বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে ৩০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তবে ট্রাইব্যুনালের রায়টি মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি পরিধিকে এমনভাবে বিস্তৃত করেছে বলে মনে হয়, যা রংপুরের ঘটনাকে ঘিরে উপস্থাপিত প্রমাণ দিয়ে সমর্থন করা কঠিন।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দৃশ্য খুব কম মানুষই দেখেননি। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন মানুষ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন, কোনো হুমকি সৃষ্টি করছেন না। এরপর কাছ থেকে দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গুলি করেন। এটি ছিল ওই আন্দোলনে প্রথম মৃত্যু। ঘটনাটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ছাত্রদের আন্দোলন দ্রুত একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়।
ওই ভিডিও দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা, অথবা অন্তত অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগে মামলা করার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি করেছিল। তাদের গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দায়ী হতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পথে মামলা এগোয়নি।
এর পরিবর্তে পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদস্য এবং আওয়ামী লীগ কর্মীসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। তাদের সবাইকে অন্তত একটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যা, আটজন নির্যাতন, ২২ জন নিপীড়ন এবং ছয়জন অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
তবে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে যে, আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা এবং তার আগে-পরে রংপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের দণ্ড দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি তৈরি করেনি। বিশেষ করে নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ও বিচারকেরা আন্তর্জাতিক আইনে নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা যথাযথভাবে প্রয়োগ করেননি। একইভাবে গুলি করার আগে সংঘটিত ঘটনাগুলো ‘নিপীড়ন’ বা ‘অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড’-এর পর্যায়ে পড়ে কি না, তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। আবু সাঈদের হত্যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর অপরাধ হলেও, এটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ‘হত্যা’ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান যে পূরণ হয়েছে, তার প্রমাণও রায়ে যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিষয়টি শুধু মামলার আসামিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর সঙ্গে আরও বড় একটি প্রশ্ন জড়িত—প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অপরাধের যে সংজ্ঞাগুলো প্রয়োগ করছে, সেগুলো তারা কতটা সঠিকভাবে বুঝছে এবং সাধারণ দেশীয় অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে গিয়ে তারা আইনের সীমা অতিক্রম করছে কি না।
১৬ জুলাই দুপুরের দিকে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে মিছিল নিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে এবং তাদের আন্দোলনে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে—এমন খবর কেউ কেউ পেয়েছিলেন। পুলিশ মিছিলকারীদের গেট দিয়ে ঢুকতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ধস্তাধস্তি শুরু হয় এবং পুলিশ লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয় এবং কেউ কেউ গুলির আঘাতে আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও বলেন, ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা লাঠি, রড ও চায়নিজ কুড়াল নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করেছিল।
দুপুর ২টার কিছু পর বিক্ষোভকারীরা আবার একত্রিত হয়ে ফিরে আসে। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে তাদের সমাবেশ করার প্রচেষ্টায় বাধা দেয় এবং আবু সাঈদকে মারধর করা হয়। এরপর আরও ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা গেট খুলে ফেলে। পুলিশ আবার তাদের ওপর হামলা চালায় এবং কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে।
প্রায় ২টা ২০ মিনিটের দিকে আবু সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মহাসড়কের ডিভাইডারের একটি খোলা জায়গার কাছে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গুলি করেন। যারা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের ওপরও গুলি চালানো হয়। এরপর পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা বাকি বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এক বা দুজন সাক্ষীর বক্তব্য ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখার কোনো প্রমাণ আদালত পায়নি। আবু সাঈদের মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো বিক্ষোভকারী গুরুতর আহত হয়েছেন—এমন প্রমাণও সাক্ষ্য বা হাসপাতালের নথিতে পাওয়া যায়নি। দুজন সাক্ষী গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বললেও তারা চিকিৎসা নিতে যাননি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে আইনে কয়েকটি নির্দিষ্ট উপাদান পূরণ করা আবশ্যক। কোনো নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পাশাপাশি সেটিকে একটি ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ হতে হয়। সেই হামলা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ওই হামলা সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। একই সঙ্গে হামলাটি কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের নীতির অনুসরণে বা সেই নীতি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে—এটিও প্রমাণ করতে হয়।
নির্যাতনের ক্ষেত্রেও আইনে একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির সঙ্গে সম্পর্কিত ‘Elements of Crimes’ নথি অনুযায়ী, গুরুতর শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া তখনই নির্যাতন হিসেবে গণ্য হয়, যখন ভুক্তভোগী অপরাধীর হেফাজতে বা নিয়ন্ত্রণে থাকেন। এই শর্তটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্যাতনকে সাধারণ সহিংসতা থেকে আলাদা করে।
কিন্তু ট্রাইব্যুনালের আটটি নির্যাতনের দণ্ডের ক্ষেত্রে এমন কর্মকাণ্ডকে ভিত্তি করা হয়েছে, যেখানে অভিযুক্তরা নিরস্ত্র ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর শারীরিক হামলায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল রাস্তায় লাঠিচার্জ, পাথর নিক্ষেপ এবং গুলিবর্ষণ। এসব কর্মকাণ্ড দেশীয় আইনে অপরাধ হতে পারে, কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্যাতনের যে নির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা রয়েছে, তার সঙ্গে তা মেলে না। অভিযুক্ত আটজনের কেউই বিক্ষোভকারীদের হেফাজতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখেননি। ফলে এই দণ্ডগুলো আপিলে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
নিপীড়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। আন্তর্জাতিক আইনে নিপীড়নের জন্য কোনো ব্যক্তিকে তার গোষ্ঠীগত পরিচয়ের কারণে মৌলিক অধিকার থেকে গুরুতরভাবে বঞ্চিত করতে হয় এবং এর পেছনে বৈষম্যমূলক উদ্দেশ্য থাকতে হয়। রাজনৈতিক পরিচয়ও এমন গোষ্ঠীগত পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কিন্তু ট্রাইব্যুনালের রায়ে এই সংজ্ঞা বা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মামলার নজিরের কোনো সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ নেই। প্রসিকিউশন বিক্ষোভকারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা ঠেকাতে ‘অতিরিক্ত শক্তি’ প্রয়োগকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ভিত্তি হিসেবে দেখিয়েছে। লাঠিচার্জ ও পাথর নিক্ষেপ অবশ্যই অতিরিক্ত পুলিশি শক্তি প্রয়োগ বা দেশীয় আইনে অপরাধ হতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনা যে আন্তর্জাতিক আইনে প্রয়োজনীয় মাত্রার গুরুতর মৌলিক অধিকার হরণ করেছে, তার প্রমাণ দুর্বল। বিশেষ করে যখন আবু সাঈদের মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো গুরুতর আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
‘অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড’-এর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে এ ধরনের অপরাধ প্রমাণ করতে হলে গুরুতর শারীরিক বা মানসিক কষ্ট অথবা শরীর বা স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি প্রমাণ করতে হয়। সেই কর্মকাণ্ডের প্রকৃতিও হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, জোরপূর্বক গুম বা বর্ণবৈষম্যের মতো অপরাধের সঙ্গে তুলনীয় হতে হয়।
প্রসিকিউশন দাবি করেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের হামলা, বেআইনি গ্রেপ্তার ও প্রকাশ্যে অপমানের মাধ্যমে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক কষ্ট দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে গুরুতর আঘাত, মানসিক ট্রমা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু রংপুরের ঘটনাগুলোর প্রমাণে সেই মাত্রার গুরুতর আঘাত বা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আবু সাঈদের হত্যার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি একক হত্যাকাণ্ডও মানবতাবিরোধী অপরাধের নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড হতে পারে। কিন্তু শুধু হত্যা সংঘটিত হলেই তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে যায় না। হত্যাকাণ্ডটি একটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ হতে হবে।
আবু সাঈদ হত্যার সময় এমন কোনো হামলা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছিল কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
আবু সাঈদের মৃত্যু ছিল রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায় প্রথম মৃত্যু এবং ওই দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একমাত্র হত্যাকাণ্ড। দুই দিন পর, ১৮ জুলাই থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। ১৮ জুলাই প্রায় ৫৭ জন, ১৯ জুলাই ২০১ জন এবং ২০ জুলাই ৭২ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ঘটনা আরও ব্যাপক হয়।
আবু সাঈদ যদি ওই সময় নিহত হতেন, তাহলে তার মৃত্যুকে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট যুক্তি থাকত। কিন্তু তিনি মারা যান ১৬ জুলাই, যখন সেই ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ধারা এখনও গড়ে ওঠেনি।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে পরবর্তী সময়ের ঘটনাগুলোকে ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে একীভূত করার প্রবণতা দেখা যায়। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়েছে, সারা বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বেসামরিক অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক ও পদ্ধতিগত হামলার ধারাবাহিক ও শক্তিশালী চিত্র এসব প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
কিন্তু এতে সর্বোচ্চ যা প্রমাণিত হতে পারে তা হলো—১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে কোনো এক সময়ে এমন একটি হামলা হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে না যে আবু সাঈদ হত্যার সময়ই সেই হামলা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আবু সাঈদ পুলিশের হাতে পরিকল্পিত বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন—এমন বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। এই অনুসন্ধান তার হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত ও বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে তার হত্যাকাণ্ড ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়া কোনো বৃহত্তর হামলার অংশ ছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আবু সাঈদ হত্যার সময় কোনো রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতি কার্যকর ছিল কি না। ১৮ জুলাই, অর্থাৎ আবু সাঈদের মৃত্যুর দুই দিন পর, শেখ হাসিনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি আড়ি পাতা ফোনালাপ এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকের সাক্ষ্য।
কিন্তু এর আগে এমন কোনো নির্দেশের তুলনীয় প্রমাণ নেই। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের একটি ফোনালাপকে প্রসিকিউশন আগের নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও সেই ব্যাখ্যা কথোপকথনের প্রকৃত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ট্রাইব্যুনালও মনে হয় এই ফোনালাপের ওপর নির্ভর করেনি।
রংপুরে স্থানীয় সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন কোনো নীতি ছিল—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। কোনো নথি, আড়ি পাতা কথোপকথন বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্যে এমন নীতির উল্লেখ নেই। চারজন পুলিশ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন, কিন্তু তাদের কেউ এমন কোনো নীতির কথা বলেননি। তারা সর্বোচ্চ যা বলেছেন তা হলো, ওই সংঘর্ষের সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একটি নির্দিষ্ট সংঘর্ষের সময় গুলি করার নির্দেশ দেওয়া এবং একটি রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতির অধীনে কাজ করা এক বিষয় নয়।
সবশেষে আসে ‘হামলা সম্পর্কে জ্ঞান’-এর প্রশ্ন। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির জানতে হবে যে তিনি যে কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন তা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ এবং সেটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
যদি ১৮ জুলাইয়ের আগে এমন কোনো ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলা এবং প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নীতি না থাকে, তাহলে ১৬ জুলাই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সেই হামলা সম্পর্কে কীভাবে জানতেন? কোনো নীতি বা হামলা পরে তৈরি হলে তার জ্ঞান অতীতে থাকা ব্যক্তিদের ওপর আরোপ করা যায় না।
এমনকি যদি ধরে নেওয়া হয় যে আবু সাঈদ হত্যার সময়ই কোনো বৃহত্তর হামলা চলছিল, তাহলেও তাকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত পাঁচ ব্যক্তির সেই হামলা সম্পর্কে জ্ঞান ছিল কি না, রায়ে যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বিশ্লেষণও করা হয়নি।
সব মিলিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যার চারটি প্রয়োজনীয় উপাদানের মধ্যে কেবল প্রথমটি—অর্থাৎ নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড, আবু সাঈদকে হত্যা—স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাকি উপাদানগুলোর ক্ষেত্রে রায়ে ১৬ জুলাইয়ের বাস্তবতার ওপর আইন প্রয়োগের বদলে ১৮ থেকে ২০ জুলাই এবং পরবর্তী সময়ের ঘটনাগুলোকে ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে বলে মনে হয়।
এই পরবর্তী ঘটনাগুলো বাদ দিলে যা থাকে, তা হলো দুই পুলিশ কর্মকর্তার হাতে একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। সম্ভবত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেও তা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সেই সময় এটি কোনো বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় নীতি বা ধারাবাহিক হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল—এমন প্রমাণ নেই।
এটি দেশীয় আইনে হত্যা বা অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা হতে পারত। কিন্তু এই প্রমাণের ভিত্তিতে এটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলা যায় কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।
নির্যাতন, নিপীড়ন এবং অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলো হয়তো ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে দেশের অন্যত্র ঘটে যাওয়া কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু ১৬ জুলাই রংপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রমাণ দিয়ে এসব অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে।
এসব বিষয়কে নিছক কারিগরি বা প্রযুক্তিগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো সেই অপরাধগুলোর আইনি সংজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেগুলোর বিচার করার জন্যই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই প্রশ্নগুলো আপিলে কীভাবে বিবেচিত হবে এবং প্রসিকিউটর ও বিচারকেরা আন্তর্জাতিক অপরাধের আইনি সংজ্ঞাগুলো কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করবেন—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ অনিশ্চিত আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো দণ্ড শেষ পর্যন্ত আবু সাঈদের পরিবার বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে নাও আসতে পারে। বরং এমন দণ্ড আপিলে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা একটি মামলা এমন দণ্ড দিতে পারত, যা পরবর্তী আইনি পর্যালোচনার মুখে আরও দৃঢ়ভাবে টিকে থাকার সম্ভাবনা রাখত। হাসানুল হক ইনুর দণ্ড নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও ওই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও প্রকাশিত হয়নি।
ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরাধের গুরুতরতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক অপরাধের সঠিক আইনি সংজ্ঞা প্রয়োগ করা। আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড যে ভয়াবহ অপরাধ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু সেই অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য আন্তর্জাতিক আইনে যে অতিরিক্ত শর্তগুলো পূরণ করতে হয়, সেগুলো প্রমাণিত হয়েছিল কি না—শেষ পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার জন্য সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আপনার মতামত জানানঃ