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়।
যেসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ঘেঁটে আওয়ামী লীগ ঘরানার একাধিক ব্যক্তির হেফাজতে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট ঘটনা যাচাই করা গেছে। যেমন—গত ডিসেম্বরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে রিমান্ডে নেওয়ার সময় বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক ওয়াসিকুর রহমান বাবুর মৃত্যু হয় বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এ বছরের মার্চে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে মব সৃষ্টি করে পুলিশে সোপর্দ করার পর কারা হেফাজতে মারা যান স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহনূর আলম—প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ষোলো মাসে বগুড়াতেই এমন ছয়জন নেতার মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন প্রতিবেদন সারাদেশে আরও রয়েছে, তবে এগুলোকে একত্র করে কোনো স্বাধীন সংস্থা এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট, নাম-পরিচয়সহ সমন্বিত তালিকা প্রকাশ করেনি।
সিদ্ধান্ত: দাবিটি এখনো যাচাই-অযোগ্য
সবমিলিয়ে, “দুই বছরে হেফাজতে ৪৩ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর মৃত্যু” শীর্ষক দাবির মূল উৎস কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উপলব্ধ তথ্যে যা পাওয়া যাচ্ছে তা হলো—আওয়ামী লীগের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী সংখ্যাটি ২১, স্বাধীন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান দলীয় পরিচয় অনুযায়ী বিভাজিত নয়, এবং গণমাধ্যমে প্রতিবেদিত সুনির্দিষ্ট ঘটনার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। এই পরিস্থিতিতে ৪৩ সংখ্যাটিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নাম-তারিখসহ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছ থেকেই উঠে এসেছে—যা ছাড়া প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কার্যত অসম্ভব।
আপনার মতামত জানানঃ