
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ পথে প্রবেশ ও স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়া—ভিসা থেকে গ্রীনকার্ড পর্যন্ত—গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক নির্বাহী আদেশ, প্রেসিডেন্সিয়াল প্রক্লেমেশন এবং প্রশাসনিক নীতিমালা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল কাঠামো, যা লাখো আবেদনকারীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনগুলো ঠিক কী, আর দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এর তাৎপর্য কতটা গভীর?
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিস্তৃত তালিকা এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ১৯টি দেশের ওপর প্রাথমিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির পর, গত ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক নতুন প্রক্লেমেশনের মাধ্যমে সেই তালিকা বাড়িয়ে ৩৯টি দেশে নিয়ে যান, যা কার্যকর হয় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে। এর মধ্যে ১২টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ও অ-অভিবাসী উভয় ধরনের ভিসা সম্পূর্ণ স্থগিত, বাকিদের জন্য আংশিক বিধিনিষেধ। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে পৃথক এক ঘোষণায় ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা (গ্রীনকার্ডমুখী) প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করে, যদিও পর্যটন, শিক্ষা বা কর্মভিসার ক্ষেত্রে এই স্থগিতাদেশ প্রযোজ্য নয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ৭৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে পাকিস্তান, নেপাল, মিশর, ইরাক ও ব্রাজিলের মতো দেশ।
আরও একটি নতুন নীতি সরাসরি বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের ছুঁয়ে গেছে। পর্যটক ভিসার (বি-১/বি-২) আবেদনকারীদের কাছ থেকে জামানত বা “ভিসা বন্ড” আদায়ের একটি কর্মসূচি ২০২৫ সালে সীমিত পরিসরে চালু হওয়ার পর, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে তা আরও ২৫টি দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে—যার তালিকায় বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। এই নিয়মের আওতায় পড়া দেশগুলোর নাগরিকদের কনস্যুলার কর্মকর্তার বিবেচনায় ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতে পারে।
গ্রীনকার্ড প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন এসেছে একাধিক স্তরে। ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) মে মাসে জারি করা এক নীতিমালায় স্পষ্ট করেছে যে “অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস”—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থেকে স্থায়ী বসবাসের আবেদন প্রক্রিয়া—সম্পূর্ণরূপে একটি বিবেচনাধীন (discretionary) সুবিধা, যেখানে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলেই অনুমোদন নিশ্চিত নয়। কর্মকর্তাদের এখন প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে, বিস্তৃত মানদণ্ডের ভিত্তিতে যাচাই করতে বলা হয়েছে। জুলাই মাসের ভিসা বুলেটিনে দেখা যাচ্ছে, ভারতের নাগরিকদের জন্য কর্মভিত্তিক ইবি-২ ক্যাটাগরির গ্রীনকার্ড এই অর্থবছরের বাকি সময়ের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ নির্ধারিত কোটা ইতিমধ্যে পূর্ণ হয়েছে। বিবাহভিত্তিক আবেদনের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি বেড়েছে—মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবেদনকারীদের এখন আগের চেয়ে বেশি সাক্ষাৎকার ও নথি যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কর্মভিসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন এইচ-১বি ভিসার ওপর এক লাখ ডলার ফি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রক্লেমেশনের মাধ্যমে চালু হওয়া এই ফি বিদেশে অবস্থানরত এবং কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদনকারী নতুন এইচ-১বি কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থানরত পুনর্নবীকরণ বা স্ট্যাটাস পরিবর্তনের আবেদনকারীরা এর বাইরে। এই ফি নিয়ে আইনি লড়াই এখনও চলমান—জুনের শুরুতে একটি ফেডারেল আদালত ফি-টিকে বেআইনি ঘোষণা করলেও কয়েকদিনের মধ্যেই একই আদালত সেই রায় স্থগিত রাখে, ফলে আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফি কার্যকর রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ নীতিও এখন ভিসা প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৫ সালের জুন থেকে শিক্ষার্থী ও বিনিময় ভিসার আবেদনকারীদের জন্য শুরু হওয়া এই বাধ্যবাধকতা পরে এইচ-১বি কর্মীদের জন্যও সম্প্রসারিত হয়। চলতি বছরের ৩০ মার্চ থেকে এই নিয়ম আরও ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য হয়েছে—বাগদত্তা ভিসা, ধর্মীয় কর্মী, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার হয়ে সহযোগিতাকারীদের ভিসা ক্যাটাগরি পর্যন্ত এর আওতায় এসেছে। আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরে ব্যবহৃত সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট প্রকাশ করতে হয় এবং সাক্ষাৎকারের আগে প্রোফাইল প্রকাশ্য রাখতে হয়—কোনো অ্যাকাউন্ট গোপন রাখলে বা প্রকাশ না করলে আবেদন বিলম্বিত বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই সামগ্রিক প্রবণতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা একটি সুনির্দিষ্ট দিকে অগ্রসর হচ্ছে—আবেদনের প্রতিটি স্তরে কঠোরতর যাচাই, বিবেচনার সুযোগ সংকোচন, এবং নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য বাড়তি প্রতিবন্ধকতা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এর অর্থ দাঁড়ায় দ্বিমুখী চাপ—একদিকে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিতাদেশ, অন্যদিকে পর্যটক ভিসায় আর্থিক জামানতের নতুন শর্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিগুলো এখনো বিবর্তনশীল—আদালতের রায়, প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করে আগামী মাসগুলোতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বর্তমান প্রবণতা যা নির্দেশ করছে, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের দরজা আপাতত সংকুচিত হওয়ার পথেই রয়েছে, প্রশস্ত হওয়ার নয়।
আপনার মতামত জানানঃ