
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন। দল, সরকার ও নেতৃত্ব—এই তিনটি স্তরের কেন্দ্রেই ছিলেন একজন ব্যক্তি। ফলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয় শুধু একটি সরকারের বিদায় নয়; এটি এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামোর পরীক্ষা, যা দীর্ঘদিন ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা এবং মমতার ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
বিজেপি ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ২০৭টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তৃণমূল নেমে গেছে ৮০ আসনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। তবে আসনের ব্যবধান যতটা একতরফা, ভোটের চিত্র ততটা নয়। তৃণমূল প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে—অর্থাৎ ক্ষমতা হারালেও দলটির সামাজিক ভিত্তি একেবারে ধসে পড়েনি। প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের সমর্থন পাওয়া একটি দলকে শুধু নির্বাচনী ফল দেখে রাজনৈতিকভাবে শেষ ঘোষণা করা যাবে না। Reuters, Associated Press
কিন্তু তৃণমূলের মূল সংকট ভোটারের সংখ্যা নয়; ক্ষমতা হারানোর পর দলীয় সংগঠন, নেতৃত্বের কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের আনুগত্য ধরে রাখা।
ক্ষমতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা দলের পরীক্ষা
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক চরিত্র বুঝতে হলে পশ্চিমবঙ্গের গত দেড় দশকের ক্ষমতার কাঠামো দেখতে হবে। দলটি ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল স্থানীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং সরকারি সুবিধা বণ্টনের একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। মমতার জনপ্রিয়তা এই নেটওয়ার্ককে কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত রাখত।
ক্ষমতায় থাকার সময় স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলেও শেষ সিদ্ধান্ত আসত ওপর থেকে। নির্বাচনের মনোনয়ন, সাংগঠনিক পদ, সরকারি প্রকল্প কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার ভাগ—সব ক্ষেত্রেই কালীঘাট ছিল চূড়ান্ত কেন্দ্র। কিন্তু সরকার চলে যাওয়ার পর এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন।
ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার যে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ছিল, তা আর নেই। বিপরীতে বিজেপি এখন রাজ্য ও কেন্দ্র—দুই স্তরেই ক্ষমতায়। ফলে রাজনৈতিক সুবিধা, প্রশাসনিক নিরাপত্তা কিংবা ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তৃণমূলের একাংশ নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের দিকে যেতে চাইবে—এটাই ভারতীয় রাজনীতির পরিচিত প্রবণতা।
নির্বাচনের পর তৃণমূলের সাংসদ ও নেতাদের একটি অংশ বিদ্রোহ করেছে বলে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। বিদ্রোহী অংশের দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন পৃথক অবস্থান নিয়ে এনডিএকে সমর্থন করতে প্রস্তুত। তবে এই সংখ্যার সত্যতা নিয়ে তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে এবং প্রকাশ্য বৈঠকে উপস্থিত সাংসদের সংখ্যা দাবির তুলনায় কম ছিল। তাই এটিকে এখনো চূড়ান্ত বিভাজন না বলে গুরুতর সাংগঠনিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত। Times of India
এখানেই তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: দলটি কি ক্ষমতাহীন অবস্থাতেও নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে?
মমতা বনাম অভিষেক—নাকি দুই প্রজন্মের সংঘাত?
তৃণমূলের ভেতরের দ্বন্দ্বকে শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রকাশ্যে মমতা এখনো অভিষেকের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এবং দলীয় বিদ্রোহের জন্য বিজেপির চাপ ও ভয়ভীতিকে দায়ী করেছেন। জুলাই মাসেও তিনি অভিষেককে রক্ষা করে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। The New Indian Express
তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে তৃণমূলে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক পদ্ধতির সংঘাত দীর্ঘদিন ধরেই ছিল।
মমতার রাজনীতি গড়ে উঠেছে আন্দোলন, জনসংযোগ, আবেগ এবং সরাসরি রাজনৈতিক উপস্থিতির ওপর। তিনি মানুষের ভাষা ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে অভিষেক দলকে আরও কেন্দ্রীভূত, তথ্যনির্ভর ও পেশাদার নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার দিকে নিতে চেয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ নতুন প্রজন্মের নেতারা প্রযুক্তি, জনমত জরিপ, পেশাদার পরামর্শক এবং সাংগঠনিক কর্মদক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ক্ষমতায় থাকাকালে এই দুই পদ্ধতি পাশাপাশি চলতে পেরেছে। কিন্তু বড় নির্বাচনী পরাজয়ের পর পুরোনো ও নতুন—দুই পক্ষই অন্য পক্ষকে দায়ী করার সুযোগ পাচ্ছে। প্রবীণ নেতাদের একাংশ মনে করতে পারেন, অভিষেকের ঘনিষ্ঠদের প্রভাব বাড়ায় মমতার ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক সংযোগ দুর্বল হয়েছে। অভিষেকপন্থীরা বলতে পারেন, পুরোনো নেতাদের দুর্নীতি, স্থানীয় দাপট এবং জনবিচ্ছিন্নতার মূল্য দলকে দিতে হয়েছে।
এই বিরোধ যদি প্রকাশ্য ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়, তৃণমূলের ভাঙন দ্রুত হবে। কারণ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে অস্পষ্টতা থাকলে স্থানীয় নেতারা বুঝতে পারবেন না—তাঁদের আনুগত্য মমতার প্রতি থাকবে, নাকি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নেতা অভিষেকের প্রতি।
মমতা এখনো তৃণমূলের শক্তি, আবার সীমাবদ্ধতাও
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো তৃণমূলের সবচেয়ে পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য মুখ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিবিরোধী ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। রাজ্যের সংখ্যালঘু, নারী এবং বিভিন্ন সরকারি কল্যাণ কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের মধ্যেও তৃণমূলের ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
তাই তৃণমূল তাৎক্ষণিকভাবে মমতাকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব বসাতে পারবে না। এমন পদক্ষেপ দলের অবশিষ্ট সমর্থকদের আরও বিভ্রান্ত করতে পারে। আবার সব সিদ্ধান্ত মমতার হাতে রেখে দিলে নেতৃত্বের প্রজন্মান্তরও ঘটবে না।
‘মমতা-পরবর্তী তৃণমূল’ কথাটি তাই মমতা ইতিমধ্যে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন—এমন অর্থ বহন করে না। বরং দলটি এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে মমতার উপস্থিতির মধ্যেই তাঁর পরবর্তী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল এবং সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
এই রূপান্তরের জন্য তিনটি কাজ জরুরি।
প্রথমত, নির্বাচনী পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে সৎ মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু নির্বাচন কমিশন, বিজেপি কিংবা কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দায়ী করলে দলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, নিয়োগ কেলেঙ্কারি, স্থানীয় নেতাদের দাপট এবং কর্মসংস্থানের সংকট আড়ালে থেকে যাবে।
দ্বিতীয়ত, মমতা ও অভিষেকের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। মমতা যদি রাজনৈতিক ও আদর্শিক নেতৃত্ব দেন, তবে অভিষেককে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের নির্দিষ্ট ক্ষমতা দিতে হবে। একই সংগঠনে দুটি অস্পষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্র দীর্ঘদিন কার্যকর থাকতে পারে না।
তৃতীয়ত, দলত্যাগ ঠেকানোর চেয়ে কর্মী ও ভোটার ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষমতার সুবিধার জন্য আসা নেতাদের অনেকে চলে যেতে পারেন; কিন্তু স্থানীয় কর্মী ও প্রায় ৪১ শতাংশ ভোটারকে ধরে রাখা গেলে তৃণমূল আবারও শক্তিশালী বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারে।
বিরোধী দল হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ কতটা?
তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুযোগ হলো—পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান বিকল্প এখনো তারাই। বাম ও কংগ্রেস কিছু আসন ও ভোট ফিরে পেলেও রাজ্যব্যাপী তৃণমূলের সমতুল্য সাংগঠনিক উপস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। নতুন বিজেপি সরকার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা ও কেন্দ্র–রাজ্য সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে অসন্তোষের প্রধান সুবিধাভোগী হতে পারে তৃণমূল।
ভারতের রাজনীতিতে বড় নির্বাচনী জয় দ্রুত প্রত্যাশার চাপও তৈরি করে। বিজেপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অর্থ হলো, ব্যর্থতার দায় অন্য কারও ওপর চাপানো কঠিন হবে। তৃণমূল যদি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়, বিধানসভার ভেতরে কার্যকর থাকে এবং ধর্মীয় মেরুকরণের বিপরীতে জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আনে, তাহলে তার পুনরুত্থানের পথ খোলা থাকবে।
কিন্তু যদি দলটি শুধু মমতার ব্যক্তিগত প্রতিবাদ, নির্বাচনী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এবং বিদ্রোহীদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সাংগঠনিক ক্ষয় থামবে না। পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ বছরের বাম শাসনের পতনের পর বামফ্রন্ট যেভাবে ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে গেছে, সেই অভিজ্ঞতা তৃণমূলের সামনে সতর্কবার্তা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা কোনো দল বিরোধী রাজনীতির নতুন ভাষা তৈরি করতে না পারলে তার পুরোনো সংগঠন দ্রুত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। NUS Institute of South Asian Studies
তৃণমূলের ভবিষ্যৎ তাই শুধু মমতা না অভিষেক—এই প্রশ্নে নির্ধারিত হবে না। মূল প্রশ্ন হলো, দলটি কি ক্ষমতার নেটওয়ার্ক থেকে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারবে?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা তৃণমূলকে আপাতত বাঁচিয়ে রাখতে পারে। অভিষেকের সাংগঠনিক দক্ষতা দলটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই দুই শক্তি যদি পরস্পরের পরিপূরক না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে বিজেপির চাপের চেয়েও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তৃণমূলের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠবে।
তৃণমূল এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু দলটি যে কাঠামোয় ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল, সেই কাঠামোয় আর টিকতে পারবে না। বিরোধী দল হিসেবে তার টিকে থাকা নির্ভর করবে—পরাজয়কে অস্বীকার করার বদলে তা থেকে শেখা, উত্তরাধিকার প্রশ্নের সমাধান এবং ব্যক্তিনির্ভর দল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনে রূপান্তরের ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ