আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা থেকে সংগৃহীত অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করতে যাচ্ছে ট্রাইব্যুনাল। এ জন্য ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ বা কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত বিধি চূড়ান্ত হলে তা পূর্ববর্তী রায়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে। ফলে ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে নতুন কোনো আইনি জটিলতা থাকবে না বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত নাম ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জুলাই হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কোন সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত হবে, কোন সম্পত্তির ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ কীভাবে ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাবে?
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও বিদ্যমান কার্যপ্রণালি বিধিতে আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা জরিমানা এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের মৌলিক বিধান রয়েছে। তবে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি কীভাবে প্রশাসনিকভাবে চিহ্নিত করা হবে, কীভাবে তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে, কখন ও কীভাবে নিলাম বা বিক্রি করা হবে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ কীভাবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণ করা হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপদ্ধতি স্পষ্ট নয়।
ফলে ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের পর্যায়ে একটি আইনি ও প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এই শূন্যতা দূর করতেই কার্যপ্রণালি বিধিতে বিস্তারিত বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ক্ষেত্রে ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ অথবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় জরিমানা আদায় ও সম্পত্তি বিক্রির যে পদ্ধতি রয়েছে, তার আদলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে ট্রাইব্যুনালের বিধিতে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এর ফলে কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের রায় কার্যকর করার সময় সরকারের নির্বাহী বিভাগ কীভাবে এগোবে, তার একটি নির্দিষ্ট আইনি পথ তৈরি হবে।
ট্রাইব্যুনালের এই উদ্যোগের ফলে শেখ হাসিনার ঘোষিত সম্পদের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজের নামে প্রায় চার কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ঘোষণা করেছিলেন। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তার নিজ নামে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ বাজেয়াপ্ত বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারে।
ঘোষিত সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা অর্থ, সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত। হলফনামা অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা ছিল প্রায় দুই কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর পাশাপাশি ছিল ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং প্রায় ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল মোটরগাড়ি, স্বর্ণালঙ্কার ও আসবাবপত্র। হলফনামায় প্রায় ৪৭ লাখ টাকার দুটি মোটরগাড়ি, ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালঙ্কার এবং সাত লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাবপত্রের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এসব সম্পদের মালিকানা ও মূল্য যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রেও রয়েছে কৃষিজমি ও প্লট। হলফনামায় গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, গাজীপুর ও রংপুরে মোট ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব জমির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় ছয় লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া ঢাকার পূর্বাচলে শেখ হাসিনার নিজের নামে থাকা ১০ কাঠার একটি প্লটের মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমিও তার ঘোষিত সম্পদের তালিকায় রয়েছে।
তবে বিষয়টি শুধু নির্বাচনী হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে সম্পদ ঘোষণায় অসত্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার অভিযোগও তদন্তের পর্যায়ে এসেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনা নিজের নামে ৬ দশমিক ৫০ একর জমি দেখিয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের তল্লাশিতে তার নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পত্তি পাওয়ার তথ্য উঠে আসে।
এখানে আইনি প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির নামে গোপন বা ঘোষণাবহির্ভূত সম্পত্তি পাওয়া গেলে সেটি কার অর্থে, কীভাবে এবং কখন অর্জিত হয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। যদি আইনগতভাবে প্রমাণিত হয় যে সম্পত্তি ওই ব্যক্তির একক মালিকানাধীন এবং তা অপরাধলব্ধ অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাহলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী সেটিও বাজেয়াপ্তের আওতায় আসতে পারে।
কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সরল নয়। কারণ একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের রায় হলেই তার পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের নামে থাকা সব সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজেয়াপ্ত করা যায় না। সম্পত্তির মালিকানা, অর্থের উৎস এবং অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আলাদাভাবে প্রমাণের বিষয়।
এই কারণে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। বহুল আলোচিত এই ঐতিহাসিক বাড়িটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নামে নিবন্ধিত নয়। এটি শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া কোনো রায়ের ভিত্তিতে ট্রাস্টের সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
একইভাবে সুধা সদনের মালিকানার বিষয়টিও আলাদা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার এই বাসভবনের মালিকানা শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদের নামে। ফলে সেটি শেখ হাসিনার নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, তা মালিকানার নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।
গাজীপুরের মৌচাকে থাকা প্রায় ২৯৭ শতক বা ৯ বিঘা বাগানবাড়ির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে সম্পত্তিটির উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হিসেবে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং তাদের সন্তানদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তির যৌথ মালিকানাধীন কোনো সম্পত্তি শুধু একজনের বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের কারণে সম্পূর্ণভাবে বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই—মালিকানা ও আইনি দায় পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
পূর্বাচলের ৬০ কাঠা জমির বিষয়টিও জটিল। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শেখ হাসিনা, তার সন্তান এবং বোন-ভাগ্নেদের নামে ১০ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা চলমান। ফলে এসব সম্পত্তির বিষয়ে আলাদা বিচারিক প্রক্রিয়ায় মালিকানা, বরাদ্দের বৈধতা এবং অর্থের উৎস নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করা যায় না, যদি না আলাদা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয় যে ওই সম্পদ অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছিল অথবা প্রকৃত মালিকানা গোপন করে অন্যের নামে রাখা হয়েছিল।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনি মালিকানা এবং অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিজের নামে থাকা সম্পত্তি এবং অপরাধলব্ধ অর্থে অর্জিত সম্পত্তি শনাক্ত করার জন্য কার্যকর তদন্তও প্রয়োজন।
ট্রাইব্যুনালের নতুন বিধি এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো রায় ঘোষণার পর সম্পত্তি শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ভূমি ও ব্যাংক নথি যাচাই করা, সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, প্রয়োজন হলে নিলাম করা এবং সেই অর্থ নির্ধারিত ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি প্রয়োজন।
কারণ আদালতের রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে সেই আদেশ কার্যকর করতে একাধিক সরকারি সংস্থাকে কাজ করতে হতে পারে। ভূমি অফিস, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারপতি এবং আইনজীবীদের নিয়ে একটি আইনি সেমিনারের কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। সেখানে আলোচনা করে কীভাবে বিধি সংশোধন করা যায়, কীভাবে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়ন করা হবে এবং ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যকর কাঠামো তৈরি করা যায়—এসব বিষয়ে মতামত নেওয়া হতে পারে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অধিকার। মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় যারা স্বজন হারিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তিতে শেষ হয় না। ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনও বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সেই অর্থে দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণের তহবিলে দেওয়া হলে তা প্রতীকী এবং বাস্তব—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এই অর্থ বণ্টনেও স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। কারা ক্ষতিপূরণ পাবেন, কী পরিমাণ পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন এবং কোন কর্তৃপক্ষ তা যাচাই করবে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ঘোষিত সম্পদের তালিকা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হলেও প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণে আরও তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ হলফনামায় থাকা সম্পদ এবং তদন্তে পাওয়া সম্ভাব্য সম্পদের মধ্যে পার্থক্য থাকলে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের সময় প্রতিটি সম্পদের উৎস ও মালিকানা যাচাই করতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত কোনো সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। এটি ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই এর প্রতিটি ধাপ আইনের নির্দিষ্ট বিধান, আদালতের আদেশ এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় একটি রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নতুন আইনি বিরোধ তৈরি হতে পারে।
নতুন বিধি সংশোধনের উদ্যোগ সেই সম্ভাব্য জটিলতা কমানোর একটি প্রচেষ্টা। বিধি চূড়ান্ত হলে শুধু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইতোমধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যান্য ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ সামনে যে প্রক্রিয়া তৈরি হতে যাচ্ছে, তার প্রভাব একটি মামলার গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে। আদালতের রায় কীভাবে বাস্তবে কার্যকর হবে, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সম্পদ কীভাবে শনাক্ত ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে এবং সেই সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে এই নতুন আইনি কাঠামো।
শেখ হাসিনার ঘোষিত ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, গাড়ি, স্বর্ণালঙ্কার, আসবাবপত্র, কৃষিজমি, পূর্বাচলের প্লট এবং টুঙ্গিপাড়ার সম্পত্তি তাই এখন শুধু সম্পদের তালিকা নয়; এগুলো পরিণত হয়েছে একটি বড় আইনি প্রক্রিয়ার অংশে। একই সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তি কিংবা ট্রাস্টের সম্পত্তি নিয়ে পৃথক আইনি প্রশ্নও সামনে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—আইনের স্পষ্টতা, সম্পত্তি শনাক্তকরণে নির্ভুলতা এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণে স্বচ্ছতা। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সম্পত্তি আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করে যদি সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছানো যায়, তাহলে তা বিচারপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হতে পারে। আর যদি মালিকানা ও আইনি সীমারেখা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়, তাহলে একই সঙ্গে সম্পত্তির অধিকার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায্যতার প্রশ্নও সুরক্ষিত থাকবে।
এখন তাই অপেক্ষা কার্যপ্রণালি বিধির সংশোধনের। কারণ আদালতের রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া এক বিষয়, আর সেই নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর করে সম্পদকে ক্ষতিপূরণে রূপান্তর করা আরেক বিষয়। নতুন বিধি সেই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান কতটা কমাতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ