
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুধু সরকার বদলায়নি; বদলে দিয়েছে প্রায় দেড় দশকের একটি পরিচিত রাজনৈতিক কাঠামো। বিজেপি ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি এবং তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসন পেয়েছে। কংগ্রেস দুটি, সিপিআইএম একটি এবং আরও কয়েকটি ছোট দল অবশিষ্ট আসন পেয়েছে। এই ফলের মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটেছে এবং বিজেপি প্রথমবার রাজ্যে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচন কমিশনের ফলাফল
কিন্তু নির্বাচনী পরাজয় তৃণমূলের সংকটের শেষ ছিল না; সেটি ছিল শুরু। ক্ষমতা হারানোর পর দলটি এখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত। একদিকে মমতা–অভিষেক নেতৃত্বাধীন অংশ, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। বিরোধ এখন দল পরিচালনার প্রশ্ন ছাড়িয়ে তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীকের মালিকানা পর্যন্ত গড়িয়েছে।
দুই পক্ষই নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের দাবি জানিয়েছে। বিদ্রোহী শিবির অধিকাংশ নির্বাচিত বিধায়কের সমর্থন তাদের সঙ্গে রয়েছে বলে দাবি করছে। কমিশন উভয় পক্ষের নথি, সাংগঠনিক সমর্থন এবং আইনগত যুক্তি পরীক্ষা করছে। Indian Express বাংলার প্রতিবেদন
এই বিরোধের নিষ্পত্তি শুধু একটি দলের প্রতীক কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর ওপর নির্ভর করবে বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তি কে হবে, তৃণমূলের বিপুল ভোটভিত্তি কোথায় যাবে এবং রাজ্যের রাজনীতি আবার দ্বিমেরু থাকবে, নাকি নতুন করে বহুমেরু হয়ে উঠবে।
মমতা ছিলেন নেত্রী, দল ও সরকারের যৌথ পরিচয়
তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় শক্তিই এখন তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে দল গঠনের পর থেকে তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয় মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে।
দলের মতাদর্শ, কর্মসূচি কিংবা সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়ে মমতার ব্যক্তিগত সংগ্রামের ইতিহাস ছিল বেশি শক্তিশালী। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলন, বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই, সাধারণ জীবনযাপনের ভাবমূর্তি এবং সরাসরি জনসংযোগ—সব মিলিয়ে মমতাই হয়ে উঠেছিলেন তৃণমূলের প্রধান রাজনৈতিক ভাষা।
২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এই ব্যক্তিনির্ভরতা আরও বেড়েছে। সরকার, দল এবং নেত্রীর পরিচয় ক্রমে একাকার হয়ে যায়। নিচু স্তরের সংগঠন বহু ক্ষেত্রে আদর্শ বা নীতির ভিত্তিতে নয়, ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সুবিধা বণ্টনের নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতায় থাকার সময় এই কাঠামো কার্যকর ছিল। নেত্রীর জনপ্রিয়তা ভোট আনত, প্রশাসন সরকারি কর্মসূচি পৌঁছে দিত এবং স্থানীয় সংগঠন উপকারভোগীদের সঙ্গে দলের সম্পর্ক ধরে রাখত। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই একই কাঠামো দ্রুত দুর্বল হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চলে গেলে সুবিধাভিত্তিক আনুগত্যও স্থায়ী থাকে না।
এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সক্রিয় নেতৃত্ব থেকে সরে যান, প্রশ্নটি কেবল তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন—তৃণমূল কি মমতাকে ছাড়িয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পেরেছে?
বর্তমান বিভক্তি বলছে, সেই রূপান্তর সম্পন্ন হয়নি।
অভিষেক কি স্বাভাবিক উত্তরসূরি?
মমতা-পরবর্তী তৃণমূলের আলোচনায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামই সবচেয়ে আগে আসে। তিনি দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং লোকসভায় তৃণমূলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। গত কয়েক বছরে প্রার্থী নির্বাচন, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনী প্রচার এবং তথ্যনির্ভর রাজনৈতিক কৌশলে তাঁর ভূমিকা বেড়েছিল।
কিন্তু অভিষেকের নেতৃত্বের সামনে তিনটি বড় বাধা রয়েছে।
প্রথমত, মমতার রাজনৈতিক বৈধতা এসেছে আন্দোলন, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জনসংযোগ থেকে। অভিষেক সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারী হলেও একই ধরনের নিজস্ব রাজনৈতিক বৈধতা এখনো তৈরি করতে পারেননি।
দ্বিতীয়ত, পারিবারিক উত্তরাধিকারের অভিযোগ তৃণমূলের ভেতরে ও বাইরে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। বিদ্রোহী নেতাদের অসন্তোষের একটি অংশ মমতার ব্যক্তিগত নেতৃত্বের চেয়ে অভিষেককে কেন্দ্র করে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধেই গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তৃতীয়ত, ২০২৬ সালের নির্বাচনী পরাজয়ের দায় থেকে অভিষেক নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন না। দলীয় কৌশল ও প্রার্থী নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা যত বেশি ছিল, ফলাফলের দায়ও তত বেশি তাঁর ওপর বর্তায়।
ফলে মমতা যদি তাঁকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, দলীয় আনুগত্যের একটি অংশ তা মেনে নিলেও অন্য অংশে নতুন বিদ্রোহ সৃষ্টি হতে পারে। উত্তরাধিকার তখন ঐক্যের বদলে আরও বিভক্তির কারণ হয়ে উঠবে।
বিদ্রোহী তৃণমূল কি প্রধান বিরোধী শক্তি হতে পারবে?
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের শক্তি শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে নয়, বিধায়কসংখ্যা ও আইনগত স্বীকৃতি দিয়েও নির্ধারিত হয়। বিদ্রোহী শিবির যদি তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়কের সমর্থন এবং দলীয় প্রতীকের অধিকার পায়, তাহলে তারাই বিধানসভায় প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কিন্তু আইনগত স্বীকৃতি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেয় না।
তৃণমূলের ভোটাররা কি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্য বিদ্রোহী নেতাদের মমতার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করবেন? নাকি তাঁদের দলত্যাগী, ক্ষমতাকেন্দ্রিক কিংবা বিজেপির পরোক্ষ সহযোগী হিসেবে দেখবেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান সম্পদ হতে পারে বিধায়ক, জেলা পর্যায়ের নেতা এবং স্থানীয় সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের অভাব। তাঁরা যদি শুধু ‘মমতা ও অভিষেকবিরোধী তৃণমূল’ হিসেবে পরিচিত থাকেন, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে বড় রাজনৈতিক শক্তি হওয়া কঠিন হবে।
অন্যদিকে বিজেপিও বিদ্রোহীদের খুব কাছে নিতে আগ্রহী নয়। আসন্ন পৌর নির্বাচনে বিজেপি তৃণমূলের বিদ্রোহী কিংবা তাদের সম্ভাব্য নতুন দলের সঙ্গে জোট না করে এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিজেপি একই সঙ্গে নিজের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে এবং বিরোধী ভোটকে বিভক্ত রাখতে চাইছে—এমন ব্যাখ্যা করা যায়। The Indian Express
অর্থাৎ বিদ্রোহী তৃণমূলের সামনে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি: বিজেপির বিরোধিতা না করলে তারা বিরোধী শক্তি হতে পারবে না, আবার মমতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এলে নিজেদের পরিচিত ভোটভিত্তির একটি অংশও হারাতে পারে।
বামেরা কি হারানো জায়গা ফিরে পাবে?
ঐতিহাসিক বিচারে তৃণমূলের পতনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হওয়ার কথা বামফ্রন্টের। ২০১১ সালের আগে টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা বামদের একসময় গ্রাম, শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাঙ্গন এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে শক্তিশালী ভিত্তি ছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফল বলছে, তৃণমূলের পতন আপনা-আপনি বামেদের পুনরুত্থান ঘটায়নি। বিজেপিবিরোধী ভোটের বড় অংশ এখনো তৃণমূলের কাছে রয়েছে। নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে, বিপরীতে বাম–কংগ্রেসসহ ছোট দলগুলোর সম্মিলিত প্রভাবও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বামেদের সামনে প্রধান সমস্যা স্মৃতির রাজনীতি। প্রবীণ ভোটারের কাছে তাদের দীর্ঘ শাসনের সাংগঠনিক স্মৃতি রয়েছে, কিন্তু তরুণ ভোটারের বড় অংশ বামফ্রন্টকে ভবিষ্যতের বিকল্প হিসেবে নয়, অতীতের শক্তি হিসেবে দেখে।
তারপরও বামদের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে তিনটি ক্ষেত্রে—চাকরি ও শ্রমের রাজনীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং বিজেপি–তৃণমূল উভয়ের পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির বিপরীতে অর্থনৈতিক প্রশ্ন।
বর্তমান বিজেপি সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একই সময়ে যাদবপুরসহ বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে বাম ছাত্রসংগঠন ও বিজেপিসংশ্লিষ্ট সংগঠনের সংঘাত সামনে এসেছে। এসব ক্ষেত্র বামেদের দৃশ্যমানতা বাড়াতে পারে, কিন্তু আন্দোলনের উপস্থিতিকে নির্বাচনী সমর্থনে রূপ দেওয়ার মতো রাজ্যব্যাপী সংগঠন তাদের নতুন করে গড়তে হবে।
কংগ্রেসের সম্ভাবনা কোথায়
পশ্চিমবঙ্গের অনেক জেলায় কংগ্রেসের পুরোনো সামাজিক ভিত্তি এখনো পুরোপুরি বিলীন হয়নি। বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের কিছু অংশে দলটির ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে।
তৃণমূল ভেঙে গেলে সংখ্যালঘু ভোটের একটি অংশ কংগ্রেসের দিকে ফিরতে পারে। তবে তার জন্য দলটিকে শুধু দিল্লিনির্ভর নেতৃত্ব বা নির্বাচনের সময়কার জোট-আলোচনা থেকে বেরিয়ে নিয়মিত মাঠের রাজনীতিতে ফিরতে হবে।
কংগ্রেসের আরেকটি সমস্যা হলো, পশ্চিমবঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থান প্রায়ই অস্পষ্ট। জাতীয় পর্যায়ে বিজেপিবিরোধী ঐক্যের জন্য তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজনীতি করা—এই দুই কৌশলের টানাপোড়েন দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করেছে।
তৃণমূলের ভাঙন কংগ্রেসকে সুযোগ দেবে; কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো সংগঠন, নেতৃত্ব ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বার্তা তৈরি না হলে ভোটাররা শুধু ঐতিহাসিক স্মৃতির কারণে ফিরে আসবেন না।
সংখ্যালঘু ভোটই কি নির্ধারণ করবে নতুন বিরোধী শক্তি?
তৃণমূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটভিত্তিগুলোর একটি ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠী। বিজেপিকে ঠেকাতে সক্ষম সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে তৃণমূলকে সমর্থনের একটি কৌশলগত প্রবণতা বহু নির্বাচনে দেখা গেছে।
কিন্তু দল ভেঙে গেলে এই ভোটও একসঙ্গে এক শিবিরে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মমতার প্রতি ব্যক্তিগত আস্থা একটি অংশকে তাঁর শিবিরে রাখবে। স্থানীয় প্রার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক অন্য অংশকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দিকে নিতে পারে। কংগ্রেস, বাম এবং আইএসএফও নতুন সুযোগ পেতে পারে।
এখানে একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বিরোধী ভোট কয়েকটি দলে ভাগ হলে বিজেপির রাজনৈতিক সুবিধা বাড়বে। ফলে ভোটাররা আবারও আদর্শ বা দলীয় পছন্দের বদলে ‘কে বিজেপিকে হারাতে পারবে’—এই হিসাব করে সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধী শিবিরের দিকে যেতে পারেন।
তাই ভবিষ্যৎ বিরোধী নেতৃত্ব শুধু নেতার জনপ্রিয়তায় নির্ধারিত হবে না; কোন দল দ্রুত প্রমাণ করতে পারে যে তার সংগঠন অক্ষত, ভোটব্যাংক স্থানান্তরযোগ্য এবং নির্বাচনে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করার বাস্তব ক্ষমতা আছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিজেপির জন্য বিভক্ত বিরোধিতা আশীর্বাদ, কিন্তু চিরস্থায়ী নয়
তৃণমূলের ভাঙন বর্তমান বিজেপি সরকারের জন্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা। বিরোধী দল নিজেদের নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়লে সরকারের নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে কার্যকর চাপ কমে যায়।
কিন্তু এই সুবিধা স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিজেপির শাসনের ওপর। ক্ষমতায় আসার পর বিজেপিকে এখন কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তার মতো বাস্তব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
সরকার উন্নয়ন ও বিনিয়োগের নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করছে এবং দুর্নীতি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু ঘোষণাগুলো বাস্তব ফল না দিলে ক্ষমতাবিরোধী অসন্তোষ তৈরি হবে। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট
সেই অসন্তোষ কে সংগঠিত করবে, সেটিই বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সম্ভাব্য তিনটি ভবিষ্যৎ
প্রথম সম্ভাবনা হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও তৃণমূলের অবশিষ্ট ভোটভিত্তি তাঁর শিবিরকে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে ধরে রাখবে। দলীয় প্রতীক হারালেও তিনি নতুন প্রতীক ও সংগঠন নিয়ে ফিরে দাঁড়াতে পারেন। ভারতের রাজনীতিতে দলীয় প্রতীকের চেয়ে নেতার পরিচয় শক্তিশালী হওয়ার নজির রয়েছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, বিদ্রোহী শিবির জোড়াফুল প্রতীক এবং অধিকাংশ বিধায়কের সমর্থন ধরে রেখে সাংগঠনিক তৃণমূলের উত্তরাধিকার দাবি করবে। কিন্তু মমতার আবেগী ভোটভিত্তি ছাড়া সেটি হয়তো একটি শক্তিশালী বিধানসভা গোষ্ঠী হবে, পূর্ণাঙ্গ গণদল নয়।
তৃতীয় সম্ভাবনা, দুই তৃণমূল পরস্পরকে দুর্বল করবে এবং সেই শূন্যতায় বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ ও নাগরিক আন্দোলনের মধ্য থেকে নতুন বিরোধী সমীকরণ তৈরি হবে। এটি সবচেয়ে ধীর, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
শেষ পর্যন্ত জায়গাটি নেবে কে?
তাৎক্ষণিক হিসাবে উত্তরটি বাম বা কংগ্রেস নয়; তৃণমূলের কোনো একটি অংশই প্রধান বিরোধী জায়গাটি ধরে রাখার সবচেয়ে সম্ভাব্য দাবিদার। কারণ দলটি নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরও প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট এবং ৮০টি আসন পেয়েছে। এত বড় ভোটভিত্তি রাতারাতি অন্য দলে স্থানান্তরিত হয় না।
কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে শুধু জোড়াফুল প্রতীক কিংবা মমতার নাম যথেষ্ট হবে না। বিরোধী শক্তিকে প্রমাণ করতে হবে, তারা ক্ষমতা হারানো নেতাদের আশ্রয়কেন্দ্র নয়; তারা জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সরকারের জবাবদিহির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠিত শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে সংগঠিত করে। তাঁর পরবর্তী তৃণমূল টিকে থাকবে কি না, সেটিও একই পরীক্ষায় নির্ধারিত হবে—দলটি কি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের বাস্তব উদ্বেগকে ধারণ করতে পারবে, নাকি নিজের নাম, প্রতীক ও উত্তরাধিকার নিয়েই নিঃশেষ হবে?
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিতে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই জায়গা উত্তরাধিকারসূত্রে কেউ পাবে না। অর্জন করতে হবে।
আপনার মতামত জানানঃ