
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরান যে শর্তগুলো সামনে এনেছে, সেগুলো শুধু একটি সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রশ্ন নয়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ অবরোধের অবসান, জব্দ করা সম্পদ ফেরত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার দাবি—সব মিলিয়ে তেহরান হরমুজ সংকটকে বৃহত্তর আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এ কারণে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি নৌপথ-সংক্রান্ত সমঝোতা হলেই সংকট শেষ হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা এখন আর বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না। বরং প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে: হরমুজ কি আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত একটি জলপথ হবে, নাকি এর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ইরান নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে?
একটি পথ, কিন্তু একাধিক সংকট
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির দুই পাশে অবস্থিত। দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনায় জাহাজ চলাচলের জন্য একটি অস্থায়ী পথ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তেহরান স্পষ্ট করেছে, ওমানের সঙ্গে চুক্তি হওয়া এবং প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া এক বিষয় নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাকের জোলকাদরের ঘোষিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া। ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা ও তেহরানের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধের দাবিও জানিয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের খবর—দুটিতেই এই অবস্থানের প্রায় একই বর্ণনা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে সমঝোতা খুব কাছাকাছি থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রকে আগের ইসলামাবাদ সমঝোতা লঙ্ঘনের দায় নিতে হবে। বিপরীতে ওয়াশিংটন এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নিতে অনিচ্ছুক, যা হরমুজে ইরানের একতরফা কর্তৃত্ব বা জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। রয়টার্স এবং এপি জানিয়েছে, একটি অস্থায়ী সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেও মৌলিক বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত।
ইরানের শর্তগুলো কি সত্যিই চুক্তির জন্য?
শর্তগুলোর ব্যাপ্তি দেখে মনে হতে পারে, ইরান প্রণালি খোলার চেয়ে বন্ধ রাখতেই বেশি আগ্রহী। কিন্তু কূটনৈতিক দরকষাকষিতে প্রাথমিক দাবিই সাধারণত চূড়ান্ত অবস্থান নয়। তেহরান সম্ভবত সর্বোচ্চ দাবি সামনে এনে কয়েকটি অর্জন নিশ্চিত করতে চাইছে—নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে ছাড়, জব্দ সম্পদের কিছু অংশ ফেরত এবং হরমুজ ব্যবস্থাপনায় আনুষ্ঠানিক ভূমিকা।
অর্থাৎ সব মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রত্যাহারের মতো দাবি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম হলেও নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা সীমিত সম্পদ ছাড়ের মতো বিষয়ে দরকষাকষি হতে পারে। এ দৃষ্টিতে ইরানের কঠোর অবস্থান পুরোপুরি আলোচনা বন্ধের ঘোষণা নয়; বরং আলোচনার মূল্য বাড়ানোর কৌশল।
এই কৌশলের পেছনে সামরিক বাস্তবতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা তাকে গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির শক্তি দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ বিজয় না পেয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেহরান রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
তবে এই কৌশল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এডিএনওসির জাহাজে ইরানি হামলার অভিযোগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে সংঘাত শুরুর পর অন্তত ১৫টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে; একজন নাবিক নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরাত এসব হামলাকে নৌচলাচলের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
হামলা অব্যাহত থাকলে ওমানের মধ্যস্থতা দুর্বল হতে পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ইরানবিরোধী নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে। তখন হরমুজ থেকে মার্কিন উপস্থিতি কমার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

কেন হরমুজ নিয়ে কোনো পক্ষ সহজে ছাড় দেবে না
হরমুজ দিয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি এবং বৈশ্বিক তেল ও পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। একই পথে চলত বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই পথকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবেশদ্বারগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সংঘাতের আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য এই পথ দিয়ে যেত। সংকটের প্রথম তিন মাসে তা গড়ে প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে এটি ইতিহাসের বৃহত্তম জ্বালানি সরবরাহ বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। আইইএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকদের সম্মিলিত সরবরাহ ক্ষতি ইতোমধ্যে ১৩০ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়েছে।
বিকল্প পথও সীমিত। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু পাইপলাইন হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহন করতে পারলেও সেগুলোর অতিরিক্ত সক্ষমতা স্বাভাবিক হরমুজ প্রবাহের তুলনায় অনেক কম। কাতারের এলএনজি রপ্তানির কার্যকর বিকল্প সমুদ্রপথ নেই। ফলে একটি অস্থায়ী নৌপথ খুললেও জাহাজে হামলার ঝুঁকি, বীমা ব্যয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা না কমলে স্বাভাবিক বাণিজ্য দ্রুত ফিরবে না।
এখানেই ইরানের শক্তি এবং দুর্বলতা দুটোই রয়েছে। হরমুজ বন্ধ রেখে তেহরান বিশ্ববাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে নিজের তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে সংকট চললে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন, বন্দর ও জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়াবে। তখন হরমুজকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিধা
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি বিপরীত চাপ রয়েছে। একদিকে ইরানের শর্ত মেনে নেওয়া হলে তেহরান এটিকে সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে। হরমুজে ইরানি নিয়ন্ত্রণ বা বাধ্যতামূলক মাশুল মেনে নেওয়া আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের প্রচলিত নীতিরও বড় পরিবর্তন ঘটাবে।
অন্যদিকে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তেল, এলএনজি, জাহাজভাড়া ও বিমার দাম আরও বাড়বে। এর প্রভাব মার্কিন ভোক্তা থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত একটি সমঝোতা চাইতে পারেন। কিন্তু ইরানের সব দাবি মেনে চুক্তি করলে তা রাজনৈতিকভাবে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে।
ফলে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে একটি ধাপে ধাপে ব্যবস্থা: প্রথমে নির্দিষ্ট নৌপথে সীমিত জাহাজ চলাচল, এরপর মার্কিন অবরোধের আংশিক শিথিলতা, ইরানের তেল বিক্রিতে সাময়িক ছাড় এবং পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা। কিন্তু এমন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পারস্পরিক অবিশ্বাস। আগের ইসলামাবাদ সমঝোতা ভেঙে যাওয়ায় নতুন চুক্তির বাস্তবায়ন ও নজরদারির জন্য গ্রহণযোগ্য তৃতীয় পক্ষ প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী
হরমুজ সংকট বাংলাদেশের জন্য দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়। বাংলাদেশের আমদানি করা জ্বালানি তেল ও এলএনজির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বিশেষ করে কাতারের এলএনজি হরমুজ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে আসে। সরবরাহ কমলে বাংলাদেশকে শুধু বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষির ব্যয়ও বাড়বে।
জ্বালানির আমদানি মূল্য বৃদ্ধির অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ, সরকারের ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি। জাহাজভাড়া ও যুদ্ধঝুঁকি বিমার ব্যয় বাড়লে খাদ্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও ব্যয়বহুল হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতও পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পরোক্ষ চাপের মুখে পড়তে পারে।
তাই ঢাকার জন্য শুধু তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। এলএনজির উৎস বহুমুখী করা, জ্বালানির জরুরি মজুত বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে একক আমদানিনির্ভরতা কমানোর প্রয়োজন রয়েছে। হরমুজ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও জ্বালানি নিরাপত্তার এই দুর্বলতা দূর হবে না।
সমঝোতা নাকি নিয়ন্ত্রিত অচলাবস্থা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ পুরোপুরি ও নিঃশর্তভাবে খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো সীমিত বা অস্থায়ী নৌপথ চালু করা এবং তার বিনিময়ে ইরানকে কিছু অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া। কিন্তু নৌপথের নিয়ন্ত্রণ, জাহাজ পরীক্ষা, মাশুল এবং মার্কিন বা মার্কিন-সংশ্লিষ্ট জাহাজের চলাচল নিয়ে বিরোধ থেকেই যাবে।
ইরানের ঘোষিত শর্তগুলো তাই একদিকে দরকষাকষির সূচনা, অন্যদিকে দীর্ঘ সংকটের সতর্কবার্তা। তেহরান যদি হরমুজকে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিরোধ বাড়বে। আর ওয়াশিংটন যদি সামরিক চাপ দিয়েই নৌপথ সচল করতে চায়, তাহলে জাহাজ চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সংকটের সমাধান নির্ভর করবে কে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করবে—এই প্রশ্নের চেয়ে কে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত, তার ওপর। আপাতত কোনো পক্ষই সেই ছাড় দেওয়ার অবস্থায় নেই। ফলে একটি অস্থায়ী সমঝোতা সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূরের বিষয়।
আপনার মতামত জানানঃ